ঘৃষ্ণেশ্বর বা ঘুশ্মেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ
পূণ্যভূমি ভারতের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের শেষ জ্যোতির্লিঙ্গ ঘৃষ্ণেশ্বর বা ঘুশ্মেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মহারাষ্ট্রর ইলোরা গুহার কাছে অবস্থিত।ঔরঙ্গাবাদ থেকে ৩০ কিলোমিটার এবং দৌলতাবাদ (দেবগিরি) থেকে দশ কিলোমিটার দূরে ভেলুর গ্রামে আদি অনন্তকাল ধরে বিরাজ করছেন ভগবান ঘৃষ্ণেশ্বর মহাদেব। ঘৃষ্ণেশ্বর শব্দের অর্থ “করুণার প্রভু”। শিবপুরাণের কোটিরুদ্র সংহিতার ৩২ ও ৩৩ তম অধ্যায়ে এই জ্যোতির্লিঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বহুপূর্বে এখানে ছিল পিতলঘোড়া নামে এক বিশাল পার্বত্য বনভূমি। সেই বনভূমিতে ছিল আদিম মানব গোষ্ঠীর বাস। পিতলঘোড়া পাহাড়ের মাথায় ঝর্ণার জলের মত ঝরে পড়তো একটি সুমিষ্ট জলের ধারা। সেখান থেকেই গোদাবরীর উপনদী পূর্ণার জন্ম। সেই জলধারা বয়ে গিয়েছে ইলোরা গুহামন্দিরের সামান্য দূর থেকে।

সেই জলধারা অতিক্রম করে কিছুটা গিয়েই একস্থানে একটি দিব্যজ্যোতি সম্পন্ন শিলাস্থর হঠাৎ করে জেগে উঠেছিল একদিন। গ্রাম্য মানুষেরা শিব জ্ঞানে সেই শিলাস্থরকে পূজা করতে শুরু করল। রাতের অন্ধকারে অপ্সরা কিন্নরীদের নৃত্যগীত শোনা যেত। তখন আলোয় ভরে উঠতো কিছুক্ষণের জন্য চারিদিক। কিন্তু কাছে গেলে কাউকে দেখা যেত না। অনেক পরে একবার এক জটাধারী সন্ন্যাসী এসে নানা মন্ত্রে ওই শিলাস্তরে পুজো করে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, — এই শিলায় স্বয়ং মহাদেবের জ্যোতির্লিঙ্গ রূপের প্রকাশ। এই ভূমি হল দেবভূমি, এটি শিবালয়। সেই থেকে ভক্তরা চেষ্টা করে এখানে একটি মন্দির গড়ে তোলেন। কথিত আছে, বেরুলের শিবভক্ত উপজাতি-প্রধান ঘৃষ্ণেশ্বরের কৃপায় এখানে গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছিলেন। এই টাকায় তিনি মন্দিরটির সংস্কার করান ও শিখরসিঙ্গনপুরে একটি হ্রদ প্রতিষ্ঠা করেন।
যদিও বা পুরনো মন্দির এখন আর নেই। বর্তমানে যে মন্দিরটি আছে সেটি ১৬ শতকে শিবাজীর দাদা মালোজি ভোঁসলে প্রথম পুনরুদ্ধার করেন। এরপর বর্তমান মন্দিরটি ইন্দোরের রানী অহল্যাবাই হোলকার দ্বারা নির্মিত হয়েছে।

প্রায় ৪৪ হাজার বর্গফুট লাল পাথরে ঘেরা প্রাগৈতিহাসিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মন্দির প্রাঙ্গণ। মহাদেব মন্দিরটি দেখলেই মনে হয় যেন একটি বিশাল টোপর বসানো রয়েছে। মন্দিরের রক্ষিত শিলালিপিটি এখানকার পর্যটকদের কাছে একটি বিশেষ আকর্ষণ। মন্দিরের পাঁচটি চূড়া এবং মন্দিরের দেওয়ালের গায়ে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, প্রচুর ভাস্কর্য, সূক্ষ্ম নকশা খোদিত আছে। মন্দিরে নন্দিকেশ্বরের একটি মূর্তিও আছে।
এখানে মন্দিরে ঢোকার একটি রীতি প্রচলিত আছে। মেয়েদের ঢুকতে কোন বাধা নেই কিন্তু পুরুষরা প্রবেশ করলে উর্ধাঙ্গ রাখতে হবে অনাবৃত। মন্দিরে গর্ভগৃহে রয়েছেন ঘৃষ্ণেশ্বর মহাদেব। গর্ভগৃহের আয়তন ১৭ ফুট বাই ১৭ ফুট। লিঙ্গমূর্তিটি পূর্বমুখী।বিশাল আকার নয়, কালচে পিঙ্গল বর্ণের খসখসে জ্যোতির্লিঙ্গই গর্ভ মন্দিরের বিশেষ আকর্ষণ।

শিব পুরান অনুসারে, দক্ষিণ ভারতে দেবগিরি পর্বতে ব্রহ্মবেত্তা সুধর্ম নামে নিঃসন্তান এক ব্রাহ্মণ তার পত্নী সুদেহাকে নিয়ে বাস করতেন। সন্তান লাভের আশায় সুদেহা তার বোন ঘুশ্মার সঙ্গে স্বামীর বিবাহ দেন। দিদির উপদেশে ঘুষ্মা ১০১টি শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে পূজা করেন এবং সেগুলি নিকটবর্তী হ্রদে বিসর্জন দেন। শিবকৃপায় তাদের একটি পুত্র সন্তান লাভ হয়। ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণের ঘুষ্মার প্রতি প্রেম বৃদ্ধি পায়।এতে সুদেহা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। একদিন রাগে ঘুষ্মার ছেলেকে সুদেহা খুন করে হ্রদের জলে ফেলে দেয়। পরের দিন ঘুশ্মার পুত্রবধূ স্বামীর বিছানায় রক্তের দাগ দেখতে পেয়ে শাশুড়িকে বলেন। ঘুশ্মা তখন শিবের পূজায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ও সুধর্ম পূজার আসন ছেড়ে ওঠেন না, এমনকি ঘুশ্মার মধ্যে কোন ভাবান্তরও দেখা যায় না। মহাদেবের প্রতি আস্থা রেখে বলেন, ‘যিনি আমার পুত্র দিয়েছেন তিনি তাকে রক্ষা করবেন।’
এরপর হ্রদে শিবলিঙ্গ বিসর্জন দিতে গিয়ে ঘুশ্মা দেখেন তার পুত্র ফিরে আসছে। এতে ঘুশ্মা আনন্দিত বা দুঃখিত কিছুই হননা।

মহাদেব ঘুশ্মার অচল ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বর প্রার্থনার জন্য বলেন। ঘুশ্মা তখন শিবকে অনুরোধ করেন, সুদেহাকে ক্ষমা করে তিনি যেন অনন্তকাল ধরে এখানে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে অবস্থান করেন। শিব সম্মত হন এবং ঘুশ্মার নামানুসারে লিঙ্গের নাম হয় ঘুশ্মেশ্বর বা ঘৃষ্ণেশ্বর।যে হ্রদে ঘুশ্মা শিবলিঙ্গ বিসর্জন দিতেন সেই হ্রদটির নাম হয় শিবালয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী সন্তান-সুখে বঞ্চিত দম্পতিরা শিবালয়ে এসে পূজা করলে তাদের সন্তান লাভ হয়।
ইলোরার কৈলাস মন্দিরের বিরাটত্ত্ব ও গঠন চাতুর্যে সীমিত হয়েছে জ্যোতির্লিঙ্গ ঘুশ্মেশ্বর মহাদেব মন্দিরের আকর্ষণ। অনেকেই এই মন্দিরের খবরই জানেন। ফলে ইলোরা অজন্তা ভ্রমণে গিয়ে অনেকেরই ভ্রমণ থেকে বাদ পড়ে যায় ভারতের প্রাচীনতম জ্যোতির্লিঙ্গ ঘুশ্মেশ্বর মহাদেব। শিবরাত্রিতে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী সমাগম ঘটে পবিত্র এই তীর্থক্ষেত্রের মন্দিরে।

এক এক জ্যোতির্লিঙ্গে শিবের এক এক শক্তির প্রকাশ। স্বল্পে সন্তুষ্ট মহাদেব ভক্তের প্রার্থনা ও প্রেমভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তার কাঙ্খিত বস্তু প্রদান করেন। তিনি ভক্ত কল্যাণে সদা তৎপর — এই বিশ্বাসই শিবভক্তের জীবনের সম্পদ।।
শিব শক্তির অপার মহিমা আপনার লেখোনীর
মাধ্যমে বারবার ঈশ্বর দর্শনে জ্ঞানের পরিসীমা
বাড়িয়ে ধন্য করে কৃতার্থ হই শঙ্কর শম্ভুর কৃপায়।
যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারত-
বর্ষ,উঠিল বিশ্বে সেকি কলরব সেকি মা ভক্তি সে
কি মা হর্ষ* ডি. এল. রায়ের এই মহান মহত গান
মনে গুনগুন করে ওঠে ভক্তিরসে ভক্তিভাবে,এই
সুন্দর দেশটার “কণ কণ মে ভগবান” এই উক্তির
যথার্থতা খুঁজে পাই আপনার প্রতিবেদনে।জয় শিব শম্ভু????কোটি প্রণাম*
ভালোলাগা ভালোলেখা ভালোবাসা।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে