সাহিত্যসৃষ্টি এবং সাংবাদিকতা— এই দুটি বিষয়েই গৌরকিশোর ঘোষ ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ। এক দিকে তিনি যেমন ‘সাগিনা মাহাতো’, ‘আমরা যেখানে’, ‘বাঘবন্দি’, ‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী হা হা’ প্রভৃতি অসামান্য গল্পগ্রন্থের রচয়িতা, তেমনই ‘প্রেম নেই’-এর মতো উপন্যাস, ‘রূপদর্শীর নক্সা’-র মতো রঙ্গব্যঙ্গ রচনাতেও তিনি সমান পারদর্শী।
গৌরকিশোর ঘোষের জন্ম যশোহর জেলায়, ৫ আষাঢ় ১৩৩০, ২২ জুন, ১৯২৩। হাতেখড়ি শ্রীহট্ট জেলার এক চা-বাগানে। স্কুলের দরজা পার হন নবদ্বীপে। ১৯৪৫ সালে আই এস সি পাস করেন।
১৯৪১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি ক্রমাগত পেশা বদলেছেন। প্রাইভেট টিউটর, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, খালাসি, রেস্তোরাঁর বয়, ট্রেড ইউনিয়ন অর্গানাইজার, ইস্কুলমাস্টার থেকে ভ্রাম্যমাণ নৃত্য সম্প্রদায়র ম্যানেজার, ল্যান্ডকাস্টমস ক্লিয়ারিং কেরানি, প্রুফ রিডার। পরে কলকাতার একাধিক বিখ্যাত সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন।
তিনি সম্মানিত হয়েছেন বহু পুরস্কারে। উল্লেখযোগ্য আনন্দ পুরস্কার (১৯৭০), কো জয় উক স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৬), খো জাই স্মৃতি-পুরস্কার (১৯৭৮), ম্যাগসেসে পুরস্কার (১৯৮১) এবং বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৮২)।

১৯৭৫ সালের ২৫ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। অভ্যন্তরীণ গোলযোগের জন্যে সংবিধানের ৩৫২ (২) ধারামতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। বিনা বিচারে আটক করার আইন মিসা জারি করা হয়। প্রেস সেন্সরশিপ চালু করা হয়। আকাশবাণীর সম্প্রচার থেকে বহু বিষয় ছাঁটাই হতো। এমনকী রবীন্দ্রনাথের লেখার অংশও কেটে বাদ দেওয়া হতো। জ্যোতির্ময় দত্ত সম্পাদিত ‘কলকাতা’ পত্রিকায় গৌরবাবুর একটি ঐতিহাসিক লেখা বেরোয়। এই লেখায় এক কিশোরকে তার বাবা চিঠি লিখছেন। সেই লেখার কিছুটা আমরা উদ্ধৃত করছি- ‘এই দেশে গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়েছে। এখন গোটা দেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়েছে। চার পাশে শুধুই সন্ত্রাস। আমাদের শিরদাঁড়াগুলো খুলে নিতে চাইছে। যাতে বুকে হাঁটতে আর আমাদের কষ্ট না হয়। পুরো সমাজটাকে টিকটিকি-আরশোলায় ভরে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে’। আরেকটি লেখায় তিনি লেখেন, ‘বিবেক-বিবেচনা বিসর্জনের প্রহর এখন। মানুষকে এখন শুধু বেঁচে থাকতে হবে। প্রতিবাদ না করার মধ্যে মানুষের অসহায়তাই প্রকাশ হয় না, বরং তার সব কিছু বিসর্জন দেওয়ার নিদর্শন পাওয়া যায়। মাথা তুলতে সাহস পাই না কেউ। খাচ্ছি দাচ্ছি সিনেমা দেখছি, আর চায়ের দোকানে জাঁকিয়ে বসে রাজা-উজির মারছি। ঘরের অন্ধকারে রমণ করছি’।
গৌরকিশোর তখন থাকতেন পাইকপাড়ার সরকারি আবাসনে একটি ছোট ফ্ল্যাটে। বিশাল পুলিশবাহিনী সেই বাড়ি ঘিরে ফেলে। একজন লেখককে গ্রেফতার করতে এত বড়ো পুলিশবাহিনী কেন হাজির হয়েছিল, এটা আজও বড়ো প্রশ্ন। অথচ তাঁর পাইকপাড়ার বাসায় মুখ্যমন্ত্রী-সহ রাজ্যের তাবড়ো মন্ত্রীরা মাঝে মাঝেই যেতেন। গৌরবাবুকে পার্ক স্ট্রিট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে লক-আপে রাখা হয়। তিনি মামলা করে রাজবন্দির মর্যাদা আদায় করেন।
জ্যোতির্ময় দত্ত বলেছেন- গৌরবাবু আসলে হয়ে উঠেছিলেন সে সময়ের সমস্ত সাংবাদিক, কবি লেখক প্রভৃতি সকলের ‘প্রতিবাদী প্রতিনিধি’। বিখ্যাত কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এই কথাটাই একটি অনুষ্ঠানে শ্রীমতী গান্ধীর মুখের ওপর বলেছিলেন। গৌরবাবুর ‘আমাকে বলতে দাও’ এবং ইংরিজিতে ‘লেট মি হ্যাভ মাই সে’ বই দুটিও নিষিদ্ধ করা হয়।
আশ্চর্যের কথা, গৌরবাবুকে কংগ্রেস বলতো বামপন্থী, বামপন্থীরা অনেকেই বলতেন আমেরিকার গুপ্তচর আর নকশালপন্থীদের এক অংশ তাঁর মুণ্ডু কাটার ফরমান জারি করেছিল। গৌরবাবুর মতো একজন বড়ো লেখকের এটাই বোধহয় নিয়তি।