কালিদাস লিখেছেন, আষাঢ়ে বর্ষা আসে তার সমস্ত ঐশ্বর্য ও শৌর্যের সমারোহে। রাজ সমাগমের মত সাড়ম্বরে। বিদ্যুত তার পতাকা। বজ্র তার জয়ভেরী। জলভারে কালো মেঘ যেন তার বিশাল হস্তিযূথ।
মেঘদেবতা ইন্দ্রের এমন আগমনের ঘনঘটায় শঙ্কিত, চকিত ব্রজবাসী পুজোর বিস্তৃত আয়োজন করত। নন্দরাজা সে পুজোর প্রধান উদ্যোক্তা। শ্রীকৃষ্ণ তখন ধীরে ধীরে গোকুলের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠছেন। তিনি আপত্তি জানালেন।
পুজো কর তোমরা এই গোধনের। গোপালন আমাদের জীবিকা। আমরা পুজো করব, উৎসব করব আমাদের গাভীগুলিকে নিয়ে। এই গোবর্ধন পর্বতকে। যে আমাদের রক্ষা করে। ফলফুলওষধি দান করে। শ্রীকৃষ্ণ গরীব ব্রজবাসীকে নিষেধ করলেন এমন ষোড়শোপচারে ইন্দ্রপুজোর কোনো প্রয়োজন নেই।
শ্রীকৃষ্ণের জীবনের এই প্রথম বিদ্রোহে গোপেরা সঙ্গ দিলেন। গোবর্ধন পর্বতের পুজো হল। ইন্দ্রযজ্ঞের জন্যে যে সমস্ত উপকরণ আনা হয়েছিল, তা দিয়ে দরিদ্র গ্রামবাসীরা ভূরিভোজ করলেন। গোরু বাছুররাও পূজিত হল।

ইন্দ্রের রোষে তখন খেপা শ্রাবণ ছুটে এসে ভাসিয়ে দিল ব্রজভূমি। ঝড়বৃষ্টির প্রাবল্যে বৃন্দাবন প্রায় ধ্বংসের পথে। তখন ঐ গিরি গোবর্ধন মুখ রাখল কিশোর নেতার। পাহাড়টা চষা ছিল কৃষ্ণবলরামের। দু-জনে মিলে সমস্ত ব্রজবাসী আর গোরু বাছুরদের পাহাড়ের বিভিন্ন গুহায়, গর্তে, কোটরে স্থান করে দিতে পেরেছিলেন।
ভক্তরা বললেন, শ্রীকৃষ্ণ স্বরূপ ধারণ করলেন। বাঁ হাতের কনিষ্ঠায় তুলে ধরলেন গোবর্ধন পর্বতকে।সকলকে তার নীচে আশ্রয় নিতে বললেন।
ভক্তকবি ব্যাসদেব ভাগবতে কৃষ্ণলীলার বর্ণনায় লিখলেন, — “ইত্যুক্ত্বা একেন হস্তেন কৃত্বা গোবর্ধনাচলম্/ দধার লীলায় কৃষ্ণশ্ছত্রাকমিব বালকঃ”।
ব্রজকুলপতি ক্ষুধাতৃষ্ণা ভুলে এক সপ্তাহ ধরে ঐভাবে রয়ে গেলেন।এক পাও নড়লেন না।
ইন্দ্র এই দেখে বিস্মিত হলেন। শ্রীকৃষ্ণের পদপ্রান্তে নিজের রাজমুকুট নামিয়ে প্রণাম জানালেন। বললেন, আমি নিজের পদগর্বে উন্মত্ত ছিলাম। বৃষ্টি ও ঝড় কে দিয়ে ব্রজভূমিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলাম। আমার অপরাধ হয়েছে। আমায় ক্ষমা করুন।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, মহেন্দ্র আমি তোমার মঙ্গলাকাঙ্খী। তোমার ঐশ্বর্যের অহংকার, রাজপদের গর্ব চূর্ণ করার জন্যেই তোমার যজ্ঞ ভঙ্গ করেছি। আমি যে দন্ড ধারণ করে আছি, ঐশ্বর্যে যারা মত্ত হয়ে আছে ,তারা তা দেখতে পায় না।
ইন্দ্র তখন তাঁর সমস্ত অহংকার ত্যাগ করে নন্দের নন্দনের চরণ বন্দনা করলেন। তাঁর ঐরাবত স্বর্গের আকাশগঙ্গা থেকে জল আনল। সেই জলে অভিষেক করে ইন্দ্র শ্রীকৃষ্ণকে গোবিন্দ নামে অভিহিত করলেন।
এদিকে সমস্ত ব্রজবাসী বিপদমুক্ত হয়ে তাদের প্রিয়মানুষটিকে দেবতার আসনে বসালেন।কখন যে গিরি গোবর্ধন আর ব্রজবাসীর প্রিয় কানু এক হয়ে গেলেন, তা ব্রজবাসীরা নিজেও জানেন না। আমরা যে “দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা!”

ব্রজভূমের মানুষ এবার নতুন করে আয়োজন করলেন অন্নকূট উৎসবের।
“অন্ন ঘৃত দধি দুগ্ধ গ্রামে যত ছিল।
গোপালের আগে লোক আনিয়া ধরিল।।
গ্রামের যত তন্ডুল ডালি গোধুমাদি চূর্ণ।
সকল আনিয়া দিল পর্ব্বত হইল পূর্ণ।।
দশ বিপ্র অন্ন রান্ধি করে এক স্তূপ।
জন চারি পাঁচ রান্ধে ব্যঞ্জনাদি সূপ।।
বন্য শাক ফলমূলে বিবিধ ব্যঞ্জন।
কেহ বড়া বড়ী কড়ি করে বিপ্রগণ।।
জন পাঁচসাত করে রুটি রাশি রাশি।
অন্নব্যঞ্জন সব রহে ঘৃতে ভাসি।
নববস্ত্র পাতি তাতে পলাশের পাত।
রান্ধি রান্ধি তার উপর রাশি কৈল ভাত।।
তারপাশে রুটি-রাশি উপপর্বত কৈল।
সূপ ব্যঞ্জন ভান্ড সব চৌদিকে ধরিল।
তার পাশে দধিদুগ্ধ মাঠা শিখরিণী।
পায়েস মাথনি সর পাশে ধরে আনি।।
দধিদুগ্ধ সন্দেশ আদি যত কিছু ছিল।
সুবাসিত জল নব্যপত্রে সমর্পিল।।
অচমন দিয়া পুনঃ তাম্বুল অর্পিল।
ধূপ দীপ করি নানা ভোগ লাগাইল।।
ব্রজবাসী লোকের কৃষ্ণে সহজ পিরীতি।
গোপালের সহজ প্রীতি ব্রজবাসীর প্রীতি।।”
(চৈতন্যচরিতামৃত)

নতুন বস্ত্রে পলাশের পাতা পেড়ে তাতে গ্রামের মানুষ থরে থরে চালডালগম দিয়ে অন্নকূট সাজালেন। রুটির রাশি দিয়ে উপপর্বত বানানো হল। দশজন ব্রাহ্মণ ভাত রাঁধলেন। আরো চারপাঁচ জন অন্যান্য ব্যঞ্জন। গোপালের প্রিয় ঘি, দইদুধ, ননী মাঠা, সন্দেশ, পায়েস, এবং শিখরিণী (শরবত) সঙ্গে রাখা হল। এছাড়াও নানাবিধ শাক, তরিতরকারি, বড়িবড়া, কড়ি (দই, বেসনের একটি পদ) ফলমূল, মিষ্টান্ন দিয়ে সাজানো হল গোপালের ভোগ। সুবাসিত জল নিবেদন করা হল তাঁকে। শেষে আচমন করিয়ে দেওয়া হল পান ।
ভক্তিরসের সূত্র ধরে ভক্তকবি শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী আমাদের সামনে তুলে ধরলেন মধ্যযুগে অন্নকূটের এক ছন্দময় ছবি। বৈষ্ণবসাহিত্যে আমরা বারবার নানারকম নিরামিষ ব্যঞ্জনের তালিকা পেয়েছি। ভগবান এবং তাঁর ভক্তদেরও রেঁধেবেড়ে খাইয়ে তৃপ্ত হয়েছেন সেই সময়ের মানুষ।
কিন্তু মানুষরূপী ভগবান আবার যখন তখন চুরি করে পরের বাড়িতে মাখন খান , তারজন্যে শাস্তিও পান।সখাদের জন্যেও খাবার চুরি করেন।ভক্ত শবরীর দেওয়া এঁটো ফলও খেয়ে নেন। বন্ধু সুদামার পুঁটুলির সামান্য নাড়ুতে আগ্রহ দেখান। আজকের পুণ্য তিথিতে তিনিই গিরিরাজরূপে অন্নকূটের অন্নগ্রহণ করে ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। সে মহাপ্রসাদ জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ গ্রহণ করে ধন্য হন।
খুব ভালো লাগল।
প্রাপ্তি ????
অপূর্ব..!!
ধন্যবাদ ????