সম্প্রতি দেশের উচ্চ আদালত পঞ্জাব ও তামিলনাড়ুর রাজ্যপালকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছে। পঞ্জাবের সরকার উচ্চ আদালতে অভিযোগ জানায়, রাজ্যপাল বনোয়ারিলাল পুরোহিত বিধানসভায় পাশ হওয়া অন্তত ৭টি বিলে অনুমোদন না দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছেন। ওই বিলগুলি রাজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাজ্যপাল সেই বিল আটকে রাখায় প্রশাসনের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পঞ্জাব সরকারের নালিশের ভিত্তিতে দেশের উচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চ রাজ্যপালের জবাব তলব করেন, আদলত ধমকের সুরেই বলেন, “আপনি আগুন নিয়ে খেলছেন। আমাদের দেশ একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চলে। সেই পদ্ধতি মেনেই চলতে দিন।” আদালত রাজ্যপাল বনওয়ারিলাল পুরোহিতকে এও মনে করিয়ে দেয় যে বিধানসভায় পাশ হওয়া বিল দীর্ঘ দিন আটকে রাখা যায় না। সেই সঙ্গে আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করে, “পাঞ্জাবে যা হচ্ছে, তাতে আমরা একেবারেই খুশি নই”।
কেরল এবং তামিলনাড়ুর সরকারও রাজ্যপালের বিরুদ্ধে একই অভিযোগে মামলা করে। সেখানেও রাজ্যপালের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত চরমে উঠেছে বিধানসভা থেকে পাশ হয়ে আসা বিল রাজ্যপাল ঝুলিয়ে রেখেছেন বলে। কেরলের সিপিএম সরকার সর্বোচ্চ আদালতে অভিযোগ করে জানায়, রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খান সংবিধানের উল্টো পথে হেঁটে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিলে সম্মতি দেন নি, এর ফলে সরকারি কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। ওই বিলগুলি তিন বছরের বেশি সময় ধরে রাজভবনেই বন্দি পড়ে আছে। তিনটি বিলের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত বিল, মুখ্যমন্ত্রীকে লোকাউক্তের তদন্তের আওতায় বাইরে রাখার বিল এবং অন্য একটি বিল যেটি আটকে থাকায় সে রাজ্যের সমবায় ব্যবস্থা ক্ষতির মুখে পড়েছে। রাজ্যপালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকারের নালিশ, রাজ্যপাল পাশ হওয়া ১২টি বিলে সম্মতি না দিয়ে রাজভবনে আটকে রেখেছেন। অথচ সেগুলি তিনি বাতিলও করেননি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলি আটকে থাকায় রাজ্য সরকারের কাজকর্মে যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত এপ্রিল মাসেও তেলাঙ্গানাতেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সে রাজ্যের রাজ্যপাল তামিলিসাই সৌন্দরাজন বেশ কয়েকটি বিল সই না করে আটকে রাখেন। তার জেরে তেলাঙ্গানাতে সাংবিধানিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। ফলে তেলেঙ্গানার বিআরএস সরকার দেশের উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়। যদিও মামলার শুনানি শুরু হওয়ার আগেই রাজ্যপাল সৌন্দরাজন তিনটি বিলেই সই করে দেন। তাঁরা যে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন, বিধানসভায় পাশ হওয়া সিদ্ধান্তের উপরে খবরদারি করা যে তাঁদের শোভা পায় না, রাজ্যপালদের সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রতিটি অবিজেপি শাসিত রাজ্যে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের প্রতিনিধি রাজ্যপালদের সঙ্গে সংঘাত লেগেই রয়েছে। সেই সংঘাত মাত্রা ছাড়িয়ে দেশের উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ালে খোদ প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “রাজ্যপালদের সামান্য একটু আত্মানুসন্ধান করা জরুরি। তাঁদের মনে রাখতে হবে, রাজ্যপাল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন। বিধানসভা কোনও সিদ্ধান্ত নিলে তাকে গুরুত্ব দেওয়াটা জরুরি”। এই মন্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলিতে রাজ্যপালদের সঙ্গে সরকারের সংঘাত নতুন নয়। প্রসঙ্গত বাংলার একদা রাজ্যপাল জগদীপ ধনকডড়ের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত চরমে উঠেছিল। কিন্তু কেন এই সংঘাত বা দ্বন্দ্ব? আসলে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার অ-বিজেপি রাজ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করার যে প্রথা বা রীতি সেটা ভেঙে দেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। অ-সংবিধানিক ভাবে তারা রাজ্যপালকে দিয়ে সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, যাতে গণতান্ত্রিক পক্রিয়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। লোকসভা ভোটের সময় যত এগিয়ে আসছে তারা ততই কোমর বেঁধে মাঠে নামছে। বিরোধীদের বক্তব্য অনুসারে, লোকসভার আগে দলীয় স্তরে তো বটেই, প্রশাসনিক স্তরেও সংঘাত সৃষ্টি করতে বিজেপি কোনওরকম খামতি রাখতে চাইছে না। গত ফেব্রুয়ারি মাসেই কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার একযোগে ১২ রাজ্যের রাজ্যপাল বদল করেছে। তখন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, যে সব রাজ্যে বিজেপি ভোটে হেরেছে সেই সব রাজ্যে কেন্দ্র তথা মোদীর সরকার রাজ্যপালেদের এজেন্ট করে পাঠাচ্ছে। তারপর থেকেই দেখা যাচ্ছে রাজ্যপালেরা বিরোধি রাজ্যের সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি করে সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করছেন। রাজ্যপাল নিজের মনমত যা খুশি কি করতে পারেন? দেশের উচ্চ আদালতের মতানুযায়ী, বিধানসভা কোনও সিদ্ধান্ত নিলে তাকে গুরুত্ব দেওয়াটাই রাজ্যপালের উচিত কাজ। প্রসঙ্গত, বাংলার পরিস্থিতিটাও বেশ খানিকটা একই রকম। বিধানসভায় পাস হওয়া বহু বিল আটকে রেখেছেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে রাজ্য সরকারও। দেখার বিষয় দেশের উচ্চ আদালত সে বিষয়ে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।