তিনি বাঙালির অ্যাংরি ইয়ং ম্যান যাঁর টিকালো নাকের নিচে গম্ভীর হাসি, চোখে চোখ রেখে, দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দেওয়ার ক্ষমতা সিনেমাপ্রেমীদের মন জয় করতে পারে ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রি কাঁপানো সেই দক্ষ অভিনেতার নাম ভিক্টর ব্যানার্জী। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজীর পাশাপাশি তিনি মালয়ালম, তেলেগু, ওড়িয়া, অহমিয়া ভাষার সিনেমায় অভিনয় করেছেন। বহু বিদেশি পরিচালকের কাছে তিনি প্রথম পছন্দের নায়ক। বলা যায় তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক বাঙালি অভিনেতা।
অথচ এই ভারতীয় অভিনেতা তাঁর সমকালের অসংখ্য নায়কের ভিড়ে কোথাও যেন একপেশে হয়ে রয়ে গিয়েছেন। নিজের রাজ্যে যোগ্য সন্মানটুকু অবধি পাননি। তাঁর দক্ষ অভিনয়ের ফ্যান হিসেবে বড়ো দুঃখ হয়। কেন, আপনারাই বিচার করুন।
পিতৃদত্ত নাম পার্থসারথি বন্দ্যোপাধ্যায়। মা-বাবা দুই পরিবারের দিক থেকেই তিনি জমিদার বংশের সন্তান। জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ অক্টোবর মালদার চাঁচলে। শৈশব ও স্কুল জীবনের বড় সময় কেটেছে শিলং-এ। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষদের পরিশ্রমক্ষমতা ও সততা তাকে প্রভাবিত করেছিলো। পাহাড়প্রেমী ভিক্টর।

শিলং-এর সেন্ট এডমান্ড স্কুলে পড়াশোনা করে কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে গ্রাজুয়েশন। কলকাতায় থাকাকালীনই ব্রিটিশ কাউন্সিলের নাটকে অভিনয় করেছিলেন ভিক্টর।
তুলনামুলক সাহিত্য নিয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েট হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজ থেকে বৃত্তি লাভ করেন। সেখানে তিনি গীতিনাট্যে যুক্ত হন। কলেজ জীবন থেকেই গ্রুপ থিয়েটার ও নাটকে অভিনয় করা শুরু হয়। এইখান থেকেই নেক নজরে পড়েন সত্যজিৎ রায়ের। ১৯৭৭ সালে ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ সিনেমার মধ্যে দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ।
আশির দশকের শুরুতেই বাংলা মেনস্ট্রিম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর কাজ শুরু হয়। ১৯৮০ সালে পীযূষ বসুর ‘দুই পৃথিবী’ ছবিতে মহানায়ক উত্তমকুমরের ছোটভাই-এর চরিত্রে অভিনয় করেন। ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ ছবিতে তাঁর তুখোড় অভিনয় দক্ষতা মুগ্ধ করেছিলো সত্যজিৎ রায়কে। তিনি তাঁর পরবর্তী ছবি ‘ঘরে বাইরে’ তে নিখিলেশের চরিত্রটি করার জন্য ভিক্টরকে মনোনীত করেন। চলচ্চিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয় দর্শকমননে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নেয়। সেরা পার্শ্বচরিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন এই সিনেমায়। তাঁর অভিনীত আগুন, দেবতা, মধুবন, আক্রোশ, প্রতিদান, ব্যবধান, লাঠি, প্রতিকার, একান্ত আপন ইত্যাদি হিট বাংলা সিনেমা ।

বিরেশ চ্যাটার্জীর পরিচালনায় ১৯৮৭ সালে মুক্তি পায় অপর্ণা সেনের সঙ্গে অন্যতম সুপারহিট ছবি ‘একান্ত আপন’। ‘তোলো ছিন্নবীণা’, ‘ও তোমারই চলা পথে’ কিংবা ‘এমন মধুর সন্ধ্যা’ এই গানগুলো আজও দুর্গাপূজার মন্ডপে মনে করিয়ে দেয় ভিক্টর ব্যানার্জির কথা।
প্রভাত রায়ের বাণিজ্যিক ছবি “লাঠি” সেই সময় মাসের পর মাস চলেছিল বাংলার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে। এই ছবিটির জন্য ১৯৯৭ সালে Best Actor in a Leading Role এ BFJA Award পান ভিক্টর ব্যানার্জী।
কাজ করেন ১৯৮২ সালে শ্যাম বেনেগালের হিন্দিছবি “আরোহণ”-এ। বলিউডের তাবড় তাবড় অভিনেতা আমজাদ খান, সঞ্জীবকুমার, সঈদ জাফরি, ওম পুরির মতো বিশ্বখ্যাত ফিল্ম ব্যক্তিত্বের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন। এরপর স্যার ডেভিড লিন কেবিইর “প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া”-র অফার। ডেভিড লিন কেবিই ছিলেন বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইংরেজি চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজক। লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া, দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই, ডক্টর জিভাগো এবং আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’র মত বিখ্যাত মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র সমূহ পরিচালনার জন্য তিনি সর্বাধিক স্মরণীয়।

‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ ইএম ফরস্টারের উপন্যাস এবং লেখকের সেরা কাজগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত। প্রথমে এই গল্পের প্রোটাগনিস্ট ডক্টর আজিজের রোলে পরিচালক লণ্ডন নিবাসী এশীয় অরিজিন অভিনেতাকেই কাস্ট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খোদ সত্যজিৎ রায় তাকে এই রোলে ভিক্টর ব্যানার্জীর নাম প্রস্তাব করেন। এত বড় হলিউডের ব্যানারে মুখ্য চরিত্রে কাজ করা সেই সময় ছিলো বিশাল চাঞ্চল্যকর ব্যাপার। ১৯৮৪ সালে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর প্রবল প্রশংসিত হয়। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রায় দশটিরও বেশি পুরস্কার জিতে নিয়েছিল এই ছবি। যার মধ্যে মোট দুটি বিভাগে অস্কার জিতেছিল এই ছবি। ভিক্টর ব্যানার্জিও গোল্ডেন গ্লোব ফেস্টিভ্যালে সেরা অভিনেতার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। যে মঞ্চে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, ব্র্যাড পিটের মত অভিনেতারা পুরস্কার নিতে ওঠেন সেই মঞ্চে ভিক্টরের চোস্ত ইংরেজী এবং স্পিচ বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল সকলকে। এরপর ভিক্টর কাজ করেন অস্কার জয়ী পরিচালক রোনাল্ড নেমির সাথে। কাজ করলেন ‘ফরেন বডি’ ছবিতে। গোটা ইংল্যান্ডে তখন ভিক্টরের জয়জয়কার, রাস্তা ঘাট ছেয়ে গেল ‘ফরেন বডি’র পোস্টারে। ভিক্টর ব্যানার্জিকে বৃটেনের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার মঞ্চ Bafta awards-এ শ্রেষ্ঠ অভিনেতার নমিনেশন পায়।
একটা মজার ঘটনা বলি। ‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’-র জন্য পার্টি দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রানী। সেই পার্টিতে প্রপার ড্রেসআপ করতে গেলে যে খরচা হতো সেই সময় ভিক্টরের পক্ষে সেটা ছিলো অসম্ভব। তাই বুদ্ধি করে সেই পার্টিতে পরলেন বাঙালির ঐতিহ্য ধুতি পাঞ্জাবি। সেদিন সন্ধ্যেবেলার এই পোশাকের মাস্টারস্ট্রোক সবার চোখ কেড়ে নিয়েছিল।

ভিক্টর ব্যানার্জীর ডকুমেন্টারি ‘Where No Journeys End’-র জন্য তিনটি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। ডকুমেন্টারিটি হিউস্টন আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিল। ডকুমেন্টারি ফ্লিম ‘The Splendour of Garhwal and Roopkund’-এর পরিচালক হিসেবে জিতে নিয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ পুরস্কারেও সম্মানিত করা হয়েছে তাঁকে।
বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের দৌলতে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত পরিচালক পাবলো সিজারের নাম আমাদের কাছে পরিচিত। ভারতীয় প্রযোজক সূরজ কুমারের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় ‘থিঙ্কিং অফ হিম’ (Thinking of Him) ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ২০২২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকীতে। রবীন্দ্রনাথ ও আর্জেন্টিনার লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে এই ছবি। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’র ফরাসি অনুবাদ পড়ে ভিক্টোরিয়া তাঁর বিশাল ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন বুয়েনস আয়রেসে গিয়েছিলেন, সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় ভিক্টোরিয়া তাঁর সেবা করেছিলেন। ১৯২৫ সালের ৩ জানুয়ারি বুয়েনস আয়রেস থেকে তিনি চলে এসেছিলেন ভারতে। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ৬৩, ভিক্টোরিয়ার মাত্র ৩৪। তেষট্টি বছরের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে চৌত্রিশ বছরের আর্জেন্টাইন লেখিকা তথা রবীন্দ্রপ্রেমী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বন্ধুত্ব, সখ্যতা আর স্বার্থহীন ভালবাসার গল্প নিয়েই এই চলচ্চিত্র। ‘থিঙ্কিং অফ হিম’-এ প্রবীণ রবি ঠাকুরের ভূমিকায় পরিচালক বেছে নিয়েছেন ভিক্টর ব্যানার্জিকে। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন এলিওনোরা ওয়েক্সলার। ছবিতে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন রাইমা সেন ও হেক্টর বরদোনি। তাঁর সাবলীল অভিনয় মুগ্ধ করেছে বিশ্বের সকল সিনেমা প্রেমীদের।

১৯৯১ সালে উত্তরকাশীতে ভয়াবহ ভূমিকম্প-এ, ১৯৯৯ সালে সাইক্লোন বিধ্বস্ত ওড়িশাতে ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন তিনি। অসমে তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত পুরোদস্তুর আবাসিক বিদ্যালয় মোরান ব্লাইন্ড স্কুল তত্ত্বাবধানের সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছেন অভিনেতা।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জনসেবামূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে তিনি যুক্ত। অসমের শ্রীমন্ত শঙ্করদেব সোসাইটি, উত্তরাখণ্ডের বার্ড ওয়াচার সোসাইটি, নর্থ-ইস্ট হিল ট্র্যাক্টের দিমাসা উপজাতির জন্য গুডউইল অ্যাম্বাসেডরও তিনিই। বিভিন্ন আন্দোলনের সূত্র ধরেই তার সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ যদিও সেখানে খুব একটা সাফল্য পাননি।
একজন অসামান্য ব্যক্তিত্বর অধিকারী বাঙালি অভিনেতাকে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সেভাবে ব্যবহার করল কই!! অথচ বিশ্বদরবারে ভারতের নাম পৌঁছে দিয়েছেন এই অভিনেতা। তাঁর প্রাপ্য গুরুত্ব, মর্যাদাটুকু কি সত্যিই দিতে পেরেছে রাজ্য। প্রশ্ন থেকেই যায়। বহু প্রশ্নের মাঝেই দর্শকের হৃদয়ে মর্যাদার সঙ্গে থাকুক দাপুটে অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জি।।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: বিভিন্ন নিউজ মিডিয়া এবং গুগল।
অসাধারণ তত্ত্ব জানলাম ধন্যবাদ
থ্যাঙ্ক ইউ