আজ ২০ আগস্ট বিখ্যাত বাঙালি ফুটবল খেলোয়াড় চিনের প্রাচীর গোষ্ঠ পালের জন্মদিন। রক্ষণে খেলার জন্য খ্যাতিলাভ করেছিলেন। দৈনিক ইংলিশম্যান তাকে চিনের প্রাচীর উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
গোষ্ঠ পাল তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি মাদারীপুর মহকুমা বর্তমান নড়িয়ার ভোজেস্বর গ্রামে ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ২০ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তার বাবা শ্রীযুক্ত বাবু শ্যামলাল পাল ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। গোষ্ঠ পাল ফুটবল খেলে উপমহাদেশে সেই বিংশ শতাব্দীতে নাম কুড়ালেও কখনোই বাংলাকে ভোলেননি। তিনি কলকাতার “সারদাচরণ এরিয়ান ইনস্টিটিউশন” এ স্কুলজীবন কাটিয়েছেন। তাঁর আত্মজীবনীতেও তিনি বারবার লিখেছেন বাংলার কথা, তৎকালীন পূর্ব বাংলার (বর্তমানে বাংলাদেশ) কথা। আত্মজীবনীতে লিখেছেন,
‘পূর্ব বঙ্গের ফরিদপুরের মাদারীপুর সাব ডিভিশনের ভোজেস্বর গ্রামে আমার জন্ম হয়, দিনটি ১৮৯৬ সালের ২০শে আগস্ট, দিনের আলো ফুটিবার আগেই আমি ধরিত্রীর মুখ দেখিয়াছিলাম, আমার পিতা সেই সময় ঘরে ছিলেন না, পিতৃদেবের নাম শ্রীযুক্ত বাবু শ্যামলাল পাল, বরিশালের ঝালকাটি বন্দরে তেজারতির কারবার করিতেন, আমি পিতার প্রথম এবং একমাত্র সন্তান’।
গোষ্ঠ পাল ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলা আরম্ভ করেন।
মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি কলকাতার একটি ক্লাবে খেলার সুযোগ পান। এই বয়সেই তিনি কুমারটুলির হয়ে মাঠে নামেন। ১৯০৭ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতার কুমারটুলি ক্লাবে খেলেছেন। মোহনবাগানের খেলোয়াড় রাজেন সেনের সহায়তায় তিনি ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগান দলে যোগ দেন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগানের হয়ে তিনি প্রথম খেলেন। এরপর ২৩ বছর ধরে মোহনবাগানের হয়ে খেলেছেন। পরাধীন ভারতে সবুজ-মেরুন রঙের জার্সি গায়ে মোহনবাগান রক্ষণে তাঁর বিক্রমকে ভয় পেত বুট পরা ইংরেজ ফুটবলাররাও। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মোহনবাগানের অধিনায়ক নির্বাচিত হয় ও পরবর্তী ৫ বছর অধিনায়ক ছিলেন। ১৯২৪ সালে প্রথমবার ভারতীয় ফুটবল দল বিদেশের মাটিতে খেলতে যায় এবং তিনি তার অধিনায়ক নির্বাচিত হন। তিনি হকি খেলাতেও দক্ষ ছিলেন এবং ক্রিকেট এবং টেনিসও খেলতেন। ১৯৩৫ সালে তিনি ফুটবল থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর অবসর গ্রহণও একটি অভূতপূর্ব ঘটনার মধ্যে দিয়ে ঘটে। মোহনবাগান মাঠে মোহনবাগান ও ক্যালকাটা ক্লাবের মধ্যে খেলা চলছিল। তখন ক্যালকাটা ক্লাব ব্রিটিশদের গর্বের ক্লাব ছিল। সেই ম্যাচের রেফারি ক্লেইটন ব্রিটিশ পক্ষপাতী ছিলেন এবং মোহনবাগানের ফুটবলাররা বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে ঢুকলেই বাঁশি বাজিয়ে দিচ্ছিলেন। এই ঘটনা চলতেই থাকে – এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন গোষ্ঠ পাল সহ দলের সকলে এবং অবশেষে সকলে মাঠে শুয়ে পড়েন। এই প্রতিবাদ ময়দানে গভীর প্রভাব ফেলেছিল কিন্তু ব্রিটিশ প্রভাবিত IFA গোষ্ঠ পালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করে। গোষ্ঠ পাল প্রতিবাদে খেলাই ছেড়ে দেন।
গোষ্ঠ পালের সময় মোহনবাগান আই এফ এ শিল্ড বা লীগ, রোভার্স, ডুরান্ড কোনো বড় ট্রফিই জিততে পারেনি। লীগই প্রথম পায় গোষ্ঠ পাল অবসর নেওয়ার চার বছর পর। তাহলে গোষ্ঠ পালের কৃতিত্বটা কোথায়?
আসলে পরাধীন ভারতে শক্তিমান সাহেব দলগুলোর সঙ্গে সমান সমান লড়াই করাই ছিল তখন এদেশের ক্লাবগুলোর লক্ষ্য, যে কাজে গোষ্ঠ পাল এবং মোহনবাগান ক্লাব বিশেষ পারদর্শিতা দেখায়। ক্যালকাটা ক্লাব, উরস্টার্স, নর্থ স্ট্যাফর্ড, লিস্টার্স, মিডলসেক্স, হাইল্যান্ড ইনফ্যান্টি — প্রায় সবার বিপক্ষেই মোহনবাগান তীব্র লড়াই গড়ে তুলেছিল, এবং এই লড়াইয়ের পুরোভাগে ছিলেন গোষ্ঠ পাল। লম্বা টানা কিক, নির্ভয় ট্যাকলিং, প্রতিপক্ষকে হিমশীতল মেজাজে তারা করা আর গোটা মাঠে বুদ্ধির আলো ছড়িয়ে গোষ্ঠ অনবদ্য, অনুপম, অপ্রতিম। ‘দ্য ইংলিশ ম্যান’ — এর এক দুঁদে সাংবাদিক রেড রোজ ছদ্মনামে লিখে বসেছিলেন সেই প্রবচনটি, “Gostha Impregnable as the Chinese Wall.” আর তিনি ভারতীয় ফুটবলের এক প্রবাদ হয়ে গেলেন ‘চাইনিজ ওয়াল’। কোনও বড় ট্রফি না জেতায় গোষ্ঠ পালের প্রতিক্রিয়া ছিল “ট্রফি পাওয়ার কথা যত না চিন্তা করসি, সাহেব গো হারামু কি কইরা সেই চিন্তাই তখন বেশী করসি। ট্রফি পাই নাই বইল্যা আমাগো কষ্ট হয় নাই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাকে বলেছিলেন ‘তুমিই তা হলে সেই চিনের প্রাচীর গোষ্ঠ পাল!’’
১৯৬২ সালে গোষ্ঠ পালকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি ভারতের প্রথম ফুটবল খেলোয়াড় যিনি পদ্মশ্রী উপাধি পেয়েছেন। সেই খেতাব নেওয়ার সময়ও তাঁর বাঙালি আত্মবোধের পরিচয় মেলে। সে বছর খেতাব পেয়েছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও, গায়ে তাঁর নির্দিষ্ট পোশাক — গলাবন্ধ কোট। গোষ্ঠ পালের ওসব বালাই নেই। তারাশঙ্কর বললেন, ‘গলাবন্ধ কোট পরেননি। এটা না পরে খেতাব নেওয়া যাবে না’। গোষ্ঠবাবু বললেন, ‘ধুতি-পাঞ্জাবিতে যদি খেতাব না পাওয়া যায়, নেব না, ফিরে যাব’। সব শুনলেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ, স্বয়ং রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘উনি একজন ফুটবলার, যে পোশাকেই আসুন, আমার আপত্তি নেই’।
১৯৭৫ সালের ৮ এপ্রিল পরলোক গমন করেন ‘চীনের প্রাচীর’ গোষ্ঠ পাল।তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় ফুটবলের এক যুগের অবসান হয়। মৃত্যুর পরেও বাঙালির জীবনে অমর হয়ে আছেন তিনি। তাই তার পরেও তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন –
১৯৮৪ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয় তাঁর ভাস্কর্য। খালি পায়ে ফুটবল খেলার ঔদ্ধত্যটাই বোঝানো হয়েছে এই ভাস্কর্যে। সেই ভাস্কর্যের নিচে লেখা আছে, “ভারতীয় ফুটবলে সর্বকালের সেরা ব্যাক। সে যুগে বুটপরা ইউরোপীয় ফুটবলারদের বিরুদ্ধে খালি পায়ে খেলে দুর্ভেদ্য চীনের প্রাচীর নামে খ্যাত। খেলার মাঠে স্বজাতির সম্মান প্রতিষ্ঠায় ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষে অন্যতম সৈনিক।” ইডেন গার্ডেন্স ও মোহনবাগান মাঠের সামনে দিয়ে যাওয়া কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটির গোষ্ঠ পাল সরণি।
১৯৯৮ সালে তাঁর নামে ডাকটিকিটও প্রকাশিত হয়।
মোহনবাগান ক্লাব ২০০৪ সালে তাঁকে মরনোত্তর ‘মোহনবাগান রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করে। মোহনবাগান ক্লাবের ভেতরে তার নামে একটি সংগ্রহশালা ‘গোষ্ঠ পাল সংগ্রহশালা’ তৈরি হয়েছে।
এ যুগের ফুটবল প্রেমিকরা গোষ্ঠ পালকে মনে রেখেছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। সে যুগের কিংবদন্তিতূল্য ফুটবলার গোষ্ঠ পাল যুগ যুগ অমর থাকবেন।
ছবি : ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদের সঙ্গে গোষ্ঠ পাল
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।