আজ সক্কাল সক্কাল স্নান করে শীতলষষ্ঠীকে জল দিল মুন্নি। বাড়ির মস্ত বড় শিলটা মহা সমাদরে আজ ঠাকুরঘরে ঠাঁই হয়েছে। সেই কোন আদ্যিকালে বাবার ঠাকুর্দা-ঠাকুমা নাকি বেণারসে তীর্থ করতে গিয়ে এই শিলনোড়া এনেছিলেন। এখন তো বাটাবাটির কাজ সব মিক্সিতে হয়। কেবলমাত্র আজকের পুজোয় আর যৌথ পরিবারের বিয়েতে কলাতলায় মঙ্গলকাজে, বরকনে দাঁড়ানোতেই এই শিলনোড়ার ব্যবহার।
মনে পড়ে মেজ জ্যেঠিমা এই শিলেই প্রতিদিন তাল তাল জিরে-ধনে-আদা-পোস্ত-সরষে বাটতেন। মাখনের মত মসৃণ মশলাবাটায় তাঁর খ্যাতি ছিল। মুন্নি চোখ বুঁজলে এখনো মেজজ্যেঠিমার বাটনাবাটার তালে তালে হাতের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ শুনতে পায়। শিলটা দেখে মুন্নি একটু ভাববিভোর হয়ে গেছিল। চটকা ভাঙল যখন নতুনঠাকুমা বলতে শুরু করলেন.— জৈষ্ঠ্য মাসে জামাই ষষ্ঠী, শ্রাবণ মাসে চাপড়া ষষ্ঠী, আশ্বিনমাসে দুর্গা ষষ্ঠী, অঘ্রাণমাসে মূলাষষ্ঠী, পৌষমাসে পাটাই ষষ্ঠী, মাঘমাসে শীতলষষ্ঠী, ফাল্গুনমাসে অশোকষষ্ঠী, চৈত্রমাসে নীলষষ্ঠী।”

বারোমেসে ষষ্ঠী ঠাকরুণদের নাম জপতে জপতে মুন্নি একবার সারাবাড়ি ঘুরে বেড়ানো ঠাকরুণের বাহনদের কথা মনে করল। ষষ্ঠী ঠাকরুণের কৃপায় বড় কাকুমণির আদুরে কালো, সাদা, ছাইরঙা মার্জার বাহিনীরা সারাদিন পায়ে পায়ে ঘুরছে সবার। মুন্নি ভয়ে ভয়ে ছেলেকে তাদের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে, কিন্তু তার তিনবছরের লাল তাদের খেলার সঙ্গী করে তাদের পিছুপিছু ঘুরছে।
মুন্নি ওরফে সঙ্গীতা ছ-বছর পর বাড়ির সরস্বতী পুজোয়। সুদূর ক্যালিফোর্ণিয়া থেকে সে সরস্বতীপুজোর আগে, মাঝরাতে যখন মিত্তিরবাড়ির দরজায় পা রাখল, তখন ছোটো কাকিমা গালে হাত দিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন, “ওমা, এ-যে মাঝরাতে স্বয়ং জ্যান্ত সরস্বতীর আবির্ভাব হল!” ফুটফুটে মুন্নির মার্কিনদেশের জলবায়ুতে রূপ আরো খোলতাই হয়েছে। বাড়ির মেয়ে এতদিন পর সাহেবদের দেশ থেকে বাড়িতে আসছে, সঙ্গে আবার নাতিবাবু! সবার আহ্লাদের আর সীমা নেই। মুন্নির ছোটকাকু নাতির জন্যে দোকান থেকে বাসন্তীরঙের ক্ষুদে পাঞ্জাবি আর ধুতি কিনে এনে বলছেন, “দেখতো মুন্নি নাতিবাবুর এটা গায়ে হবে কিনা”। মুন্নির বাবা বইয়ের দোকান থেকে খুঁজে পেতে যোগাড় করেছেন স্লেটপেন্সিল। আজ যে তাদের আদরের নাতির হাতেখড়ি হবে বাগদেবীর সামনে।
“ওম্ যা কুন্দেন্দু তুষারহারধবলা …. “মার্কিনী উচ্চারণে, আধো আধো বুলিতে তিনবছরের লাল যখন পুষ্পাঞ্জলি দিল বাড়িশুদ্ধু লোকের কি উল্লাস! মুন্নির ছেলের কার্যকলাপ দেখে তাদের আর বিস্ময়ের সীমা নেই।

ওড়িষ্যাতে বেশ বড়ো করে হয় শীতল ষষ্ঠীর পুজো
তবে পিৎসা, বার্গার, চকলেট খাওয়া ছেলের কি আর বাঙালি খাবার মুখে রুচবে, সে নিয়ে এতদিন বড়ই চিন্তিত ছিল বাড়ির সবাই। কিন্তু সে ছেলে দিব্যি প্রসাদের থালা থেকে কদমা নিয়ে চুষে চুষে খেল। তারই জন্যে কম ঝাল দেওয়া হয়েছে খিচুড়ি, বাঁধাকপির তরকারিতে। টম্যাটোর চাটনি সহযোগে সেসবেরও স্বাদ তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিল পুঁচকে লাল।
বাড়ির পুজো শেষ হতেই মুন্নিও ছেলেকে কাকা-জ্যাঠা-কাকিমা-মা-বাবার হাতে ছেলেকে সঁপে দিয়ে হলুদ প্রজাপতির মতই ঘুরে বেড়াল সারাদিনটা। সেই আগেকার মত সেজেগুজে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দিল। স্কুলকলেজে ঢুঁ মারল। সন্ধ্যেবেলা যখন বাড়ি ফিরল, তখন দেখল ন-ঠাকুমা বিশাল হাঁড়িতে গোটা সেদ্ধ বসিয়েছে। পরিবারের সবার জন্যে। একটু নাক কুঁচকোলো সে। “কাল সেই আবার অখাদ্য গিলতে হবে! “মুন্নির মনে পড়ে গেল সরস্বতীপুজোর ফর্দের সঙ্গে থাকত কড়াইসেদ্ধর বাজারের ফর্দ। বাবা-কাকারা ঠাকুমাদের নির্দেশে লিস্ট মিলিয়ে মাষ-কড়াই অর্থাৎ খোসাসুদ্ধু নতুন বিউলী বা কড়াইয়ের ডাল, ছোটবেগুন, জোড়া কড়াইশুঁটি, জোড়া সিম, রাঙাআলু বাজার থেকে কিনে আনতেন। বিয়ের আগে মুন্নি ঐ নুনতেল বিহীন গোটা মটরশুঁটি-সিম-বেগুন-কড়াই সেদ্ধ খাওয়া নিয়ে কি অশান্তিটাই না করত! তখন আবার বড়ঠাকুমা মানে বাবার জ্যেঠিমা বেঁচে। তিনি বলতেন, “শীতল ষষ্ঠীর দিন ঐ বাসীভাত, কড়াইসেদ্ধ আর কুলের অম্বল সবাইকে খেতে হয়। শরীর ঠান্ডা হয় এতে। তোমরা এখনকার ছেলেপুলেরা মানতে চাওনা, বসন্তের শুরুতে মা শীতলাকে উচ্ছুগ্গু করা এ প্রসাদ খেলে মায়ের দয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।” মিত্তিরবাড়ির বৌঝিদের বটঠাকুমার ওপর কথা বলার জো তো ছিলই না, মুন্নির যথেষ্ট শিক্ষিত বাবা-জ্যাঠা-কাকারা একথার প্রতিবাদ করত না। মা-ঠাকুমাদেরও সাধ্যি ছিলনা আদরের মেয়েকে অন্য পদ বানিয়ে দেবার। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে সবার সঙ্গে ভাতের পাতে বসত মুন্নি। কোনোরকমে গলাধঃকরণ করত বিস্বাদ-বিবর্ণ কড়াইসেদ্ধ, ঠান্ডাভাত। দুটোই তার দুচোখের বিষ ছিল তখন। সেই মনখারাপ দূর হত বিকেলে ছোটকার সঙ্গে বেড়িয়ে লুকিয়ে পাড়ার কেষ্টদার দোকানের চপকাটলেটে!

এখন অবশ্য বটঠাকুমা স্বর্গে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির নিয়মকানুন অনেক শিথিল হয়েছে। বাসীভাতের বদলে সবার গরম ভাত জোটে। পাতের কোণে নিয়মরক্ষের একটুখানি বাসীভাত। শীতল ষষ্ঠীর দিন সবার সঙ্গে খেতে বসে মুন্নি দেখল তার জন্যে ফুলকপির তরকারি হয়েছে। মা বানিয়েছে তার প্রিয় মোচার ঘন্টও। তবু মেজকাকিমা একটা ছোট বাটিতে একটু গোটাসেদ্ধ তুলে দিয়ে তাকে বললেন, “একটু মুখে দে মা। ছেলের মা হয়েছিস, আজকের শীতলষষ্ঠীর দিনে ছেলের মঙ্গলের কথাটাও ভাবিস”। মুন্নি অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাঁচাসরষের তেল আর নুন ছড়িয়ে কড়াইসেদ্ধ দিয়ে ভাত মেখে একগরাস খেয়ে দেখল, কই আগেকার মত তেমন মন্দ তো লাগল না! এ স্বাদ যেন কতকালের চেনা হয়েও অনন্য। কাঁচা সরষে তেলের ঝাঁঝের ভেতর দিয়ে সে যেন তার অবুঝ ছোটবেলাকে ফিরে পেল আবার! মুন্নি আরেকটু চেয়েই নিল কাকিমার কাছে। বাড়ির সবাই মুখচাওয়াচায়ি করল। মুখ টিপে হাসল। ঠোঁটকাটা ছোটকাটা তো টিপ্পনিই কাটল, “কি ব্যাপার রে মুন্নি? what a change!”

সন্ধ্যেয় ঠাকুর বিসর্জনের পর মুন্নি নতুনঠাকুমার ঘরে গিয়ে কথায় কথায় জেনে নিল শীতল ষষ্ঠীতে শিলের ওপর রাখা হয় মরশুমী ফল, সবজি, আখের টুকড়োয় গাঁথা দুটি কড়ি। শিলটিকে লালপাড়, সাদাকোরা কাপড়ে মুড়ে তাতে ছোট মাটির কড় বা লাল রুলি, সিঁদূরপাতা দেওয়া হয়। সন্তানবতী মায়েরা তাতে একটু করে গঙ্গাজল দিয়ে প্রণাম করেন। সংসারের অতি নিত্যপ্রয়োজনীয় এই যন্ত্রটিকেও সেদিন এভাবে মূল্য দেওয়া হয়। নতুনঠাকুমাকে অবাক করে দিয়ে জেনে নিল কড়াইসেদ্ধর সহজ-সরল রেসিপি। তার উপকারিতা।
রাতে ছেলে ঘুমিয়ে পড়লে মুন্নি নিজের ছোট্ট-প্রিয়, কোলের যন্ত্রটিকে বার করে খুটখুট করে টাইপ করে ফেলল শীতল ষষ্ঠী আর কড়াইসেদ্ধর কথা। সে একজন নাম করা ব্লগার। তার ইংরিজিতে লেখা ব্লগের ফলোয়ারের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে। এক বিখ্যাত মার্কিনী প্রকাশক তাকে মোটা টাকার লোভ দেখাচ্ছে এই লেখাগুলিকে বই আকারে প্রকাশ করার জন্যে….।
Golper chhole bangalir chirokalin ekta kristi ke eto sundor kore tule dhorlen!!
Shroddha janai aponake????????
খুশি হলাম লেখা পড়ে ভালোলাগা জানালেন বলে। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।