বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্নেহধন্য গীতিকার, সুরকার ও গায়ক গিরীন চক্রবর্তীকে নিয়ে বাঙালি নীরব কেন? তিনি কি কাব্যে উপেক্ষিত থেকে গেলেন? তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি। বাঙালি কি যোগ্যের সমাদর করতে ভুলে গেছে?
নেহাত কারার ঐ লৌহকপাট-এর এ আর রহমান কর্তৃক সুরবিকৃতির বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদের পিঠোপিঠি গিরীন চক্রবর্তীর নামটি লাইমলাইটে এল আবার, নাহলে বাঙালি তাঁকে ভুলেই মেরে দিয়েছিল।
১৯২১ এর ডিসেম্বর থেকে ১৯২২ এর জানুয়ারির ২০ তারিখের মধ্যে কোনও এক সময় কাজী নজরুল ইসলাম ‘কারার ওই লৌহকপাট’ কবিতাটি লেখেন। সদ্য কারান্তরালে যাওয়া দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর অনুরোধে তিনি এই দেশাত্মবোধক কবিতাটি লেখেন। বাঙ্গালার কথা পত্রিকায় ছাপা হয়। ১৯২৪-এ এটি ‘ভাঙার গান’-এর অন্তর্ভুক্ত হয়।
লোকশ্রুতি এই যে, কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৩-এ কারারুদ্ধ থাকাকালীন সহবন্দীদের সঙ্গে কবিতাটি আবৃত্তি করতেন দৃপ্ত কণ্ঠে। কোনও স্বরলিপিবদ্ধ সুর ছিল না তাতে। লোকমুখে কবিতাটির একটা চালু সুর ছিল অবশ্য। ১৯৪২-৪৩ থেকেই কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ প্রশাসন ভাঙার গান বাজেয়াপ্ত করলে এই কবিতা বা গানের চালু সুরটি জনমানস থেকে মুছে যায় অনভ্যাসে। তারপর ব্রিটিশশাসনের সমাপ্তি হলে ১৯৪৯-এ লোকগীতিশিল্পী ও নজরুলগীতিগায়ক তথা সুরকার গিরীন চক্রবর্তীর গলায় গানটি রেকর্ড করে কলম্বিয়া রেকর্ডস। এই গানটির রেকর্ডে গীতিকার ও সুরকার হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের নামই আছে। রেকর্ডে উল্লিখিত হয়েছে রেকর্ডিংয়ে সংগীত-পরিচালনা করেছেন সুরকার নিতাই ঘটক।নিতাইবাবু নিজেও নজরুলগীতির বিশিষ্ট সুরকার ছিলেন। ৫১ টি নজরুলগীতিতে সুর দিয়েছিলেন। গিরীনবাবু নিজেও ছিলেন প্রসিদ্ধ লোকগীতিগায়ক ও নজরুলগীতিশিল্পী। তিনি ২৯টি নজরুলগীতিতে সুরারোপ করেন। কারার ঐ লৌহকপাট-এর সুর তাঁরই করা। কেন রেকর্ডে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি সুরকার হিসেবে, সেটাই রহস্য। মনে হয় গানটির সংগীতপরিচালক নিতাই ঘটকের সঙ্গে গিরীনবাবুর রেষারেষি ছিল। তাই শিল্পী হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হলেও সুরকার হিসেবে নজরুল ইসলামের নামই রাখা হয়েছে। কলম্বিয়া রেকর্ডসও কাজী নজরুল ইসলামের ব্র্যান্ডভ্যালু কাজে লাগিয়েছে। গিরীনবাবুর সুরকরা ২৯টি নজরুলগীতির মধ্যে ১২ টির খোঁজ মেলে। বাকিগুলির হদিশ দিতে পারেননি গবেষকরা। অঙ্কের হিসেব বলে এগুলিকে নজরুলের সুর বলেই চালিয়ে দিয়েছে রেকর্ড কোম্পানিগুলি।
গিরীন চক্রবর্তী সুজন মাঝি ছদ্মনামেও গান গেয়েছেন। শচীনদেব বর্মণের গুরু তিনি। শচীনকর্তার গানে তাঁর প্রভাব প্রকটভাবে ধরা পড়ে। শচীনবাবুর ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে’-র সঙ্গে সুরের মিল আছে তাঁর ‘আমারে ভুলিয়ে বন্ধু’ লোকগীতিটির। এটা অন্তত আমার কানে ধরা পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা কী বলবেন তা জানি না।
বাংলা শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্যের অতীত না জানলে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া যাবে কী ভাবে? শিকড়ের সন্ধানে তাই বারে বারেই যেতে হয়। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই হয়তো গিরীন চক্রবর্তীর নাম শোনেনি। একালের শ্রোতা পাঠকের সাথে গিরীন চক্রবর্তীর সামান্য পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার আছে বৈকি!
কালের নিয়মে বহু গুণী মানুষের শতবর্ষ পেরিয়ে যায় আমাদের অজান্তেই। গিরীন চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই শিশির মঞ্চে শতবর্ষ উদযাপনের একটি অনুষ্ঠান হয়। এ ছাড়া একটা দুটো অনুষ্ঠান হয়ে থাকতে পারে। দুই বাংলায় যে ভাবে উদযাপন হওয়া উচিত ছিল তা কিন্তু হয়নি।
৫ ই মে ১৯১৮ সালে বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে জন্মগ্রহণ করেন গিরীন চক্রবর্তী। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এই উপমহাদেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া উল্লেখযোগ্য। এই জেলার সঙ্গীতসাধকদের অন্যতম হলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলি খাঁ, ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ, মহর্ষি মনমোহন দত্ত, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁ প্রমুখ। এই সুরসাধকদের সমৃদ্ধ মাটি ও তিতাসের জলহাওয়ায় বেড়ে উঠেছেন গিরীন চক্রবর্তী। সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আফতাবউদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি লোকসঙ্গীতের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল টান।
অজস্র গানের তিনি রচয়িতা এবং সুরারোপ করেছেন। এর মধ্যে লোকগীতি, শ্যামাসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান, আধুনিক গান সহ বহু চলচ্চিত্রের গান রয়েছে। গান রচনা করেছেন, সুর করেছেন। গেয়েছেন কখনও স্বনামে আবার কখনও ছদ্মনামে। সুজন মাঝি, রতন মাঝি, দ্বিজ মহেন্দ্র হলো তাঁর ছদ্মনাম। আবার ইসলামি গানের ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন সোনা মিঞা।দুঃখের বিষয় হলো তাঁর এই অসংখ্য গানের কোনও সংকলন নেই। ঢাকা বেতারে কাজ করেন কিছুদিন। এরপরে কলকাতায় চলে আসেন এবং আকাশবাণী কলকাতায় যুক্ত থাকাকালীন চালু করেন পল্লীগীতির আসর।জসীমউদ্দিন যেমন ছিলেন পল্লীকবি, গিরীন চক্রবর্তী ছিলেন পল্লীগীতির গুরু।
তিনি এইচ এম ভি- তে ট্রেনার হিসাবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। এই সময়েই তিনি খ্যাতির শিখরে পৌঁছান। এই সময়ে তাঁর কাছে তালিম নিয়ে যে সকল শিল্পীরা খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁরা হলেন আব্বাসউদ্দীন, চিত্ত রায়, ভবানীচরণ দাস, চিন্ময় লাহিড়ী, আঙুরবালা দেবী, ইন্দুমতী দেবী, কমলা ঝরিয়া, শৈল দেবী, হরিমতি দেবী, রাধারাণী দেবী, যূথিকা রায়, শচীন দেববর্মন, তালাত মামুদ, অসিতবরণ, সত্য চৌধুরী, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, বাঁশরী লাহিড়ী, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। বলা যায় তালাত মামুদকে আবিষ্কার করেন গিরীন চক্রবর্তী।
গিরীন চক্রবর্তী রচিত লোকগীতি গেয়েছেন আব্বাসউদ্দীন, অমর পাল, বিষ্ণুপদ দাস প্রমুখ। এ কথা সকলেরই জানা যে ‘আল্লা ম্যাঘ দে পানি দে’ গানটির প্রথম চারটি লাইন সংগৃহীত হলেও পরের লাইনগুলি লেখেন তিনি। লিখেছেন ‘নাও ছাড়াইয়া দে পাল উড়াইয়া দে’-র মতো কালজয়ী গান। দুটি গানই আব্বাসউদ্দীনের গলায় অসম্ভব জনপ্রিয়। দেশভাগের যন্ত্রণা থেকে তাঁর রচিত- ‘কিশোরগঞ্জে মাসির বাড়ি/ মামার বাড়ি চাতলপাড়/ বাপের বাড়ি বামনবাইড়া/ নিজের বাড়ি নাই আমার।’ এবং ‘শিয়ালদহ গোয়ালন্দ আজও আছে ভাই/ আমি যাব আমার বাড়ি সোজা রাস্তা নাই। গানদুটির আবেদন সে সময়ে মানুষকে চমকে দিয়েছিল।
এবার আসা যাক কাজী নজরুল ইসলাম ও গিরীন চক্রবর্তীর সম্পর্ক প্রসঙ্গে। গিরীন চক্রবর্তী ছিলেন কাজী সাহেবের বন্ধু – সহকারী। একেবারে ছোট ভাইয়ের মতো। গিরীন চক্রবর্তীর ঢাকার পৈতৃক বাড়িতে কাজী সাহেব অনেকবার গেছেন। কাজী সাহেবের পরিবারের সদস্যরাও গিরীনবাবুকে নিজেদের পরিবারের একজন বলে মনে করতেন। কাজী সাহেবের লেখা অন্তত ২৯ টি গানে সুরারোপ করেছেন গিরীন চক্রবর্তী। ‘এই শিকল পরা ছল’ গানটিতে গিরীনবাবুর সুর স্বয়ং নজরুলকেও বিস্মিত করে। ‘কারার ওই লৌহকপাট’ গানটির প্রথম গ্রামাফোন রেকর্ড হয় গিরীনবাবুর গলায়। ‘বিদ্রোহী’ ও ‘নারী’ কবিতা দুটির অংশবিশেষ সুর করে নিজের গলায় রেকর্ড করেন গিরীনবাবু। কাজী নজরুল ইসলাম, গিরীন চক্রবর্তী ও আব্বাসউদ্দীন, -এই ত্রয়ীর এক অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল।
তাঁর রচিত বিখ্যাত কিছু গান হল- নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে/কিশোরগঞ্জে মাসির বাড়ি/শিয়ালদহ গোয়ালন্দ আজও আছে ভাই/বাড়ি ছিল পদ্মা নদীর পাড়ে/আয় রে বাঙালি আয় সেজে/কালী তারা ষোড়শী/হিসাব যদি চাইবি মা তোর/তুমি কোন বা দ্যাশে/আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে (জালালউদ্দিন নামে ড়এক গ্রামীণ লোকশিল্পী রচিত লোকগানের প্রথম চার পঙক্তি সংগ্রহের পর বাকি অংশটা রচনা করেন)।
গিরীন চক্রবর্তী কলকাতার ‘বেঙ্গল মিউজিক কলেজ’, ‘বাসন্তী বিদ্যাবীথি’ ও ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়’-এও অধ্যাপনা করেন। তিনি সেখানকার সিলেবাস কমিটির সদস্য ও পরীক্ষার প্রশ্নকর্তা ছিলেন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ হতেই মাত্র ছত্রিশ বছর বয়স থেকেই তিনি দিল্লিতে ‘জাতীয় সঙ্গীত সম্মেলন’-এ নিয়মিত আমন্ত্রিত হতেন। এছাড়া তিনি সংগীত নাটক অকাদেমির প্রতিষ্ঠাকাল হতে তিনি সদস্য ছিলেন।এই অসম্ভব গুণী মানুষটি বড় অকালে প্রয়াত হন। ১৯৬৫ সালের ২২ ডিসেম্বর মাত্র ঊনষাট বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। সঙ্গীতের ধারায় বহুবিস্তৃত পথে হেঁটেছেন গিরীন চক্রবর্তী। তাঁর সেই বহুবিধ যাত্রার উপযুক্ত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
বাংলা লোকগীতির যে ধারা শচীন দেববর্মণ, প্রতিমা বড়ুয়া, নির্মলেন্দু চৌধুরী, অমর পাল-রা বহন করে নিয়ে গিয়েছেন, তার পথিকৃৎ হিসেবে গিরীন চক্রবর্তীর নাম করতেই হবে। গিরীন চক্রবর্তীর গান শুনলে দেশভাগের যন্ত্রণা ও আর্তনাদ শোনা যায়। এপারে আসা মানুষের ওপারের জন্যে নস্ট্যালজিয়া ও বেদনাবিধুর স্মৃতি তাঁর লোকগীতি থেকে ঠিকরে বেরোয়। Oxford reference-এ বাংলা ভাটিয়ালি- ভাওয়াইয়া সুরকে লোকগীতিতে সার্থক ব্যবহার করার কাণ্ডারী হিসেবে গিরীন চক্রবর্তী, আব্বাসউদ্দীন ও শচীন দেববর্মণের নাম করা হয়েছে। বাংলার আগুনখেকো গবেষকরা এবার সঙ্গীত নাটক আকাদেমি, বেঙ্গল মিউজিক স্কুল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিরীনবাবুর যুক্ত থাকাকালীন নথিপত্রের সন্ধানে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে পারেন।