ইতিহাসে মোড়া আর জি কর মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল। বাংলা তথা ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসেও এই কলেজের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। সম্প্রতি এই গৌরবান্বিত হাসপাতালে চেস্ট মেডিসিনের কর্তব্যরত এক চিকিৎসক ছাত্রীর ধর্ষণ ও মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সারা দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে আর জি কর হাসপাতালের নাম। বিচারের দাবিতে উত্তাল গোটা বিশ্ব। অথচ চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রবাদপ্রতীম রেনেসাঁ পুরুষটি কত অপমান, কত লড়াই করে গড়ে তুলেছিলেন এই প্রতিষ্ঠান। এই কলেজ তৈরীর জন্য তিনি দোরে দোরে ভিক্ষা পর্যন্ত চেয়েছিলেন। যার নামে নামাঙ্কিত এই প্রতিষ্ঠান সেই আর জি কর অর্থাৎ রাধাগোবিন্দ করের চারদিন পরেই ১৭২ তম জন্মবার্ষিকী (জন্ম: ২৩ আগস্ট ১৮৫২)।
হাওড়া রামরাজাতলা স্টেশন থেকে মিনিট ১৫ হাঁটা পথ দূরত্বে বেতড়ের বিখ্যাত কর বাড়ি। এখানেই ১৮৫০ সালের ২৩ আগস্ট জন্মেছিলেন রাধাগোবিন্দ কর। হিন্দু স্কুল থেকে পাশ করে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পড়েন। ১৮৮৩ সালে তিনি পাড়ি দেন স্কটল্যান্ডে। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে MRCP করে ১৮৮৬ সালে দেশে ফিরে এলেন। এসেই নেমে পড়লেন আত্মার সেবায়। ছাত্রাবস্থায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শুধু বাংলায় লেখা চিকিৎসা বিজ্ঞানের বই যথেষ্ট নয়, রোগীদের সমস্যা সমাধান করতে গেলে দেশীয় মেডিক্যাল স্কুল ও কলেজের প্রয়োজন। সেই থেকেই শুরু হয়েছিল আরজিকর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বীজ বপণ।
কলকাতা সবচেয়ে পুরাতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল গুলির মধ্যে অন্যতম আর জি কর।
১৮৮৬ সালে যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে ডা. কর কলকাতা এসে ব্রিটিশ শাসকদের অধীনে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক একটি জাতীয় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই বছরই কলকাতায় ১৬১ নম্বর পুরনো বৈঠকখানা বাজারের একটি বাড়িতে ডা. মহেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, ডা. অক্ষয় কুমার দত্ত, ডা. বিপিন বিহারী মৈত্র, ডা. এম্. এল. দে, ডা. বি. জি ব্যানার্জী এবং ডা. কুন্দন ভট্টাচার্য্যের মত কলিকাতার বিখ্যাত ডাক্তারদের সমিতি গঠন করে এশিয়ার প্রথম বেসরকারি মেডিকেল স্কুল — ‘ক্যালকুল স্কুল অফ মেডিসিন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে এই স্কুলের নাম পরিবর্তন করে ক্যালকাটা মেডিকেল স্কুল রাখা হয় তখন এটি ২৯৮ আপার সার্কুলার রোডে স্থানান্তরিত হয় ।

১৮৯০ সাল নাগাদ ব্রিটিশ সরকার এই স্কুলে শব ব্যবচ্ছেদের অনুমতি দেন। এই স্কুলে সমস্ত বিভাগে পড়াশোনা করা হতো বাংলায় লেখা বই দিয়ে। রাধাগোবিন্দ করের লেখা বই তো ছিলই, সঙ্গে ছিল মধুসূদন গুপ্তের লেখা বই।
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে শ্যামবাজার ও বেলগাছিয়া মধ্যবর্তী একটি স্থানে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে জমি কিনে ৭০ হাজার টাকা খরচা করে ৩০ শয্যার অন্তর্বিভাগ বিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। প্রিন্স অ্যালবার্ট ভিক্টরের ভারতদর্শনের স্মৃতিরক্ষা তহবিল থেকে ১৫ হাজার টাকা পাওয়া গেছিল বলে, এই ভবনের নাম তার নামে রাখা হয়।
১৮৯৯ সালের মার্চ মাস, কলকাতায় গরমের সাথে বেড়েছে প্লেগের প্রকোপ। ওয়ালডেমার হপকিন্সের প্লেগ ভ্যাকসিন তখন কলকাতায় পাওয়া যাচ্ছিল কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বলল ভ্যাকসিন জরুরি নয়। যথারীতি মহামারীর আকার নিলো প্লেগ। সেই সময় উত্তর কলকাতায় ঘুরে ঘুরে রোগীদের সেবা করছেন দুজন মানুষ– এক আইরিস মহিলা ভগিনী নিবেদিতা অন্যজন রাধাগোবিন্দ কর।রোগীকে বাঁচানোর জন্য পথ্য দিচ্ছেন নিজের পয়সায়। আসলে দুজনেই যে শিবজ্ঞানে জীব সেবাকে জীবনের মন্ত্র করে নিয়েছেন।
ডা. করের বেসরকারি মেডিকেল স্কুল স্থাপনের কয়েক বছর পরেই আরো একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় — কলেজ অব ফিজিসিয়ানস অ্যান্ড সার্জেন্স অব বেঙ্গল। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে খৃষ্টাব্দে ক্যালকাটা মেডিক্যাল স্কুল এবং কলেজ অব ফিজিসিয়ানস অ্যান্ড সার্জেন্স অব বেঙ্গল এই দুই প্রতিষ্ঠানকে একত্রীভূত করে দ্য ক্যালকাটা মেডিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অব ফিজিসিয়ানস অ্যান্ড সার্জেন্স অব বেঙ্গল নাম দেওয়া হয়। ১৯১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে এই যুক্ত প্রতিষ্ঠানটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পায়।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে এর নাম পরিবর্তন করে বেলগাছিয়া মেডিকেল কলেজ রাখা হয়। কলেজের উদ্বোধন করেন তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল। তাঁর অনুদানের জন্য কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ। নানান উত্থান পতনের পর রাধাগোবিন্দ করের ছোট্ট চারাগাছটি মহীরুপে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার পরে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ই মে এই কলেজে নাম পরিবর্তন করে ডঃ রাধা গোবিন্দ করের নামে রাধাগোবিন্দকর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রাখা হয়। যদিও নিজের নামাঙ্কিত হাসপাতাল রাধাগোবিন্দ কর দেখে যেতে পারেননি।
এই কলেজের পশ্চিম দিকে পূর্ব ক্যানাল রোড, দক্ষিণ দিকে ক্ষুদিরাম বসু সরণী, পূর্ব দিকে চক্ররেল ও টালা রেল স্টেশন এবং উত্তর দিকে ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড অবস্থিত।
ক্যাম্পাসের উত্তরপূর্ব দিকে সাত তল বিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ভবন অবস্থিত। এই ভবনে শারীরবিদ্যা, প্রাণরসায়ন, ভেষজবিজ্ঞান, জীবাণুবিজ্ঞান, ফরেন্সিক, কমিউনিটি মেডিসিন প্রভৃতি বিভাগ এবং গ্রন্থাগার অবস্থিত।
১৯৫৮ সালের ১২ই মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই কলেজের দায়িত্ব গ্রহণ করে। তারপর থেকেই এটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এই কলেজে চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রায় সব বিভাগের পঠন পাঠনের সুযোগ আছে। এমবিবিএস থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর, পিজি ডিপ্লোমা বা পোস্ট ডক্টরঅরাল কোর্স করার সুযোগ আছে এখানে।

সেইকালে চিকিৎসাবিদ্যা পড়াশোনা হত ইংরেজীতে ইউরোপীয় চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থায়। ফলে সমস্যায় পড়তেন বঙ্গসন্তানরা। সেই সময় ডাক্তারিতে বাংলায় কোনও বই ছিল না। তাই ডাক্তারি পাশ করার আগেই বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই লেখার কাজে হাত দেন। ১৮৭১ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বই ‘ভিষগবন্ধু’। অন্যান্য বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্যহল ‘সংক্ষিপ্ত শারীরতত্ত্ব’, ‘রোগী পরিচর্য্যা’, ‘ভিষক সুহৃদ’, ‘প্লেগ’, ‘স্ত্রীরোগের চিত্রাবলী ও সংক্ষিপ্ত তত্ত্ব’, ‘সংক্ষিপ্ত শিশু ও বাল চিকিৎসা’, ‘সংক্ষিপ্ত ভৈষজতত্ত্ব’, ‘কর সংহিতা’ ও ‘কবিরাজ ডাক্তার সংবাদ’ ইত্যাদি। ইংরেজি জানা ডাক্তারি ক্লাসের ছাত্ররাও তাঁর বই পড়তেন।
এত কিছু করা সত্ত্বেও দুঃখের কথা হলো, দেশের মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থার পথ সুগম করতে তাঁর এই লড়াইয়ে তিনি বাঙালি সমাজের সমর্থনও পাননি। এমনকি বিদ্যাসাগরও তাকে নিরুৎসাহ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন স্কুল স্থাপন করা আর মেডিকেল স্কুল স্থাপন করার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তবু দমেননি নেই এই বাঙালি ডাক্তার। কি অসম্ভব কষ্ট করেছিলেন তিনি। চিকিৎসক রীতম জোয়ারদারের একটি প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, হাসপাতাল তৈরির অর্থ সংগ্রহের জন্য ডাক্তার বন্ধু শৈলেন গুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাড়ির, ধনী পরিবারে বিয়ের বাড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।শ্রদ্ধায় কেউ তার সাধ্যমতো সহযোগিতা করতেন,আবার কেউ কেউ মুখ বেঁকিয়ে,পাশ কাটিয়ে, টিপ্পনী কেটে চলে যেতেন। অথচ শত অপমান সহ্য করেও নিরহংকার মানুষটি সকলের জন্য হাসপাতাল তৈরির স্বপ্ন সার্থক করা থেকে পিছিয়ে আসেননি।
শুধু দানের অর্থ নয়, চিকিৎসক হিসেবে উপার্জিত অর্থের সমস্তই দান করে গেছেন মেডিকেল স্কুল ও হাসপাতালের জন্য। মৃত্যুর সময় রাধা গোবিন্দ করে নিজস্ব সম্পত্তি বলতে কিছুই ছিল না শুধু ছিল বেলগেছিয়ায় গড়ে তোলা একটি বাড়ি। সেই বাড়িটিও উইল করে দান করে যান মেডিকেল কলেজকে। তিনি নিজের গোটা জীবনটি উৎসর্গ করেছেন দেশ ও দেশবাসীর প্রতি। দেশবাসীর চিকিৎসার খামতি রুখতে আদর্শ ও ভালো চিকিৎসক গড়ে তুলতে কত কিছুই না তিনি করে গেছেন। উনিশ শতকের বাংলার প্রকৃত রেনেসাঁ পুরুষ ছিলেন এই রাধা গোবিন্দ কর জীবদ্দশায়। মৃত্যুর পরেও তিনি তার প্রাপ্য যথার্থ সম্মানটুকু কতটা পেয়েছেন, সে কেবল ক্ষীন স্মৃতি বাঙালি বলতে পারেন মানুষই । যে জঘন্য কারনে আর জি করের নাম দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে তা থেকে শীঘ্রই মুক্তি পাক। এবছর রাধাগোবিন্দ করের জন্মদিনের অর্ঘ্য হোক ঘটনার যথাযথ তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি।
“এক ঝলক আর জি কর”র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লিখেছেন যা বর্তমানে অনেককে আকর্ষিত করবে
জানবার উৎসুকুতায়,তাকে ঘিরে কেন এত জন
আন্দোলন?কিন্তু তারা বর্তমানের পরিস্থিতির নাম
গন্ধ খুঁজে পাবেনা এই প্রতিবেদনে।আপনি সযত্নে
এড়িয়ে গেছেন”আর জি কর” কে ঘিরে প্রতিজন’র
রাত্রি দখলের কাহিনী।অথচ আপনিও একজন
মেয়ে।যাই হোক প্রিয় শহর আজ কলঙ্কিত,এই
মহান শহর আজ রক্ত কান্না ভেজা কারন মহিলারা
আজ ভীষণ রকম অসুরক্ষায় নিজেকে অসহায়
ভেবে বেছে নিয়েছেন প্রতিবাদ প্রতিরোধের পথ।
শহর,অশালীন অসভ্য শয়তান প্রশাসনিক শক্তির
কাছে ভয়ে নতজানু না হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে তীব্র
প্রতিবাদের মাধ্যমে আগামী সুরক্ষিত করতে।
এই পরিস্থিতির নেপথ্য সংলাপ এই প্রতিবেদনে
থাকলে তিলোত্তমার অভয়াকে সান্ত্বনা সহানুভুতি
জানাতে শহরের পাশে থাকা যেতো।শান্তি পেতো
প্রতিটি অভয়া নির্ভয়া।
ভালো থাকুন ভালোরাখুন ভালোবাসুন সব্বাইকে।
মতামতের জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।
কলকাতার বুকে সেরা সরকারী হাসপাতালটি জন্ম দিয়েছে হাজার হাজার চিকিৎসকের। নিত্যদিন যাঁরা পরিষেবা দেয় হাজার হাজার রোগীর। এই বৃহৎ-কর্মযজ্ঞ চলছে যে হাসপাতালে, সেই হাসপাতালের জন্ম দিয়েছেন এক বিলেত ফেরত চিকিৎসক কি অক্লান্ত পরিশ্রম করে, কত মান অপমান সহ্য করে। তাঁর বৃহৎ কর্ম যজ্ঞের কথা ছাড়ুন, অধিকাংশ বাঙালি তার নামই শোনেনি। এটাও কি কম লজ্জাজনক!!
এই হাসপাতালের চেস্ট মেডিসিনের ঘটনাটি এতটাই অমানবিক, যে কোন সুস্থ মানুষ এর প্রতিবাদ না করে থাকতে পারবেনা।আমার পরিবারে দুজন ডাক্তার। তাই আন্দোলন চলছে প্রতিনিয়ত।২৩ সে আগস্ট ডাক্তার রাধাগোবিন্দ করের জন্মদিনের অর্ঘ্য হোক ঘটনার যথাযথ তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি।