একজন লেখক যা লেখেন বা বলেন সেই বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাঁর দিনযাপনের যথেষ্ট মিল থাকবে, এরকম একটা কথা আগে শোনা যেতো। লেখকের সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর জীবনকে মিলিয়ে দেখা আধুনিক সাহিত্য সমালোচনায় গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু গিরিশ ছিলেন সর্ব অর্থেই ব্যতিক্রমী। একদিকে ধর্মান্ধতা এবং ধর্মীয় ভেদবুদ্ধির বিপদ বার বার ফিরে এসেছে তাঁর বিভিন্ন নাটকে। অন্যদিকে অশক্ত শরীরে পোর্টেবল অক্সিজেনের নল নাকে নিয়ে বার বার বার তিনি রাজপথে ধর্না দিয়েছেন হিন্দুত্ববাদীদের উত্থানের বিরুদ্ধে। তাঁর দীর্ঘ দিনের বন্ধু সাংবাদিক গৌরি লঙ্কেশ হিন্দুত্ব ব্রিগেডের হাতেই খুন হয়েছিলেন ২০১৭ সালে। তখন গিরিশের শরীর একেবারেই অচল। তা স্বত্বেও আন্দোলন কর্মসূচি থেকে বিরত করা যায়নি তাঁকে। এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গিরিশ বলতেন, এই অদম্য মনোভাব আমি পেয়েছি আমার মা কৃষ্ণাবাই মনকিকরের কাছ থেকে। এই কৃষ্ণাবাই নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখ। গিরিশের বাবা ডাঃ রঘুনাথ কারনাড ইচ্ছে করেই বিভিন্ন গ্রামে বদলি নিতেন। কারণ সেখানে চিকিৎসকের বেশি প্রয়োজন।
গিরিশ কারনাডের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৯ মে, মহারাষ্ট্রের মাথেরানে। এর পর তাঁর বাবা বদলি হন ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত শিরসিতে। কর্ণাটকের সারস্বত ব্রাহ্মণ গিরিশের ছোটবেলা কিন্তু কেটেছে কোম্পানি নাটক এবং পার্সি থিয়েটার দেখে। অভিজাত বা উচ্চবর্ণের জন্য এইসব বিনোদন তখন মনে করা হতো অনভিজাতদের জন্য আয়োজন। পরে এই কারনাড পরিবার ধারওয়াড়ে চলে আসে। গিরিশ বলতেন, ধারওয়াড় ছিল এই মাটিতে অমরাবতীর প্রতিরুপ। একদিকে সোয়াই গন্ধর্বের কাছে সংগীতশিক্ষা করছেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ভীমসেন যোশী, তো আরেক দিকে নরম মিষ্টি স্বরে বীরশৈব সাধকদের বচন গাইছেন মল্লিকার্জুন মনসুর। তাঁদের বাড়িতে পুবের দরজা খুলে দিলে বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসতো গাঙ্গুবাই হাঙ্গলের গান। এসবের মধ্যেই তাঁর স্নাতক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা এবং কবিতার প্রেমে পড়া। এমনই প্রেম যে গিরিশ ভাবলেন ইয়েটস, এলিয়ট, পাউণ্ডদের দেশে যাবো। তাই কবিতা সরিয়ে রেখে গণিত, রাশিবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করলেন। সারা পৃথিবী জুড়ে অনুষ্ঠিত হওয়া পরীক্ষা পাস করে ভুবনবিদিত Rhodes scholar হয়ে পৌঁছে গেলেন Oxford বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ইতিমধ্যে প্রথম নাটক ‘যযাতি’ লেখা হয়ে গেছে। লন্ডনে বসেই লিখেছিলেন ‘অঞ্জুমাল্লিগে’ যার বাংলা নাম ‘যামিনী’। ১৯৬৪ সালে নেহরুর প্রয়াণের পর ‘তুঘলক’ রচনা করেন। সেই সময় থেকেই বিতর্ক। এই নাটক জরুরি অবস্থার সময় নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ অনুবাদ শুরু করেন ৬০-এর দশকের শেষে। গিরিশ নিজেই বলেছেন, তাঁর নাট্য রচনার নতুন পর্ব সুচিত হয়েছিল এই সময়। ১৯৭২ সালে ‘হয়বদন’ নাটকটি একেবারে নতুন গিরিশ কারনাডকে পাঠক এবং দর্শকের সামনে উপস্থিত করলো। এর পরে ‘নাগমণ্ডল’। ৯০-এর দশকে একদিকে যখন মণ্ডল এবং কমণ্ডলুর লড়াই, অর্থাৎ রামমন্দির আন্দোলন এবং মণ্ডল কমিশন নিয়ে আগুন জ্বলছে, তার মধ্যে গিরিশ রচনা করলেন ‘তালে-দণ্ড’ বা ‘রক্ত কল্যাণ’ নাটকটি। সেই সময় থেকেই হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের আক্রমণের লক্ষ্যে তিনি। দ্বাদশ শতাব্দীর বীরশৈব সাধক বাসবন্নাকে নিয়ে লেখা এই নাটকে গিরিশ দেখিয়েছিলেন, এই সাধকরা সংগ্রাম করেছিলেন রাজার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতিভেদ দূর করতে। গিরিশ বার বার বলতেন, রাজশক্তি, রাষ্ট্রশক্তিকে সব সময় সন্দহের চোখে দেখা ভালো। সুধা ভরদ্বাজরা প্রধানমন্ত্রীকে খুন করার ষড়যন্ত্রের দায়ে আটক হওয়ার পর তিনিও নিজেকে অকপটে ‘শহুরে নক্সাল’ বলতেন। শরীর ভেঙে পড়ছিল, তবু লড়াই থামছে না। বোম্বাই সিনেমায় চোখ ধাঁধানো সাফল্য কোনওদিন তাঁকে প্রতিষ্ঠানমুখী করতে পারেনি। সব সময় বলছেন- ঘরে ঘরে private dissenter থাকা চাই। তাঁর প্রয়াণে বাংলায় তাঁর প্রধান অনুবাদক কবি শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, এই শূন্যতা আর কি কখনও পূর্ণ হবে… মনে হয় না।