গিরিধারীকে কেউ গিরিধারী বলে না এ দুঃখ যতটা ওর নিজের তার চাইতে অনেক বেশি ওর মায়ের। গিরিধারী ছাড়া ওর মায়ের আছে তো খানকতক ফাটা কাপড়-শায়া-ব্লাউজ, চারটে ছেঁড়া ময়লা কাঁথা, দুটো ন্যাকড়া-গোঁজা তেলচিটে বালিশ, একটা ছেঁড়া মাদুর, খানকতক অ্যালুমিনিয়ামের তোবড়ানো বাসন আর একটা হুঁকো। আর দুটো বস্তা আছে, ঝুড়িও আছে তিনটে। ঝুড়ি নিয়ে ও কয়লা গোবর কুড়োয়। বস্তাটাই রোজ লাগে। পুরোনো কাগজ, লোহা, টিন, কৌটো এইসব কুড়োয়।
ছেলেটা যখন সবে হাঁটতে শিখেছে তখনই সুরতিয়ার বর দুসরা শাদি করল। নাকি সুরতিয়া গন্ধা! সুরতিয়া কিসে এত গন্ধা হল তা ও বোঝে নি। শ্বশুরবাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে কোনোদিন ও বাহার যায় নি। ঘরেই কামকাজ সারতে সারতে কখন যে সূরয পশ্চিমে ঢলে যেত ও টের পেত না। বাড়ি ভরতি লোক। ভঁঈস! সেসব দেখভাল করা, ঘরদুয়ার সাফসুতরো করা ও-ছাড়া কে করবে। সুরতিয়ার রং কালো হলেও বড় বড় চোখ কাঁধ ছাপানো চুল দেখেই ওরা বহু পসন্দ করেছিল ওর ন-বছর বয়সে। সুরতিয়ার রং কালো কিন্তু মাথা হেলিয়ে দাঁড়ালে যেন পাথরপ্রতিমা। তার যেমন চওড়া কবজি তেমন পায়ের গোছ, ভরাট বুক আর ধীর চলনের ভারী চওড়া পেছন তো এমন ভরা বাড়ির বহু হবারই মতো। মণ মণ গেঁহু হয়। দুধের ফেনা ওপচানো বালতি, এ-ঘর সে-ঘর, এ-দুয়ার সে-দুয়ার এ সবের মাঝে এমন রাজেন্দ্রাণী নারী শরীরই তো মানায়।
কাজেই রং কালো হলেও সুরতিয়ার শাদি হয়। গাওনা হয়।
বাপ পসন্দ করেছিল বহুকে। বাপ যদ্দিন ছিল রাম অবতার কথাটি বলে নি। শাদির সময় তার বয়স তেরো বছর। গাওনা হবার পরেও সে বউকে তেমন করে পায় না। যেন সুরতিয়া তার বউ নয়, তার বাপের বেটার বহু। তার মা তো তার বাপের কথায় ওঠে বসে। তার বাপ যেমন যেমন বলবে তাদের গোটা সংসারটাই তেমন তেমন চলবে। অথচ রাম অবতার দশ ক্লাস পর্যন্ত ইংরেজি স্কুলে পড়েছে, জুলপি কামানো লম্বা চুল রাখে ফিল্মের হিরোর মতো। গিরিধারী জন্মাবার পর থেকেই তার মন উড় উড়ু। ছেলে হামা দিতে শিখলে সুরতিয়ার চোখ থেকে পানি গড়ায়। পিচুটি জমে ওঠে ঘন ঘন। ডাগদর দেখানো হল। ওষুধ খেয়ে আর চোখে আইড্রপ দিয়ে সুরতিয়ার চোখ তখনকার মতো ভালো হল তো শ্বশুর একরাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে সেই যে শুল আর উঠল না।
শ্বশুর মরার পরে ঠিক পুরো একবছরও সুরতিয়া শ্বশুরাল ছিল না। রাম অবতার মাঝে মাঝে ওর বিছানায় রাত কাটাতে আসত। রাম অবতার সে সময়ের আগে বা পরে কোনো কথা বলত না, যেমন ভুখ লাগলে মানুষ খায়, তেমনি গবগবিয়ে খেত ওকে। সুরতিয়ার তাতে দুখ বাড়ত, কিন্তু একটা ভঁঈসের মতোই কালো মস্ত শরীরটা চিত করে ও শান্তভাবে স্বামীকে গ্রহণ করত। পীড়ন করতে দিত। রাম অবতার উঠে গেলে ও কাপড় ছেড়ে, হাত-পা শরীর ধুয়ে আসত কুয়োপাড়ে। অত রাতে জল তোলার শব্দে কেউ জেগে যেতে পারে ভেবে আস্তে জল তুলত। শরীর ঠাণ্ডা হলে ও ফিরে এসে ছেলেকে দেখত ঠিক আছে কিনা।
এভাবেই হয়তো কাটত কিন্তু রাম অবতারের দুসরা শাদির কথা উঠলে সুরতিয়া ছেলে কোলে বাপের কাছে চলে আসে। তার বাপের ছোটবাড়ি, অল্প জমিন, দুটো বলদ আর এক ভঁঈসানী। ভঁঈসানীটা বুড়ি। সুরতিয়া ওর পিঠে চেপেছে বালিকা বয়সে। ওর দুধ খেয়েছে। ওর দুধ খেয়েই তো তার এমন শরীর। ভঁঈসানী এখন দুধ দেয় না। বাপ বুড়ো হয়েছে। মাও জোয়ান নেই। তো সুরতিয়া, এক দুখী আওরৎ তায় কোলে এক বাচ্চা কী করবে? রাম অবতার খোঁজ করতেও এল না। বাপ বলল সে খোঁজ করবে। সুরতিয়া মুখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে বলল, ‘কভী নহী!’
বুড়ো বাপ, বুড়ী মাঈ আর এক বুড়ী ভঁঈসানী তো বেশিদিন বাঁচে নি। একজন একজন করে সবাই মরে গেলে সুরতিয়ার দাদা আসে বাংলা মুলুক থেকে। সে তার বানাবার কারখানায় কাম করে, ওখানে ভঁঈস কিনেছে, জার্সি গাই কিনেছে। কারখানায় কাজ করেও সে এবেলা নয়তো ওবেলা সাইকেলের হ্যান্ডেলে দুধের ক্যান ঝুলিয়ে বাড়ি বাড়ি দুধ বেচে। দাদা এসে সুরতিয়াকে শ্বশুরবাড়ি দিয়ে আসতে চাইলে সুরতিয়া উনুনে লকড়ি গুঁজে দিয়ে দাউ দাউ আগুনের আভায় কালো মুখ রাঙিয়ে বলে, ‘কভী নহী।’
তা দাদা আর কি করে? কীই-বা করতে পারে শিউপূজন। তার তো সময় নেই। তাই সে বাপের ঘর, জমি আর বদল দুটো বেচে বোন আর ভাগ্নেকে নিয়ে রূপনারায়ণপুরে, তার ঘরে এল। সে কোয়ার্টারে থাকে না। চাকরির নিয়ম অনুযায়ী তার প্রাপ্য দু-কামরার ছোট কোয়ার্টার। সেখানে তার পাঁচ-ছটা ছেলেমেয়ে, বউ, দুটো ভঁঈসানী আর একটা গাই তাদের বাচ্চা নিয়ে আঁটবে কী করে? থানার কাছেই তার নিজের ঘর সে বানিয়ে নিয়েছে। একতলা তিন কামরা মস্ত উঠোনের বাড়ি। সেখানে সুরতিয়া আড়াই বছরের গিরিধারীকে নিয়ে বারান্দার এককোণে খাটিয়া পেতে শুল।
বছরখানেক এভাবে তারপর দাদা আর ভাবীর অসুবিধা হওয়াতে সুরতিয়া উঠোনের ধারেই এক ঝোপড়ি ছিল লকড়ী রাখার সেখানে উঠে এল। মাটিতে তালাই পেতে ছেলে নিয়ে নিশিযাপন করে। ছ-সাত বছর বয়স পর্যন্ত গিরিধারী মায়ের আঁচল ধরেই ঘোরে। তারপর সুরতিয়া ওকে স্কুলে দেয়। কারখানার বাংলা মাধ্যম স্কুলেই দেয়। বাংলা মুলুকে ছেলে বড় হচ্ছে বলেই হয়তো। তা সে স্কুলেই গিরিধারী তার নতুন নামটি পায়। কোনো এক পরিহাসপ্রিয় দিদিমণি তাকে এই বলে সম্বোধন করলে সারা স্কুলের ছেলেমেয়েরা ‘গিদ্ধর’ ‘গিদ্ধর’ বলে ওর পেছনে ছোটে। তা সে স্কুলে গিরিধারী থাকে কী করে?
মা বস্তা নিয়ে কাগজ, টিন, লোহা কুড়োতে পথে নামে। ছেলে সিগারেটের পুরোনো প্যাকেট নিয়ে তাস খেলে। মা ঝুড়ি নিয়ে লাইনের ধারে ধারে কয়লা কুড়োয়। ছেলে কয়লার ঝুড়ি ঘরে দিয়ে আসে। দিনমানে যেমন তেমন ভাত জোটে কি জোটে না, সন্ধেবেলা উনুন ধরালে ছেলে বলে, ‘মা, আলু ভরকে রোটি বনা।’
এই স্পেশাল রুটি বানানোতে সুরতিয়া গিরিধারীর মা হয়ে ওঠে। শীতের হিম হিম সন্ধ্যায় কাঁথা জড়িয়ে উনুনের ধারে বসে গিরিধারী। সুরতিয়া একটা বড় অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে দুটো বড় বড় আলু চার টুকরো করে খোসাসমেত সেদ্ধ করতে দেয়। তারা ভাঙা বাংলা আর মুলুকের হিন্দি মেশানো ভাষায় ছেলেকে গল্প বলে— কখনো কোনো শোনা কাহিনী তার মুখে নতুন আদল পায়, যে গল্প সে শুনে এসেছে তার মায়ের ওম জড়ানো কোলটিতে বসে বা নানীর ডাল বাছার ফাঁকে ফাঁকে সেই সব হনুমানজি, রামজি, লছমনজি আর সীতামায়ীর কাহানী তার মতো করে নিচু গলায় বলে যায়। কখনো তার নিজের ছেলেবেলায় গল্প মনে পড়ে, তার বাপের জমি আর খেতের ওপর দিয়ে ছুটে যাওয়া দুপুর। কুয়োতলার জল আনার গল্প, মল বাজিয়ে বাজিয়ে জল আনার গল্প, ভঁঈসানীর পিঠে চড়ে বেড়াবার গল্প।
ছেলে বলে, ‘মাঈ তব তোহরা শাদি ভঁঈলবা?’
মায়ের মুখে একটু লাজুক হাসি ফোটে— বুঝি-বা কিশোরী সুরতিয়ার আদল পায় তার ভাঙা প্রতিমাস্বরূপ মুখখানি। সে একটু উদাস হয়ে যায়। বিয়ের দিনটি তার তেমন করে মনে পড়ে না। যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই তার বিবাহপর্ব পার হয়ে গেছে। আলো, বাজনা, নতুন চেলির খসখস শব্দ, কিশোর বরের অপরিচিত মুখটি যেন স্বপ্ন। বহুত মিঠি সপনা। ‘রৈন কা সপনা’। এসব তার মনে যেন আবছা ছবি হয়ে আছে। জল রঙের ধোওয়া ছবি। সে ছবির কোনো রেখাই স্পষ্ট নয়। সে ছবির কোনো রংই আলাদা করে বোঝা যায় না। তবু সে তো ছবিই। রং রেখা আলাদা করে বোঝা না গেলেও সে ছবির একটা স্বপ্নিল দূরত্ব আছে। রহস্য আছে। মাধুরিমা আছে। নইলে সুরতিয়া খসে পড়া ঘোমটা মাথায় নতুন করে তোলে কেন? তার বড় বড় রক্তাভ চোখের কোণে জমা পিচুটি মুছে নেয় উঁচু হওয়া হাঁটুর কাপড়ে। ছেলের উৎসুক ব্যগ্র মুখখানির দিকে তাকিয়ে তার তরুণ স্বামীর প্রেমময় দুই বাহু আর দশ আঙুলের সোহাগ মনে আসে। এত কম, এত কম পেয়েছে সুরতিয়া যে তার মনে যেন ওই কটা মাসের প্রতিটি মুহূর্ত ক্ষোদিত হয়ে আছে। প্রাচীন কোনো শিলালিপির মতো ধূলিজড়িত তবু সেই অক্ষর যা শুধু সুরতিয়াই পড়তে পারে। লেচির ভেতরে মশলা দেওয়া আলুসেদ্ধ পুরে দুই করতলের চাপড়ে সেটাকে চেপ্টে বড় করতে করতে বলে, ‘হাঁ বেটা, তব হাম শ্বশুরাল গঈ!’
ছেলে বারো-তেরো বছরের হল তবু সুরতিয়া ওকে কোনো কাজে দেয় না। তবে ও নিজে একটা কাজ পায়। জল তোলা। বর্তন আর কাপড়া উপড়া সাফ করার কাজ। ঝাড়ু দেবার কাজ। কাজটা পায় ও মঈনুদ্দীন শাহেবের বাড়ির পেছনে কাগজ কুড়োতে গিয়ে। মঈনুদ্দীনের বড়মেয়ে হাসিনা মুরগি খুঁজতে গিয়ে ওকে দেখে। হাসিনা মাধ্যমিকে অঙ্কে ব্যাক, সেলাই জানে বিস্তর। সে দৌড়ে মাকে বলে, ‘আম্মা একজন লোক রাখবেন, কাজের?’
মঈনুদ্দনী শাহেব ফুট ইন্সপেক্টর। তাঁর তিন পুত্র ও সাত কন্যা। এদিকে মেয়েদের তিনি স্কুলে দিয়েছেন। বড়ছেলে আমিনুদ্দীন কলকাতায় কলেজে পড়ে। মেজ রহিমউদ্দীন ক্লাস এইট আর ছোট নাসিউদ্দীন সবে থ্রিতে উঠেছে। তাঁর স্ত্রী প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। মেয়েরা বড় হওয়াতে আর বাধ্য হওয়াতে রান্না বাদে সবই চলে যায়। বউ-এর হাতের রান্না ছাড়া মঈনুদ্দীন শাহেবের চলে না। তাই ফতিমা টুলে বসে রান্নাটা নিষ্ঠার সঙ্গে করেন। তাতেই তিনি বিকেলে কোমরের ব্যথায় প্রায় উঠতেই পারেন না। মেয়েরা বিকেলে খালি ভাতটুকু করে।
তা এতসব ঘরের কাজ করলে মেয়েগুলো পড়বে কখন? সেজমেয়ে রোশেনারা এরই মধ্যে সময় করে নেয়। সে একটু দুবলা পাতলা বলে বোনেরাও তাকে এই কনসেশনটুকু দেয়। ফলে রোশেনারা ক্লাস নাইনে ওঠে ফার্স্ট হয়ে। বিকেলে সাইকেল চালিয়ে রায় স্যারের বাড়ি অঙ্ক কষতে যায়।
ফতিমা প্রথম যখন আসেন তখন তাঁর কোলে-কাঁখে পরপর সন্তান। পেটেও সন্তান। দেশ থেকে একটা কাজের মেয়ে, দশ-এগারো বছরের সঈদাকে এনেছিলেন বলে তাঁর অসুবিধে হয় নি। কিন্তু সঈদা তো একটা মেয়ে। তাকে তো তার বাপ-মা একদিন বিয়ে দিতেই পারেন। তেমনি একদিন সঈদাকে দেশে চলে যেতে হয়। তখন ফতিমাকে কাজের লোক খুঁজতে হয়। আর খুঁজতে খুঁজতে তিনি আবিষ্কার করেন এখানে পয়সা দিয়েও কাজের লোক, তাও শুধু বাইরের কাজ করার লোক পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনিতে যারা বাড়ি বাড়ি কাজ করে সেই বাউরিরা মুসলমানের বাড়ি কাজ করবে না। তাদের মরদরা বাগানটাগান সাফ করা কি জল তুলে দিতে রাজি হলেও মেয়েরা নাকি মুসলমানের এঁটো মাজবে না। এমনকি কোনো ডিহি গ্রাম থেকে কাঁকালে মুড়ির বস্তা নিয়ে যে প্রৌঢ়া তিলি রমণীটি আসে সেও মুড়ি মাপবার সময় উঁচু থেকে আলগোছে মুড়ি ঢেলে দেয় মুড়ির টিনে পাছে তার মুড়ি মাপার পাইটি ছোঁয়া যায়? ফতিমা পরে জেনেছে এরা নাকি বাউরিদেরও ছোঁয় না। চাষের জমিতে যে ধান হয় তাতে সংবছরের খোরাকটুকু চলে, বাদবাকি ডাল তেল নুন মশলা চা চিনি জোটাতে বাড়ির মেয়েছেলেদের বস্তা কাঁখে সাত জাতের ছোঁওয়া বাঁচিয়ে মুড়ি বিকুতে হয়। ‘তবে কি ছোঁয়া বাঁচে মা? তাই ঘরে ঢোকার আগে পুকুরে ডুব দিয়ে নিই।’
কাজে কাজেই গিরিধারীর মাকে পেয়ে ফতিমা হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন।
সুরতিয়াও খানিকটা বাঁচে যেন। রোজ কয়লা কুড়িয়ে বেচতে বেচতে তার দেরি হয়ে যায়। সারাদিন কৌটো লোহা কাগজ কুড়িয়ে হপ্তা শেষে আগে বরাকর যেত বেচতে তো এখন রূপনারায়ণপুরেই এসব পুরোনো লোহালক্কড় বেচার দোকান হয়েছে। এখন একটা মাসমাইনের কাজ পেয়ে ও দিন গুনতে শুরু করে কবে রূপেয়া পাবে। পুজোর কত দেরি। এরা পুজোতে কাপড় দেবে না, ঈদে দেবে। সুরতিয়াকে ওরা বলেছে আর দুমাস পর রোজা রাখবে ওরা এক মাহিনা তক। তারপরে চাঁদ দেখে নামাজ পড়বে। খানাপিনা হবে। নতুন কাপড় হবে। তখন সুরতিয়াও অনেককাল পরে নয়া শাড়ি পিনবে। সে ঠিক করেছে যে করেই হোক রূপেয়া পেলেই ছেলের জন্য নয়া পিরান কিনবে। প্যান্ট ভী কিনবে। তার অমন রাজার বেটার মতো ছেলে কিনা ফাটা ময়লা গেঞ্জি পরে, তাপ্পি দেওয়া পরের প্যান্ট পরে শুকনো মুখে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে! সুরতিয়া ভাবী তার ছেলের দুটো একটা ফাটা শার্ট কি প্যান্ট নয়তো গেঞ্জি গিরিধারীকে দেয়। তাকে দিয়ে এটা-ওটা ফাই ফরমাশ খাটিয়ে নেয়! তার নিজের ছেলে বড় ইসকুলে পড়ে ঠিকই কিন্তু সে খুব পিকচার দেখে স্কুল পালিয়ে। সিগ্রেট ভী পীতা— এসব সুরতিয়া জানে। তাই গিরিধারী যখন মাকে কখনো মামীর দেওয়া শার্ট প্যান্ট দেখায় আর ভাইয়ার গল্প করে, ভাইয়া কীরকম সব ফিল্ম গানা গাইতে পারে, ডায়ালগ বলতে পারে অমিতাভজির মতো তখন সুরতিয়া সত্যিই রেগে যায়।
‘ই তো ঠিক বাত কে তু গিদ্ধর হায়! উ সব হাম জানতী হ্যায়, ফেক দে ও কামিজ। কেয়া তু উসসে ফির ভিখ মাঙগা?’
এখন সুরতিয়া নিজের পয়সা দিয়েই ছেলেকে জামা-প্যান্ট কিনে দিতে পারবে।
রমজান মাস শুরু হয়েছে। সুরতিয়ার কাজ বেড়েছে। ওকে ভোরে আসতে হয় কাজে। ফলে কয়লা কুড়োতে দেরি হয়। ফতিমার আবার ঘর ঝাঁট দিয়ে মুছলে মন ওঠে না। রোজ তিনখানা ঘর, দুটো বারান্দা, কুয়োতলা, উঠোন জল দিয়ে ধুয়ে মোছা চাই। বড় চৌবাচ্চা দুবেলাই খালি হয়ে যায়। দুবেলাই ভরতে হয়। মুরগির ঘর সাফ করতে হয়। কাপড় কাচতে হয় বড় দুবালতি। ফতিমার নিজের, মঈনুদ্দীন শাহেবের লুঙি পাজামা গেঞ্জি পাঞ্জাবি রোজ সাবান কাচা। মেয়েরা আগে নিজেরাই সালোয়ার কামিজ কাচত এখন সুরতিয়ার মতো কামিন থাকতে তারাও বালতিতে এসব ভিজিয়ে দেয়। ফতিমার বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, কাঁথা, টেবিলক্লথ সব হাসিনার হাতের তৈরি। আব্বা শাদা পছন্দ করেন বলে নানান নকশার এইসব কাচাকাচিও ফিস এতোয়ার সাফ করতে হয়। ফতিমা মাঝে মাঝে ভাত দেন সুরতিয়াকে। ও কুয়োপাড়ে বসে চোরের মতো খেয়ে নেয়। সেদিন কোথা থেকে গিরিধারীও জুটে যায়। দু-চার গ্রাস খেয়ে মা ছেলের দিকে সানকিটা ঠেলে দেয়— ‘খালে বেটা মামাকো মত বোল!’ হুস হাস করে গিরিধারী সানকি খালি করে, লাল দাঁত বের করে বলে, ‘মা তানি পানি দে।
রেহানা বলে, ‘ও মা, তুমি তো কিছু খেলে না খালি খালি পানি খেলে কি পেট ভরে?’ তখন গিদ্ধর কি মাঈ হয়ে যায় সুরতিয়া। বোঝে পেটের ভেতরে মোচড়াচ্ছে। ঘোমটাটা টেনে নাবায় কপালের ওপর। বলে, ‘দিদি ফেন আচে?’
‘কেন? ও হো ভাতের ফ্যান? তুমি খাবে? দাঁড়াও আম্মাকে বলছি!’
যাটি ভরে ফ্যান নিয়ে আসে রেহানা— তারপর কৌতূহলে দাঁড়িয়ে থাকে সুরতিয়ার সামনে। মানুষের ফ্যান খাওয়া দেখবে বলে ন-বছরের রেহানা ওর সামনে থেকে চলে যেতে পারে না। ‘নিমক দিবি দিদি?’ সুরতিয়ার দুই করতল গরম হয়ে ওঠে ফ্যানের তাপে। জিভ ভিজে যায় লালাক্ষরণে।
রেহানা ছুটে নুন আনে চামচে করে। বলে, ‘দাড়াও আমি ঘুঁটে দিই। রাখো, বাটিটা মাটিতে রাখো।’ হাঁটু ভেঙে বসে রেহানা, নুন মিশিয়ে দেয় ফ্যানের বাটিতে। আর অমনি হাঁটু গেড়ে বসে থাকে। চামচ হাতে সুরতিয়া বাটি তুলে তৃষ্ণার্ত গাভীর মতো চুমুকে চুমুকে বাটি নিঃশেষ না করা পর্যন্ত। এমন আশ্চর্য ঘটনা আম্মাকে বলাতেও তিনি বিন্দুমাত্র অবাক না হলে রেহানা দৌড়ে দিদির কাছে যায়, ‘বড় আপা, গিরধারীর মা ফ্যান খেয়েছে।’ হাসিনার মুখটা করুণ হয়ে যায়। সেলাই থেকে চোখ না সরিয়েই বলে, ‘ও খুব গরিব। খেতে পায় না তাই খেয়েছে। তবে ফ্যান খাওয়া ভালো— ভিটামিন আছে।’
রেহানা বলে, ‘তবে আমরা খাই না কেন? আমরা তো ছাগলকে দিতাম। দিতাম না?’ হাসিনা একটু মুশকিলে পড়ে। এমন পুষ্টিকর খাদ্য নিজেরা না খেয়ে ছাগলকে দেয়ার কারণটা ও ঠিক চট করে বানাতে পারে না। এমন শুষ্টিকর খাদ্য, গরিব যারা, খেতে পায় না বলে তারাই খায়, চেয়ে চেয়ে খায় এ ব্যাপারটাও যুক্তি দিয়ে সাজানো কঠিন। তার চাইতে সত্যি বলা অনেক সোজা। কিন্তু সেই সত্য কথন রেহানার কৌতূহল মেটালেও হাসিনার নিজের সইবে না। তাই সে বোনকে বলে, ‘তোমার পড়াশোনা নেই? এখনো পর্যন্ত একদিনও রোজা রাখ নি মনে আছে? যাও পড়তে বোস, নয়তো তোমার স্কুলের ক্রাফট নিয়ে এসো।’
রেহানা প্রায় নাচতে নাচতে বেরিয়ে যায়। দেশলাই বাক্স, আঠা, জরি, চুমকি আর পুঁতি নিয়ে আসে। ওয়াল হ্যাঙ্গিং তৈরি করতে হবে।
রোজার কদিন সন্ধেবেলা আসতে হয় সুরতিয়াকে। বেগুনি, আলুর চপ, মিষ্টি, মুড়ি খাওয়া হয়। লুচি পরোটা তরকারি তৈরি হয় কোনোদিন। সবার খাওয়া হলে সুরতিয়া বাসন মেজে ডাকে— ‘হে, মাঈজী হামি বাসন মেসে দিয়েসে!’ রেহানা দৌড়ে আসে এক ঠোঙা খাবার নিয়ে। সুরতিয়ার আঁচলে দিয়ে দেয়। খুব করুণ মুখে বলে, ‘আজ ফ্যান নেই!’
গিরিধারী একদিন বলে, ‘ভাত দে, হররোজ, চুপ মুড়ি আচ্ছা নহী লাগতা।’
সুরতিয়া মুশকিলে পড়ে। রাতে সে উনুন ধরাচ্ছে না। দিনের বেলা কাঠকুঠো জ্বেলে আলুভাতে ভাত রেঁধে মায়-ব্যাটায় খায়। রোজ ভরপেট ভাত হয় না। গত দুমাসের মাইনে থেকে সে ছেলের জামা কেনার পয়সা রাখতে পারে নি। সে মনে মনে ভেবেছে পরবে বখশিস পেলে কিনবে। ছেলের কথায় সে চুপ করে থাকে। গিরিধারী বলে! ‘ভাত না দিবি তো রোটি পাকা। আলু ভরকে রোটি হামরা বহোত পসন্দ। বহুত আচ্ছা লাগতা!’
‘কাল দেগা বেটা, অব শো যা।’ মাত্র এটুকুই বলে সুরতিয়া।
নতুন কাপড় পাবার আগে সুরতিয়া একপ্রস্থ পুরোনো শাড়ি ব্লাউজ পায় মনিব বাড়ি থেকে এই শর্তে যে ও সেগুলো পরেই কাজ করতে আসবে। হাসিনা বলে, ‘আম্মা ওকে আমার এই ছাপা শাড়িটা দিই। আমার ব্লাউজ হবে না সালমার ব্লাউজ হবে মনে হয়। যা নোংরা জামাকাপড়ে আসে দেখলে ঘেন্না হয়।’ পরিষ্কার শাড়ি গোড়ালি পর্যন্ত নাবে সুরতিয়ার! তাতে পায়ে জার্মান সিলভারের মল দেখা যায় সালমার খুব ছটফটে উচ্ছল স্বভাব— একটানে সুরতিয়ার ঘোমটা নাবিয়ে দিলে ওর কাঁধের একটু ওপরে ঝুলে থাকা ছোট চুল বেরিয়ে পড়ে। রেহানা হাসিতে ফেটে পড়ে, ‘বড়বু, দেখুন এ যে একেবারে বয়কাট চুল! মুখখানা লম্বাটে— আমি এর নাম দিলাম রিনি সাইমন! শুধু চোখ দিয়ে যদি…।’ হাসিনা হাসি চেপে বলে, ‘তুমি কি চুল কেটেছ?’
সুরতিয়া নির্বোধের মতো হাসে, ‘নহী দিদি, হামরা তো অ্যায়সে হী…।’
আজ কাজে যায় নি সুরতিয়া। বাড়িতেই হাসিনার দেওয়া শাড়ি ব্লাউজ পরে মুখখানা গামছায় মুছে নেয়। হাতদুটো আজ এতদিন পর ওর ন্যাড়া ন্যাড়া লাগে। হাতে কোনো চুড়ি পরে না ও। গলায় একটা স্টীলের চেন আছে। কানেও কিছু নেই। কিন্তু ছেলের সামনে এখন নতুন করে এসব পরা যায় না। তার ছেলে খুব হুঁশিয়ার লেড়কা— ঠিক বুঝে ফেলবে আজ মামা ডেকেছে ওর বাবুজি এসেছে পাটনা থেকে ওদের নিতে তাই মায়ের এত সাজ।
সুরতিয়া তো রাম অবতারের চেহারাই ভুলে গেছে। ছেলে বছরখানেক হতেই ও চলে এল তো সেই ছেলেরই বয়স এখন তেরো-চোদ্দ। তেরা সাল বাদ ওর মরদ কেন এল ও বুঝে উঠতে পারে না। তার ঝোপড়ি এক উঠনে হলেও তাকে রাস্তা ঘুরে সামনের গেট দিয়ে বাপের ঘরে ঢুকতে হয়। বাপ নেই, মা নেই, তাই উঠোনের দিকে দেয়াল তুলে দিয়েছে বড়ভাই। ভাবী বলে, নাকি দাদার বিজনেসের পার্টি আসে সুরতিয়ার ঝোপড়ি দেখা গেলে ওদের লজ্জা হবে। তাছাড়া তাতে সুরতিয়ারই নাকি ভালো হল একদিকে পাকা দেয়াল পেল। দাদা টালির ছাদ করে দেয় তার আদরের বোনটিকে। অন্য তিনদিকে ইটের দেয়াল করে দেয় মাটির গাঁথনিতে। কেরোসিন তেলের টিন পিটিয়ে চ্যাপটা করে দরজা করে দেয়। ভাবী নথ নেড়ে বলে, ‘বহুত রূপিয়া খচ হো গলবা।’
দাদার উঠোনে চাপাইতে দাদা আর রাম অবতার বসে সিগারেট খায়। অনেকদিন পর সুরতিয়া আর গিরিধারী ভরপেট ভাত, ডাল, ভাজি, তরকারি, আচার খায়। মামা গিরিধারীকে ডাকে। গিরিধারী ভয় আর বিস্ময়ে এগোয়। বাপ্ এই লম্বা চওড়া আদমী ওর বাবুজি? কেমন গোঁফ, কেমন ধবধবে পিরান আর চুস্ত পরা, কেমন জুতো, হাতে ঘড়ি, গলায় সোনার হার। মামা চোখ ইশারা করলে গিরিধারী বাপের স্ফীত দুই পায়ের পাতা স্পর্শ করে। কী পরিষ্কার পা যে বুড়ো আঙুলের গোড়ায় ঘন লোম ঘাসের মতো উঁচিয়ে আছে ও দেখে।
ভাবী বললেও সুরতিয়া ওঠে না। একগলা, ঘোমটার নীচে ঠোঁট টিপে বসে থাকে কাঠ হয়ে। ভালো মন্দ, ভয় আনন্দ, তার কোনো অনুভূতিই জাগে না। শুধু উৎকর্ণ হয় ও যেন একটা শব্দও শ্রবণের বাইরে যেতে না পারে।
কিন্তু রাম অবতারের কথা শুনে ও মাথা নাড়ে ‘কভী নহী, কভী নহী, মেরা বেটা, গিরথ্র মেরা বেটা হ্যায় যবসে হাম ঘর ছোড় কর চলী আঈ উস দিনসে ও সিরেফ মেরা বেটা হ্যায়। অউর কিসিকা কুছ নহী।’ এপক্ষে রাম অবতারের সাতটি মেয়ে। তাদের কারো করো বিয়ে হয়ে গেছে। সে তাই ছেলেকে নিয়ে যেতে চায়। তার এত জমিন, বাড়ি এসব কে দেখবে তা না হলে? ও বরং সুরতিয়াকে কিছু টাকা দিয়ে দেবে। তাছাড়া সুরতিয়া মুসলমান বাড়িতে কাজ করছে। রাম অবতার তার ছেলেকে কী করে মুসলমান বাড়িতে কাজ করতে দেয়? দেশে জানলে কেউ তার হাতে জল খাবে?
ঝমঝম পা ফেলে ও ঝুপড়িতে চলে আসে। পারলে ভাত তরকারি উগরে দেয় কেননা দাদা আর ভাবীও বলে এটা গিরধারীর পক্ষে ভালো। সুরতিয়ার পক্ষেও ভালো। না হয় রাম অবতার মাসে মাসে ওকে টাকা দেবে। গিরধারী কত আরামে থাকবে সেটা সুরতিয়া ভাবল না?
বিকেল পর্যন্ত গিরিধারী ওখানেই থাকল। সন্ধেবেলা এসে মাকে দেখাল নতুন জামা-প্যান্ট বাবুজি কিনে দিয়েছে। সুরতিয়ার ভেতরটা শুকিয়ে গেছে। ও উঠে হুঁকো সাজে। তামাকে ধোয়ায় ওর মাথাটা হালকা হয়।
রাতেও ছেলে মামার বাড়ি থেকে খেয়ে আসে। মাকে বলে, ‘বাবুজি হামকো লে যায়েগা!’ ‘তো ফির যা উসকা সাথ!’ সুরতিয়া শুয়ে পড়ে।
‘ও তো আচ্ছা আদমী। তুভী চল হমারা সাথ!’
‘নহী!’
‘কাহে?’
‘ও হামকো যানে নহী বোলা!’
‘তো হমভী নহী যাউঙ্গা।’ বলে মাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে গিরিধারী!
সুরতিয়া উঠে ছেলের শিয়রে বসে। হুঁকো সাজতে ইচ্ছে করল না বলে বিড়ি ধরায়। ও তো সতীনের ঘর করবে না বলে অমন শ্বশুরবাড়ি স্বেচ্ছায় ছেড়ে এসেছিল। আজ তেরো বছর পরে সেই শ্বশুরবাড়িতে ওকে যেতে বললেও ও যেত না। কিন্তু ওর বর তো তা বলে নি। এখন তার শরীর শুকিয়েছে। সে আর জোয়ানী নয় তবু তো সে এখনো অওরৎ। কিন্তু সে যে অওরৎ একথাটা কেউ ভাবে নি। হয়তো সে নিজেও ভাবে নি। সে তো এখন শুধু গিরিধারীর মা। গিধারী কী মাঈ। তাই ছেলে ঘুমোলেও সে ঘুমোতে পারে না। যেন কেউ আসবে তার বেটাকে নিয়ে যেতে তাই সে ছেলের শিয়রে নিশি জাগে। বাইরে আকাশ জাগে। তারারা জাগে। হাওয়ারা ছোটাছুটি করে জাগে। শব্দহীন আনন্দে শাদা ফুলগুলি ফুটে ওঠে। গাছেরা পাতা দিয়ে ঘিরে রাখে তাদের। মাটির গভীর থেকে উঠে আসে কেঁচো, পিঁপড়ে। আরশোলারা দেয়ালের ফুটো থেকে, রান্নাঘরের আনাচকানাচ, ফাটল থেকে খরপায়ে বেরিয়ে আসে। মাঠের গর্ত থেকে ইঁদুর বেরিয়ে আসে। হেলেদুলে এঁকেবেঁকে কোনো সরীসৃপ চলে যায়।
সুরতিয়া যেন একা জাগে না। এইসব প্রাকৃতিক জীবও জাগে। কার সাধ্য তার ছেলেকে নিয়ে যায় এমন জাগরণ থেকে?
সারাটা রাত সুরতিয়া গিরিধারীর মা হয়ে জেগে থাকে।
মেয়েদের সকালে স্কুল বলে ফতিমা এমনিতেই ভোরে ওঠেন। এখন রোজার মাস বলে রাত তিনটের সময় উঠে হিটারে ভাত রাঁধেন। ছেলেমেয়েরা যারা যারা রোজা রাখবে তারা, তিনি নিজে আর মঈনুদ্দীন শাহেব দুধ ভাত খেয়ে নেন আলো ফোটার আগেই। ঢকঢক পানিন খেয়ে নেন যতটা পারেন। সাহানা ক্লাস সেভেনে পড়ে, খুব শক্তসমর্থ বড়সড় চেহারা এবছর প্রথম থেকেই রোজা রাখছে। নাসিরউদ্দীন থ্রিতে পড়ে সেও একদিন কামাই করে নি। সে রোজ সন্ধেবেলায় কুর্তা পাজামা পরে, মাথায় শাদা নেটের কাজ করা টুপি, কোরান পড়ে। তার নিষ্ঠা, স্মৃতি আর বুদ্ধি দেখে মঈনুদ্দীন ভাবে ওকে মাদ্রাসায় পড়িয়ে মৌলবী করলে হত। কিন্তু তিনি পরিবর্তমান দুনিয়াকে ঠাহর করে দেখেছেন ইংরাজি শিক্ষাই ভালো। তিনি নিজে ভালো উর্দু জানেন তার বিবিও জানেন তাতেই নাসিরের চলবে এটা তাঁর মনে হয়।
দরজা খুলে একে একে বোনেরা বেরিয়ে আসে। ক্লাস টেনের আমিনা, নাইনের রোশেনারা, সেভেনের সাহানা আর ক্লাস ফোরের রেহানা। সবচেয়ে ছোটো পাঁচ বছরের সুলতানা, সে মায়ের পাশে ঘুমোয়। ফতিমা একটু শুয়ে নেন এসময়। হাসিনাই সামলায় বোনেদের স্কুল-যাওয়া পর্বটা।
‘এ কি! এত ভোরে তুমি কেন?’ আমিনার পেছন পেছন বাকি বোনেরা গলা বাড়িয়ে দেখে বাইরের বারান্দায় চট পেতে চাদর মুড়ি দিয়ে গিরিধারী ঘুমোয়। তার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে ওর মা। সূরতিয়া জোড়হাত করে। তার বর আজকের রাতের গাড়িতে মুলুক যাবে ততক্ষণ তার ছেলেকে যেন এই বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়।
হাসিনা বোনেদের বলে, ‘তোমরা যাও, বাস চলে যাবে। আমি আব্বাকে জিগ্যেস করছি।’ ভেতরে গিয়ে হাসিনা দেখল আব্বা ওজু করছেন। ও জানে এতে তাঁর পনেরো মিনিট লাগবে। এই হাত ধুচ্ছেন তো ধুচ্ছেনই। সেই পা ধুচ্ছেন তো ধুচ্ছেনই। কুলকুচো করছেন তো করেই যাচ্ছেন। ওঁ মায়ের কাছে যায়।
‘আম্মা?’
ফতিমা ধড়ফড় উঠে বসেন। সব শুনে বলেন, ‘আহা, থাকুক আজ। কত কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করছে তাকে নিয়ে গেলে ও বিটি আর বাঁচবে না।’
হাসিনা বিরক্ত হয়, ‘কোথায় থাকবে অতবড় ছেলে? তার ওপরে চোর কিনা কে জানে।’ সে উপায়ও ফতিমা বাতলে দেন; ‘মুরগির ঘরটা ওকে দিয়ে সাফ করা আজ। চৌবাচ্চায় পানি ভরুক। পেছনের বাগানটা সাফ করুক। কাজেকম্মে থাকলে ভালো থাকবে। সন্ধেবেলা দুটো টাকা দিলেই হবে।’
সন্ধেবেলা চা খাবার খেয়ে দুটো টাকা পকেটে রাখে গিরিধারী। তার জীবনের প্রথম উপার্জনের টাকা।
আঁচলে গিঁট দেখে সুরতিয়ার বুক ধ্বক করে ওঠে। ও বালতির জলেই টিপে দেখে আঙুল দিয়ে— নোট! খুচরো টাকা নয়। পয়সাও নয়। কাপড় কাচার সময়, হাসিনা, বেশিরভাগ দিন দাঁড়িয়ে থাকে। যতক্ষণ কাপড়ে সাবানের ফেনা থাকবে ততক্ষণ জলে ধুতে হবে। যখন একটুও ফেনা থাকবে না তবে নিজে বালতি ভরে নিয়ে তারে টানটান মেলবে। ক্লিপ আটকাবে। আজও হাসিনা দাঁড়িয়ে। এদিকে বালতির ভেতরে জলের মধ্যে দুহাত ভরে দিয়েছে সুরতিয়া। কচলাতে কচলাতে গিঁট খুলে নোট দুখানা বের করে নেয়। কত টাকার নোট ও বুঝল না তবে বড়। ডান হাতের মুঠোয় দোমড়ানো নোট নিয়ে ও একবার ভাবল বলে মাঠে যাবে। কিন্তু তাতে পরে খোঁজ খুঁজি হলে সন্দেহ হবে ভেবে ও হাতটা উঠিয়ে পা চুলকোবার জন্য নিচু হল। আর শাড়ির ঘেওর নিচু হয়ে পা ঢাকল। ও পায়ের তলায় চাপা দিল টাকাটা। হাসিনা বালতি নিয়ে বাইরের তারে কাপড় মেলতে গেলে ও এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। উঠোনের কোণে জড়ো করা কাগজ কুচি, ঠোঙা আর ময়লার মধ্যে নোট দুটো, লাল দেখে বুঝল কুড়ি টাকার দুখানা নোট, রেখে দিল। এই ময়লাগুলো ঘর ধোওয়া মোছা হলে, ওই বাইরে ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে যাবে।
ঘর মুছতে মুছতেই সুরতিয়া শুনতে পেল ফতিমা টাকা খুঁজছেন। হাসিনা, উত্তেজনায় লাল মুখ ওকে জিগ্যেস করে, ‘এ্যাই গিরধর কি মা তুমি আঁচল খুলে দুটো কুড়ি টাকার নোট নিয়েছ?’ ‘না, মা, হামি নেয় নি।’
‘তুমি নাও নি তো কে নিয়েছে? বলো কোথায় রেখেছ?’ হাসিনা বলে।
‘হামি নেয় নি মা তো ফির কাঁহাসে দেব?’
‘মিথ্যে বোলো না।’ ফতিমা মেয়ের পেছনে দাঁড়ান।
‘সাচ বলচি মা, হামি টাকা দেখে নি।’
ফতিমা বলে ওঠেন, ‘তুমি আমার মাথাটা খারাপ করে দেবে দেখছি।’
সুরতিয়া ঝট করে শাড়ি খুলে ফেলে ঝাড়ে, ‘দেখো, হামরা পাশ রূপোয়া কাঁহা, দেখো।’ হাসিনা বলে, ‘কাপড় খুলছ কেন অসভ্যের মতো। আম্মা ওর কাছে নেই। ও কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। শিগগির বলো নইলে পুলিশে দেব। আব্বা আসুন আগে।’
সুরতিয়া ভয় পায়। চুরি যে ও করে না তা ঠিক নয়, তবে টাকাপয়সা কোনোদিন চুরি করে নি। টুকটাক জিনিশ চোখের সামনে পাহারাহীন থাকলে ও তো সেটা নিতেই পারে বলে ওর মনে হয়। এভাবে ও ভাবীর চারটে চামচ সরিয়ে বিক্রি করেছে। মঈনুদ্দীন শাহেবের বাগানে এটা-ওটা লোহার জিনিশ যা পড়েছিল, এ কয়েক মাসে তা পুরোনো লোহা-লক্কড়ের দোকানে চলে গেছে। একটা কাঁসার ঝিনুক পড়েছিল আলমারির পেছনে সেটাও ও বেচে দিয়েছে। কিন্তু এসব ও খুব সাবধানে করে। রাস্তায় আগের মতো ঘুরে ঘুরে জিনিশ কুড়োতে পারে না সে তো এখানে কাজ করার জন্যই। কাজে কাজেই এরকম দু-চারটে জিনিশ সরানোর হক ওর আছে বইকী। কিন্তু আজই প্রথম ও টাকা সরাল। তাও টাকাটা হাতের মুঠোয় এসে গেল বলে ও লোভ সামলাতে পারল না। এ টাকাটা দিয়ে ও গিরিধারীর জন্য একটা চাদর কিনবে ভেবেছিল। শীতে ছেলেটার খুব জাড় লাগে।
কিন্তু পুলিশের কথায় ও ভয় পায়। যদি গিরিধারীকে ধরে পুলিশ? ও উঠোনের কোণে যায়। নোট দুটো বের করে। হাসিনার হাতে দেয়। হাসিনা নোট দুখানা নিয়ে বালতি থেকে আস্তে জল ঢেলে ধুয়ে বারান্দায় রোদে দেয়। দুটো পরিষ্কার পাথর চাপা দেয়।
ফতিমা দুটো টাকা দেন হাসিনাকে, ‘বউকে বল এ দুটো নিতে।’
টাকাটা হাত পেতে নিয়ে সুরতিয়ার মন খারাপ হয়ে যায়। দু-টাকায় কী হবে? গিরিধারীর চাদরের দাম পঁয়ত্রিশ টাকা।
ফতিমা বলেছিলেন, ‘আহা গরিব মানুষ, লোভে পড়ে নিয়ে ফেলেছে টাকাটা; ওকে মাপ করে দিন।’ তাতে ঈদ পর্যন্ত ওকে রাখতে রাজি হন মঈনুদ্দীন শাহেব।
আবার সুরতিয়া শুধুই কাগজ কুড়োনিয়া হয়ে যায়। লাইনের ধারে ফেলে দেওয়া কাঁচা কয়লা কুড়োতে গিয়ে বাউরি মেয়েদের সাথে আঁচড়া-আঁচড়ি করে মার খায়। সে তো এখানে পরদেশী। তার তো আছে এক বেটা। গিরিধারী। সেই বেটা তো তাকে রক্ষা করে না উলটে মায়ের কাছে রোটি চায়। সিনেমা দেখার পয়সা চায়। সুরতিয়া বলে, ‘কাম কর বেটা।’
তা গিরিধারীর বয়ে গেছে কাজ করতে। ও একদিন মামার কাছে ঠিকানা জেনে মায়ের কয়লা বেচা পয়সা চুরি করে বাবার কাছে চলে যায়। সুরতিয়া কাঁদে। তার বেটাই যদি তাকে ভুলে গেল তো রইল কি? সে কার জন্য কয়লা কুড়োবে? বেচবে? কার জন্য কাগজ, টিনা, লোহা কুড়োবে? চুরি করবে? বেচবে? কার জন্য চূলা ধরাবে? পুরি ভাজবে? রোটি বানাবে? ছট পরবে কার জন্য মিঠা ঠেকুয়া বানাবে? সবই তো গিরিধারীর জন্য!
গিরিধারী আসে মাস দুয়েক পর। আবার যায়। আবার আসে। সুরতিয়া আর কিছু বলে না। ছেলে এলে, ঘুমোলে সেও ঘুমায়। তার আর কোনো জাগরণ নেই। প্যাচারা জাগে। সারারাত। কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে। সাপ, ইঁদুর, টিকটিকি, আরশোলা আর পোকারা জাগে। সেই জাগরণে শুধু গিদ্ধর কি মাঈ জাগে না। এমনকি সুরতিয়া যেন সকালে চোখ মেলে কিন্তু জাগে না।
এখন তো রূপনারায়ণপুরে অনেক ছেলেমেয়ে ছেঁড়া কাগজ পলিথিন প্যাকেট, কৌটো, লোহা কুড়িয়ে বেড়ায়। মিহিজামের ছেলেমেয়রা আসে। গিরিধারীর মা তো একা কুড়োয় না। আরো তিন-চারটে বউও আসে টায়ারের নয়তো হাটে কেনা নীল হাওয়াই পায়ে। পিঠে বড় বড় পলিথিনের বস্তা। তারা কথা বলে না বললেই হয়। নীরবে চোখ মাটিতে রেখে এগোয়। এখন তো রূপনারায়ণপুরে কত বাড়ি, কত লোক। আর যত বাড়ি যত লোক ঠিক ততই আবর্জনা। ফেলে দেওয়া জিনিশের পাহাড়। সেসব ফেলার তেমন করে কোনো ব্যবস্থা নেই। সুরতিয়া সেই আবর্জনার মধ্যে মানবশরীর নিয়ে ঘোরে এইসব কাগজ কুড়নীদের সঙ্গে— যেমন কাক মরা ইঁদুর মুখে করে নিয়ে যায়, কুকুর নোংরা এঁটো খায়, শকুনে মড়া খায় তেমনি ও মিশে যায় মনুষ্যেতর কোনো প্রাণীর মতো মনুষ্য জগতের বাইরে তার ভগ্ন প্রতিমার মতো শরীর নিয়ে। তার সে শরীরে কোনো জাগরণ নেই। কোনো উদ্যম নেই। সে শুধু এক জাগরণহীন, উদ্যমহীন শরীর বাঁচিয়ে রাখার স্বভাবে বেঁচে থাকে।
বিয়ের ছমাস পর হাসিনা আর তার স্বামী বাস স্ট্যান্ড থেকে রিকশা চাপে। হাসিনা রিকশাআলাকে বলে, ‘আরে গিদ্ধর তুই?’
গিরিধারী সলজ্জ হাসে। ‘দিদি ভালো আছো?’
‘কেমন আছিস?’
‘ভালো।’
‘তোর মা কেমন আছে?’
গিরিধারী জবাব দেয় না। একটু পরে বলে, ‘নিজে রিকশা কিনব দিদি— কদিন যাক।’ তারপর আবার একটু হেসে বলে, ‘ঘরমে বহু ভী হ্যায়।’
হাসিনা বলে, ‘তাহলে তোর মা এখন আরামে আছে। লোকের বাড়ি আর কাজ করতে দিস না মাকে।’
গিরিধারী জোরে প্যাডেলে চাপ দেয়।
এ সময় ভাগ্যিস ওর মা কাগজ কুড়োয় না। গিরিধারী তো আলাদা ঘরে থাকে। সেখান থেকে মায়ের ঝোপড়ি দেখা যায় না। তবু ও জানে ওর মা এসময় ঝোপড়িতে অন্ধকারে জেগে বসে থাকে। গিরিধারী রিকশা জমা দিয়ে ঘরে যায় মায়ের ঝোপড়ির সামনে দিয়ে। যেতে যেতে ও বলে, ‘নিদ নহী আঈ মাঈ?’ মা উত্তর দেয়, ‘অব তো শো যায়গী।’ চব্বিশ ঘন্টায় এইটুকু জাগরণের জন্যই বোধহয় সুরতিয়া বেঁচে থাকে।