| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পেয়েছি—যা খুঁজছিলাম, তা পেয়েছি : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

Reporter
জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় / ১৪১৪ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

তিনি খাটে থাকলে বেড়াল মেঝেতে। আর তিনি মেঝেতে থাকলে পোষ্য বেড়াল খাটে। পদার্থবিদ্যার জটিল কোয়ান্টাম তত্ত্বের এটাই বোধ হয় সরলতম রূপ! আমাদের বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জীবনে আইনস্টাইনের ভূমিকা কী, তা সবাই জানে। ৪ঠা জুন, ১৯২৪। মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তখন জার্মানির জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। একদিন তাঁর কাছে একটা চিঠি আসে। চিঠির সাথে একটা ৪ পাতার গবেষণাপত্র। প্রেরক তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার সত্যেন্দ্রনাথ বসু। আইনস্টাইন চিঠিটা পড়লেন মন দিয়ে। সত্যেন্দ্রনাথের চিঠিটা ছিল এইরকম—“Respected Sir, I have ventured to send you the accompanying article for your perusal and opinion… . …আপনি লক্ষ্য করবেন, আমি প্ল্যাঙ্কের সূত্রের সহগটি চিরায়ত তড়িত চৌম্বকতত্ত্ব ব্যবহার না করে নির্ধারণের চেষ্টা করেছি কেবলমাত্র দশাস্থানের ক্ষুদ্রতম আয়তনকে hν ধরা যায় এই অনুমিতি থেকে। যথোপযুক্ত জার্মান ভাষা না জানায় প্রবন্ধটি ভাষান্তরিত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি এটি যদি প্রকাশযোগ্য মনে করেন, তবে সাইটশ্রিফট ফুর ফিজিকে (Zeits. für Physik) প্রকাশের ব্যবস্থা করলে বাধিত হব।…”

আইনস্টাইন তখন বিজ্ঞান জগতের সুপার স্টার। বস। তাঁর কাছে এ ভাবে চিঠি লিখতে বুকের পাটা লাগে। শুধু প্রবন্ধ ছাপানোর সুপারিশ করার অনুরোধ হলে কথা ছিল। আইনস্টাইন তখন নিজের কাজ নিয়েই ভীষণ ব্যস্ত। পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের কোন এক অখ্যাত তরুণ কিনা আবদার করেছেন তাঁর লেখা অনুবাদের। যদিও সত্যেন বোস নামটা তাঁর অজনা নয়। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রবন্ধগুলো জার্মান ভাষায় প্রকাশ হয়। সেগুলো ইংরেজিতে প্রথম অনুবাদ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণ গবেষক মেঘনাদ সাহা আর সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

সত্যেন্দ্র নাথ বসু স্ত্রী ঊষারাণী বসু

আইনস্টাইন বিরক্ত হননি। ছুঁড়েও ফেলে দেননি প্রবন্ধটা। মন দিয়ে পড়েন। মনে ধরে প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটা দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে প্রবন্ধে। দেওয়া হয়েছে সেটার সমাধান। আইনস্টাইন নিজেও এই সমস্যা নিয়ে এক সময় কাজ করেছেন, কিন্তু সমাধানটা বের করতে পারেননি। পরে তো কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে গবেষণাই ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। আইনস্টাইন শত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রবন্ধটি অনুবাদ করলেন। নাম দিলেন “Plancks Gresetz and Lichtquantenhypotheses” (প্ল্যাংকের সূত্র ও আলোক কোয়ান্টাম তত্ত্ব) প্রকাশিত হলো সাইটশ্রিফট ফুর ফিজিকে (Zeits. für Physik, 24, 178, 1924)। আইনস্টাইন প্রবন্ধটির শেষে একটি পাদটীকা সংযোজন করেছিলেন যা আজও বিজ্ঞান অনুসন্ধিৎসু পাঠককে চমৎকৃত করে—“আমার মতে বোস কর্তৃক প্ল্যাঙ্ক সূত্র নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রধাপ। এখানে ব্যবহৃত পদ্ধতি আদর্শ গ্যাসের কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রয়োগ করা যায়, যা আমি অন্যত্র বর্ণনা করব।” এই একটা নোটই পাল্টে দিল এদেশের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস। কোয়ান্টাম তত্ত্বের মহাসড়কে যুক্ত হলেন এদেশের এক বিজ্ঞানী। আর সত্যেন বোসকে একটা চিঠিতে লিখলেন—“আমি আপনার প্রবন্ধটি অনুবাদ করে সাইটশ্রিফট ফুর ফিজি’কে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অবদান বলে মনে করি যা আমাকে খুশি করেছে। আপনিই প্রথম ‘উৎপাদকটিকে’ কোয়ান্টামতত্ত্ব থেকে নির্ধারণ করেছেন, অবশ্য ‘পোলারায়ন উৎপাদক সম্বন্ধে যুক্তি’ অতটা শক্তিশালী নয়। এটি প্রকৃতপক্ষেই একটি উৎকৃষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা।”

গুরুর এই দাক্ষিণ্য জীবনে ভোলেননি সত্যেন্দ্রনাথ। এ ব্যাপারটা সবার জানা। যা অজানা, তা হল, সত্যেন্দ্রনাথের কোনও ধারণা ‘আইনস্টাইন সমর্থন না করায়’ বাঙালি বিজ্ঞানীর দুঃখ। যা তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন মনের কোণে। এ রকম এক দুঃখ এক বার তিনি ফাঁস করেছিলেন নিজের ছাত্র, বিজ্ঞানী পার্থ ঘোষের কাছে। তার আগে অবশ্যই পার্থকে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করতে হয় যে, তিনি আর কাউকে তা জানাবেন না। ইতিহাস রক্ষার খাতিরে পার্থ সে প্রতিজ্ঞা ভাঙেন ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায়। পার্থ জানান, তাঁর পেপারে আলোর কণা ফোটনের এক ধর্মের কথা লিখেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। আইনস্টাইন তা কেটে দেন। অথচ, সত্যেন্দ্রনাথ যে ধর্মের কথা বলেছিলেন, তা পরে শনাক্ত হয়। তখন কেন সত্যেন্দ্রনাথ আইনস্টাইনের ভুল ধরিয়ে দেননি? ছাত্র পার্থ এ প্রশ্ন করেছিলেন মাস্টারমশাই সত্যেন্দ্রনাথকে। তাঁর জবাব: ‘‘কে বলেছে ওই ধর্মের কথা, তাতে কী আসে-যায়? ধর্মটা শনাক্ত হয়েছে, তাই যথেষ্ট।” গুরুভক্তি?

আইনস্টাইনের ভুল নিয়ে আলোচনা তাঁকে নিন্দা করতে নয়। এ ব্যাপারে শেষ কথাটি লিখেছেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন ওয়েনবার্গ, ‘আইনস্টাইন নিশ্চয়ই বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী, আর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের এক জন। তাঁর ভুল নিয়ে কথা বলা হয়তো আত্মম্ভরিতা মনে হবে। কিন্তু অগ্রগণ্য বিজ্ঞানীদের সাফল্যের চেয়ে ভুলভ্রান্তি অনেক সময় বেশি দেখায় তাঁদের সময়ের ধ্যানধারণা। আমরা যারা ভুল করি, তারা একটু সান্ত্বনা পেতে পারি এটা ভেবে যে, ভুল আইনস্টাইনও করতেন। বুঝতে পারি, আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরিরা পির-পয়গম্বর নয় যে তাঁদের রচনা ধ্রুব সত্য বলে মানতে হবে। ওঁরা ছিলেন বড় বড় মানুষ। আমাদের জ্ঞানার্জনের পথ প্রশস্ত করেছেন।’

কবি বিষ্ণু দে-র সঙ্গে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্র নাথ বসু

সত্যেন্দ্রনাথ বোসের প্রবন্ধটা সাইটশিফ্রট ফ্যুর ফিজিকে ছাপা হলো ১৯২৪ সালের আগষ্ট মাসে। ততদিনে কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে মৌলিক কাজ হয়েছে তিনটে। প্ল্যাঙ্ক, আইনস্টাইন আর বোর করেছেন কাজ তিনটি। চতুর্থ কাজটি করলেন আমাদের সত্যেন বোস। কোয়ন্টাম জগতে একেবারে আনকোরা নাম। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে আগে জন্ম হয়েছে বলবিদ্যার। তারপর সেখানে ঢুকেছে পরিসংখ্যান। কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জন্য তখনো বলবিদ্যার জন্ম হয়নি। তাঁর আগেই কেয়ান্টাম পরিসংখ্যানের জন্ম দিলেন সত্যেন্দনাথ বসু।

সত্যেন্দ্রনাথ বোসের প্রবন্ধ যখন প্রকাশ হচ্ছে তখনো অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী উলফগ্যাং পাউলি স্পিন ধারণার প্রবর্তন করেন নি। সত্যেন বোসের তো জানার কথাও নয়। আলোর কণা চরিত্র বেশ ভালোভাবে ব্যখ্যা করা যায় বোসের পরিসংখ্যান দিয়ে। কিন্তু বস্তু কণার কোয়ান্টাম চরিত্র ঠিক ঠাক ব্যাখ্যা করতে পারে না বোসের পরিসংখ্যান। কারণ ওই স্পিন। বস্তুকণাগুলো নিজ অক্ষের ওপর ঘোরে। কণাগুলোর চার্জ থাকে। একই চার্জের একই ভরের দুটি কণা একই শক্তিস্তরে পাশাপাশি থাকতে পারে না। পাউলি বললেন, এই সমস্যার একটা সমাধান আছে, যদি সমধর্মী দুটি কণা পরস্পরের বিপরীত দিকে ঘোরে। বস্তুকণাদের এই বিপরীতমুখি স্পিন বৈশিষ্ট্যের খবর ছিল না বোস-আইনস্টাইন তত্ত্বে। তাই বস্তুকণাদের জন্য আরেক ধরনের পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হলো। দরকার পড়ল বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের পরিমার্জনেরও। পরিমার্জিত সেই পরিসংখ্যান তৈরি করলেন এনরিকো ফার্মি ও পল ডিরাক। সেই পরিসংখ্যানের নাম তাই ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান। এরপর ঘটে বাঙালির জন্য গর্ব করার মতো ঘটনা। মহাবিশ্বের তাবৎ বস্তুকণাকে দুটো ভাগে ভাগ করা হলো। যেসব কণা ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান মেনে চলে তাদের নাম দেওয়া হলো ‘ফার্মিওন’। আর যেসব কণা বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে তাঁদের নাম হলো ‘বোসন’ কণা।

এরপর সত্যেন্দ্রনাথ বোসের পরিসংখ্যান নিয়ে কাঁটাছাড়া শুরু করেন আইনস্টাইন। আরও পরিমার্জিত করে সুন্দর কাঠামোতে দাঁড় করান সেটাকে। এজন্যই পরিসংখ্যানটির নাম হয়ে যায় ‘বোস-আইনস্টাইন’ পরিসংখ্যান। এই পরিসংখ্যানের সূত্রধরেই জন্ম হয় বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবনের (Bose-Einstein condensation) । এটাকে বলে পদার্থের ৫ম অবস্থা। এ এক আশ্চর্য অবস্থা। পরম শূন্য তাপমাত্রার খুব কাছাকাছি তাপমাত্রায় গ্যাসীয় পদার্থের পরমাণুগুলো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অনেকটা ফোটনের মতো আচরণ করে পরমাণুগুলো। বস্তুর ওই অবস্থাকে কঠীন, তরল, বায়বীয় বা আয়নিত কোনোটার সাথেই মেলানো যায় না। তাই ওই অবস্থার নাম দেওয়া হলো ‘বোস-আইনস্টাইন ঘণীভূত’ অবস্থা। তবে অত সহজে মেলেনি এই ঘনীভবনের দেখা। অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবনের অস্তিত্ব পরীক্ষাগারে প্রমাণের জন্য ২০১১ সালে তিন পদার্থবিদ পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার।

গায়ক দিলীপ রায়-এর (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র) বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্র নাথ বসু

ফিরে যাই বোসের প্রবন্ধে। কী বলেছিলেন সত্যেন বোস, যেটা শুনে আইনস্টাইনও মুগ্ধ হলেন! ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে পদার্থবিজ্ঞান পড়ে এক অদ্ভুত সমস্যায়। কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ ব্যখ্যা করতে পারছে না চিরায়ত বলবিজ্ঞান। এমনকী ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুৎচুম্বকীয় তত্ত্বেও নেই তার ব্যাখ্য। সমাধানে এগিয়ে এলেন বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী; লর্ড র‌্যালে, চার্লস র‌্যামজে, উইলহেম ভীন। কিন্তু খুঁত রয়ে গেল সবার তত্ত্বে। তখন জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক প্রকাশ করলেন তাঁর বৈপ্লাবিক কোয়ান্টাম তত্ত্ব। সেই তত্ত্বে বিকিরণ বা আলোকে দেখানো হলে গুচ্ছগুচ্ছ শক্তির ঝাঁক আকারে। প্ল্যাঙ্কের সেই শক্তিগুচ্ছের নাম কোয়ান্টাম। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন ফটো-তড়িৎক্রিয়ার ব্যাখ্যায় ব্যবহার করলেন কোয়ন্টাম তত্ত্ব। তিনি আলোর সেই গুচ্ছকে বললেন আলোর কণা। নাম দিলেন ‘ফোটন’। তখন থেকেই সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হলো প্ল্যাঙ্কের কোয়ন্টাম তত্ত্ব।

পরিসংখ্যান বিদ্যার কাজ হলো সূক্ষ্ম গণনাকে কাঠামোবদ্ধ করে বৃহৎ মানে নিয়ে যাওয়া। তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্বে তেমনটাই করে দেখিয়েছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী জেমস ক্ল্যার্ক ম্যাক্সওয়েল। বস্তুকে অতি ক্ষুদ্র কণার সমষ্টি ধরে নিয়েছিলেন। তারপর সেগুলো বিন্যাস করে একটা গড়মান বের করে বস্তুর তাপ, চাপের মতো ভৌত বিষয়গুলির মান বের করা চেষ্টা করেছিলেন। এজন্য শুধু নিউটনীয় গতিবিদ্যা হলেই চলে। কিন্তু পরমাণুর ভেতরের জগতে নিউটনীয় বলবিদ্যা অচল। সেটা ডেনিশ বিজ্ঞানী নীলস বোর দেখিয়েছেন। তাই পরমাণু মডেলে কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রয়োগ করা হলো। কিন্তু ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের মুল কোয়ান্টাম তত্ত্বেই তো গলদ রয়েছে। প্ল্যাঙ্কের সমীকরণের ডানদিকে দুটো অংশ। একটা অংশে আলোকে বিকিরণ শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। আরেকটা অংশে আলোকে দেখানো হয়েছে গুচ্ছশক্তির কণা হিসেবে। সমস্যটা হলো, ডানদিকের প্রথম অংশটির হিসাব করতে হচ্ছিল ম্যাক্সওয়েলর তড়িৎচুম্বকীয় সমীকরণের সাহায্যে। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্বকে নিউটন এবং ম্যাক্সওয়েল কারো সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। সেটা সমাধান করার মতো কোনো স্বতন্ত্র অঙ্ক প্ল্যাঙ্কের জানা ছিল না। আইনস্টাইনই প্রথম বিষয়টা নিয়ে কাজ করেন। একটা সমাধানও বের করেন তিনি। কিন্তু আইনস্টাইনের সমাধানটা ঠিক ছিল না। অথচ প্ল্যাঙ্কের সেই তত্ত্ব ধরেই আইনস্টাইনের ফটোতড়িৎ ক্রিয়া, বোরের কোয়ন্টাম পরমাণুর মডেল গড়ে উঠেছে। তাই এই তত্ত্বগুলোতেই সেই ত্রুটির প্রভাব পড়েছিল। সত্যেন্দ্রনাথ বোস ত্রুটিটারই মূল উৎপাটন করতে চাইলেন।

সত্যেন্দ্রনাথ বোস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের কোয়ান্টাম তত্ত্ব পড়াতেন। একদিন সেটাতেই হলো ভুল । ভুল কখনো কখনো আশীর্বাদ বয়ে আনে। ‘ভুল’ ক্যালকুলেশনের যে ‘ভুল’ সমাধান বেরুলো সেটা এক কথায় অভূতপূর্ব! সেটাতে কোয়ান্টামের পুরনো ত্রুটিটা ‘নেই’ হয়ে গেছে। চমকে উঠলেন সত্যেন্দ্রনাথ বোস। বুঝতে পারলেন প্ল্যাঙ্ক সূত্রের ফাঁকটা তিনি দেখে ফেলেছেন। যেটা দেখার চেষ্টা করছিলেন আইনস্টাইন, ডিবাইয়ের মতো কোয়ান্টামের দিকপালও। কিন্তু ঠিকঠাক ফাঁকটা তাঁরা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সত্যেন বোস পেলেন। ওই ভুল থেকেই। পুরো ক্যালকুলেশনটা তিনি নোট করে নিলেন। তারপর সেটা নিয়ে চলল কাঁটাছেঁড়া। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর স্যত্যেন বোস প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বকে ত্রুটিমুক্ত করতে সমর্থ হলেন।

ছাত্রবৃন্দের সাথে স্যার জগদীশ চন্দ্র বোস। উপবিষ্টঃ (বাম থেকে) মেঘনাদ সাহা, জগদীশ চন্দ্র বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ। দণ্ডায়মানঃ (বাম থেকে) স্নেহময় দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দেবেন্দ্র মোহন বসু, নিখিলরঞ্জন সেন, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নগেন্দ্রচন্দ্র নাগ।

এই অভিজ্ঞতা অন্যভাবে সমর্থন করেছেন তাঁর স্কুল বয়সের বন্ধু প্রয়াত অধ্যাপক নীরেন রায়। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাসটি যখন একটি বাংলা মাসিক সাহিত্য পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল তখন অধ্যাপক বসু, আমি এবং কয়েকজন বন্ধু কিস্তিগুলো প্রতি মাসে সতর্কভাবে পড়তাম, পরে আমরা বিশ্লেষণ করতাম এবং পরের কিস্তিতে কী ঘটবে তার পূর্বধারণা করতাম। আমাদের প্রত্যেকের পূর্বধারণাগুলো কাগজে লিখে রাখতাম। পরের মাসে পত্রিকাটি বের হলে উপন্যাসটির পরের কিস্তি পড়ার সময় মিলিয়ে দেখতাম আমদের ধারণা মতো উপন্যাসটির উন্নতি ঘটছে কিনা। এভাবে আমরা তখন উপন্যাস পড়তাম।’ এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় সত্যেন বোস বিজ্ঞান গবেষণায় যে পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন সাহিত্যেও সেই পদ্ধতির ব্যবহার করতেন। এটি যেকোনো বিষয়ে জ্ঞানের সাধারণ স্তর থেকে স্বাধীনভাবে উন্নতি করার একটি পদ্ধতি। এতে নিজের পূর্বধারণাগুলো অন্যদের পূর্বধারণা এবং বিষয়ের ক্রমোন্নতি মিলিয়ে দেখার সুযোগ ঘটে।

সত্যেন্দ্রনাথ বোসের কোয়ান্টাম সংখ্যায়নের কাজটি কত গভীর তাৎপর্যময় ছিল তা তিনি নিজেই সে সময় বুঝতে পারেননি। তার মন্তব্য, “আমার ধারণাই ছিল না যে আমি যা করেছি তা নতুন কিছু।” তবে ১৯২৫ সালে বার্লিনে আইনস্টাইনের সান্নিধ্যে এলে সত্যেন বোস তাঁর কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত হন। সে সময়কার কথা তিনি এভাবে স্মরণ রেখেছেন,“…জার্মানিতে যখন উপস্থিত হলাম, তখন দেখি প্রায় সকলেই আমার প্রবন্ধ পড়ছেন ও আলোচনা করছেন। স্বয়ং আইনস্টাইন আমার নতুন সংখ্যায়ন রীতিতে বস্তুকণার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে এর প্রয়োগক্ষেত্র অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন।”

সত্যেন্দ্রনাথ বোসের বাবা সুরেন্দ্রনাথ বোস ছিলেন ‘ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি’র একজন হিসাবরক্ষক। তাঁর দাদাও সরকারি কর্মী ছিলেন। সুরেন্দ্রণাথ বোস আর আমোদিনি বোসের প্রথম সন্তান সত্যেন্দ্রনাথ বোস। ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে ঈশ্বরমিল লেনের পৈতৃক গৃহে তাঁর জন্ম। সুরেন্দ্র আর আমোদিনির আরো ছয় সন্তান ছিল, তারা সবাই ছিল মেয়ে। শিক্ষার হাতেখড়ি নর্মাল স্কুল। এই স্কুলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কিছুদিন পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘নিউ ইন্ডিয়ান স্কুল’ ঘুরে সত্যেন ভর্তি হলেন হিন্দু স্কুলে। হিন্দু স্কুলের গণিতের শিক্ষক ছিলেন উপেন্দ্রনাথ বক্সি। সত্যেনের গণিতের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি কোন এক পরীক্ষায় তাঁকে ১০০ নম্বরের মধ্যে ১১০ নম্বর দেন। বিস্মিত প্রধান শিক্ষককে বক্সি বাবু বলেছিলেন—“সত্যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেবল সব সমস্যার সমাধান করেনি, বরং সব সমস্যার সম্ভাব্য সকল সমাধানও বের করেছে!”

বাবা সুরেন্দ্রনাথের গণিত এবং বিজ্ঞানের প্রতি ছিল অদম্য আকর্ষণ। এই আকর্ষণ থেকেই তিনি ১৯০৩ সালে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল ও কেমিক্যাল কোম্পানি চালু করেন। শৈশব থেকেই সত্যেন্দ্রনাথ বোস ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তার বাবাই মূলত তার গণিতে দক্ষতা বাড়াতে মূল ভূমিকা পালন করেন। সুরেন্দ্রনাথ প্রতিদিন কাজে যাবার সময় ঘরের মেঝেতে বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যা লিখে যেতেন যা সত্যেন্দ্রনাথ তার বাবা বাড়ি ফেরার আগেই সমাধান করে রাখতেন।এভাবে ধীরে ধীরে তার গণিতের প্রতি ঝোঁক অত্যন্ত বেড়ে যায় এবং দক্ষতাও বাড়ে। ১৯০৭ সালে ১৩ বছর বয়সে তিনি ভারতের অন্যতম পুরাতন বিদ্যালয় ‘দ্য হিন্দু স্কুল’ এর ভর্তি পরীক্ষায় ৫ম স্থান অধিকার করেন এবং সেখানে ভর্তি হন। স্কুলে ভর্তির অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি গণিতে অত্যন্ত ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার গণিত শিক্ষক উপেন্দ্রনাথ বক্সি বিশ্বাস করতেন যে সত্যেন্দ্রনাথ একদিন পিয়েরে লাপ্লাসের মতো বিখ্যাত গণিতবিদ হবেন।

১৯০৮ সালে এই স্কুল থেকেই তাঁর এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষার মাত্র দুদিন আগে সত্যেন আক্রান্ত হোন জল বসন্তে। ফলে সেবার আর তার পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। ১৯০৯ সালের পরীক্ষায় তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মেট্রিক পরীক্ষায় ৫ম স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রেসিডেন্সি কলেজে সেই সময়ে জ্ঞানী ব্যক্তির এক অপূর্ব সমাবেশ। একই ক্লাসে পড়ছেন মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নিখিল রঞ্জন সেন ও শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ। আর পড়াচ্ছেন প্রফুল্লচন্দ্র, জগদীশচন্দ্র এবং আরো অনেকে। ১৯১১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।  চতুর্থ বিষয়েও তিনি ১০০ নম্বর পেয়েছিলেন। পরে ১৯১৩ সালে গণিতের স্নাতক এবং ১৯১৫ সালে মিশ্র গণিতে মাস্টার্স—উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। মাস্টার্সে তার শতকরা ৯২ শতাংশ নম্বর প্রাপ্তি এখনো কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড হিসেবে অক্ষুন্ন আছে! উভয় পরীক্ষায় বাংলার অপর বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। এর মধ্যে ১৯১৪ সালে এম-এস-সি পরীক্ষার আগে সত্যেন বসু ডাক্তার যোগেন্দ্রনাথ ঘোষের মেয়ে ঊষাবতী দেবীকে বিয়ে করেন।বিয়ের সময় বসুর বয়স ছিল ২০ এবং উষার বয়স ছিল মাত্র ১১! বসু দম্পতির ঘরে মোট নয়জন সন্তানের জন্ম হয় যাদের মধ্যে দুজন শৈশবে মারা যায়। বাকিদের মধ্যে পাঁচ মেয়ে এবং দুই ছেলে ছিল বসুর।

সত্যেন্দ্রনাথ বোস, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিস ও নরবার্ট ওয়েনার ম্যাসাচুয়াস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি

বিদেশে গিয়ে লেখাপড়া করার ইচ্ছে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ছোটবেলা থেকেই ছিল। ১৯১৫ সালে পাস করার পর সত্যেন্দ্রনাথ বসু চেষ্টা শুরু করলেন। এম-এস-সি পরীক্ষায় রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পাবার পর তাঁর শিক্ষক প্রফেসর ডি এন মল্লিক সস্নেহে ডেকে বললেন, “এত বেশি নম্বর পেয়েছ পরীক্ষায়, বড় বেমানান লাগছে হে”। সত্যেন্দ্রনাথ ভাবলেন এবার মনে হয় সুযোগ এলো বিদেশ যাবার। কিন্তু হলো না। সে বছর পদার্থবিদ্যা বা গণিতের জন্য কোন বৃত্তি দেয়া হলো না। সবগুলো বৃত্তি পেলো রসায়নের শিক্ষার্থীরা। এত ভালো রেজাল্ট করার পরেও ভালো কোন চাকরির ব্যবস্থা হলো না। কিংবা বলা যায় এত ভাল রেজাল্টের কারণেই কোন চাকরি পাওয়া গেলো না। এত ভাল ছাত্রকে কেউ সাধারণ চাকরি দিতে চান না। তাঁর বাবা রেলওয়ের বড় অফিসারদের ধরে রেলওয়েতে একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে চাইলেন। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ রাজী হলেন না। তিনি বাবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসামে চলে গেলেন। সেখানে গৌরীপুরের জমিদারের ছেলেকে প্রাইভেট পড়ানোর দায়িত্ব নিলেন।

এর অনেক পরে সত্যেন্দ্রনাথ বসু এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “পাশ করার পর প্রথম একটা বছর আমি টিউশনি করে কাটিয়েছি। এই এক বছরে বাইরের দু’একটা কলেজে ও অন্যান্য সরকারি অফিসেও চাকরির চেষ্টা করেছিলাম। হয়নি। যাকে প্রাইভেট পড়াতাম সে এখন সিনেমা জগতের দিকপাল কুমার প্রমথেশ বড়ুয়া। পাটনা কলেজে একটা দরখাস্ত পাঠিয়েছিলাম। উইলসন সাহেব তখন সেখানকার প্রিন্সিপাল। স্যার যদুনাথ সরকার তখন সেখানে অধ্যাপনা করতেন। কিন্তু সেখানেও আমার চাকরি হলো না। তাঁরা জানালেন তাঁদের দরকার একজন সেকেন্ড ক্লাস এম-এস-সি। তখন ভাবলাম ফার্স্ট ক্লাস না পেয়ে সেকেন্ড ক্লাস পেলেই বুঝি ভালো ছিল। আর একবার বাবার বন্ধুর কথামত আলিপুর আবহাওয়া অফিসে একটা দরখাস্ত পাঠিয়েছিলাম। জবাব এলোঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতী ছাত্রের উপযুক্ত কোন চাকরি এখানে খালি নেই। প্রার্থী অন্য কোথাও দরখাস্ত করলে ভালো হয়”।

চাকরির জন্য দরখাস্ত করতে করতে ক্লান্তি এসে গেল। নিজের পড়াশোনাটা আবার শুরু করার কথা ভাবছেন। এই সময় স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কোলকাতায় রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে প্রতিষ্ঠা করেন। সেটা ১৯১৪ সাল। ১৯১৭ সালে পদার্থবিদ্যা পড়ানো শুরু হয়। একদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জির কাছ থেকে ডাক এলো। শুধু সত্যেন বসু নয়, তাঁর মত আরো সব কৃতী ছাত্রদের ডেকেছেন তিনি। খাড়া সিঁড়ি বেয়ে লাইব্রেরি ঘরের পাশে স্যার আশুতোষের খাস কামরায় হাজির হলেন সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা, শৈলেন ঘোষ। সবাই কৃতী ছাত্র, কিন্তু পরিপূর্ণ বেকার। স্যার আশুতোষের বিরাট ব্যক্তিত্বের সামনে ভয়ে ভক্তিতে সকলেই বিনীত, নম্র। স্যার আশুতোষ শুনেছেন এই নবীন ছাত্ররা চাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের নতুন নতুন বিষয় পড়ানো হোক। তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, “তোরা পড়াতে পারবি?” সত্যেন বসু উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে, যা বলবেন তা-ই যথাসাধ্য চেষ্টা করবো”। স্যার আশুতোষ সস্নেহে হাসলেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু আর মেঘণাদ সাহা দুজনই বিজ্ঞান কলেজে যোগ দেন শিক্ষক হিসাবে, গণিত বিভাগে। কলেজে মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য তাদেরকে বিষয় বেছে নিতে বলা হলে সত্যেন্দ্রনাথ বসু জৈবপদার্থবিজ্ঞান এবং ফলিত গণিত বেছে নেন। এক বছর পরে তারা দুজনই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে বদলি হোন। ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি তারা দুজন গবেষণায় মনোযোগ দেন। তবে, বিজ্ঞান কলেজে সেই অর্থে গবেষণাগার বলে কিছু ছিল না। কেবল প্রেসিডেন্সী কলেজের লাইব্রেরি যেখানে কিছু বিজ্ঞান সাময়িকী পাওয়া যেত। অনেক বইও সেখানে ছিল না। তবে, সেই সময় একটি ঘটনা ঘটে যা তাদের দুজনের জন্যই সৌভাগ্য বয়ে আনে। অস্ট্রিয়ার নাগরিক ড. ব্রাউলকে স্বাস্থ্যগত কারণে চিকিৎসকরা কোন একটি উষ্ণ দেশে থাকতে পরামর্শ দিলে তিনি কোলকাতায় এসে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে যোগ দেন। আসার সময় তিনি প্রচুর বই-পত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন যা বসু-সাহা তাদের পড়াশোনার কাজে লাগাতে শুরু করে।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগে পর্যন্ত কলকাতায় সত্যেন্দ্রনাথ বসু বেশ কিছু গবেষণা করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি ছিল মেঘনাদ সাহার সঙ্গে যৌথভাবে। সাহার সঙ্গে কাজগুলো পদার্থবিজ্ঞানের হলেও বিশুদ্ধ গণিতে সত্যেন্দ্রনাথ বোস এই সময় একাধিক নিবন্ধ প্রকাশ করেন। এছাড়া মেঘনাদ সাহর সঙ্গে মিলিত ভাবে সত্যেন্দ্রনাথ বোস আইনস্টাইনের আপেক্ষিতা তত্ত্বের মূল জার্মান নিবন্ধসমূহ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন যা কলকাতা থেকে দুই খন্ডে প্রকাশিত হয়। কয়েকদিনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়ে সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন সত্যেন্দ্রনাথ। বেতন ধার্য হয় ৪০০ টাকা।

১৯২৪ সালে আইনস্টাইন অনুবাদকৃত তার প্রবন্ধটি জার্মানি পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর তিনি ইউরোপে গিয়ে পড়াশোনা করার মনস্থির করলেন। উপাচার্যের নিকট সত্যেন্দ্রনাথ ইউরোপ পড়াশোনার জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকার অনুদানের আবেদন করেন। এই টাকা তিনি ইউরোপ ঘুরতে যাবার জন্য নয়, বরং ইউরোপের বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ করার জন্য চেয়েছিলেন। তার এই আবেদন কিছুদিন ঝুলে ছিল। তবে তার বিখ্যাত প্রবন্ধটি প্রকাশের পরই এটি অনুমোদিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার পি জে হার্টজ তাকে ১৩ হাজার ৮০০ টাকা অনুদান দেন এবং সাথে বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের সাথে কাজ করার সুপারিশ করেন। রাদারফোর্ড তখন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানচেস্টারে তাঁর ছাত্রদের নিয়ে গবেষণা করছেন। তার ল্যাবরেটরিতে তখন আর জায়গা ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথ তাই জার্মানি আর ফ্রান্সে কাটিয়ে দিলেন দুই বছর। এর মধ্যে তিনি হাইজেনবার্গের সান্নিধ্য পেয়েছেন। কাজ করেছেন দ্য ব্রগলির রঞ্জন রশ্মি গবেষণা কেন্দ্রে। মাদাম কুরির রেডিয়াম ইনস্টিটিউটেও কাজ করেন এই বিজ্ঞানী।

“পেয়েছি। যা খুঁজছিলাম, তা পেয়েছি।” জানা গেল, ‘ঈশ্বর কণা’ সত্যি সত্যিই আছে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সব চেয়ে ব্যয়বহুল, সব চেয়ে প্রতীক্ষিত পরীক্ষার ফল। শুরু হল গবেষণার নতুন অধ্যায়। কারণ, যে কণাটির খোঁজ মিলেছে, তা সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কল্পিত ‘বোসন’ গোত্রের হলেও, পিটার হিগস কল্পিত কণার সঙ্গে হবহু এক নয়। তবে, তার খুব কাছাকাছি। নতুন কণার আবিষ্কারে বিজ্ঞানীরা উল্লসিত। কারণ, হিগস-কল্পিত কণা যেখানে ব্যাখ্যা করত শুধু পদার্থের ভর, সেখানে নতুন কণাটি সমাধান করতে পারে ব্রহ্মাণ্ডের আরও বহু রহস্যও। ‘ঈশ্বর কণা’ গুরুত্বপূর্ণ আরও এক কারণে। ব্রহ্মাণ্ড ব্যাখ্যায় বিজ্ঞানীদের সব চেয়ে সফল তত্ত্বের নাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল। ওই তত্ত্বে বলা হয়েছে যতগুলি কণার কথা, তাদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি কেবল ওই ‘ঈশ্বর কণা’। অথচ, তা কি না অন্য কণাদের ভর জোগায়। এ হেন কণার খোঁজ না মিললে স্ট্যান্ডার্ড মডেল যেন মুণ্ডহীন ধড়। অনাবিষ্কৃত কণাটির গুরুত্ব সাধারণ মানুষকে বোঝাতে ১৯৯৩ সালে কলম ধরেছেন লিও লেডারম্যান। বইয়ের নাম কী হবে? লেডারম্যান এ কণার বিষয় নিয়ে লেখা তাঁর প্রকাশিতব্য বইটির নাম দিতে গিয়ে বেশ সমস্যাতেই পড়লেন। কী নাম দেবেন, তা ভাবতে ভাবতে একসময় খানিক উষ্মাভরেই বোধহয় বলে ফেলেছিলেন, ‘গড ড্যাম পার্টিকেল’! আর বলাই বাহুল্য, ঝানু প্রকাশক তা মুহূর্তেই লুফে নিয়েছিলেন। কিন্তু খানিক পরই প্রকাশকের মনে হয়েছিল বাজার কাটতির জন্য চাই আরও স্মার্ট আর ছোট নাম। তো লেডারম্যানের কাছে প্রস্তাব পাড়লেন প্রকাশক। নাম টা একটু ছেঁটে ‘গড পার্টিকেল’ রাখা যায় না? লেডারম্যান সম্মতি দিলেন। বইয়ের নাম রাখা হয়েছিল ‘দ্য গড পার্টিকেল’। ব্যস, হু হু করে বাজারে বিক্রি হতে শুরু হয়েছিল সে বই। সেই গড পার্টিকেলের নাম বাংলা করলে দাঁড়ায় এই ‘ঈশ্বর কণা’।

‘ঈশ্বর কণা’ বা গড পার্টিকেল বিষয়টি আদৌ ধর্ম-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নয়। এটি পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এই নামের পেছনে বেশকিছু মজার বিষয়ও রয়েছে। হিগস ও বোসন দুজন বিজ্ঞানীর নাম মিলিয়ে এ কণার নামকরণ। বোসন হচ্ছে পূর্ণসংখ্যক স্পিন বা ঘূর্ণন-বিশিষ্ট একটি মৌলিক কণিকা। এই কণিকা বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে। এক শক্তিস্তরে অনেক বোসন একসঙ্গে থাকতে পারে। তাই বস্তুর জাত-পরিচয় দানকারী বোসন নাম নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু হিগসের নাম আলোচনা এলেও বস্তুর ভরের ব্যাখ্যা কেবল স্কটল্যান্ডের বিজ্ঞানী হিগস দেননি। ষাটের দশকে পদার্থের ভর ব্যাখ্যার পেছনে হিগস ছাড়াও কাজ করেছিলেন ফিলিপ অ্যান্ডারসন, জেফ্রি গোল্ডস্টোন, রবার্ট গাউট ও ফ্রাঁসোয়া এঙ্গলার্ট। এ ছাড়া এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টমাস কিবল এবং তাঁর দুই মার্কিন সহযোগী জেরাল্ড গুরালনিক ও কার্ল হাগেন। কণাটির ধারণা তিনি প্রথম প্রকাশ করলেও এ ক্ষেত্রে গবেষণায় অন্যান্য বিজ্ঞানীর অবদান থাকায় এ কণাটির নাম হিগস বোসন রাখার পক্ষে ছিলেন না হিগস। কিন্তু তাঁর এক ছাত্র গবেষণাপত্র লেখার সময় ‘হিগস-বোসন’ কথাটি ব্যবহার করেন। যা পরে প্রচলিত হয়ে যায়। ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ ভরের ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। কণার ভর না থাকলে তা ছোটে আলোর বেগে। অন্য কণার সঙ্গে জোট বাঁধে না। ফলে বস্তু সৃষ্টির তত্ত্ব আর খাটে না। তাই ভরের এই ব্যাখ্যা পেতে এমন একটি কণার সন্ধান করছিলেন গবেষকেরা, যাকে ১৯৯৩ সালে বিজ্ঞান লেখক লিও লেডারম্যান নাম দেন ‘গড পার্টিকেল’ বা ‘ঈশ্বর কণা’।

তিল ধারণের জায়গা-শূন্য সেমিনার রুমে অ্যাটলাস-দলের মুখপাত্র ফ্যাবিওলা গিয়ানোত্তি ঘোষণা করলেন, “আমাদের তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন এক কণার।” তাঁর মতে, এই শনাক্তকরণ এতটাই নিখুঁত যে, তাতে ভুলের সম্ভাবনা ৩৫ লক্ষে ১। গিয়ানোত্তি জানান, ফলাফল প্রকাশে শীঘ্রই পেপার ছাপাচ্ছেন তাঁরা। সিএমএস দলের মুখপাত্র জো ইনকান্ডেলা ঘোষণা করলেন, একই রকম ভরের কণার সন্ধান তাঁরাও পেয়েছেন। তাঁর মন্তব্য, “আমরা যা দেখেছি তা নাটকীয়। আমরা খুঁজে পেয়েছি নতুন এক কণা। এটা যে ‘বোসন’, সে বিষয়ে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই। এটা আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সব চেয়ে ভারী ‘বোসন’। এমন ‘বোসন’ খুঁজে পাওয়ার তাৎপর্য গভীর। আমাদের খুব ভেবেচিন্তে কথা বলতে হচ্ছে।” প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষ ঘটেছে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের অ্যাটলাস এবং সিএমএস নামে দুই যন্ত্রে। সেখানে ধ্বংসস্তূপ বিশ্লেষণ করে ‘ঈশ্বর কণা’র জন্মের খোঁজ নিয়েছেন ওই দুই যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত দু’দল বিজ্ঞানী। যাঁরা আজ পেশ করলেন তাঁদের বিশ্লেষণের ফলাফল। স্পষ্ট জানা গেল, দু’দলই পাচ্ছেন নতুন একটি কণার চিহ্ন। যে কণার ভর ১৩৩টি প্রোটনের মোট ভরের সমান।

“এটা এমন এক মুহূর্ত যে উত্তেজিত না হয়ে পারছি না,” বললেন সার্ন-এর রিসার্চ ডিরেক্টর সার্জিও বার্তোলুচি, “গত বছর আমরা বলেছিলাম, ৫ জুলাই ২০১২ সালে হয় খুঁজে পাব হিগস-এর কাছাকাছি নতুন কোনও কণা, অথবা স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরের হিগস বোসন। ঠিক তাই হল। যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেও বলতে পারি, আমরা গবেষণার পথে নতুন এক বাঁকের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাদের এ বার নতুন কণা সম্পর্কে গভীরে জানতে হবে।” অতঃপর? এ বার এই নতুন কণার চরিত্র অনুধাবনের লক্ষ্যে এগোবে এই গবেষণা। এর ধর্ম হিগস-কল্পিত কণার থেকে কতটা আলাদা? অনেকটা আলাদা কি? তেমন সম্ভাবনার কথা ভেবেই মহা উল্লসিত পদার্থবিজ্ঞানীরা। কারণ, স্ট্যান্ডার্ড মডেল ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ব্রহ্মাণ্ডের মোট পদার্থের। খোঁজ মিলেছে মাত্র ৪ শতাংশ বস্তুর। বাকি ৯৬ শতাংশ গেল কোথায়? বিজ্ঞানীদের আশা, আবিষ্কৃত নতুন কণা সন্ধান দেবে সেই নিখোঁজ ৯৬ শতাংশের।

সত্যেন বসু ছিলেন আত্মভোলা মানুষ। সব বিজ্ঞানীই মনে হয় কম-বেশী আত্মভোলা। নিউটন, আইনস্টাইন, আর্কিমেডিস, গ্যালিলিও সম্পর্কেও আমরা শুনেছি। সত্যেন বসুরও অনেক মজার ঘটনা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময়ের একটা ঘটনার উল্লেখ করেছেন কাজী মোতাহার হোসেন সত্যেন বসুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে। একদিন সত্যেন বসুর মেয়ে বায়না ধরলো সিনেমা দেখতে যাবে। সত্যেন বসু তখন গণিতের একটা জটিল সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত। তবুও মেয়ের পীড়াপীড়িতে রাজী হলেন। মেয়েকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে গেলেন মুকুল সিনেমায় (পরে এই সিনেমা হলের নাম হয়েছে আজাদ)। গাড়ী থেকে নেমে গাড়োয়ানকে টাকা দিতে গিয়ে দেখেন মানিব্যাগ ফেলে এসেছেন বাসায়। চিন্তিত মুখে মেয়েকে বললেন, “তুই এখানে একটু অপেক্ষা কর মা, আমি বাসায় গিয়ে মানিব্যাগটা নিয়ে আসি”। একই ঘোড়ার গাড়ীতে ফিরে এলেন বাসায়। নিজের টেবিলের ওপর থেকে মানিব্যাগটা তুলে নিতে গিয়ে নজর পড়লো যে বৈজ্ঞানিক সমস্যাটির সমাধান খুঁজছিলেন তার ওপর। অমনি সব ভুলে গিয়ে সমস্যাটির সমাধানে বসে গেলেন। এদিকে সময় চলে যাচ্ছে। গাড়োয়ান অপেক্ষা করছেন তো করছেনই। সাহস করে হাঁকডাকও করতে পারছেন না। এত বড় বিজ্ঞানীর বাড়ীতে কি হাঁকডাক দেয়া চলে? কিন্তু দু’ঘন্টা পরেও যখন তাঁর প্রিয় ‘বোস সাহেব’ বেরোলেন না, গাড়োয়ান সাহস করে ঘরে ঢুকে দেখলেন সত্যেন বসু চেয়ারে বসে অংক কষছেন নির্বিকার চিত্তে। গাড়োয়ানের ডাকে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার?” গাড়োয়ান কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “হুজুর, আপনি টাকা নিয়ে সিনেমা হলে যাবেন বলেছিলেন। আপনার মেয়ে সেখানে অপেক্ষা করছে”। এবার সত্যেন বসু সম্বিত ফিরে পেলেন, “তাই তো, বড্ড ভুল হয়ে গেছে”।

জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কাজের মধ্যে অতিবাহিত করেছেন প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসু। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি প্রাইম নাম্বার নিয়ে গবেষণা করেছেন। ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ভোর ছ’টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন সত্যেন বসু। আশি বছরের একটা কর্মময় জীবন কাটিয়ে গেলেন এই পৃথিবীতে। পেছনে রেখে গেলেন তাঁর অমর কীর্তি।

আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “পেয়েছি—যা খুঁজছিলাম, তা পেয়েছি : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়”

  1. Debartha chaudhuri says:

    Asadharon research er result ei lekha!!!thanx & hats off 2 u dada!!!anek din dhore khujchilam erokom kichu Sat yen Bose er poor!!!meghnad saha er opor erokom kichu pele khub badhito hobo!!

  2. খাইরুল says:

    দাদা কাজলদীঘি উপন্যাস শেষ করেন প্লিজ

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev