শুধু বাঙালরাই ঝালের মাস্টার একথা একদমই ভুল। বাঁকুড়া, মেদিনীপুরের লঙ্কা তো নয় যেন “সাপের ছোবল”। এবার লঙ্কা খাওয়ায় ব্যাপারে পিছিয়ে নেই “নাসা”ও।
খাদ্যের জন্য স্পেস স্টেশনে প্যাকেজড ফুড পাঠায় নাসা। কেবল প্যাকেজড ফুডে নির্ভরশীল না হয়ে, কিছু সব্জি স্পেস স্টেশনে চাষ করার গবেষণা চলছিলো ২০১৫ সাল থেকেই। ১০টি সব্জি চাষও হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে লঙ্কা। লঙ্কা চাষ তুলনামূলকভাবে সহজ। নিজের থেকে পরাগমিলনও হয় লঙ্কা গাছে। জীবাণুর হামলা কম। তাই ১২টি প্রজাতির লঙ্কা মহাকাশে চাষ করার জন্য বেছে নেয় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার। সেই সাধের লঙ্কা কুচি দিয়ে মেক্সিকান ট্যাকো বানিয়ে রীতিমতো মহাভোজ করলো মহাকাশচারীরা। লঙ্কা চাষে আত্মনির্ভশীল নাসার ছবি দেখলো মর্ত্যবাসীরা।

বেশি লঙ্কা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, এমন ঘটনা বিগত কয়েক দশকে শোনা যায়নি। তবে লঙ্কার জন্মকথা নিয়ে নানান মুনির নানা মত। বেদে ঝাল লঙ্কার উল্লেখ পাওয়া যায় না। রামায়ণের লঙ্কা কাণ্ডের কথা পড়ে মনে হতেই পারে, লঙ্কা কোথা থেকে এসেছে তা তো নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। মনে রাখতে হবে, প্রাচীণ ভারতের জলবেষ্টিত ভূ-খন্ডকেই লঙ্কা বলা হতো। লঙ্কার অর্থ বিদেশ। “ষোলো শতকের শেষ দিকে উত্তর ভারতে বসে লেখা ‘আইন-ই-আকবরি’-তে চল্লিশটা পদের রান্নার বিবরণ দেওয়া আছে। কিন্তু তার কোনওটাতেই লঙ্কার নামগন্ধ নেই। সব পদেই গোলমরিচের ব্যবহারের কথা লেখা।”
সে যাই হোক লঙ্কার আদিভূমি বলিভিয়া — দক্ষিণ আমেরিকা। মাতৃ লঙ্কাটির নাম উলুপিকা। কলম্বাস এই লঙ্কা ইউরোপে নিয়ে আসেন। এরপর ‘পর্তুগিজরা পশ্চিম ব্রাজিল থেকে লঙ্কাকে প্রথমে পশ্চিম আফ্রিকায় এবং পরে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে গোয়ায় নিয়ে আসেন। সেখান থেকেই লঙ্কার সর্ব ভারত বিজয়।’ পারানামবুফো থেকে এসেছিল বলে, এর প্রথম নাম হয় পারানামবুফো পেপার। ভারতবর্ষ প্রকৃতই সোনার দেশ। এখানে লঙ্কা ও গোলমরিচ দুটোই পাওয়া যায়।

“লঙ্কার এই ভারতবিজয়ের পুরো কৃতিত্ব দাবি করতে পারে পর্তুগিজরা। কারণ ওদের হাত ধরেই তো লঙ্কা এ দেশে পৌঁছেছিল। তার প্রমাণ হল, মুম্বই বাজার। সেখানে লঙ্কাকে ‘গোয়াই মিরচি’ বলা হত কয়েক দশক আগেও। পর্তুগিজরা শুধু এ দেশের লোককে লঙ্কার স্বাদ চাখিয়ে ক্ষান্ত থাকেনি। পর্তুগিজ যাজকরা ১৫৪২-এ জাপানে আসেন। সঙ্গে আসে লঙ্কা। তার পর কোরিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যান তারা। বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী পর্তুগিজরা আঁচ করেছিল যে, আগামীদিনে লঙ্কা গোলমরিচকে কোণঠাসা করে দেবে। সারা বিশ্বের রান্নাঘর কুক্ষিগত করবে। অন্যরা জেগে ওঠার আগে যতটা সম্ভব ব্যাবসা করে নিয়েছিল তারা। কারণ তারা জানত, লঙ্কা ফলানো খুব সহজ, তাই একবার জানাজানি হয়ে গেলে লঙ্কার ব্যাবসা আর শুধুই নিজেদের হাতে আটকে রাখা যাবে না।”
হেঁসেলের গোলমরিচের স্থান দখল করলো লঙ্কা। ক্রমে ক্রমে লঙ্কা হয়ে উঠলো গরিবদের মসিহা। কারণ লঙ্কা বাটা, কাঁচা পিয়াঁজ দিয়ে একথালা পান্তা ভাত খাওয়া হয়ে যায়। শুধু তাই, গরম ভাত, ঘি, একটু আলু সেদ্ধ আর একটা কাঁচা লঙ্কা — যে কোন স্পাইসি ফুড কে হার মানিয়ে দেবে।

কাঁচা লাল লঙ্কায় ভরপুর ভিটামিন সি ও বিটা ক্যারোটিন ক্যান্সার থেকে ডায়াবেটিস পেশেন্টদের জন্য ম্যাজিকের কাজ করে। খাবার হজমে কাঁচা লঙ্কা মহৌষোধির মতো কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিয়মিত ধূমপানকারীদের নিয়ম করে কাঁচা লঙ্কা খাওয়া দরকার। এতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন এ থাকায় হাড়, দাঁত ও মিউকাস মেমব্রেনকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। ত্বকের বলিরেখা দূর করতে খেতে পারেন কাঁচা লঙ্কা। লঙ্কা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষ এখন অনেক এগিয়ে। ভারত প্রতি বছর ১.৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন লঙ্কা উৎপাদন করে। শুধু তাই নয়, রপ্তানিকারক হিসেবে ভারতের নাম সকলের কাছে সুপরিচিত।

ধানি লঙ্কা (একটু ছোট হাইটের মেয়ে যার কথাবার্তায় গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়।) বলে যতই লঙ্কাকে স্ল্যাং শব্দের গোষ্ঠীতে ফেলুন না কেন, জীবের কল্যাণের জন্যই লঙ্কার মর্ত্যে আগমণ। গরিবদের যতো কমদামী খাবার আছে, তাদেরকে ভোজনযোগ্য করার জন্য একা লঙ্কাই সর্বাগ্রে লিড দেয়। আহার থেকে ওষুধ — লঙ্কার বহুমুখী ব্যবহারে আমরা ভারতীয়রা এই মুহুর্তে সবার আগে। তাইতো দক্ষিণ ভারতের প্রবাদপ্রতিম চারণকবি পুরন্দরদাস লঙ্কাকে ভালোবেসে গানে বলেছেন, “হে গরিবদের মসিহা, তোমায় পেলে বিটঠল ভগবানকেও ভুলতে বসি।”
তথ্যঋণ : বঙ্গীয় রসনার রসালো কাহিনী – শংকর, খানাতল্লাশি— পিনাকী ভট্টাচার্য এবং সম্পর্কিত সংবাদ মাধ্যম।
খুব ভালো লাগল। জানলাম অনেক নতুন তথ্য।
খুব ভালো লাগলো লঙ্কা নিয়ে এই লেখাটি। অনেক কিছু জানতে পারলাম।
খুব ভালো লাগল
আপনার প্রতিবেদন পেজ ফোরের পৃষ্ঠাকে আরও
আকর্ষক করে তোলে। “লঙ্কা” বিবরণ তার প্রমাণ
প্রত্যেক পরিবেশনে জ্ঞান অর্জন করি,সম্মৃদ্ধ হই।
লঙ্কার গুণগান এই লঙ্কা ভক্তকে ‘ঝাল’ রসে সিক্ত
করলো।ভালোলাগা ভালোবাসা।
চমৎকার লাগল লঙ্কাবৃত্তান্ত।
সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
লঙ্কার পাঁচ কাহন ।
অতি সুন্দর প্রতিবেদন।