কয়েকদিন আগে প্রকাশিত ইন্টার গভর্নমেণ্টাল ক্লাইমেট চেঞ্জ এর রিপোর্ট নিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়েই কী হবে কী হবে গোছের একটা মরা কান্না শুরু হয়ে গেছে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে পৃথিবী রসাতলে গেল রব তুলেছি আমরা। কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট করে কেউই বলছেন না যে, এই অমার্জনীয় অপরাধের জন্য মানুষই দায়ী। আমাদের বদভ্যাস, লোভ ডেকে এনেছে এই বিপদ। রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে “উষ্ণায়ন, তাপপ্রবাহ, প্রবল বৃষ্টিপাত, সমুদ্রের জলস্ফীতি, খরা সহ যাবতীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় আরও প্রবল হয়ে ওঠার জন্য দায়ী মানুষের পরিবেশ বিরোধী কাজকর্ম।” এ শুধু আজকের কথা নয়, প্রথম থেকে এবারের ছ’নম্বর রিপোর্ট অবধি প্রতিটিতেই আমাদের কাজকর্মের দরুন পরিবেশের বিধ্বংসী হয়ে ওঠার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা কান দিইনি। প্রতিটি রিপোর্টেই বলা হয়েছে মানুষ ভুল করছে, কিন্তু আমরা শুনিনি।

দীর্ঘকালের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা এখন প্রযুক্তির কারণেই অনেক সহজ। জলবায়ুর অবস্থার পূর্ববর্তী তথ্য, AR6 এর মত উন্নততর বিপদ সঙ্কেত, পরিবেশ সংক্রান্ত মাপকাঠিগুলির উন্নতি, সরজমিন অনুসন্ধান এবং প্রাপ্ত তথ্যের উপযুক্ত বিশ্লেষণের সুবিধা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কাজ অনেক সহজ ও ভ্রান্তিহীন করে দিয়েছে। কিন্তু তাতে আমাদের ভ্রান্তি কাটেনি। জলবায়ুর আঞ্চলিক ফারাকগুলিও এখন আগের তুলনায় অনেক স্পষ্ট। বিজ্ঞানীরা আমাদের তা দেখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা শুনিনি।
মনুষ্যসৃষ্ট লাগামছাড়া দূষণ পৃথিবীকে এখন যতটা উষ্ণ করে তুলেছে তা এই গ্রহের ২০০০ বছরের ইতিহাসে ঘটেনি। এবারের আই পি সি সি রিপোর্টের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হবে। সেখানে পরিস্কার করে বলা হচ্ছে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের সামগ্রিক তাপমান ১৮৫০–১৯০০-র মধ্যে ১.০৯ গুণ বেড়েছে। সত্যি বলতে কি ১৯৫০ থেকেই মানুষের পরিবেশ দূষণের কারণে পৃথিবী উষ্ণ হয়ে উঠতে শুরু করেছিল, এখন আমরা তার চরম রূপ দেখছি। আগে কি কারণে পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে, তার জন্য মানুষই দায়ী কিনা, তা বোঝা যেত না কিন্তু এখন AR6 তা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিচ্ছে। আগে উষ্ণায়নের কারণ এভাবে সরাসরি জানা যেত না।

এখন বিজ্ঞানীরা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন, অস্বাভাবিক উষ্ণ প্রবাহের পিছনে নিশ্চিতভাবেই মনুষ্যসৃষ্ট কারণ রয়েছে। দুঃখের কথা, প্রযুক্তির এই সাফল্য এবং সেই সাফল্য থেকে পাওয়া তথ্য আমরা উষ্ণায়ন রুখতে কাজে লাগাচ্ছি না। মনে পড়ে গেল রামপ্রসাদের গান— স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা।