কখনও কখনও একটা ছোট নাম না জানা জনপদের ছোট্ট লড়াই তাৎপর্যে অনেক বড় হয়ে ওঠে। প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ফেলে দেয় পাতা জোড়া বড় খবরকেও। তেমনই একটা ঘটনা ঘটেছে মহারাষ্ট্রের ইয়াবতামাল জেলায়। বহুদিন ধরে চলে আসা কুসংস্কার ভেঙে হলুদ চাষ করেছেন সে গ্রামের মেয়েরা। এ প্রতিবাদ কোন আলোকপ্রাপ্ত শিক্ষিত মেয়েরা করেননি। করেছেন গ্রামের গরিব ও নিরক্ষর চাষি পরিবারের মেয়েরা।

ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হলুদ উৎপাদক দেশ। শুধু উৎপাদকই নয় আমাদের দেশে রান্না থেকে শুরু করে বিয়ে নানা কাজে ব্যবহার হয় হলুদ। ভারত সবচাইতে বড় হলুদ রপ্তানিকারক দেশ। অঙ্কের হিসেবে এই কর্মকাণ্ডের চেহারা দাঁড়াবে ৮০ শতাংশ উৎপাদন এবং ৬০ শতাংশ রপ্তানি। কিন্তু এই বিপুল কর্মকাণ্ডে মেয়েদের কোন জায়গা নেই। হলুদ চাষে তাদের যোগ দেওয়া মানা! এমনিতে আমাদের দেশে কৃষিকাজে মেয়েদের শ্রমদানে কোন বাধা নেই। গোটা দেশেই ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও চাষবাস করে। ইয়াবতামালে কিন্তু হলুদ ক্ষেতের ত্রিসীমানায় মেয়েদের আসার অধিকার নেই। কারণ এখানকার বাসিন্দাদের অন্ধবিশ্বাস যে ঋতুমতী মহিলাদের ছায়া হলুদ ক্ষেতে পড়লে বা তারা ক্ষেত স্পর্শ করলে সব হলুদ নষ্ট বা দূষিত হয়ে যাবে।

কে, কবে কখন এই অদ্ভুত নিয়ম চালু করেছে জানা নেই, তবে এই বিশ্বাসই দিব্যি বেঁচে রয়েছে বছরের পর বছর। এদিকে কোভিডের দাপট কমার পর বাজারে হলুদের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু এই চাহিদা মেটানোর মত শ্রমশক্তির ঘাটতি রয়েছে। তাই মেয়েরাই সবরকম নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে নেমে পড়েছেন ক্ষেতে। গতবছরই গ্রামের মেয়েরা ভেবেছিলেন, খরচ কমাতে নিজেদের সংসারের প্রয়োজনীয় সব ফসল তারা ক্ষেতে চাষ করবেন। তখনই নিজেদের পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ক্ষেতে হলুদ চাষ করার কথা ভাবেন তারা। কিছু মেয়ে তাতে আপত্তি তোলেন। কিন্তু বেশিরভাগই এই আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে হলুদ চাষ করতে নেমে পড়েন ক্ষেতে। তাদের একটাই কথা, হলুদ একটা লাভজনক ফসল। গ্রামে যখন অভাবের তাড়নায় কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন সেসময় শুধুই কুসংস্কারের শিকার হয়ে মেয়েরা একটা লাভজনক ফসল চাষ করবেন না কেন!

ইয়াবতামালে আছে এক আজব নিয়ম। মেয়েরা চাষবাসের সব কাজই করতে পারবে, আপত্তি শুধু হলুদ চাষেই। শুচিতার প্রশ্ন তুলে তাদের একাজ থেকে দূরে রেখেছিলেন নীতিবাগীশরা। গ্রামের মেয়েদের ইচ্ছা এবং অতিমারি পরবর্তী পরিস্থিতি এই কুসংস্কার ভেঙে ফেলার কাজটা সহজ করে দিয়েছে। এব্যাপারে একটি সংস্থা তাদের সহায়তা দিয়েছে। ঋতুমতী অবস্থায় চাষ করার পরও গ্রামের সবাই দেখেছেন ফসল নষ্ট হয়নি। এখন গ্রামের মেয়েরা হলুদ চাষ করছেন ব্যবসায়িকভাবে, আরও বড় বাজারের জন্য। তারা বুঝতে পারছেন চাষবাসের সমস্যার কারণ শুধু প্রকৃতির বিরূপতা আর ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়াই নয়, কুসংস্কারও একটা বড় বাধা।