গুরু আসনে উপবিষ্ট হলে শিষ্য তাঁকে পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে বন্দনা করলেন। শিষ্যকে আশীর্বাদ করার পরে গুরু তাঁকে বললেন, বৎস, তোমার মনে রামায়ণ এবং রামচন্দ্র সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে বলছিলে!
শিষ্য করজোড়ে বললেন, হ্যাঁ গুরুদেব সম্প্রতি রামচন্দ্র এবং রামমন্দির নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের আবেগ সঞ্চারের প্রচেষ্টা দেখে আমার মনে বেশ কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে।
গুরুদেব বললেন, অত্যন্ত স্বাভাবিক। তোমার প্রশ্ন করো, আমি যথাযোগ্য জবাব দেব।
শিষ্য বললেন, গুরুদেব, রামচন্দ্র কি শুধুই হিন্দুজাতির দেবতা?
গুরুদেব মুচকি হেসে বললেন, আমরা যুগ যুগ ধরে রামচন্দ্র এবং রামায়ণের দিকে নজর রাখলে দেখব, রামচন্দ্র যে ধর্মকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, সেটা আজকের হিন্দুধর্ম নয়। তিনি একজন প্রকৃত শাসকের ধর্মকেই তুলে ধরেছেন। সেটা হল দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন। তাঁর প্রজাহিতৈষী মনোভাবই ছিল সেই ধর্ম। রাবণকে হত্যা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর ধর্ম। তাই বার বার দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ রামায়ণকে আপন করে নিয়েছেন। নিজেদের ধর্মের পরিসরে তাঁরা শাশ্বত মানব কল্যাণের বাণী শুনেছেন রামকথার মধ্য দিয়ে।

বিভিন্ন ভাষাতেও লেখা হয়েছে রামায়ণ। হিন্দিতে তুলসীদাস এবং বাংলায় কৃত্তিবাস ওঝার কথা আমরা জানি। এছাড়াও ওড়িয়া ভাষায় বলরাম দাস, তেলুগু ভাষায় রঙ্গনাথ, কন্নড় ভাষায় অভিনব পম্পা, তামিল ভাষায় কম্ব রামায়ণ রচনা করেন। মারাঠি ভাষায় একনাথ ভাবার্থ রামায়ণ রচনা করেন। এমনকী বিভিন্ন ধর্মের মানুষও রামায়ণের আদর্শ ও বাণীকে আপন করে নিয়েছেন। লখনউয়ের নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ সংস্কৃত রামায়ণকে উর্দুতে অনুবাদ করিয়েছিলেন। তিনিও সেই রামায়ণের স্বাদ আস্বাদন করতেন। আমরা বারবার দেখি, যে মনুষ্যত্বে উত্তরণের কথা রামচন্দ্র বলেছিলেন, সেটাই হল প্রকৃত ধর্ম। তিনি শুধু হিন্দুধর্মের বিচ্ছিন্নতায় বাঁধা পড়লে যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে ভগবানরূপে বিরাজমান থাকতে পারতেন না। বরং তাঁর মাহাত্ম্যকে আজ নতুন করে ধর্মের নিগড়ে বেঁধে কেউ কেউ তাঁর উপর একচেটিয়া অধিকার কায়েম করতে চাইছেন। রামচন্দ্রকে নিয়ে এই বেনিয়া মনোবৃত্তি রামভাবনার পরিপন্থী।
শিষ্য বললেন, গুরুদেব, ভারত ছাড়াও বিশ্বের বহু দেশেই শ্রীরামচন্দ্রকে নিয়ে রামায়ণ লেখা হয়েছে বলে জানি। গুরু বললেন, হ্যাঁ বৎস, দেশ, কাল, সীমানার বেড়া ভেঙে বহুকাল আগে থেকেই শুরু হয়েছিল রামায়ণের বিজয়যাত্রা। তার মধ্যে ছিল না কোনও বিচ্ছিন্ন মানসিকতার ভাবনা। ধর্মের কুচুটেপনা কখনও আবৃত করতে পারেনি রামায়ণকে কিংবা রামচন্দ্রকে। তাই অন্তত ৩০০টি রামায়ণের সন্ধান পাওয়া যায়। শুধু তো হিন্দু নয়, বৌদ্ধ, জৈন-সহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষও রামায়ণ লিখে গিয়েছেন। তাঁরা রামায়ণ পাঠ করে শান্তিলাভ করতেন।
শিষ্য বললেন, শ্রীরামচন্দ্রের এই যে বিশ্বজয়, তার জন্য তো হিন্দুধর্মকেই বাহবা দিতে হয়। থাইল্যান্ড, লাওস, বর্মা, কম্বোডিয়া, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, চীন, জাপান, মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনাম, নেপাল, শ্রীলঙ্কা-সহ বহু দেশে রামায়ণের সন্ধান পাওয়া যায়।

পদ্মচরিত
গুরুদেব মৃদু হেসে বললেন, বহির্বিশ্বে রামায়ণের প্রসারের পিছনে হিন্দুরা নয় বৎস, প্রয়াসী ছিলেন বৌদ্ধরা। তাঁরাই রাময়ণকে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বৌদ্ধধর্মের প্রসারের পথ ধরেই বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে রামায়ণ ও রামচন্দ্রের মাহাত্ম্য। প্রায় হাজার বছর আগে থাইল্যান্ডের নাম ছিল সিয়াম। সেখানে একটি শহরের নাম আয়ুথায়া। বর্তমানে ব্যাঙ্কক থেকে ৭০-৭৫ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। আয়ুথায়া নামটি এসেছে অযোধ্যা থেকেই। পরবর্তীকালে সেখানে রাজা হন রামাথিবোধি। তাঁর সময়ে লেখা হয়েছিল থাই ভাষার রামায়ণ ‘রামাকিয়েন’। এখানে আয়ুথায়ার রাজা থটসরোতের (দশরথ) পুত্র ফ্রা রাম। তাঁর স্ত্রী হলেন সাং সিদা (সীতা)। তাঁর ভাই ফ্রা ফ্রোত (ভরত), ফ্রা লোক (লক্ষ্মণ) এবং ফ্রা সাতারুত (শত্রুঘ্ন)। এই রামায়ণে হনুমানের চরিত্রকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
গুরুদেব একটু থেমে আবার শুরু করলেন, বৌদ্ধদের রচিত রামায়ণের নাম দশরথ জাতক। এই রামায়ণে সীতাহরণের প্রসঙ্গ নেই। এছাড়া জৈনদের রামায়ণ হল পউমাচরিয়াম, অর্থাৎ পদ্মচরিত্র। সেখানে রামচন্দ্রকে পদ্মের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তিনি এক অহিংসার প্রতীক। সেই কাব্যে রাবণ বধ হয়েছিলেন লক্ষ্মণের হাতে এবং রামচন্দ্র মোক্ষ লাভ করেছিলেন। সেখানে রামচন্দ্র কোনও দেবতা নন, তাঁকে জৈন ধর্মের এক আদর্শ পুরুষ হিসাবে দেখানো হয়েছে।
লাওসের রামায়ণ মোটামুটি সংস্কৃত রামায়ণেরই অনুবাদ। সেখানে রামচন্দ্রকে বুদ্ধের অবতার হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই অনুবাদে লাওস সংস্কৃতির আধারেই বর্ণিত হয়েছে রামকথা। তাদের রামায়ণের নাম ফ্রা লাক ফ্রা রাম।
শিষ্য বললেন, আচ্ছা প্রভু, ইরানেও কি রামায়ণের চর্চা হয়েছে?

হিকায়ত সেরি রাম
গুরুদেব বললেন, হ্যাঁ। ওদের দেশের রামায়ণের নাম দস্তান-ই-রাম। পার্সি ভাষায় রামায়ণ লেখা হয়েছিল সম্রাট আকবরের অনুরোধে। মোল্লা আব্দুল কাদির বদাউনি পার্সি ভাষায় রামায়ণের অনুবাদ করেছিলেন।
মালয় দেশে লেখা রামায়ণের নাম হিকায়ত সেরি রাম। মানে শ্রীরামের কাহিনি। এই গ্রন্থে রামের থেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছেন লক্ষ্মণ। পূর্বতন বর্মা বা মায়ানমারে লেখা রামায়ণের নাম ইয়ামা জাতদাউ। এখানে গল্পটা একই। যম (রাম), থিদা (সীতা), লখন, যবনা (রাবণ) চরিত্রগুলিকে নিয়ে একই কাহিনি। শুধু সেদেশের জায়গার নামগুলি ব্যবহার করা হয়েছে। নেপালি কবি ভানুভক্ত উৎকৃষ্ট রামায়ণ রচনা করেন। আর এক কবি সিদ্ধিদাস মহাজু নেপালি ভাষায় সিদ্ধি রামায়ণ রচনা করেন। শ্রীলঙ্কায় কুমারদাসা রচনা করেন জানকীহরণ কাব্য। ইন্দোনেশিয়ায় আমরা পাই কাকাউইন রামায়ণ। এছাড়াও চীন, জাপানেও রামায়ণের চর্চা ছিল। সব মিলিয়ে রাম ছিলেন বিশ্বের এক আদর্শ পুরুষ।
শিষ্য বললেন, তাহলে গুরুদেব, রামচন্দ্রকে নিয়ে কেন এত একপেশে মনোভাব? কেন তাঁকে শুধু হিন্দুদের বলেই মনে করা হচ্ছে?
গুরুদেব বললেন, মহাত্মা গান্ধীকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রামচন্দ্র কে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, রাম হলেন আমাদের বিবেক, আমাদের সত্য। তিনি রামনামকে ব্যবহার করে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে জোয়ার আনতে চেয়েছিলেন। রামনামের মধ্যেই তিনি ঈশ্বর এবং আল্লাকে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন রামনামকে অবলম্বন করে সকল ধর্মের মানুষের মনে সুমতি ফিরে আসুক। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল বহুক্ষেত্রে ধর্ম একটা দুর্মতির আখড়া হয়ে উঠেছে। আসলে একটা ব্যাপার ভীষণভাবে ঘুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, রামায়ণের রামচন্দ্র কোনও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন। তিনি হলেন, শৌর্য, বীর্য, সুশাসন এবং এক পবিত্র সংস্কৃতির প্রতীক। সেই সংস্কৃতিকেই মানুষ আঁকড়ে ধরতে চায়। প্রত্যেকেই তাঁদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের আধারেই রামচন্দ্রকে স্থাপন করেছেন। কিন্তু কোথাও কারও সঙ্গে এনিয়ে সংঘাত বাধেনি। আসলে মানুষ একটা শাশ্বত সত্যকে অনুসরণ করতে চায়। একটা ধ্রুব আদর্শকেই মানবকল্যাণের কাজে ব্যবহার করতে চায়। তাই রামায়ণ কোনও একক দেশের নয়, কোনও ধর্মের নয়, কোনও রাজনীতিরও নয়। সেটা একটা আইডিয়া, মানব কল্যাণের এক সংবিধান, যা আবহমান কাল ধরে অনুসৃত হয়ে আসছে। শুধু অযোধ্যার রামমন্দিরের ঢক্কানিনাদে তাকে আঁকড়ে ধরলে সারসত্যটুকু মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে না।

দশরথ জাতক
শিষ্য বললেন, প্রভু দেখে মনে হচ্ছে, এই প্রথম ভারতে শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। তা তো নয়, সারা দেশে তো তাঁর অসংখ্য মন্দির রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, উত্তর ভারত নয়, দক্ষিণ ভারতেই রামমন্দিরের সংখ্যা বেশি, বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে। শুধু দক্ষিণ ভারতেই রামচন্দ্রের শতাধিক মন্দির রয়েছে।
গুরু হেসে বললেন, তুমি ঠিকই বলেছো বৎস্য। তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল, তেলেঙ্গানায় রামচন্দ্রের অজস্র মন্দির আছে। তামিলনাড়ুতে রামস্বামী মন্দির, কোলা ভালভিল রামার মন্দির, বীররাঘব স্বামী মন্দির সহ আর অনেক। অন্ধ্রপ্রদেশে কোদান্ডারামা মন্দির, কেরলে শ্রীরামস্বামী ক্ষেত্রম সহ অন্তত একশোটি মন্দির আছে। এছাড়া, বিহার, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র ও বাংলায় আছে অসংখ্য রামমন্দির।
শিষ্য বললেন, তাহলে এই মন্দির নিয়ে এত উন্মাদনা কেন প্রভু?
গুরু বললেন, বৎস, এই উন্মাদনার পিছনে জড়িয়ে আছে ত্রিশক্তি। ধর্ম, ভক্তি ও রাজনীতি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটাই প্রবল। তাই মন্দির প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপ্রধানকে বুক বাজিয়ে বলতে হয়, রামচন্দ্রকে আমি বাসস্থান দিয়েছি, মাথার ওপর ছাদ দিয়েছি, বিমানবন্দর বানিয়ে দিয়েছি। তিনিই আবার রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠা করবেন। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্যে মানুষ কী না করতে পারে! মন্দির যখন দেবতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, রাজনীতি যখন মানবধর্মের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, ক্ষমতার প্রলোভন যখন কাণ্ডজ্ঞান লুপ্ত করে, তখন বুঝতে হবে, সেখানে ভগবান উপেক্ষিত। রামের সুশাসনের শিক্ষা আমরা পাইনি। তাই আজও রাবণরূপী ধর্ষকরা রাষ্ট্রের আশীর্বাণী পেয়ে মাথা উঁচু করে সমাজে ঘুরে বেড়ানোর সাহস পায়। রামচন্দ্রের দুষ্কৃতী বিনাশের শিক্ষা চাপা পড়ে থাকে শাসকের সিংহাসনের তলায়। অন্তর্যামী অন্তরালে মুচকে হেসে বলেন, সম্ভবামি যুগে যুগে।