পৌরাণিক মতে জম্বুদ্বীপ তথা ভারতবর্ষকে বেষ্টন করে আছে লবণসমুদ্র। এইরকমভাবে শাকদ্বীপ, প্লক্ষ দ্বীপ ইত্যাদিও বিভিন্ন সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে আছে। মহাভারতে পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথেও উল্লেখ আছে লবণসমুদ্রের। লবণের দেবী আছে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মে।
গ্রিকদের লবণের দেবী অ্যাম্ফিট্রাইট, রোমানদের লবণের দেবী স্যালাজাক, প্রাচীন ইরানের লবণদেবী তিয়ামাত, আজটেকের পৌরাণিক কাহিনীতে আছে, Huixtocihuatl ছিলেন একজন দেবী, তিনি লবণ এবং নোনা জলের তত্ত্বাবধায়ক। মণিপুরের মেইতে জাতির লোকেদের লবণের দেবী থুমলেইমা।
ভারতে হিন্দুদের কোনও লবণদেবীর খোঁজ পাওয়া যায় না কেন, সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার। বিহারের গয়ায় বাসিরী (বাশুলী) বলে এক দেবীর সন্ধান পাওয়া গেছে। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতো পণ্ডিত সেই দেবীকে সরস্বতী বা বাগীশ্বরীর একটি রূপ বলে মনে করেন। তাঁর মতে তান্ত্রিক সরস্বতী প্রথমে বাসুলী ও পরে মঙ্গলকাব্যের যুগে মঙ্গলচণ্ডীতে পরিণত হন। অনেকের মতে এই দেবী বিশালাক্ষীর রূপান্তর।
আমার মতে বাসিরী (অপভ্রংশে বাসুলী) একজন লবণের দেবী। সংস্কৃত শব্দ বসির-এর অর্থ সামুদ্রিক লবণ। লবণের দেবী তাই বাসিরী।
অধিকাংশ শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের মতে দেবী সরস্বতী ওরফে বাগীশ্বরীই বাসিরী তথা বাসলী। এই দেবীকে তো চণ্ডীদাস উপাসনা করতেন। পণ্ডিতদের মতে, তাঁর বাসলী দেবী ছিলেন সাক্ষাৎ চতুর্ভুজা সরস্বতী মূর্তি। বীরভূমের নানুরে অলিখিত ভাবে আজও তিনি কুলদেবী। বাঁকুড়ার বেলেতোড়ে আর একটি চতুর্ভুজা “দেবী সরস্বতী বা বাসলী” মূর্তি আছে। আরও নানা স্থানে দেবী বাসলীর মূর্তি দেখা যায়।

দেবী বাসলীর মূর্তি
বিষ্ণুপাদমন্দিরের প্রধান চত্বরে প্রবেশের জন্য দ্বিতীয় স্তরে যে দ্বার আছে এবং যেখানে ফুল,জল, নৈবেদ্য বিক্রি হয়, সেই দ্বারে দক্ষিণ দিকের প্রাচীরগাত্রে এক কুলুঙ্গিতে অতি প্রাচীন প্রস্তর খোদিত দেবী সরস্বতীর(?) মূর্তি আছে। সেখানে তিনি চতুর্ভুজা, বীণাপুস্তকহস্তা স্মিতবদনা। দেবী সেখানে বাসিরী (বাগীশ্বরী) নামে প্রসিদ্ধা।
নানুরের বাসলী মাতৃকা দেবী। ইনিও তথাকথিত সরস্বতী মূর্তি। নানুরের বাসলী দেবীর নিকটে শারদীয়া পূজার সপ্তমীর দিন হতে বলির ব্যবস্থা আছে নবমীর দিন পর্যন্ত ছাগ, মহিষ এবং একটি মেষর বলি দেবার বিধি আছে। এছাড়া অন্য সময়ও লোকে বলি মানসিক করে যায়। সময় মত বলি এনে পুরোহিত দ্বারা নিবেদন করা হয়। এই দেবীর নবপত্রিকা স্নানের সময় হাঁড়ি পথে দেবীর উদ্দেশ্যে একটি শুকর উৎসর্গ করে। বাসলী বা বাগীশ্বরীই মনসা। ডক্টর সুকুমার সেন এই ঐক্যের কথা বলেছেন। বাসলী অনেক স্থানেই সিংহারূঢ়া দেবী সরস্বতী, অনেক স্থানে ষোড়শী চণ্ডী। সুধীভূষণ ভট্টাচার্যের মতে তন্ত্রের সরস্বতীই হলেন বাসলী, তিনিই মঙ্গলচণ্ডী। তিনি মহাকালী। মহাকালী নাগহস্তা ও নাগযজ্ঞোপবীতিনী।
জৈনদের ধ্যানমন্ত্রে মহাকালীকে বলা হয়েছে, “বরদ পাশাধিন্ঠিত দক্ষিণভূজাং নাগাঙ্কশান্বিত বামকরাম।” তাঁর হস্তে নাগাঙ্কুশ। মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য অংশে পাওয়া যায় আদ্যাশক্তি মহামায়া স্বাত্তিকরূপে সরস্বতী এবং তামসিক রূপে মহাকালী। তিনিই প্রলয়কালে মহাকালী, সৃজনকালে মহালক্ষ্মী এবং বিকাশকালে মহাসরস্বতীরূপে অবতীর্ণা হন। দেবী সরস্বতীর হস্তে থাকে অক্ষমালা, অঙ্কুশ, বীণা এবং পুস্তক। বলাবাহুল্য, নাগ এখানে হস্তী।
তন্ত্রসার গ্রন্থে মা বাসলী বা বাশুলী তাঁর ধ্যানমন্ত্রে এভাবে বর্ণিত:
মা তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, দ্বিভুজা, উগ্ররূপা, খড়্গ ও খেটকহস্তা, রক্তবসনা, মুণ্ডমালাবিভূষিতা। জটামুকুটশোভিত মা শবের ওপরে অবস্থান করেন।
এছাড়া ধর্মপূজাবিধানে মা বাসলীর বন্দনার নির্দেশ আছে, সেখানে মা এই প্রণাম মন্ত্রে বন্দিত:
বিশালবদনা দেবী বিশালনয়নোজ্জ্বলে।
দৈত্যমাংসস্পৃহে দেবী বিশালাক্ষী নমোহস্তুতে।।
মায়ের ধ্যানমন্ত্র অবশ্য ধর্মপূজা বিধানে যা পাই, তা তন্ত্রসার থেকে ভিন্ন। ধর্মপূজাবিধানে মা সিঁদুরবর্ণা, বিকটদন্তা, মুণ্ডমালিনী, হাস্যমুখরা, খড়্গহস্তা, রক্তপানরতা, মায়ের পায়ে নূপুরমঞ্জরী। মা বাশুলীর সঙ্গে মঙ্গলচণ্ডিকার অভিন্নতাও ঘোষিত হয়েছে এই ধ্যানমন্ত্রে।
রাঢ়ভূমির সর্বত্র যদিও বাশুলী পূজিত হয়েছেন, বস্তুত তিনিই রাঢ়অধিষ্ঠাত্রী দেবী, কিন্তু তাঁর উপাসনার উৎস ও ব্যাপকতা সম্ভবত প্রাচীন সুহ্ম, বর্তমানের হুগলি জেলায় সূচিত। মা বাশুলীর মূর্তির বিভিন্নতা লক্ষণীয়। তা মায়ের পূজার প্রাচীনত্ব এবং মায়ের আদি পূজা নানা রূপে প্রচারিত হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করছে। তা ইঙ্গিত করে যে বাশুলী আদিতে সর্বময়ী জগজ্জননী প্রকৃতিমাতৃকা হিসেবে উপাস্য ছিলেন বলেই তাঁর নানা রূপভেদ আছে।
হুগলির সিনেট অঞ্চলে বিশালাক্ষী ও বিষলক্ষ্মী/বিষহরি মনসা দুই ভগ্নীরূপে পূজিত হন, অতএব মা সত্যই সর্বময়ী। তিনি সরস্বতী, তিনি চণ্ডী, তিনি কালী, তিনিই মনসা।
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের বাসিরী তথা বাসুলী নিয়ে এই ধোঁয়াশা সত্যিই অবাক করে। মনে হয় বলি, ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’
পণ্ডিতদের মতে ব্রহ্মা সৃষ্টি করেছেন এই ব্রহ্মাণ্ড — ভগবান শিব ধবংস করবেন এবং এই সময়ের মাঝে ভগবান বিষ্ণু পালন ও রক্ষা করেছেন এবং করবেন। বিহারের গয়ায় রয়েছে ভগবান বিষ্ণুপাদ মন্দির। গয়া নামটি এসেছে গয়াসুরের নামে। পুরাকালে গয় নামে এই অসুর বিষ্ণুর উপাসনা শুরু করে। তার উদ্দেশ্য ছিল অমরত্ব লাভ করা এবং স্বর্গ দখল করা। সে এই জন্য তুখোড় তপস্যা শুরু করে। তপস্যা এত দাপটে করতে থাকে যে বিষ্ণু আর স্থির থাকতে পারেন না- তিনি ছুটে যান গয় এর কাছে। গয় বিষ্ণুর কাছে বর চান যেন অমর হতে পারেন। তখন বিষ্ণু বলেন — “হে গয়- আমার অবতাররাও জন্ম নেয় এবং এই পৃথিবীতেই তাদের মৃত্যু হয়। তুমি অন্য কোন বর চাও। আমি তোমাকে পৃথিবীর নিয়মের ব্যাতিক্রম কোন বর দিতে পারব না। তুমি অন্য কিছু চাও।” তখন গয় মহা চিন্তায় পড়ে যায়। শেষে সে বলে — “হে পরম বিষ্ণু- আমাকে এমন এক দেহ দান করুন যেন আমার দেহ স্পর্শ না করে এই পৃথিবীর কারো স্বর্গলোক প্রাপ্তি না হয়।” তখন ভগবান বিষ্ণু বললেন — “এ জন্য আমাকে যজ্ঞ করতে হবে- এবং তোমাকে মৃত্যুবরণ করে দেহখানা দিতে হবে।” এ শুনে সদাহাস্যময় গয়াসুর নিজের দেহ দান করতে প্রস্তুত হল। কিন্তু সে এত বিরাট ছিল যে বিষ্ণু কোথাও দাঁড়াতে পারছিলেন না। তখন গয় নিজের মাথা পেতে দেয়- ভগবান বিষ্ণু সেই মাথায় পা দিয়ে ওই এলাকাকে পবিত্র করে দেন এবং বর দান করেন যে এই খানে পিণ্ডদান না করে কোন দেব, দানব বা মানুষের আত্মা স্বর্গ লোকে প্রবেশ করবে না।

গয়ার বিষ্ণুপাদ মন্দিরে
ফল্গু নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির। রামায়ণে লেখা আছে এই ফল্গু নদী পূর্বে প্রবাহমান ছিল। রাজা দশরথের মৃত্যুর পর এখানে শ্রী শ্রী রামের অনুপস্থিতিতে সীতাদেবী দশরথের পিণ্ডদান করেন। এখানে এই পিন্ডদানের সাক্ষী ছিল এই ফল্গু নদী, অক্ষয় বট ও তুলসীকে সাক্ষী মানেন। শ্রীরাম ফিরে এলে সীতা দেবী পিণ্ড দানের কথা জানান এবং বলেন যে এর সাক্ষী এঁরা আছেন। এই সময় অক্ষয়বট সত্য স্বীকার করেন। কিন্তু ফল্গু নদী ও তুলসী রামের পায়ের স্পর্শ পাবার আশায় মিথ্যে সাক্ষী দেন। এতে সীতা দেবী অভিশাপ দেন। এরপর থেকে এই ফল্গু নদীর জল শুকিয়ে যায় আর তুলসী যত্রতত্র জন্মায়।
বিশালাক্ষী থেকে নয়, বাগীশ্বরী থেকে নয়, আমার মতে বাসিরী বসির শব্দ থেকে জাত একজন লবণের দেবী। সংস্কৃত শব্দ বসির-এর অর্থ সামুদ্রিক লবণ। লবণের দেবী তাই বাসিরী। সরস্বতী মূলত জলের দেবী। তিনি পদ্মাসনা, হংসবাহনা, মুক্তাহার ধারিণী, কচ্ছপী বীণার অধিকারিণী। তাঁর সঙ্গে সামুদ্রিক লবণের দেবীর কিছুটা সাদৃশ্য তো থাকবেই! তাই লবণের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বাসিরীর সঙ্গে সরস্বতীকে গুলিয়ে ফেলেছেন অনেকে। আবার লক্ষ্মী সমুদ্র মন্থনের ফলে উঠে এসেছিলেন। তাই তিনি লবণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দক্ষিণ ভারতে তিনি লবণের ধারক ও বাহক হিসেবে স্বীকৃতা। তাই লবণের দেবী বাসিরীর সঙ্গে লক্ষ্মীরও মিল খুঁজে পান অনেকে।
গয়ার বিষ্ণুপাদ মন্দিরে তাহলে বাসিরীর উপস্থিতির কারণ কী? আসলে গরুড় হল বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। গরুড়পুরাণে বিষ্ণু গরুড়কে মানুষের মৃত্যুকাল ও পরকালের কর্তব্য নিয়ে যে উপদেশ দিয়েছেন, তা বিবৃত ও বিধৃত হয়েছে। তাতে আছে, মৃত্যুর সময় ও মৃত্যুর পরে কাউকে লবণদান করলে তার মন থেকে যমভীতি কেটে যায়। তাই বিষ্ণুপাদ মন্দিরের প্রবেশদ্বারে বাসিরীমূর্তির পাশেই ফুল, বেলপাতা, নৈবেদ্য বিক্রি হয়। লবণের দেবীর ছোঁয়ায় পিণ্ডদানের উদ্দিষ্ট প্রয়াত মানুষের সমস্ত যমভীতি দূর হবে। যমভীতি দূর হবে পিণ্ডদান করতে আসা বয়স্ক প্রবীণ বৃদ্ধদের মন থেকেও। বাসিরীর সঙ্গে তাই পরকাল ও মানুষের পিণ্ডদানের সম্পর্ক আছে।