| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ছেচল্লিশের দাঙ্গায় হিন্দুদের ত্রাণকর্তা গোপাল পাঁঠা আসলে ছিলেন পাটোয়ার : অসিত দাস

Reporter
অসিত দাস / ১৭৮৯ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫

কলকাতায় ১৯৪৬-এ হাজার হাজার পাঁঠার মাংসের দোকান ছিল, কিন্তু কোনও দোকানের মালিকের পদবি বা উপাধি গোপাল পাঁঠার মতো ‘পাঁঠা’ হয়ে যায়নি। গোপাল মুখোপাধ্যায়ের গোপাল পাঁঠা হয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ কী, সেটা সুরঞ্জন দাসের মত ঐতিহাসিকও ভেবে দেখেননি। যদিও তিনি ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিয়ে অনেক কাজই করেছেন।বিবেক অগ্নিহোত্রী তাঁর সিনেমায় ‘এক থা কসাই’ বলে যতই ন্যারেটিভ তৈরি করুন না কেন, গোপালের যে পাঁঠার মাংসের দোকানের আড়ালে আরও ব্যবসা ছিল, তা অনেকেই লিখে গেছেন। উইকিপিডিয়াও গোপাল মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁকে ব্যবসায়ী বলে উল্লেখ করেছে। আর সর্বোপরি কলেজ স্ট্রিটের বৌবাজারে অবস্থিত ‘বাঙালির পাঁঠার মাংসের দোকান’-এর পূর্বতন মালিক হিসেবে সাইনবোর্ডে উল্লিখিত বিপ্লবী অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে কিন্তু কেউ অনুকূল পাঁঠা বলে কোথাও উল্লেখ করেননি। গোপালবাবুর বংশধররা দৃশ্যতই তাঁর পাঁঠা পদবি নিয়ে যথেষ্ট বিরক্ত ও রুষ্ট। বিবেক অগ্নিহোত্রীর ট্রেলারের ‘এক থা কসাই, গোপাল পাঁঠা’ ন্যারেশন নিয়ে তাঁরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ। তাঁদের মতে গোপালবাবু ছেলেবেলা থেকেই কুস্তির আখড়ায় নাম লিখিয়েছিলেন সেকালের রেওয়াজ অনুসারে। তাই তাঁর শরীর ছিল পেশিবহুল আর বুকের পাটা ছিল কুস্তিগিরদের মতো চওড়া। সেই রকম চওড়া বুকের পাটা দেখে লোকে তাঁকে গোপাল পাটা নামে ডাকত। সেটা থেকেই অপভ্রংশে লোকমুখে হয়ে যায় গোপাল পাঁঠা। এতে নিন্দুক ও সাম্প্রদায়িক উসকানি থাকতেই পারে। বিবেকবাবুর বিবেক এসব দিক বিবেচনা করেনি বলে তাঁর বংশধররা বেশ ক্ষুব্ধ।

সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গবেষণায় প্রমাণ করেছেন ব্যবসার সূত্রে তাঁকে অনেক মুসলমান ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হতো। তাই তিনি এত মূর্খামি করবেন না যে মুসলিমদের জনে জনে হত্যা করার সংকল্প নেবেন।

গোপাল মুখোপাধ্যায়ের মুসলিম-যোগাযোগ তাঁর আর একটি পেশার দিকে নজর দিতে বাধ্য করে। পাটোয়ার-রা ছিল মুঘল প্রশাসনের খাজনা আদায়কারী। ইতিহাসবিশ্রুত রমানাথ পাটোয়ারীর নাম অনেকেরই মনে রাখার কথা। তিনি কলকাতার আদিযুগে (সতেরো শতক ও আঠেরো শতকের সন্ধিলগ্নে) ভূষণার জমিদার সীতারাম রায়ের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে তাঁর গোবিন্দপুরের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন মুঘলদের হাত থেকে বাঁচাতে। মুঘলরা সীতারামের মৃত্যুদণ্ড দেয় হিন্দু জমিদার তথা নৃপতিদের মুঘলদের খাজনা না দেওয়ার জন্যে ডাক দেওয়ার অপরাধে। তবে সীতারাম নিজে বিপদে পড়ামাত্র স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও আত্মীস্বজনকে ৬০ লক্ষ টাকাসমেত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন লাটগোবিন্দপুরের পাটোয়ার রমানাথ রায়ের বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকার জন্যে।সীতারামের ফাঁসি হয়ে গেলেও তাঁর পরিবারপরিজন বেঁচে গেলেন রমানাথ পাটোয়ারীর সৌজন্যে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘সীতারাম’ উপন্যাসে সীতারামের শৌর্যকাহিনী বিবৃত করেছেন। রমানাথ পাটোয়ারীর বংশধররাও পাটোয়ারী কারবার চালিয়েছেন পরবর্তীকালে। মুঘলদের খাজনাআদায়কারীর পদ বিলুপ্ত হয়ে গেল ব্রিটিশ আমলে। তখন পাটোয়াররা হিসেবরক্ষক, সুদের কারবারি, ঘুন্সী-মালার ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়। এসব কাজে তাদের দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। কলকাতায় বৈঠকখানা রোডের কাছে ও আমহার্স্ট স্টিটের পাশে এখনও পাটোয়ারবাগান আছে বহাল তবিয়তে। আছে কলকাতার বুকে আস্ত একটি পাটোয়ার বাগান লেন।

বৌবাজারনিবাসী গোপাল মুখোপাধ্যায় যে পাটোয়ারীবৃত্তি করতেন না, তা কেউ হলফ করে বলতে পারেন না। তিনি হয়তো পাঁঠার দোকানের অন্তরালে হিসেবরক্ষক ও ব্রিটিশ জমানার খাজনাআদায়ের কাজও করতেন। সেই সূত্রেই হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। গোপাল পাটোয়ার থেকেই লোকমুখে হয়ে গেল গোপাল পাঁঠা। এই নামকরণের পশ্চাতে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, ও হিন্দুদের একাংশের প্ররোচনাও ছিল। বিবেক অগ্নিহোত্রীর সিনেমায় কোনও রকম গবেষণামূলক তথ্য নেই। আছে শুধু হিন্দুমুসলমান আড়াআড়ি বিভাজনের ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা।

১৬ আগস্ট দিনটি হিন্দু সংহতি নামক একট সংগঠন গত বেশ কয়েক বছর ধরেই ‘উদযাপন’ করে আসছে, তাদের মতে ‘১৯৪৬-৪৭–এ পশ্চিমবঙ্গের রক্ষাকর্তা হিন্দু বীর’ গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের স্মরণে। এই দিনটিতে সংগঠনটি কলকাতার রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের মিছিলের আয়োজন করে। ১৬ আগস্টের প্রচারে হিন্দু সংহতি নিজেদেরকে ‘ইতিহাসের বামপন্থী বিকৃতি সংশোধনে ব্রতী’ বলে দাবিও করে। কোনও কোনও বছর হিন্দু সংহতির ১৬ আগস্টের মিছিলে ‘গোপাল মুখার্জি লাল সেলাম’ স্লোগান উঠতেও শোনা গেছে।

‘গোপাল পাঁঠা’ নামে সুপরিচিত(?) গোপাল চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন বৌবাজারের মলঙ্গা লেনের বাসিন্দা। বিপ্লবী অনুকূল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের এই ভ্রাতুস্পুত্রটি বিধান রায় ও সুভাষচন্দ্র উভয়েরই অনুরাগী ছিলেন, যদিও কংগ্রেসি রাজনীতির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের ব্যাপারে সন্দেহাতীতভাবে কিছু বলা যায় না। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট গোপাল মুখোপাধ্যায় ও তাঁর সংগঠিত ভারতীয় জাতীয় বাহিনীর ভূমিকার মধ্যে কতদূর সাম্প্রদায়িকতা ছিল, আর কতটা ছিল এলাকা ধরে রাখার কৌশল, তাও জোর দিয়ে বলা যায় না। ’৪৬-’৪৭ সালের দাঙ্গায় ব্যবহার হওয়া পয়েন্ট চব্বিশ বোরের রিভলভারগুলি গোপাল মুখোপাধ্যায় জোগাড় করেছিলেন ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় মোতায়েন হওয়া মার্কিন সৈন্যদের কাছ থেকে। তাঁর নিজের কথায় ‘এক বোতল হুইস্কি কিংবা সামান্য কিছু টাকার মুল্যে’ এই জাতীয় অস্ত্র সে আমলের কলকাতায় আকছার মিলত। আর রাজপথে যত্রতত্র সংঘর্ষে ও রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে প্রায়শ উত্তপ্ত চল্লিশের দশকের কলকাতায় এই অস্ত্র মজুত ছিল নেহাতই স্বাভাবিক একটি ঘটনা।

রাজনৈতিক হিংসা ও সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির বিভিন্ন বয়ানের উপাদান জোগানোর ক্ষেত্রে কলকাতায় ছেচল্লিশের দাঙ্গা ও ‘গ্রেট ক্যালক্যাটা কিলিং’ (অভিধাটি সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় ’৪৬ সালের ১৭ আগস্ট ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম হিসেবে)-এর গুরুত্ব ও কদর দুইই আছে ওয়াকিবহাল মহলে। ১৯৪৬ সালের গ্রীষ্মে ক্যাবিনেট মিশন ব্রিটিশ সরকারের হাত থেকে ভারতীয় নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব নিয়ে ভারত সফরে আসে। এই উপলক্ষে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃত্বের মধ্যে একটি সাময়িক সমঝোতা হলেও সে সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তার কারণ দু’পক্ষের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ আর অবিশ্বাস। এখানে উল্লেখযোগ্য, ক্যাবিনেট মিশন ১৯৪৬ সালের ১৬ মে তারিখে ভারতের স্বাধীনতার যে প্রস্তাবটি পেশ করে সেখানে কিন্তু ঐকবদ্ধ ভারতবর্ষের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছিল, সেখানে হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ আর মুসলমান- সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি আলাদা ভাবে বিন্যস্ত হবে। আর পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করার জন্য কেন্দ্রীয় ভাবে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে। এই হিন্দু– আর মুসলমান–সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলিকে আলাদা করার বিষয়টি কংগ্রেসি নেতৃত্বের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়, কারণ তাঁরা এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারে ও ভবিষ্যতের ভারতে রাজনৈতিক আধিপত্য হারানোর ভূত দেখতে পান। কংগ্রেস ও লীগ দু’পক্ষের অনড় অবস্থানের সামনে পড়ে ক্যবিনেট মিশন ১৬ জুন দ্বিতীয় আরেকটি পরিকল্পনা ঝুলি থেকে বার করে যেখানে হিন্দু–সংখ্যাগরিষ্ঠ ও মুসলমান–সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতবর্ষকে সরাসরি ভাগ করার কথা বলা হয়। আগের প্রস্তাবটিতে কংগ্রেসি নেতৃত্ব গো-স্লো গোছের একটি অবস্থান নিয়েছিল, জুন মাসের প্রস্তাবে তারা সরাসরি বেঁকে বসে। ১০ জুন একটি বক্তৃতায় নেহরু সাফ বলেন যে একমাত্র সংবিধানসভায় যোগ দেওয়া ছাড়া তাঁদের আর কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। আর এই প্রেক্ষাপটেই আসে ’৪৬-এর ১৬ আগস্ট।

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’-এর উদ্দেশ‍্য ছিল নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের দাবির স্বপক্ষে ঔপনিবেশিক সরকারের সামনে শক্তিপ্রদর্শন। তবে ছেচল্লিশের দাঙ্গা বিষয়ে ‘মুসলিম লীগের আক্রমণ’ ও সাধারণ হিন্দু জনতার প্রতিরোধের ছকটি বহু আগেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম কর্মসূচি সম্পর্কে জিন্না সাহেবের আবেদনটি যথেষ্টই মারমুখী ছিল সন্দেহ নেই, তবে একথা ভাবাটা ঠিক হবে না যে অপর পক্ষের তরফে কোনও প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।

ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জি তাঁর ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড’-এ লিখেছেন, আগস্ট মাসের ১৬ তারিখ মুসলিম লীগের সদস্যদের মতই হিন্দু মহাসভার স্বেচ্ছাসেবকরাও লড়াইয়ের জন্য তৈরি ছিল, তাদের অস্ত্র ছিল মূলত ছোরা আর দিশি পিস্তল। যুগান্তর দলের বিপ্লবী ও পরে বামপন্থী নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আত্মকথা ‘বিপ্লবের সন্ধানে’-তে লিখেছেন, “…লীগ থেকে যখন ১৬ই আগস্ট হরতাল ঘোষণা করা হল, তখন হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস মিলে ১৪ই আগস্ট দেশপ্রিয় পার্কে এক বিরাট সভা করে এক প্রস্তাব পাশ করা হল যে, এ হরতাল কিছুতেই সফল হতে দেওয়া যাবে না, … ১৬ই আগস্ট হরতাল উপলক্ষে যে দাঙ্গার সম্ভাবনা ষোল আনা, এটা সকলেই অনুভব করতে লাগল এবং দুই পক্ষই তার জন্য প্রস্তুত হল।” বস্তুত তিরিশের দশক থেকেই বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে মুসলমানদের গুরুত্ব বাড়ছিল। তাছাড়া ১৯৪০ সালে ফজলুল হক মন্ত্রীসভার আমলে প্রকাশিত ফ্লাউড কমিশনের রিপোর্টে বাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পক্ষে জোরালো সওয়াল করা হলে জমিদারিনির্ভর হিন্দু বাঙালি উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে আসে। এই দু’টি বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতিতে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার প্রকট ও প্রচ্ছন্ন যুক্তফ্রন্ট বেশ জমে উঠেছিল। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় এরই একটি সংগঠিত চেহারা দেখা যায়।

জয়া চ্যাটার্জি তাঁর বইয়ের আরেক জায়গায় তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে লিখেছেন যে, যেখানে মুসলমান দাঙ্গাকারীদের বেশিরভাগ ছিলেন গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষজন, সেখানে দাঙ্গায় অংশ নেওয়া হিন্দু জনতার মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল শিক্ষিত তরুণ, ছাত্র সমাজ ও মধ্যবিত্ত পেশাজীবী। আসলে ১৯৩১ সাল নাগাদই শহর কলকাতায় বসবাসকারীদের ৩১.৭০ শতাংশ আসছেন ভিন রাজ্যগুলি থেকে, আর ৩০ শতাংশ আসছেন কলকাতার বাইরের জেলাগুলি থেকে। মূলত কলকাতা ও তার আশপাশের অঞ্চলের কলকারখানাগুলিতে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য গ্রাম থেকে আগত এই জনগোষ্ঠীর শহরবাসের রোজনামচা যে খুব একটা সহজ ও সুখকর ছিল না সেকথা বলাই বাহুল্য। স্বাভাবিকভাবেই ভাষা ও ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সত্তার শেকড় এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যথেষ্টই মজবুত ছিল। ছেচল্লিশ ও তার পরেও মুসলমান শ্রমিক, কসাই, খালাসি বা ছ্যাকরা গাড়ির চালকদের শহরের রাজপথে দাঙ্গাকারীর ভূমিকায় দেখা গেছে, কিন্তু ছেচল্লিশের দাঙ্গায় হিন্দু মহাসভার তরফে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভূমিকা এ ব্যাপারে এগিয়ে ছিল বলে মনে হয়।

তাছাড়া ১৯৪৬-এর ১৬–১৯ আগস্টের দাঙ্গা চলাকালীন অবিভক্ত বাংলায় ক্ষমতাসীন সুরাওয়ার্দি সরকারের সাম্প্রদায়িক ভূমিকা নিয়ে নানা সময় বিস্তর কথা তোলা হয়েছে। তার মধ্যে সারবত্তাও খানিকটা আছে। কিন্তু কোনও আধাআধি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দিক থেকে যদি সরকারের ভূমিকাকে বিচার করতেই হয় তাহলে একথাও মাথায় রাখতে হবে যে সে সময়ে ৬০ লক্ষ মানুষের কলকাতা শহরে মাত্র ১২০০ সদস্যের একটি পুলিশ বাহিনী ছিল, যে–বাহিনীতে মাত্র ৬৩ জন ছিলেন ধর্মে মুসলমান। আর অফিসারদের মধ্যে একজন ডেপুটি কমিশনার ও একজন ওসি ছাড়া সকলেই ছিলেন হিন্দু। আর যদি লাশ গোনার হিসেবই করতে চাওয়া হয় তাহলে জেনে রাখা ভালো যে সুরঞ্জন দাশ সহ ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিয়ে গবেষণা আছে, এমন সব ইতিহাসবিদই একটি বিষয়ে মোটামুটি একমত। তা হল এই দাঙ্গায় মুসলমানদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় ঢের বেশি। এর কারণটি কিন্তু খুব জটিল নয়। ধনী হিন্দু ও ধনী মুসলমানদের পক্ষে পিঠ বাঁচানো অপেক্ষাকৃত সহজ হয়েছিল (ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল), কিন্তু সামাজিক ও অন্য ধরনের নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত গরিব মানুষের পক্ষে তা সহজ ছিল না। আর ১৯৪৬ সালের কলকাতায় বসবাসকারী অধিকাংশ মুসলমানই ছিলেন দরিদ্র শ্রেণির। এসব ব্যাপার বিবেক অগ্নিহোত্রীর সিনেমায় দেখা যাবে কিনা বলা শক্ত।

এই উপমহাদেশে হিন্দুত্ববাদী ও মুসলমান মৌলবাদীদের প্রচারে ইতিহাসের এক ধরনের সোজাসাপটা পাঠই বরাবর গুরুত্ব পেয়ে এসেছে, তার সহজ কারণ হল শত্রুপক্ষকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে লোক জড়ো করার রাজনীতিতে এর কাটতি প্রচুর। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারও তাই উদার হস্তে পাঠ্যক্রম থেকে এটা-সেটা বাদ দিতে উদ্যোগী হয়েছে। বলাই বাহুল্য যে ইতিহাসের এই সহজপাঠের সঙ্গে ইতিহাসের পাথুরে প্রমাণের দুস্তর ফারাক। কাজেই ১৯৪৬-৪৭–এর একচোখো ইতিহাসে গোপাল পাঁঠা যদি (কোনও ভয়ঙ্কর শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে) পশ্চিমবঙ্গের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

গোপাল মুখোপাধ্যায় ওরফে গোপাল পাঁঠা তথা গোপাল পাটা তথা গোপাল পাটোয়ার, -যে নামেই তিনি সম্বোধিত হোন না কেন, তাঁর দক্ষতা, হিসেবক্ষমতা ও নিপুণতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠবে না। একজন হিন্দু মারা গেলে দশজন সংখ্যালঘুকে মারতে হবে, এর মধ্যে শুভঙ্করীবিদ্যার ফলিত প্রয়োগ ছিল কিনা জানা নেই, তবে তাঁর এই নির্দেশে যে কার্যসিদ্ধি হয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। বিবেক অগ্নিহোত্রী যেভাবে পাঁঠা কাটার দা বা খাঁড়া নিয়ে তাঁর সংখ্যালঘু হননে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা বলছেন, তাতে সত্য ঘটনায় অনেক জল মিশেছে বলে মনে হয়। পাটোয়ারী বিদ্যার সূক্ষ প্রয়োগে যে তিনি হিন্দুদের রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিলেন, সেটা দিনের আলোর মত পরিষ্কার।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev