বিশ্বের আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও উৎকর্ষের স্বীকৃতি হিসেবে জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন বা জিআই ট্যাগ পেল না কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া-সরভাজা। এটা হলে দার্জিলিং চা, পার্মেশিয়ান চিজ কিংবা সুইস ঘড়ির মত বিশেষ অঞ্চলের উৎকর্ষবাহী পণ্যের সঙ্গে একই সারিতে বসতো বাংলা ও বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী দুটি মিষ্টি। এই ট্যাগ প্রদান করে কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রকের অধীন শিল্প প্রসার ও আভ্যন্তরীণ বাণিজ্য দপ্তর। গত ২০১৬ সাল থেকে সরপুরিয়া-সরভাজা জিআই পাবে কিনা তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। শোনা গিয়েছিল এবছর বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দুটি জিআই শিরোপা পাবে, কিন্তু তা হলনা। এই স্বীকৃতি পেলে পণ্যটির আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বাজারে বিপণনের সুযোগ এবং প্রচার ও প্রসার অনেক বেড়ে যেত।

এখনও অবধি আমাদের দেশে জিআই পণ্যের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে কর্ণাটক। বাংলার জিআই প্রাপ্ত উৎকর্ষবাহী সামগ্রী ছিল ২১টি। সরপুরিয়া-সরভাজা সেই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হত। বাংলার জিআই পণ্যগুলির মধ্যে রয়েছে গোবিন্দভোগ চাল, হিমসাগর আম, বালুচরী শাড়ি, কে সি দাসের রসগোল্লা, জয়নগরের মোয়া, শান্তিপুরের তাঁতের শাড়ি, বর্ধমানের ল্যাংচা-মিহিদানা, বাঁকুড়ার ঘোড়া, পিংলার পটচিত্র, ছৌ মুখোশ, কুশমন্ডীর কাঠের মুখোশ, ধনেখালির তাঁতের শাড়ি, নকশিকাঁথা, মেদিনীপুরের মাদুর ইত্যাদি। দার্জিলিং চায়ের জিআই ট্যাগ পাওয়া দিয়ে শুরু হয়েছিল বাংলার উৎকর্ষের এই জয়যাত্রা। কে সি দাসের রসগোল্লার জিআই পাওয়া নিয়ে অকারণ একটা বিতর্ক শুরু করেছিলেন কেউ কেউ, শেষ অবধি বাংলার রসগোল্লাকে রোখা যায়নি। তবে কি সরপুরিয়া-সরভাজার ক্ষেত্রে এইধরণের কোন বিতর্ক উঠলো?

জিআই পাওয়া মানে একটি উৎকর্ষবাহী শিল্পকার্য, কৃষিপণ্য সামগ্রী, খাদ্যবস্তু, ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষদের কাজের সুযোগ ও উপার্জন বেড়ে যাওয়া। এরফলে পণ্যটি বিশ্ববাজারে আরও বেশি পরিচিতি পায়। শিল্পীদের বিদেশে বিপণন ও প্রদর্শনী ইত্যাদিতে যাওয়ার সুযোগ বাড়ে, নতুন নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষাও সম্ভব হয়। এতে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় উৎকর্ষবাহী এই পণ্যসামগ্রীর সঙ্গে যুক্ত শিল্পী ও কারিগরদের। তাদের জীবিকা আরও নিশ্চিত হয়।

জিআই বস্তুত অপরিচয়ের অন্ধকারে ডুবে থাকা এই মানুষগুলির কাজের একটা যোগ্য স্বীকৃতি। এটা কোন লবি করে বা রাজনৈতিক কৌশলে সম্ভব নয়। নিজেদের একান্ত প্রচেষ্টা, ভাবনার অভিনবত্ব, দক্ষতা ও উৎকর্ষ দিয়ে এর সঙ্গে যুক্ত মানুষরা সামগ্রীটিকে বিশেষ করে তোলেন। শ্রেষ্ঠত্বের একটা উদাহরণ হয়ে ওঠে পণ্যটি। উৎকর্ষ ও জনপ্রিয়তা নিয়ে কোন প্রশ্ন না থাকলেও কৃষ্ণনগরের এই দুটি বিখ্যাত মিষ্টির জিআই না পাওয়া নিয়ে মিষ্টান্ন রসিকদের একটা আক্ষেপ থেকেই যাবে।