বাগনানের আকাশটা তখনো এতটা ধোঁয়াধুলো মুখরিত হয়নি। গাড়ির গর্জন বা মানুষের মেলামেশা বা চারপাশের দোকানগুলো মফস্বলীয় বাঁক পেরিয়ে শহরের দিকে হেঁটে যাবে একদিন । বাগনানের শরীরের বাঁকে বাঁকে মফস্বলের পেটঘুমের অলসতা। রেডিও। ব্লাক হোয়াইট টিভি। পাড়ার রবীন্দ্র জয়ন্তী। জলসা। খেলার মাঠ।লিটিল ম্যাগাজিন। গ্রুপ থিয়েটার। একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতা। মিছিল। বিবিধ।
১৯৮৫। আমি সবে মাধ্যমিক পেরিয়ে কলেজে। গল্প- কবিতা আর লিটিল ম্যাগাজিনের উন্মত্ত উত্তাপে বয়স সেঁকছি। অরবিন্দ দিলীপ শিবনাথদা মাবুদদা পার্থদা আরও বন্ধুরা। চায়ের কাপে তুফান। ইতিমধ্যে আফসারদা শহরের বড় কাগজের প্রতিশ্রুতিবান গল্পকার। আমাদের ধমনীতে টগবগে ফুটন্ত জীবনের উড়ন্ত স্বপ্ন। উড়ছি। চায়ের আড্ডায়। দুরন্ত সিগারেটের হাত বদলে। হঠাৎ নতুন বই পড়ার আবিষ্কারে।
আফসারদা বাগনান বাজারে ‘কথামালা’ প্রেস করল। আমাদের আড্ডাটা চায়ের কাপের তুফান ছেড়ে ‘কথামালা’ প্রেসে। ঠিক আমার বাড়ির বিপরীতে। সকাল-সন্ধ্যে-রাত্রি। সাহিত্য আমাদের বুকে যক্ষারুগীর মত প্রতিশ্রুতিবান। আফসারদার মাথায় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’-এর একটা শাখা তৈরির পরিকল্পনা। সেই প্রথম মিটিং-এ গৌরীদার সঙ্গে আলাপ।
একটা দীর্ঘ সুঠাম শরীর আর জ্ঞানজ মানুষের সাক্ষাত আমাদের সমস্ত জ্ঞান চর্চার মানচিত্রটা প্রতিদিনের বয়সহীন মেলামেশায় আলোকময় হয়ে উঠল। কবিতার ছন্দ থেকে বিশ্বসাহিত্য। মার্কসবাদ। স্ট্রিম অফ কনসাসনেস টু সুরিয়ালিজম। ফ্রয়েড টু ইয়ুং। জেমজয়েস। পার্টিশন। পূর্ব পাকিস্তানের সম্বলহীন রিফিউজি। রিফিউজি জীবনের বহুস্তরিক অভিঞ্জতা। দার্জিলিং গর্ভমেন্ট কলেজের মেধাবী ছাত্রের যাপন। কমিউনিষ্ট পার্টির আন্দোলনের ইতিবৃত্ত। রেলওয়ের শ্রমিক সংগঠন।দুবার সাসপেন্ড। আন্ডার গ্রাউন্ডের জীবন। একটা মানুষের কথাচারিতার থেকে গ্রন্থের মত সব পড়ে নিচ্ছি। যেন মানুষটা হাজার হাজার বই আর অভিজ্ঞতার একটা জানালা।
‘প্রগতি লেখক সংঘ’-এর ‘হাওড়া জেলা’ সম্মেলন থেকে ‘জাগর’ পত্রিকা। আমাদের লেখক করে গড়ে তোলার অনুশীলন। বা অন্য ধরণের মানুষ বানানোর ‘দাদাঠাকুর’। আধুনিক থাকার আশ্চর্য একটা দূরবীন ছিল মানুষটার কাঁধের ঝোলায়।
এ ভাবেই আড্ডার ভেতর চলে আসছে দেবেশ রায়, অমিয়ভূষণ, অসীম রায়, দীনেশ চন্দ্র রায়, কমলকুমার, দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ, শক্তি, সুনীল, বিনয় ইত্যাদিরা। এবং প্রত্যেকের লেখার অনুপুঙ্খ বৈশিষ্ট্য। বিশ্লেষণ। বোঝা না-বোঝার ভেতর আমাদের এক ধরণের সংশ্লেষ ঘটছে।
আরো অনেক বন্ধুদের সমাগম। শোভনদা, মুক্তি, অলোকদা।
আমাদের লেখাগুলো বদলে যাচ্ছে। হাঁটাচলার গড়ণ বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে পায়ের নিচের মাটি। মাথার ওপর আকাশ। সামনের দিকের পৃথিবীটাকে দেখার ভঙ্গি।
গৌরীদার জানলা দিয়ে চোখ রেখে আমাদের জন্মান্তর। প্রতিদিন।
গৌরীদার বাড়িতে আমাদের জন্য জানলাদরজাগুলো সব সময় অপেক্ষায় থাকত। খাওয়া বসা থাকাগুলো নিত্য। বৌদি যত্ন করে রান্না করে অফিস। গৌরীদা রেল অফিসের চাকরীতে অনিয়মিত। প্রায় প্রতি মাসে চারপাঁচ দিনের মাইনে কাটা। ঠিক এরকম একটা আড্ডায় হঠাৎ নাটকের কথা এসে পড়ে। তখন দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পরিচয় শারদীয়তে প্রকাশিত ‘শোকমিছিল’। গৌরীদা সদ্য আমাদের পড়ে শুনিয়েছেন। গৌরীদা আফসারদাকে, তুমি এটার নাট্যরূপ দিতে পারবে?
আফসারদা, চেষ্টা করতে পারি।
আমি, আমি নাট্যরূপ দেব।
গৌরীদা, ঠিক আছে দু-জনেই দাও, যারটা ভালো হবে, সেটাই গ্রহণ করা হবে।
আমি তিন দিনের মধ্যে পনের পৃষ্টা নাট্যরূপ দিয়ে যখন সবাইকে পড়ালাম, গৌরীদা এবং আফসারদা উভয়েই ভীষণ উৎসাহী। নাট্যরূপ শেষ হল।
‘শোকমিছিল’ নাটককে কেন্দ্র করে গৌরীদার অভিভাবকতায় গড়ে উঠল ‘মনন’ গ্রুপ থিয়েটার। তাপসদা, নির্ঝর, সুখময়, কৃষ্ণাদি, তৃপ্তিদি, ঝুনু, শান্ত, আলাউদ্দিন, বিকাশ, অরূপ সাঁই, শৈবাল, সন্দীপ হাজরা আরও জনা কুড়ির তাজা বয়স নিয়ে নির্ঝরের বাড়িতে শুরু হল আমাদের প্রাত্যহিক মহড়া। আমি হয়ত বছর কুড়ি। কিন্তু গৌরীদা আমাকেই নির্দেশক নির্বাচন করলেন। অনেকে প্রতিবাদে দল থেকে বেরিয়ে গেল।
তৃপ্তিদি রবীন্দ্র ভারতীতে ড্রামার প্রথম বর্ষ। বই আনে। স্তানিশ্লাভস্কি, ব্রেটল্ট বেখ্রট। ক্ষিরোদ প্রসাদ। বিজন ভট্টাচার্য। দীনবন্ধু মিত্র। গৌরীদা আমাদের পাঠ করে শোনান। তারপর আলোচনা। বিশ্লেষণ। যেন গৌরীদা নিজেও একজন নাট্যকর্মী ও নাটকের ছাত্র। এতটাই শিশুসুলভ শিক্ষার খিদে। জিজ্ঞাসা। একদিকে ‘মনন’ নাট্যগ্রুপ আর অন্যদিকে ‘জাগর’ সাহিত্য ম্যাগাজিন। গৌরীদা চূড়ান্ত ভাবে নিয়োজিত মানুষ। আমাদের সংগ্রামী নাট্যকর্মী, সাহিত্য কর্মী তৈরি করার পাঠ দিচ্ছেন। গৌরীদা বিশ্বাস করতেন, একজন নাট্য বা সাহিত্য কর্মী নিছক সৌখীন-বাবু নন। তাঁর সমাজ ও সময়ের কাছে দায়বদ্ধ থাকা ভীষণ জরুরী। প্রসঙ্গত এসে পড়ত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কাইফি আজমি, রোঁম্যা রোলা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, দেবব্রত বিশ্বাস, উৎপল দত্ত, আই পি টিএ, আন্টি ফ্যাসিষ্ট রাইটার অ্যাসোসিয়েশন, পি. সি. যোশী, পিকাসো বা বিশ্বব্যাপী বিবিধ উত্তাল আন্দোলনের উদাহরণ। গৌরীদা ‘কর্মী’ শব্দটার ওপর একটু বেশিই জোর দিতেন। এ নিয়ে আমাদের অনেকের ভেতরে একটা দ্বিধা কাজ করত। আসলে গৌরীদার অর্ন্তগত রক্তের ভেতরে যে রাজনৈতিক বোধ ক্রিয়াশীল ছিল, সেটা আমাদের মজ্জায় জাড়িত করার চেষ্টা করতেন। বলতেন, যা কিছু পুরাতন, জগদ্দল হয়ে রাষ্ট্রে, সমাজে, মগজে, বাসা পেড়ে আছে, সেগুলোকে প্রশ্ন করতে হবে, ভাঙতে হবে। তারপর আবার নতুন চেতনার আলোকে সেগুলোকেই জুড়তে হবে। তবে সমাজটা আবার সামনের দিকে এগোবে। শোনাগুলো মগজের ভেতর দিয়ে হৃদয়ে। গৌরীদা আমাদের নাম দিলেন ‘নিও ডিরোজিও’ গ্রুপ।
আমাদের হাজার হাজার কাপ চা, বিড়ি, সিগারেট চপমুড়ি, সব, গৌরীদার। প্রত্যেকের ঝোলায় প্রায় প্রতিদিন নতুন লেখার পাণ্ডুলিপি। পাঠ এবং সমবেত সমালাচনায় আবার লেখাগুলোর কাটাকুটি। কাটাকুটি লেখাগুলোর আলাদা শরীর নিয়ে নতুন লেখা হয়ে যাচ্ছে। যেন লেখার স্কুলের ছাত্র আমরা। গৌরীদা হেডমাস্টার।
চায়ের দোকানের আড্ডা শেষে বাড়ি ফেরার পথে কোন কথায় আবার আলাপ জমে উঠত। আবার মানকুর মোড়ের চায়ের দোকান। তখন হয়ত প্রসঙ্গত এসে পড়েছে সদ্য পড়া বিলাস সরং বা উদয় ভাদুড়ীর কথা। গৌরীদা সবে ‘বিজ্ঞাপন পর্ব’ বা ‘অনুষ্টুপ’ এ পড়েছেন। আমাদেরও পড়িয়েছেন। কথাগুলো সময়হীন রাত্রির দিকে এঁকেবেঁকে গড়িয়ে যেত। কিন্তু আফসারদার সাইকেল চালিয়ে বাইনানের বাড়ি ফেরার দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করে, পরের দিনের জন্য জমিয়ে রাখা হত।
গৌরীদা প্রতিদিন বাগনান লোকাল। অফিস। আমি সকালে প্রায় গৌরীদার বাড়িতে। গৌরীদা ভাত খাওয়া শেষ করে, বললেন, আমার সঙ্গে অফিসে যাবি?
আমি অবাক, কেন?
এই শুয়োরের মত জীবনটা আর টানতে পারছি না। রেজিকনেশন দেব।
আমি অবাক। ভাবলাম, গৌরীদা হয়ত মজা করছেন। গৌরীদার সঙ্গে অফিসে। গৌরীদা সত্যিই রেজিগনেশন সাবমিট করলেন। কলিগদের হাহাকার। ১৯৮৭, সেপ্টেম্বরের কোন একদিন। গৌরীদা তখন ছাপান্ন।
বাড়ি ফেরার পথে হাওড়ার রেলওয়ে বার-এ সামান্য বিয়ারপান। ফিরতে রাত হয়েছিল। বাগনান স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তাটা অনেকটা নির্জন। গৌরীদা গান ধরেছেন বেশ সুরে ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলো’।
এর পর কি করবেন?
রাজনীতি করব। স্বাধীন ভাবে বাঁচব। জীবনটাকে ভোগ করব। দেখ আমি রিফিউজি। লড়াই করতে করতে আমি খুব ক্লান্ত।
গৌরীদার রাজনৈতিক জীবনের ভেতরে বহুবিধ দ্বন্দ্ব ছিল। কমিউনিজমে চূড়ান্ত বিশ্বাস। কিন্তু সংসদীয় বা দলীয় রাজনীতির প্রতি চূড়ান্ত অবিশ্বাস। নিজের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত। পার্টিতে পাল্টা দলিল পেশ করছেন। যদিও সে দলিল কয়েকটা পর্বে ছাপা হয়েছিল ‘কালান্তরে’। মান্যতা পায়নি। সিপিআই পার্টিতে রেজিকনেশন। আজন্ম পার্টি করা একটা মানুষ, হঠাৎ পার্টিহীন। কিন্তু কোনদিন মানুষটাকে হতাশ হতে দেখিনি। বা হতাশা শব্দটার সঙ্গে মানুষটার কোনদিন আলাপ হয়নি।
আমাদের নিয়ে, সাহিত্য — নাটক নিয়ে মেতে থাকছেন। নতুন ধরণের সাহিত্য পাঠ করছেন। আমাদের পড়াচ্ছেন। হাবিব তনবিরের ‘চরণদাস চোর’ নান্দীকারের ‘ফুটবল’। নিজের পয়সায় টিকিট কেটে আমাদের নিয়ে চলেছেন। গিরিশ মঞ্চে। বা আকাদেমিতে। নাটক শেষে রাত্রিবেলা হেঁটে হাওড়া স্টেশন। আমাদের সমবেত কন্ঠে ‘উই শাল ওভার কাম’।
১৯৯১। সোভিয়েত রাশিয়ার পতন। গ্লাসানস্ত। গৌরীদা আমাকে নিয়ে কোন আড্ডায়। গুমড়ে কাঁদছেন। কারণ কথায় কথায় সোভিয়েত রাশিয়ার উদাহরণ ছিল মানুষটার সহজাত। ভীষণ স্যাটিলপন্থী। তাঁর হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীটা আমি দেখছি।
মানুষটা কনফিউজড।
আমাদের ‘মনন’ আমার নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় ‘শোকমিছিল’ খিঁচা কবলা সমাচার ‘সমান্তরাল’। ভেঙে গেল।
‘জাগর’ মৃত।
চায়ের দোকানের আড্ডার ঠেক বদল করতে করতে বাগনান হাই স্কুলের পাশে ভ্রমরদার দোকান।
তখন আড্ডায় অশোক, সাহাবুদ্দিন, মনিরুল, জগন্নাথ, মতিনদা, পার্থ মাইতি। গৌরীদার কখনো কম বয়েসী বন্ধু পাওয়ার অভাব ছিল না। নিজের বয়েসী মানুষদের সঙ্গে মিশতে ভীষণ অপছন্দ। বলতেন, আমার বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভীষণ ঘৃণা করি। রোগ আর পরচর্চা ছাড়া এদের কোন কথা নেই।
আমার প্রথম ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘সীতাকাহিনী’। ২০০২। নন্দন-২। হাঁটুতে ব্যথা নিয়ে দেখতে গেলেন। ছবি শেষ। আমি সাংবাদিকদের মিট করছি। গৌরীদাকে খুঁজছি। নেই।
বাগনানের চায়ের দোকানে, ছবিটা কেমন লাগল বললেন না তো?
খুব ভালো ছবি করেছিস তুই। অবাক লেগেছে। কত বড় হয়ে গেলি।
আপনিই তো আমাকে বড় করেছেন।
ধুস। কেউ কাউকে বড় করতে পারেনা। যার খিদে থাকে, সে নিজের মত বড় হয়ে যায় একদিন। আমি শুধু পৃথিবীটাকে দেখার ধারণাটুকু ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করি।
কিন্তু আমি তো আপনাকে গুরু বলে মানি।
গৌরীদার মুচকি হাসি।
সিনেমাটিনেমা আমি বুঝি না। এবার নতুন গুরু ধর।
আমাদের বয়স বারছিল। অনেকের সংসার, জীবিকা নিয়ে আড্ডার সময় কমে আসছিল। কিন্তু গৌরীদা তাঁর অভিজ্ঞানগুলো নতুন রক্তের ভেতর সঞ্চালিত করার অনুরাগের তাড়নায় আবার ফুটন্ত বয়সদের খুঁজে নিতেন।
গৌরীদার বয়স কোনদিন বাড়ত না।
আজীবন যৌবন লালিত একটা মানুষ। লিবারেশন পার্টিতে সংযুক্ত হয়েও দিশাহারা। তবু কাঁধের ঝোলাতে লিবারেশনের মুখপত্র নিয়ে সাইকেলিং করে পরিচিত মানুষদের দরজায় দরজায় ফেরি করে বেড়াতেন।
২০০৪। হঠাৎ আমার মাথায় উলুবেড়িয়া সাবডিভিশন ফিল্মফেস্টিভ্যাল করার আইডিয়া। গৌরীদা আর আফসারদাকে বললাম। গৌরীদার আবার কাঁধে ব্যাগ। মিটিং। সন্দীপ চ্যাটার্জীর পরামর্শ। এবং আন্তরিক বন্ধুত্ব। তৈরি হয়ে গেল প্রস্তুতি।
জুটে গেল অনেক মানুষ। আমার বড়দা দেবু মিদ্যা, মতিনদা, প্রদীপদা, বিমলদা, জয়ন্ত মন্ডল, তাপসদা-সহ আমরা সবাই। এবং উলুবেড়িয়ার আরো গুনী মানুষজন।
উলুবেড়িয়া রবীন্দ্রভবন। তিন দিনের উৎসব। উদ্বোধন করলেন মৃণাল সেন।
অথচ গৌরীদার সঙ্গে কোনদিন সিনেমার নিবিড় কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু যে কোন সৃজনশীল কর্মকান্ড মানুষটাকে ভেতর থেকে প্রাণিত করত। উত্তেজিত রাখত। অক্লান্ত পরিশ্রম করতে পারতেন। যে কোন মিটিং-এর আগেই উপস্থিত। আজীবন মিটিং-এর সময় নিয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে।
বার্ধক্যজনিত কারণে গৌরীদা নিজের তিনতলায় দীর্ঘদিন ঘরবন্দী। মাঝে মাঝে যেতাম। পাশের বিছানায় অসুস্থ বউদি। ফোনে কথা হত।
গৌরীদা চোখের দৃষ্টি আবছা। তবু বিছানায় একটা খোলা বই। আমি গেলেই নতুন কী বই পড়েছি, খুঁটিয়ে প্রশ্ন। কী নতুন সিনেমা করেছি, জিজ্ঞাসা। আমি আমার ল্যাপটপে হেডফোন-সহ আমার সিনেমা দেখাতাম।
কি আত্মনিষ্ঠ দেখবার অনুভূতি। যেন তখনো বিকেল ফুরোয়নি মানুষটার।
৮ জানুয়ারি, বিকাল ৫.১৫। নক্ষত্র হয়ে যাবার এক সপ্তাহ আগেও ফোনে কথা হয়েছিল। বলেছিলেন, মাস্ক পড়ে আসবি। আমার ঘরে যতক্ষণ থাকবি, খোলা যাবে না কিন্তু।
যাওয়ার আগেই ঘণ্টা বেজে গেল।
পরলোক কেমন দেখতে জানি না। বা যে কোন লোকেই গৌরীদা থাকুন, নিশ্চয় সেই আশ্চর্য আধুনিকতা দেখার দূরবীনটা ঝোলায় নিয়ে গেছেন।
ছবি: জগন্নাথ চৌধুরী।
গৌরী দা সত্যি তাঁর ঝোলায় নিয়ে চলে গেছেন আমাদের