“আজ কি একটু আসতে পারবি, তোর যখন সময় হবে। আমি বাড়িতেই আছি সারাদিন।”
গত ৩০শে অক্টোবর সোমবার গৌতমদার আমায় পাঠানো এটাই শেষ এসএমএস…
আমার উত্তর ছিলো….”আজ নয় শুক্রবার রাতে যাবো।”
আর সেই শুক্রবারই তুমি চলে গেলে।
জানো সেইদিন সকালেই চৈতীর (গৌতমদার স্ত্রী) সঙ্গে কথা হলো ওকেও বলেছিলাম, “আজ সন্ধায় যাবো।”
ঠিক তার পরেই কথা হলো তোমার রক্তকরবীর নন্দিনী চৈতীর সঙ্গে। ওকেও বললাম, “আজ যাচ্ছি গৌতমদার বাড়ি। রক্তকরবী নিয়ে সব কথা বলবো। এই ভাবে চলতে পারেনা (বেশ রাগ দেখিয়ে)।”
কিছুক্ষন পর চৈতীর এসএমএস…”ক্রিটিক্যাল, আমরা হার্ট ক্লিনিক যাচ্ছি।” কে জানতো তুমি একটু পরেই আর থাকবে না।
দৌড়ে রিক্সা ধরে পৌঁছে দেখি তখনও তোমার অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছয়নি। ঠিক চার মিনিট পর তুমি এলে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামার সময় তোমার বোজা চোখ দেখে তখনও বুঝিনি এই চোখ আর খুলবে না। ইমারজেন্সি রুমে ঢুকিয়ে দু-মিনিট পর তোমায় ইমারজেন্সি থেকে লিফটে উঠিয়ে ওপরে নিয়ে গেলো। আমাদের বললো পরিবারের কেও এখন আসবেন না। আমি, রাই, চৈতী থেমে গেলাম। সোমাভো আমাদের ঘনিষ্ট ও-ই উঠে গেলো।
আমরা তখনও জানি তুমি আমাদের ছেড়ে যেতেই পারো না। চৈতী অফিসিয়ালি টাকা জমা ফর্ম ফিলাপ করছে। মিনিট দশেক পর ইমার্জেন্সির ডাক্তার নেমে এলো। আমি ওনার পিছু নিলাম। ঘরে ঢুকে তোমার কথা বলতে, “উনি বললেন আপনারা পরিবারের লোক অপেক্ষা করুন। আমরা সব রকম চেষ্টা করছি।”
আমি বললাম, “ডক্টর আমি পরিবারের লোক নই। আমি পাশে থাকি আসলে ওনাদের কেউ নেই। আমি জানলে সুবিধা হত।”
ডক্টর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখুন উনি আর নেই। কিন্তু ওপরে সব রকম চেষ্টা করা হচ্ছে।”

আমি চুপ করে একটু দূরে সরে গিয়ে বসলাম। কিরকম একটা অদ্ভুত লাগছে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচল যেন। ভাবছি সত্যি গৌতমদা তুমি এই ভাবে চলে গেলে। ঘটনা এইটুকু। আমার দেখা চোখ বন্ধ গৌতমদা আর ফিরলো না। জানেন এর পর আর গৌতমদার মুখ আমি দেখিনি। শ্মশানেও না। গৌতমদা তুমি চিরকাল আমার কাছে জীবিত মানুষ।
তুমি নেই। জীবন থেমে নেই। আমরা কোন কিছুই বাদ দিচ্ছি না। কাজ করছি, খাচ্ছি, অফিস করছি। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য যা যা করার সব করছি। কিন্তু কোথাও যেন একটা তাল কেটে যাচ্ছে বার বার।
এখন দু’বেলা তোমার বাড়িতে যাই চৈতি, রাই-এর সঙ্গে কথা বলতে। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি দেখি কত চেনা অচেনা লোক এখনও তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছে। তোমার কথা বলছে। আমি তাদের দেখে ভাবি, কত লোকের মনের ভেতরে মৌমাছির চাকের মত ছোট ছোট বাসা করে গেছো তুমি… তা আগে বুঝিনি। জানো তোমার চলে যাওয়াটা আমার মনের ভেতরে একটা দগদগে ঘা হয়ে গেল। যা আর সারবে না।
প্রায় ২৪ বছর ধরে তোমার সঙ্গ পেয়েছি। আমার আবদার ভালোলাগা ঝগড়া অভিমান সব তোমাকে ঘিরে থাকতো। ফিরতে রাত হলে নিবেদিতা পিকুকে বলতো, “দেখ তোর বাবা গৌতমদার বাড়িতে বসে আছে।” …সত্যিই তাই, আমার আর কেউ রইলো না যার সাথে দু-দণ্ড বসতে পারি। দুটো কথা বলতে পারি।
বহুবছর ধরে কোনো বিশেষ কাজ কিংবা কলকাতার বাইরে থাকা ছাড়া রবিবার সকালে বাজারের থলি বাড়িতে রেখেই হেঁটে হেঁটে তোমার বাড়ি যাওয়াটা আমার রুটিনের মধ্যে ছিলো। আমি সাধারণ, পড়াশোনার প্রায় মূর্খ একটি মানুষ। তাই তোমার প্রাজ্ঞতা বুঝতে পারিনি। তোমার জ্ঞানের গভীরতা মাপার ক্ষমতাও আমার নেই। কিন্তু বহু বহু গুণে তোমাকে পেয়েছি মাতা পিতাসম বড়ো দাদার মতন। তোমার কাছে কিছুক্ষন কাটানো মানেই মানুষ হিসাবে আর একটু উত্তরণ হওয়া।
তোমার বাড়িতে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রেসিডেন্ট অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার থেকে শুরু করে রাগ সঙ্গীতের কে নেই যাঁর দ্বারা তুমি পুরস্কৃত হওনি। ভাবা যায় ভারতবর্ষের চারজন প্রেসিডেন্ট দিল্লিতে তোমায় জাতীয় পুরস্কার তুলে দিচ্ছে!! কিন্তু দেখে অবাক হতাম তোমার এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আসলে এসব তোমাকে ছুঁত না। তোমার সারাজীবনের যাপনই আসলে তোমার পুরস্কার।
তোমার বাড়িতে একটা ছবি আছে চৈতি আর তোমার বিয়েতে রেজিস্ট্রি করার সময় বিশিষ্ট নাট্যকার কিংবদন্তি অভিনেতা শম্ভু মিত্র সাক্ষী হিসেবে বসে আছে। কি যে ভালো ছবিটা … যেমন চৈতি তেমনি তুমি।
তোমার সঙ্গে দেখা করতে যখন যেতাম বেশিরভাগ সময়ই তুমি কিছু না কিছু কাজের মধ্যে থাকতে। হয় দোতলার ঘরে বসে তুমি মালা গাঁথছো। সামনে ঝুড়ি ঝুড়ি ফুল। এত মোটা মালা এবং এত সুন্দর আমি দেখিনি। আবার কখনো আচার তৈরি করছো। ইদানিং অবশ্য রক্তকরবী নিয়েই ব্যস্ত ছিলে। কোনদিন মাথার মুকুট বানাচ্ছ, কখনও ড্রেসগুলো সব উল সুতো দিয়ে ঠিক করছো। তোমার সব কাজ তুমি করতে বলে আমি ঝগড়া করতাম।
লকডাউনে আমার একটি কাজ নিয়মিত ছিলো তোমায় পান কিনে দিয়ে আসা। তোমার পানের আবদারে আমি জেরবার হয়ে যেতাম। কিন্তু তুমি সেসব পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞাসা করতে, “কি খাবি বল?”
আমি লোভী মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে যা খেতে ইচ্ছে হতো বলতাম। উপর থেকে খুব জোরে চিৎকার করে লতাকে ডেকে খাবার করার কথা বলতে। পোস্ত, হাঁসের ডিম, আলু পেঁয়াজ ভাজা, মুগ ডাল এই খাওয়াটা তোমার থেকেই শেখা। কত খাওয়ার আবদার আমি তোমার কাছে করতাম।

মনে আছে, তোমার বাড়িতে পোস্ত বাটা খেয়ে এতটাই ভালো লেগেছিলো যে কোথা থেকে কিনেছো জানতে চাইলে বললে ওই পোস্ত তুমি নাকি বড়বাজারের ভিতরে এক দোকান থেকে আনো। আমি তো থ। সল্টলেক থেকে তুমি বড়বাজারে পোস্ত কিনতে যাও!!
পরে দেখলাম, সারা কলকাতার জুড়ে তোমার বাজার করার শখ। তোমার গাড়ির পেছনে একটা গামলা থাকতো। তুমি ছাড়া আমি কাউকে দেখিনি মাছ কিনতে গাড়িতে গামলা রাখতে। কোথায় মানিকতলা শোভাবাজার পোস্তা ঘুরে ঘুরে এক একটা জিনিস কিনতে। উফফফ বাজারের কী ঘটা। এই আজব বাজারে দু’তিনবার তোমার সঙ্গ নেওয়ার পর আর যেতাম না। এক বাজারে ইলিশ তো আর এক জায়গায় কই আবার মৃগেল কিনতে অন্য বাজার। আমি হাল ছেড়ে দিতাম।
তোমার চলে যাওয়া কলকাতার সাংস্কৃতিক জগতের মানুষদের কাছে সত্যি খুবই খারাপ একটি সংবাদ। ব্রাত্য, দেবশঙ্কর, সৌমিত্রদা, রুদ্রদা, ঋতুপর্ণা, সরকারি সব ফ্রন্টের আফশোস দেখে বুঝেছি তুমি আসলে ঠিক কোন উচ্চতায় বসত করতে!!
সেদিন কাশি মিত্র ঘাটে একদম অন্তিম মুহূর্তে অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, মেনল্যান্ড চায়না এই মুহূর্তে রেস্তোরার কিং মালিক অঞ্জন বন্দোপাধ্যায় প্রায় ছুটতে ছুটতে এলো তোমায় দেখতে। ঋতু তোমার কথা বলতে গিয়ে দেখলাম কালো গগলস এর ভিতর থেকে জল পড়ছে।
পরদিন সকালে আমান, আয়ান এসে চুপ করে বসেছিল। ওদের চোখেও জল। সন্ধ্যায় প্রতুলদা অনেকক্ষন বসে থেকে বললো, “চৈতী আমি গৌতমের জন্য একটা গান করি।” গানের শেষে আমাদের চোখে জল। সবথেকে অবাক হয়েছি বিদ্যা বালানের ছুটে আসা দেখে….গুরুদক্ষিণা বোধহয় একেই বলে।
গৌতমদা, কি বিশালতায় তুমি রয়ে গেলে!! তোমার তৈরি সেই আকাশে আমরা পৌঁছতেই পারলাম না। শুধু দেখেই গেলাম মাথা উঁচু করে। নিজের জীবনকে এমন একটা সুরে বেঁধে রাখলে। আমরা শুনলাম দেখলাম বোঝার চেষ্টা কিছুটা করলেও তোমায় ছুঁতে পারলাম না। আমরা সবাই চুপ করে এবার তোমায় বোঝার চেষ্টা করছি।
ইদানিং তোমার ওপর খুব রাগ হতো। তুমি কিরকম একটু এলোমেলো হয়ে গেছিলে। জানতাম ভাবনার সঙ্গে তাল মেলানোর মত তোমার আর্থিক সহায়তা নেই বলেই তুমি পিছিয়ে যাচ্ছ শিল্পের প্রতিযোগিতায়। যা তুমি মুখে স্বীকার না করলেও কষ্ট পেতে। তাছাড়া তোমার সুগারের জন্য শরীর টলমল করতো। কিন্তু তোমার শরীর খারাপ হলেও আমার রাগ হতো। মনে হত সারাজীবন রাজার মত হৃদয়ের তুমি এখন পিছু হটলে হবে। আমাদের ধারণ করবে কে?

আসলে তুমি আমাদের মতো একটুও ধান্দাবাজ হতে পারলে না। এক রক্তকরবী করতে গিয়ে লক্ষ টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়ে ধার শোধ করছো। কিন্তু আর্টিস্টদের টাকা দিয়ে দিতে। ফিল্ম ফেস্টিভালে মতি নন্দীর উপন্যাস অবলম্বনে রাখি গুলজারের শেষ বাংলা ছবি ‘নির্বাণ’ দেশে এবং বিদেশে উচ্চ প্রশংসিত হয়েও এখনও রিলিজ করতে পারোনি। সেই তুমি নাকি বিদ্যা বালানকে স্ক্রিপ্ট শুনিয়ে বলেছো ফিল্ম করবে। কি সাহস তোমার। এইযে তোমার সমালোচনা করছি এটাও তো তোমারই শেখানো। কত ঋণ দিয়ে চলে গেলে আমায়…
যেখানে যা হত আমি তোমার কাছে গিয়ে গল্প করতাম। তুমি হঠাৎ একদিন বললে, “অশোক আমি একটা সিনেমা করব। সেখানে তোর এই গল্প গুলো থাকবে।”
আমি হেসে বললাম “কি বায়োপিক?”
তুমি বললে “এত কথা আমি বলবো না। তুই জানিস না কত সহজ সরল ভাবে যে কথাগুলো বলিস সেগুলোর কত অন্তর্নিহিত মানে রয়েছে।”
কত সুন্দর করে কত কথা বলতে। আমাকে এমন করে বোঝানোর মত লোকটিও আর থাকলো না।
“প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে।
ভয়-ভাবনার বাঁধা টুটেছে।।
দুঃখ কে আজ কঠিন বলে…
জড়িয়ে ধরতে বুকের তলে…
উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে।”
আমি ভাবছিলাম কতো মানুষ আসছে কাঁদছে তুমি কত মহান এটাও বলছে। স্মরণসভা তো এখনও অবধি বোধহয় এক ডজন ছুঁয়ে ফেলেছে। ভালো খুব ভালো। কিন্তু লাস্ট আট বছর তুমি একা হয়ে যাচ্ছিলে। আমি সেসব কথা বলে অভিযোগ করতাম। কিন্তু তুমি বলতে, “দেখ আমার পুরানো বন্ধুরা খুব ব্যাস্ত, কতো ভালো ভালো কাজ করছে। ওরা আমায় খুব ভালোবাসে।”
আমি বলতাম, “ঘণ্টা বাসে।”
জানতাম তুমিও সত্যটা জানতে। তবুও কি অদ্ভুত তোমার মানুষের প্রতি ভালোবাসা। ভরসা বিশ্বাস। কখনও কারো বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করোনি। শুধু, “ছাড় না”… বলে উড়িয়ে দিতে। এই রাজার মত হৃদয় কিভাবে লালন করতে সেকথা তুমি বলেও গেলে গৌতমদা।
সুগারে একটু কাবু হয়ে গেলেও কিন্তু তার ভেতরে আবার রক্তকরবী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরলে। আমরাও তোমার উদ্দম দেখে নেমে পড়লাম। কোন শিল্পীকে তুমি বাদ দিতে চাইতে না। সব সময় বলতে, “দাঁড়া না, আমি ঠিক করিয়ে নেব।”
আমাদের খুব রাগ হত। কিন্তু শো এর দিন দেখতাম সেই শিল্পী নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে। রক্তকরবীর সবচেয়ে কঠিন রোল বিশু। সে নিঃসন্দেহে ভালো গান গায়। কিন্তু তুমি যেভাবে রিহার্স করিয়েছো আমরা দেখে অবাক হয়ে যেতাম।
জানতাম, রক্তকরবী করার জন্য তুমি অনেক ধার করেছ। দলের সবাই এ কথা জেনেছিল। তাই চেষ্টা করতাম পরে হলেও তোমার টাকাটা কালেকশন করে দিতে। কিছু দিতে পারলেও এখনও কত টাকা পাও। আমি অভিনয়ের টাকা নিতাম না বলে তুমি বাড়িতে যেটা কিনে দিয়ে যেতে ওই টাকার চেয়েও দামি। টাকা মাটি মাটি টাকা ঠাকুরের এই কথাটা এক মাত্র তুমি উদাহরণ।

আলাপের প্রথম দিকে একবার তোমার গান শুনেছিলাম। তারপর বিভিন্ন জন্মদিন কিংবা অন্যান্য পার্টিতে দেখতাম সুনীলদা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তসলিমা নাসরিন, দেবশঙ্কর হালদার কতো মানুষ অনুরোধ করত তোমায় গান করার। তুমি দাঁড়িয়ে গান করতে। সে কি গলা তোমার… আমার নেশা ছুটে যেত। বাড়ি ফিরে আবার আমি তোমায় অনুরোধ করতাম একটা গান শোনাওনা কোনদিন না করনি। চৈতি নিজেও খুব ভালো গান করে ও তোমার সঙ্গে হারমোনিয়ামে সঙ্গ দিতো।
তাইতো তোমার একক অনুষ্ঠানে প্রবাদ প্রতিম শিল্পী সুচিত্রা মিত্র বলেছিলেন, “জর্জদার পর এরকম পুরুষালি কণ্ঠে গান বহুদিন পর শুনলাম।”
বহু মানুষ বলেছিল তুমি যদি গান নিয়েই পড়ে থাকতে, তাহলেও অনেক বড় সংগীত শিল্পী হতে পারতে তোমার এই অসংখ্য গুনের কথা একবার লিখে শেষ করা যাবে না।
এসব তো তোমার শিল্পগুন, কিন্তু তোমার দ্বারা যে কত মানুষ নীরবে উপকৃত হয়েছে তা তুমি চলে যাবার পর দেখলাম। যার জন্য দেবশঙ্কর, বিল্টু, সুরজিৎ, সেদিন ক্যামেরায় বলছিল, ” নাটক করতে গিয়ে দেখেছিলাম অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াও লাইট ক্যামেরা হলের কর্মচারীর প্রত্যেকের সঙ্গে গৌতমদার ভালবাসা জড়িয়ে থাকতো। তারা ভরসা করতো বিপদে আপদে তোমায় পাশে পেতে।”
তুমি অসম্ভব ধার্মিক মানুষ ছিলে। বাড়ির নিচে রামকৃষ্ণ-সহ হেনো কোন ঠাকুর নেই যা তোমার ঘরে ছিলো না। সব পুজো করতে। এমনকি বেশ বড় একটা রথ বের করতে। অথচ বলতে, “একেবারে টাকা নেই বুঝলি। কিন্তু রথ তো বের করতেই হবে।”
আমি বলতাম, “ধুর ছেড়ে দাও বাড়িতে পুজো করো।”
ও বাবা পরের দিন দেখি বিশাল রথ তৈরি হচ্ছে। আমি বলতাম, “অর্থ কোথায় পেলে?”
তোমার উত্তর, “মা যুগিয়ে দিলেন।”
তোমার মুখে এই মা কথাটা এক ঠাকুর ঘরে শুনতাম আর দোতলায় তোমার মেয়েকে মা বলে ডাকতে তুমি। সেই মা (রাই) রাতারাতি অনেক বড়ো হয়ে গেছে। ওর চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আমার বোন তোমার বউ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেও পারছে না। জানো আমায় জীবনে চৈতী একমাত্র ভাইফোঁটা দেয়। তোমার জন্য এবার ফোঁটা মিস হলো। খুব পাজি। বাজে তুমি। যন্ত্রের মতো চলে গেলে। একটুও বুঝতে দিলে না। বেশ দেখালে বটে।
যাক শোনো তোমার রক্তকরবীর পরিবার তোমার দেখানো পথে আবার অনেকগুলো কল শো পেয়েছি। সবাই তোমাকে ভীষণভাবে প্রতিনিয়ত অনুভব করছি। আমি জানি তুমি যা বলেছিলে তার ৫০ শতাংশ আমরা করতে পারিনি। কিন্তু কথা দিচ্ছি আমরা তা ১০০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।
সৌমিত্র মিত্রের পূর্ব পশ্চিম, আর বিজয় লক্ষ্মীদির শিশিক্ষু, এছাড়াও সব নাটকের দল একসঙ্গে তোমার একটা স্মরণসভা করছে ২৮ শে নভেম্বর মধুসূদন মঞ্চে। সেদিন তোমার পরিচালনার রক্তকরবী অভিনয় করবো আমরা। ব্রাত্য বসু, দেবশঙ্কর হালদার, সৌমিত্র মিত্র, বিজয় লক্ষ্মী বর্মন, শুভাদা, টেকনোর সত্যম, প্রতুলদা সবাই তোমার রক্তকরবীর পাশে আছে।

থার্ড বেল বাজার আগে পর্দার ভিতরে রক্তকরবীর সবাই তোমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতো।এবার থেকে আমরা তোমার ছবিতে প্রণাম করবো। এই কষ্ট আমরা সবাই পাবো তুমি কি করে বুঝবে। গরুর লেজ ধরে বৈতরণী পার করে চলে গেলে। আমাদের কথা একবারও ভাবলে না। তোমার রক্তকরবী করে আমরা তোমায় ভাবাবো। কি মজা তুমি আমাদের মাথায় হাত দিয়ে বলতে পারবে না। কি ভালো করলি। দারুন হয়েছে। আমি জানি তুমি শুধু রক্তকরবী করেই শেষ দিকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখছিলে।
যাক শোনো আমি কিন্তু কান্নাকাটি করিনি। মা বলতেন আজ মরলে কাল দু-দিন। সবই চলছে স্বাভাবিকভাবে কিন্তু তুমি নেই এটা হারে হারে বুঝতে পারছি। এ-যে কতটা নির্মম অসহায়তা তা তুমি আর কি বুঝবে? সত্যি গৌতমদা, মা-বাবা চলে যাবার পর যে শূন্যতা এসেছিল সবকিছু তুমি ছাপিয়ে গেলে। বড়ো ক্লান্ত লাগছে। তুমি তো পৌঁছে গেছো তোমার জায়গায়। চিন্তা করো না। একদিন দেখা তো হবেই। তখন বুঝে নেবো হিসাব।
আমরা পরিস্থিতির স্বাভাবিকতায় প্রিয়জনের সঙ্গে কত ভালোমন্দ কথায় জড়াই। কিন্তু সে যখন চলে যায় তখনই পিছুটানে মনে হয় বাকি থেকে গেল কতকিছু… কিন্তু এটাই কালের নিয়ম। কঠিন সত্য। যা আমাদের এভাবেই ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়। গৌতমদাও সেই ব্যাক্তি যিনি আপন ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল এক অসামান্য শৈল্পিক মনের মানুষ। যাঁর স্নেহছায়ার সান্নিধ্য এই ছবিওয়ালা অশোক মজুমদার আমৃত্যু ভুলতে পারবে না।
প্রণাম নিও শুধু আমার না রক্তকরবী পরিবারের।
১১.১১.২০২৩
অসাধারণ লেখা। হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া স্মৃতিচারণ
এক কথায় অসাধারণ লেখা।