খ্রীস্টজন্মের বহু আগে থেকে গোয়া ছিল ‘অপরান্ত’ অর্থাৎ শেষের শেষে, অপূর্ব, অনির্বচনীয়।
চারশ একান্ন বছর ধরে রাজত্ব করতে করতে পর্তুগীজরা এই কোঙ্কনি বন্দরটিকে ভালোবেসে ফেলল। মূর বা মুসলমান জাহাজিদের তাড়িয়ে সাজালো তাদের পূবের মুক্তো (Perlo do Oriente)-কে। মশলার ব্যবসায় ফুলেফেঁপে উঠে তার আদরের নাম দিল সোনালি গোয়া (Goa Dourada)। এখানকার লাল মাটিতে চার্চ আর দুর্গ বানিয়ে, সাধারণ মানুষকে খ্রীস্টধর্মে দীক্ষিত করে গড়ে তুলল তাদের পূবের রোম (Rome Do Oriento)।

গোয়াকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিলেও পর্তুগীজদের ভারতীয় রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলতে হত। তাদের গোলমরিচ রপ্তানির বেশিরভাগটাই হত মালাবার উপকূল থেকে। সেসব বহন করত ভারতীয় নাবিকরা। অন্যান্য রাজ্যগুলি থেকে ভারতীয় জাহাজে আসত তাদের খাবারদাবার। গুজরাতি ব্যবসায়ীরা ধারে যোগাত তাদের ব্যবসার টাকা। খাজনার সিংহভাগটা আসত ভারতীয় চাষীদের কাছ থেকে। সংঘাত হত না এমনটা নয়। জোর করে খ্রীস্টান করার ঘটনাও ঘটেছিল।

পর্তুগীজ পাও
সুদূর পর্তুগাল থেকে এদেশে এসে বেশিরভাগ লোকই আর স্বদেশে ফিরত না। নিজের স্ত্রী বা বান্ধবীদের সঙ্গ থেকে তারা বঞ্চিত ছিল কারণ রোমান ক্যাথলিক ধর্মে নারীদের সমুদ্রযাত্রায় ছিল বিধিনিষেধ। ফলে পর্তুগিজ পুরুষরা এদেশেই তাদের সঙ্গিনী খুঁজে নিত। অনেকে একাধিক দাসীও রাখত। এভাবেই ধীরে ধীরে পর্তুগীজ ও ভারতীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটতে শুরু করে।

পাও ডাবলি গুজরাটী খাবার।
পর্তুগীজরা এদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে গোলমরিচ, লবঙ্গ, দারুচিনি রপ্তানি করে ইউরোপীয় খাবারদাবারের স্বাদেগন্ধে জৌলুস বাড়াল। তাদের আনা বাটাটা আমাদের বড় আদরের বারোমেসে আলু হয়ে গেল। তরকারির রঙ আর রসনা দুইই বাড়াতে আমরা ব্যবহার করলাম, তাদেরই দেওয়া টম্যাটো আর লঙ্কা। তাদের দৌলতে আমরা আতা, আনারস, পেঁপের স্বাদ জানলাম। তাদের দেওয়া নামেই এসব ফল পরিচিত হল ভারতে।
এদেশে এসে এদের খাবার প্লেটে এরা প্রথমেই অভাব বোধ করল ব্রেডের। রোমান ক্যাথলিকদের প্রার্থনার পর ব্রেড খাওয়া ধর্মীয় রীতির মধ্যে পড়ে। তাই এ দেশে এসে পর্তুগিজ রাঁধুনিরা মন দিল কীভাবে ভালো ব্রেড বানানো যায়।

বরে পাও মহারাষ্ট্রীয়ানদের প্রিয় খাবার
জেসুইট পাদ্রিরা গোয়ার মানুষদের পাও (পর্তুগীজ শব্দ) বানাতে শেখালো। মজার ব্যাপার হল তারা এখানে বেকিংয়ের জন্য ইস্ট না পেয়ে ব্যবহার করত তাড়ি বা টোডি। শস্তার পেট ভরানো খাবার পাও খুব দ্রুত ছড়িয়ে গেল প্রায় গোটা ভারতে। পাওয়ের সঙ্গে এটাসেটা মিশিয়ে মহারাষ্ট্রে জনপ্রিয় হল বড়াপাও, পাওভাজি, মিশেলপাও, উসলপাও। গুজরাটে ডাভোলি। আমরা মাখন, জ্যাম আর ‘প’য়ের মাথায় একটা চন্দ্রবিন্দু লাগিয়ে পাঁউরুটি খেতে শিখলাম। হিন্দিভাষীরা নাম দিল তার ডবলরোটি। বেকিংয়ের পর রুটি প্রায় দ্বিগুণ আকার ধারণ করত তাই তার এমন দেশিবিদেশী নামকরণ!

গোয়ান ক্যুসাইন
পর্তুগিজ রাঁধুনিরা এদেশে এসে রান্না করতে গিয়ে তাদের দেশের সব উপকরণ পেল না। নিরূপায় হয়ে তারা স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করতে শুরু করল। আমন্ড মিল্কের পরিবর্তে নারকেলের দুধ। চিনির জায়গায় এলো গুড়। মাখনের বদলি হল ঘি। ময়দা না পেয়ে চালের গুঁড়ি। এর ফলে যে খাবারগুলি তৈরি হতে লাগল, সেগুলি স্পষ্টতই পর্তুগিজ খাবার হলেও তার স্বাদ ও গন্ধ হয়ে দাঁড়াল বিলকুল ভারতীয়। জন্ম নিল এক নতুন ধরনের রান্নাবান্নার কায়দা — গোয়ান ক্যুইজিন। ভারতীয় এবং পর্তুগিজ রন্ধনপ্রণালীর এই ফিউশনের পথচলা শুরু এখান থেকেই।

গোয়ান চিকেন শাক্যুটি
গোয়ার এরকমই একটি জনপ্রিয় পদের নাম শাক্যুটি (Xacuti)। ঘরে ঘরে বানানো শাক্যুটি গোয়ার মানুষ পাও দিয়ে খেতে পছন্দ করে। চিকেন, মাটন, কাঁকড়া, অয়েস্টার অথবা সব্জি-মাশরুম এর প্রধান উপকরণ। বেশ কিছু ভাজামশলা, পিঁয়াজ, ধনেপাতা, পোস্ত, নারকেল দুধে তৈরি এই পদটির স্বাদ বাঙালি জিভে একেবারেই অভিনব। যেন বিভিন্ন মশলার সিম্ফনি।
খ্রীস্টমাসের উৎসবে গোয়ার বেকারিতে

গোয়ান বেবিঙ্কার
(Bebinca) চাহিদা থাকে তুঙ্গে। বাংলার রসগোল্লার মত এর খ্যাতি। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের সাতটি পাহাড়ের কথা মনে রেখে এই কেকটির সাতটি স্তরের নির্মাণ। ইন্দো-পর্তুগীজ ফিউশন ফুডের অন্যতম এই কেকটিও নারকেল দুধের পুষ্টিতে ভরপুর।
এছাড়া ম্যাকাও থেকে পর্তুগাল ঘুরে গোয়াতে জনপ্রিয় হয়েছে সারাদুরা (serradura)। মারী বিস্কুটের গুঁড়ো, কনডেন্সড মিল্ক, ক্রীম দিয়ে সহজ প্রণালীতে তৈরি এই পুডিংটি যথেষ্ট সুস্বাদু।

গোয়ান সারাদুরা পুডিং
গোয়াতে এসে সামুদ্রিক মাছের রওয়া (সুজি) ফ্রাই না খেলে বঞ্চিত হতে হয়। এই বিশেষ মাছভাজাটি গোয়া তো বটেই, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটকের সমুদ্র উপকূলে খুবই লোকপ্রিয়।
এছাড়াও সামুদ্রিক জীবের অজস্র পদ, বিভিন্ন পানীয়, কেক, কুকিজের স্বাদ গন্ধ নিয়ে গোয়ার হোটেল বারোমাস তার পর্যটকদের আপ্যায়ন করে।

গোয়ান ফিস
গোয়ার মিশ্রসংস্কৃতির প্রভাবেই সেখানে সমুদ্রের নোনতা হাওয়ায় বাঁধনছেঁড়া খুশি। লালমাটি, নীল আকাশ, গাছের পাতায় ভালো থাকার আহ্বান। চার্চের হলে কোঙ্কনি প্রার্থনাসঙ্গীত। গণপতি উৎসবে, কার্ণিভালে মিলনমেলা। জেলেপাড়ার আঁশটে গন্ধের সঙ্গে মিশে যায় অলিগলির বেকারীর কেকের সৌরভ।
নিজে বেড়াতে গেলে হয়তো এমন অসাধারণ বেড়ানো হত না। এমন অপূর্ব ভ্রমণকাহিনী পড়া যেন না দেখা জনপদের স্বাদ, বর্ণ, গন্ধ বাস্তবিকই আহরণ করতে অলিগলি ঘুরে বেড়ানো…উপরি পাওনা সাহিত্যের কোমল ছোঁওয়ায় সিঞ্চিত অসংখ্য ঐতিহাসিক এবং প্রয়োজনীয় তথ্য। আবারও সমৃদ্ধ হলাম!!!
খুব খুশি হলাম এমন পাঠপ্রতিক্রিয়া পেয়ে।
আসলে এখানে ঠিক বেড়াতে আসিনি তো,বেশ কিছুদিন হল রয়েছি এখানে। স্থানীয় বাজার ,দোকান সব ঘুরে দেখছি। অভিজ্ঞতাও হচ্ছে নানারকম।