মৌমাছি পালন করে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ আছে। সরকারিভাবে বেকার যুবকদের মৌমাছি পালন করে স্বনির্ভর হতে সহায়তা করা হচ্ছে। রাজ্যের প্রতি ব্লকে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে যেমন আমরা মধু সংগ্রহ করে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারি, আবার খাঁচা কিংবা বাক্সের মধ্যে মৌমাছি চাষ করেও মধু পেতে পারি। বাজারে মধুর চাহিদা সবসময়ই থাকে। এমনকি বিদেশের বাজারেও এর চাহিদা লক্ষ্যনীয়। এই লাভজনক চাষে সরকারও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই বেকার যুবকরা মৌমাছি পালন করে কর্মসংস্থান নিজেরাই গড়ে তুলতে পারেন। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের সুযোগও আছে। এর জন্য ব্লকস্তরে মৌমাছি পালন করে আর্থিক চাহিদা মেটানোর জন্য সরকারও এগিয়ে এসেছে। অপরদিকে এই মধু বাইরে রপ্তানি করেও অর্থ আসতে পারে।

প্রসঙ্গত, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। আমাদের দেশের আবহাওয়ায় পরিবেশ অনুযায়ী মৌমাছি পালনের পক্ষে উপযুক্ত। রাজ্যে যে মৌমাছি পালন হয় সেগুলি আকারে ছোট, সাদা ডোরা কাটা সুবর্ণ উপযুক্ত। রাজ্যে যে রঙিন মৌমাছি পালন করা হয় সাধারণত এরা সমান্তরাল রুমে, গাছের গর্তে বাস করে। যেটা বেশি লক্ষ্য করা যায় সুন্দরবনে। এছাড়া রাজ্যের উত্তরবঙ্গ, জঙ্গল অধ্যুষিত এলাকায় গাছের মধ্যে বহু মৌমাছির বাস করতে দেখা যায়। কিন্তু বাগান বা বাড়ির ভিটে কিংবা চাষের খেতের পাশেই খাঁচা বা বাক্স তৈরি করে মৌমাছি চাষ শুরু হয়েছে।

উল্লেখ্য, আমরা প্রাকৃতিক উৎস থেকেই প্রচুর মধু সংগ্রহ করে থাকি। সাধারণত বাড়ির নিকটবর্তী গাছের কোঠরে বা ডালে হওয়া মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। এতে অনেক মৌমাছি মারা যায়। অসংখ্য বাচ্চা মৌমাছি ও ডিম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লক্ষ্যণীয়, আজকাল ফসলে চাষিরা অত্যাধিক পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করছেন। যার ফলে মৌমাছির সংখ্যাও ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। তাই ফাঁকা জায়গায় খামার, বাগান কিংবা পুরনো ভিটেতে বাক্স বা খাঁচা তৈরি করে মৌমাছি পালন করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিতে চাষ করে মধু উৎপাদন সম্ভব। এক্ষেত্রে দেখা যায় বাক্সের প্রায় সব মধু বের করা সম্ভব। প্রসঙ্গত, মধু খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়। তাছাড়া ওষুধ তৈরিতেও মধুর প্রয়োজন। মধু খুব পুষ্টিকর এবং বিভিন্ন ধরনের রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। সংগৃহীত মধু খুব তাজা ও বিশুদ্ধ। তাছাড়া প্রাকৃতিক ব্যবস্থা থেকে আমরা মোম পাই, কিন্তু আধুনিক চাষের ক্ষেত্রে মোম পাওয়া যায় না।

মোম সংগ্রহ করলে বাক্সের মধ্যে মধু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আধুনিক পদ্ধতিতে মধুচক্রটি অক্ষত থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে বাক্স বা খাঁচা থেকে একাধিকবার মধু সংগ্রহ করতে পারি। যেটা প্রাকৃতিক পরিবেশে গাছ থেকে সম্ভব নয়। আলু ওঠার পরই তিল বা সরষে চাষ হয়। এসময়টা মৌমাছি পালন উপযুক্ত সময়। এ সময় এরা এক ফুল থেকে অন্য দিকে সার্ফিং করার সময় এটি পরাগ-শস্য বহন করে। এই মৌমাছিরাই আবার উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তাই অনেক চাষিকে দেখা গিয়েছে ফসলের কাছাকাছি মৌমাছি পালনের বাক্স বা খাঁচা রাখতে। উদ্দেশ্য একদিকে ফুলে ফুলে ঘুরে মৌমাছি তার খাদ্য সহজে সংগ্রহ করতে পারে। অপরদিকে, খেতের কাছাকাছি মৌমাছির থাকার ব্যবস্থা হলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
প্রসঙ্গত, সরকারিভাবে মৌমাছি চাষ একটি ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। মৌমাছি পালনের জন্য প্রায় প্রতিটি ব্লকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। বেকার যুবকদের কাছে মৌমাছি পালনের চাষ লাভজনক। বহু বেকার যুবকও এগিয়ে এসেছেন। আয়ের উৎস বলা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মৌমাছি চাষে সঠিক পরিচর্যার কথা। ফাঁকা বাগান বা পুরনো ভিটেতে এই চাষ ভালো হয়। থাকতে হবে কাছাকাছি ফসলের জমি। যেখানে বাক্সটা রাখা হবে সেই স্থানটি অবশ্যই শুকনো, ছায়াযুক্ত, কাছাকাছি খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে হবে। সেই সঙ্গে বাক্সের কাছাকাছি কিছু ঋজু গাছ লাগাতে হবে। চাষের এলাকা দূষণ, শব্দ এবং ধোঁয়ার হাত থেকে মুক্ত রাখতে হবে। মৌমাছি চাষ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শত্রু ও রোগপোকার আক্রমণ হতেই পারে। ভেজা অবস্থায় মোম-যুক্ত দ্বারা মৌমাছি প্রভাবিত হয়। এই রোগগুলি স্পাইডার নেটের মতো লেয়ার দিয়ে আচ্ছাদিত। মধু দেখলেই তা পরিষ্কার বোঝা যাবে। অনেক সময় রোগ প্রতিরোধে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বাক্স বা খাঁচার দরজা রাতে বন্ধ এবং সকালে খুলতে হবে। মৌমাছির অন্য ক্ষতিকারক আর একটা রোগ হল— অ্যাকারিন। রোগাক্রান্ত মৌমাছি উইং ‘এ’-র মতো দেখায়। এই ধরনের রোগাক্রান্ত মৌমাছির পায়খানা হলুদ রঙের হয়। এমনকি রাণী মৌমাছি ডিম পাড়া বন্ধ করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, স্বল্প খরচে সঠিক লাভের মুখ দেখতে পাওয়া যায় মৌমাছি চাষে। এতে বহু বেকার ছেলেরা স্বনির্ভর হতে পারেন। বাড়ির বাগান, ছাদ, ফাঁকা মাঠে কাঠের বাক্স বা খাঁচা বানিয়ে রেখে সহজে চাষ সম্ভব। দেখা গিয়েছে প্রতিটি মৌমাছি বক্স থেকে ১০ কেজি মধু সংগ্রহ করা যেতেই পারে। এক্ষেত্রে একমাত্র দরকার সঠিক পরিচর্যা, তাহলেই বাণিজ্যিক ভাবে সফলতা আসবে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে কেবল সুন্দরবন। নয়, বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় মৌমাছি পালনের মাধ্যমে বহু বেকার যুবক এই চাষে এগিয়ে এসেছেন। দেশে মধু- মৌমাছির চাষ সাধারণত পাহাড়ি এলাকার মানুষের দ্বারা হয়ে থাকে। গুজরাট, জম্মু ও কাশ্মীর, দক্ষিণ রাজস্থান, পঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু ইত্যাদি রাজ্যে ব্যাপক হারে শুরু হয়েছে মধু-মৌমাছির চাষ। মধু সংগ্রহ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন সম্ভব হচ্ছে। দিনের দিন তা বাড়ছে এই চাষ।

এদিকে বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, মধু রক্ত ও ধমনী পরিষ্কার করে, গলার সংক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। শিশুদের মধু খাওয়ালে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। কাশি, ঠাণ্ডা, হজমের সমস্যা, চোখের রোগ, রক্তচাপ ইত্যাদি রোগের হাত থেকেও রেহাই মেলে। তাছাড়া ক্যানসার, হৃদরোগ, আলসার ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধ করে। এক কথায় সুস্বাস্থ্যের জন্য বাড়িতে মধু অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।