বাঙালি নাকি মনীষীর থেকে গবেটের জন্ম বেশি দেয়। ভরা বিতর্কসভায় এক তার্কিক এটা সোচ্চারে ঘোষণা করলেন। এটা কতটা সত্য, কতটা অর্ধসত্য, কতটা মিথ্যা, তার মধ্যে যাচ্ছি না। তবে গবেট শব্দটি নিয়েই আমার গবেষণা।
সমস্ত স্বীকৃত অভিধানেই বলা হয়েছে, গবেট শব্দটি দেশি বা অজ্ঞাতমূল। সংস্কৃত শব্দ থেকে আসেনি গবেট। তবে অর্থ সব অভিধানেই এক। বোকা, হাঁদারাম, নির্বোধ, বুদ্ধিশুদ্ধিহীন।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ গবেট শব্দটির এন্ট্রি নেই। নেই জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালাভাষার অভিধানেও। তবে গবা, গবুচন্দ্র শব্দদুটি নির্বোধ, বোকারাম অর্থে সমস্ত অভিধানেই আছে। গোবুদ্ধিবিশিষ্ট মানেই গবা, গবুচন্দ্র। রবীন্দ্রনাথের কবিতাও তাই গবুচন্দ্র চুপের কথা বলে।
হিং টিং ছট্
স্বপ্নমঙ্গল
স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্দ্র ভূপ,—
অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুচন্দ্র চুপ।
শিয়রে বসিয়ে যেন তিনটে বাঁদরে
উকুন বাছিতেছিল পরম আদরে।
একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড়,
চোখে মুখে লাগে তার নখের আঁচড়।
সহসা মিলাল তারা, এল এক বেদে,
‘‘পাখি উড়ে গেছে’’ বলে মরে কেঁদে কেঁদে;
সম্মুখে রাজারে দেখি তুলি নিল ঘাড়ে,
ঝুলায়ে বসায়ে দিল উচ্চ এক দাঁড়ে।
নিচেতে দাঁড়ায়ে এক বুড়ি থুড়থুড়ি
হাসিয়া পায়ের তলে দেয় সুড়সুড়ি।
রাজা বলে, “কী আপদ,” কেহ নাহি ছাড়ে,
পা দুটা তুলিতে চাহে, তুলিতে না পারে।
পাখির মতন রাজা করে ছটফট,—
বেদে কানে কানে বলে— “হিং টিং ছট্।”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণ্যবান।
বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে পাই —
গবেট বিণ বোকা। “কেউ গবেট, কেউ আকাট গবেট। হাই, ১৯৫৬। গবেটামি বি বোকামি। “এ দম্ভ আমি করেছিলুম কোন গবেটামিতে।” মুজতবা, ১৯৬০।
আমার মনে হয় গবা, গবুচন্দ্রকে তৎসম বা সংস্কৃতজাত শব্দের গ্রুপে ফেলা হলে, গবেট-কেও তদ্ভব শব্দের আওতায় আনা উচিত। আমার মতে গবাশ্রেষ্ঠ বা গবিষ্ঠ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপই হল গবেট। মানে সেরা বোকা, নিরেট বোকা, অজমূর্খ। দেশি শব্দ বলে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না গবেট-কে।
গবিষ্ঠ শব্দটি কিন্তু অভিধানবহির্ভূত নয়। বিশ্বকোষে আছে গবিষ্ঠ নামক দানবের কথা। সেই দানবের সঙ্গে গরুর কোনও যোগাযোগ আছে কিনা তা অবশ্য জানি না।
শেষ বিচারে, গবিষ্ঠ > গবিট্ট > গবেট।