একটানা ২৭ বছর যে রাজ্যে ক্ষমতায় আছে বিজেপি সেই গুজরাতে দুই দফায় আগামী ১ এবং ৫ ডিসেম্বর বিধানসভা ভোট। ২৭ বছরের মধ্যে প্রায় ১৬ বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। ২০১৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গত আট-নয় বছরে গুজরাতে বেশ কয়েকবার মুখ্যমন্ত্রী বদল হয়েছে এবং সেটা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যেই। ইতিমধ্যে গুজরাত ভোট নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা জানিয়েছে, করোনা পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হওয়া থেকে শুরু করে মোরাবিতে সেতু বিপর্যয়, রাজ্যের বেকারত্ব, নিত্য প্রয়োজীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধিতে সে রাজ্যে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া রয়েছে প্রবল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফের একবার মোদী রাজ্যে গতবারের ৯৯টি আসনের চেয়ে অনেক বেশি আসন জয় করে ফিরে আসছে বিজেপি। তা সত্ত্বেও গুজরাট ভোট নিয়ে বিজেপি চিন্তিত এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চর্চা শুরু এখন তুঙ্গে।
প্রসঙ্গত, এতকাল গুজরাতে বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল কংগ্রেস। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার পর থেকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের যে ফসল বিজেপি অনেকদিন ঘরে তুলছিল ক্রমেই তার ধার যে কমছে সেটা গত বিধানসভা নির্বাচনেও বোঝা গিয়েছিল। ভোটে বিজেপি এবং কংগ্রেসের আসন সংখ্যার ব্যবধান গত ভোটে অনেকটাই কমেছিল। ওই রাজ্যের গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস বিজেপির সঙ্গে সমানে টক্কর দিয়ে ১৮২ আসনের মধ্যে ৭৭ আসন জয় করেছিল। অন্যদিকে ১৮২ আসন বিশিষ্ট গুজরাট বিধানসভার ৯২ ম্যাজিক ফিগার টপকে বিজেপি ৯৯টি আসনে পেয়ে কোনও রকমে মুখ রক্ষা করেছিল। যদিও নির্বাচন পরবর্তী পর্যায়ে কংগ্রেসের বহু বিধায়ক বিজেপিতে যোগদান করেন। কিন্তু এবার যে গুজরাত বিধানসভা ভোট নিয়ে বিজেপি যথেষ্ট চিন্তায় রয়েছে তার অন্যতম কারণ ২০২২-এর ভোটে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আপ এবং আসাদউদ্দিন ওয়াইসির নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমী বিজেপি-র প্রতিদ্বন্দ্বী। গুজরাত নির্বাচনের দিন ঘোষণার পরই তারা জোর প্রচার শুরু করে। যদিও বিজেপির তরফে বলা হয়েছে, এই দুটি দল আদতে কংগ্রেসের ভোট কাটবে। তা সত্ত্বেও বিজেপি যে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না, তা বলাই বাহুল্য।
গুজরাত ভোটে বিজেপির দুর্বল জায়গা গ্রামীণ কেন্দ্রগুলি। দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে গুজরাতের বিধানসভা ভোটে বিজেপি শহরের কেন্দ্রগুলির তুলনায় খুব কম আসন পেয়েছিল গ্রামীণ কেন্দ্রগুলিতে। দেখে যাচ্ছে ১৮২ আসন বিশিষ্ট গুজরাট বিধানসভার ৮৪টি শহরের আসনের মধ্যে বিজেপি ৬৩টিতে জিতেছিল, অন্যদিকে ৯৮টি গ্রামীন আসনের মধ্যে পেয়েছিল ৩৬টি। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শহরাঞ্চলের স্ট্রাইকরেট ছিল ৭৭ শতাংশ। যা ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনের থেকে কম। শহরাঞ্চলে ওই সময় স্ট্রাইক রেট ছিল ৮৭ শতাংশ। সেই তুলনায় বিজেপির গ্রামীণ অঞ্চলে স্ট্রাইক রেট ৩৭ শতাংশ। ফলাফল দেখে বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলে শহরে বিজেপির প্রভাব বেশি থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তুলনায় কম। সেদিক থেকে গ্রামীন অঞ্চলে কংগ্রেসের প্রভাব বেশি ছিল।
শহরাঞ্চলে বিজেপির প্রভাব বেশি থাকলেও গুজরাতে পরিবর্তন চাইছেন যুব সম্প্রদায় ও মাঝবয়সিদের একটি বড় অংশ। ভোটের আগে বিজেপির দপ্তরে যে রিপোর্ট জমা পড়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে গত ২৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকায় যুব ও মধ্যবয়সিদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাঁরা এবার গুজরাতে পরিবর্তন চাইছেন। এই বিক্ষুব্ধ ভোটারদের কথা মাথায় রেখেই মোদী ভোটের আগে রাজ্যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রকল্পের ঘোষণা ও শিলান্যাস করেন। কিন্তু তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে যে কেন ঠিক ভোটের আগে তাড়াহুড়ো করে বিপুল বিনিয়োগের ঘোষণা করতে হল শাসক বিজেপিকে।
গুজরাট ভোটে আদিবাসী ভোটও বিজেপিকে যথেষ্ট চিন্তায় রেখেছে। প্রসঙ্গত, এই রাজ্যে তপসিলী উপজাতিদের জন্য ২৭টি আসন সংরক্ষিত। এছাড়া ১৪টি জেলার আদিবাসী ভোট গুজরাটে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। কারণ আদিবাসীদের হাতে প্রায় ১৫ শতাংশ ভোট। কিন্তু এত বছর ক্ষমতায় থেকেও বিজেপি গুজরাটে কোনও আদিবাসীকে নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পারেনি। বরং মূর্তির জায়গা নিয়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে গুজরাটের বিজেপি সরকারের সংঘাত হয়েছে। স্ট্যাচু অফ ইউনিটিকে সামনে রেখে বিজেপি সরকার আদিবাসী সমাজকে কর্মসংস্থানের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল তার বাস্তবায়ন নিয়ে তাঁরা একেবারেই সন্তুষ্ট নয়। এর উপর গ্রামীণ গুজরাতের একটি বড় অংশের মানুষ বিজেপির উপরে ক্ষুব্ধ, বিশেষ করে কৃষকরা ফসলের দাম না পাওয়ায় শাসক বিজেপির পক্ষে যে নেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভোট ঘোষণার আগে থেকেই। তা ছাড়া অর্থনীতির বেহাল দশায় গুজরাটের মানুষ বিজেপি সরকারের উপর আস্থা হারিয়েছে। গুজরাত বিধানসভা ভোটের আগে সব দিক থেকেই চাপে থাকা বিজেপির কপালে চিন্তার ভাঁজ।