শিবরাত্রি গেল বটে কিন্তু শিব ঠাকুর কে নিয়ে সারা বছর ধরেই ভক্তগণ সরগরম। শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিদেশেও বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে শিবের যেসব মূর্তি বা ভাস্কর্য রয়েছে তার পিছনে মূল ভাবনা কিন্তু সেই পুরাণের। সিন্ধু সভ্যতা হোক বা ডেনমার্ক, নেপাল, জাপান, ইন্দোনেশিয়া অথবা জম্বুদ্বীপ — শিব ঠাকুর পূজিত হন বিশ্বজুড়ে। আজকের প্রতিবেদনে তারই কিছু কথা…

জাপান: ভারতীয় যে দেবতা জাপনী জনগণের ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল তিনি হলেন মহেশ্বর শিব। জাপানি পুরাণে শিচি-ফুকু-জিন (ভাগ্যের সাত দেবতা) রয়েছেন তাদের মধ্যে দাইকোকুটেনের (daikokuten shiva) উৎস শিব বলেই মনে করেন অনেকে। মহাকাল শব্দটির প্রতিরূপ জাপানি এই নাম। ভাগ্য ও সম্পদের দেবতার রূপে পুজিত হন তিনি। কিংবদন্তী এবং শিল্পে তাকে চিত্রিত করা হয়েছে কালো-চর্মযুক্ত, স্থূল, ডান হাতে একটি ইচ্ছা-প্রদানকারী ম্যালেট বহন করা, মূল্যবান জিনিসের একটি ব্যাগ তার পিঠে ঝুলিয়ে রাখা আছে এবং দুটি চালের থলেতে বসে আছেন।
মহাকাল আবার শিবের বৌদ্ধ নাম। পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারে যখন চীনা ভিক্ষুরা বুদ্ধের মতবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে জানার জন্য বৌদ্ধ ধর্মের জন্মস্থান হিসেবে ভারতে ভ্রমণ করেছিলেন, তখন তারা অনেক সূত্র চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। ভারতীয় শিবের বৌদ্ধ রূপ থেকেই এই দেবতার বিবর্তন যার মধ্যে শিন্টো দেবতা ওকুনিনুশিরও (Okuninushi) আভাস পাওয়া যায়। জাপানের উপাস্য দেবতার সঙ্গে ‘ভাগ্যচুরির’ এক পুরনো রীতির গল্প প্রচলন রয়েছে। বলা হয় যদি কেউ এই দাইকোকুটেনের মূর্তি চুরি করার সময় ধরে না পড়েন তবে তিনি অসীম সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। এই দেবতা স্ত্রী হিসেবে রয়েছে দায়ী কখন নিয়ম যিনি আঁধারের দেবী মহাকালীর প্রতিরূপ।

জাভা বা জম্বু দ্বীপে: ইসলাম আসার আগে জাভা বা জম্বু দ্বীপে শৈব ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পরস্পরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও মিত্রভাবসম্পন্ন ছিল। মধ্যযুগীয় ইন্দোনেশীয় সাহিত্যে বুদ্ধকে শিব ও জানার্দন তথা বিষ্ণুর সঙ্গে সমার্থক দেখানো হয়েছে। হিন্দুজাতি অধ্যুষিত বালিতে বুদ্ধকে শিবের ছোট ভাই বলে বিশ্বাস করা হয়। হিন্দু ধর্মের মানুষ অধিক থাকার কারণে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই মন্দির দেখা যায় এখানে। মন্দির কে বলা হয় পুর। জাভা দ্বীপে রয়েছে একটি বিখ্যাত মন্দির রয়েছে — প্রাম্বানান (Prambanan), স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হয় লোরোজোঙ্গরাং ((Javanese: Rara Jonggrang)। এটি আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম হিন্দু মন্দির। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল ত্রিমূর্তি অর্থাৎ ব্রহ্মা-বিষ্ণু শিব কে উৎসর্গ করে।

সিন্ধু সভ্যতা: হরপ্পা মহেঞ্জোদারো খননকার্যের পরে যে শীলমোহরগুলি পাওয়া যায় তাদের মধ্যে পশুপতি শীলমোহর ছিল অন্যতম। মোহরগুলিতে পশুদের আধিক্য দেখা গেল একটি শীলমোহরের আয়তনে ছিল অন্যগুলো থেকে বেশ খানিকটা বড়। পশুপরিবৃত্ত পদ্মাসনের ভঙ্গিতে দেখা যায় এক অবয়ব।স্যার জন মার্শালের মতে এটিই আদি শিবের প্রতীক। যোগাসনে উপবিষ্ট মাথার উপরে দুই অর্ধবৃত্ত যেন দুটি শিং। এ চিত্র যেন পশুদের অধিপতি বা পশু ভাবকে প্রকট করেছে। পশুপতি চিত্রের মাথার তিনটি শিং যেন শিবের ত্রিশূল। জন মার্শালের মতে শিবের পৌরাণিক ব্যাখ্যায় যে যোগী রূপের বর্ণনা আছে তার সঙ্গে পশুপরিবৃত্ত এই চিত্রের মিল পাওয়া যায়। তবে অনেক ঐতিহাসিকের মতেই এই মূর্তিটি থেকে এটা পরিষ্কার নয় যে অবয়ব তিনটি মুখ রয়েছে কিংবা যোগাসনে বসে আছে কিনা সঠিক না অনুমান সেটা বোঝা যায় না। তবে একটু স্পষ্ট যে এই মূর্তির মাথায় অর্ধবৃত্তের সঙ্গে শিবের মাথার অর্ধচন্দ্র বা তার বাহন ষাঁড়ের শিং এর সাদৃশ্য চোখ এড়ানো অসম্ভব। তাই বাস্তবে এই মূর্তি শিবের আদি রূপ পশুপতি’র। বিতর্ক যাই থাকুক না কেন অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে এই মূর্তি আদতে শিবের আদি রূপ, পশু-পতি তিনি।

ডেনমার্ক: শিব পশুপতিনাথ রূপে নেপাল, ডেনমার্ক এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলিতে পূজা করা হত। দীর্ঘকাল ধরে গুন্ডেস্ট্রপ কল্ড্রন কেল্টিক (Gundestrup Cauldron Celtic) শিল্পকলার সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণগুলির মধ্যে একটি হিসাবে সমাদৃত হয়েছে, যা থ্রেসে তৈরি কিন্তু ডেনমার্কে পাওয়া যায়৷ ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, শিংওয়ালা দেবতার যে মূর্তিটি যা প্রাথমিক সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতায় পাওয়া গিয়েছিল, তাই আসলে পশুপতিনাথের। নিশ্চিতভাবে ২৩০০-১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সিন্ধু উপত্যকার প্রাচীন শহর মহেঞ্জোদারো থেকে একটি প্রাপ্ত সীলমোহর দেখতে পাত্রে চিত্রিত দৃশ্যের মতো। হিন্দুরা সর্বত্র পশুপতিনাথ কে ভক্তি করেন।

নেপাল: শ্রী পশুপতিনাথ (নেপালি/হিন্দি: श्री पशुपतिनाथ) “প্রাণীদের প্রভু” হিসাবে হিন্দু ভগবান শিবের একটি অবতার। তিনি সমগ্র হিন্দু বিশ্বে পূজনীয়, তবে বিশেষ করে নেপালে, যেখানে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দেবতা হিসাবে গণ্য করা হয়। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া নেপালের পশুপতিনাথের (pashupatinath) এই মন্দির।এশিয়ার অন্যতম পবিত্র স্থানগুলির মধ্যে একটি। বাগমতী নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির কাঠমান্ডু থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে। পঞ্চম শতাব্দীতে লিচ্ছবি রাজা প্রচণ্ড দেব এই মন্দিরটির তৈরি করেন বলে জানা যায়। কিন্তু ঐতিহাসিকরা মনে করেন আগেও এই মন্দির ছিল, পুরনো মন্দিরটি উইপোকায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড দেব এই নতুন মন্দিরটি গড়ে তোলেন। মন্দিরের একটি কক্ষে কালো পাথরের তৈরি ছ ফুট দীর্ঘ একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে। যার চারটি মুখে বিষ্ণু সূর্য পার্বতী ও গণেশ অধিষ্ঠিত। শিবপুরাণ মতে, এই শিবলিঙ্গটি ভক্তদের যাবতীয় মনোবাসনা পূর্ণ করেন।

ইন্দোনেশীয় শিব: হিন্দু সাহিত্যে ইন্দোনেশিয়ার যে গুরুদের কথা বলা হয়েছে তাদের আদিগুরু হলেন বাতারা (Bataraguru)। আসলে আমাদের শিব ঠাকুরই হলেন বাতারা যেটি সংস্কৃতির ভত্তরক থেকে উৎপত্তি। তবে তিনি শুধু শিব ঠাকুরই নন, তার সঙ্গে মিশেছে ইন্দোনেশীয় বিভিন্ন আধ্যাত্মিক চেতনা, আধ্যাত্মিকতার নানান দিক এমনকি দেশের নানান নায়কদের সত্তাও। তবে তার স্ত্রী কিন্তু সেই প্রাচীন দেবী দুর্গাই।
খুব সুন্দর তথ্যসহ লেখনী????????????
ধন্যবাদ জানবেন ????