বাংলায় একুশের বিধানসভা নির্বাচন যেন অন্য এক মহাভারত। যেখানে ভোটের লড়াই আদতে কুরক্ষেত্রের যুদ্ধে পরিণত হয়ে উঠেছে। রাজ্যের একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছেন দ্রোনাচার্য ও অর্জুন-রা। কেবল নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারী নন, আরও বহু গুরু শিষ্য একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছেন এবারের ভোট রণাঙ্গনে।
সিঙ্গুরে রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বনাম বেচারাম মান্না থেকে শুরু করে যাদবপুরে সুজন চক্রবর্তী বনাম রিঙ্কু নস্কর, উত্তরবঙ্গের মেখলিগঞ্জ কেন্দ্রে পরেশ অধিকারী বনাম দধিরাম রায়, অন্যদিকে শিলিগুড়িতে গুরু অশোক ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন শঙ্কর ঘোষ।
কমিশন নির্বাচনের দিনক্ষণ জানানোর পর তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ পেতেই দেখা যায় ঠাঁই হয়নি সিঙ্গুরের চারবারের বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের। ঘাসফুল শিবির জানায় মূলত বয়সের কারণেই ৮৯ বছরের রবীন্দ্রনাথকে প্রার্থী করা সম্ভব হয়নি। দলের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ মাস্টারমশাই যোগ দেন পদ্মশিবিরে। বিজেপি তাঁকে সিঙ্গুরে টিকিট দেয় একদা তাঁরই শিষ্য তৃণমূল প্রার্থী বেচারাম মান্নার উল্টোদিকে।
সাধারণভাবে বিজেপি প্রবীণদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরেই রাখে। কিন্তু সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে দেখা গেল বিজেপি ৮৯ বছরের মাস্টারমশাইকে লড়িয়ে দিল একদা তাঁরই শিষ্যের বিরুদ্ধে। ওই সিদ্ধান্তে অবশ্য পদ্ম শিবিরের কর্মীদের মধ্যেই তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধে। সিঙ্গুর আন্দোলনের অন্যতম মুখ মাস্টারমশাই রবীন্দ্রনাথ ২০০১ সালে বিধায়ক হন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারে তাঁকে মন্ত্রীও করা হয়। কিন্তু সিঙ্গুরের সেই সাড়া জাগানো জমি আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা ‘গুরু-শিষ্য’ এবার ভোটে একে অপরের বিরুদ্ধে।
গুরু শিষ্য ভোট যুদ্ধে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছেন যাদবপুর কেন্দ্রেও। সিপিএম নেতা তথা বিধায়ক সুজন চক্রবর্তীর কাছেই রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল রিঙ্কু নস্করের। বলে যায় সুজন চক্রবর্তীর কাছেই রাজনীতির পাঠ নেওয়া শুরু করেছিলেন তিনি। ২০১৪ সালের ভোটে রিঙ্কুকে সিপিএম দাঁড় করিয়েছিল মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রে। তাঁর উল্টোদিকে প্রার্থী ছিলেন তৃণমূলের চৌধুরীমোহন জাটুয়া।
জাটুয়ার কাছে রিঙ্কু পরাজিত হলেও কিন্তু সিপিএমের হাত ছাড়েননি। সিপিএমও তাঁর দিক থেকে মুখ ফেরায়নি। পুরভোটে ১০২ নং ওয়ার্ড থেকে রিঙ্কুকে সিপিএম প্রার্থী করেছিল এবং সেখানে তিনি জিতেওছিলেন। দীর্ঘদিনের এক লড়াকু কর্মী সিপিএম ছেডে় বিজেপি-তে যোগ দেবার সময়ে প্রকাশ্যে সিপিএমকেই দায়ী করেছিলেন।
গত বিধানসভায় যাদবপুর থেকে ভোটে জেতার পর এবারও সেখানে সিপিএম ওই কেন্দ্র থেকে সুজনকেই প্রার্থী করে। তবে এবার দেখা যাচ্ছে, সুজনকে লড়তে হচ্ছে তাঁরই প্রাক্তন শিষ্যের বিরুদ্ধে।
একুশের কুরুক্ষেত্রে আরেক দ্রোণাচার্য ও অর্জুনের লড়াই কোচবিহারের মেখলিগঞ্জে। যদিও সেখানে এবার তিন সতীর্থের লড়াই। যারা কেউই বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনী ছেড়ে দিতে নারাজ। তবে মেখলিগঞ্জ বলছে এবার লড়াই হবে গুরু-শিষ্যের।
আসলে মেখলিগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী পরেশ অধিকারী, বিজেপি প্রার্থী দধিরাম রায় এবং ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী গোবিন্দ রায়- তিনজনেই একদা ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকে সতীর্থ। পরবর্তীতে পরেশ অধিকারী তৃণমূলে এবং দধিরাম রায় বিজেপিতে যোগ দেন। গোবিন্দ রায় রয়ে যান ফরওয়ার্ড ব্লকে।
পরেশবাবু বাম রাজনীতিতে কয়েক দশক কাটিয়ে তৃণমূলে এসেছেন। মেয়ের চাকরি নিয়ে বড়সড়ো বিতর্কেও জড়িয়েছেন। এরপরও তাঁকে লোকসভায় প্রার্থী করার খেসারত দিতে হয়েছে তৃণমূলকে। তার পরেও তাঁকে বিধানসভা প্রার্থী করছে তৃণমূল। অন্যদিকে, কেন্দ্রটিতে বিজেপি প্রার্থী করেছে পেশায় ব্যবসায়ী তথা দলের মণ্ডল সভাপতি দধিরাম রায়কে।
পরেশ অধিকারী সাফ জানিয়েছেন, এবার বিজেপি ১৯-এর লিড ধরে রাখতে পারবে না। তিনিই জিতছেন। আর দধিরাম তো আমার হাতেই তৈরি। অন্যদিকে দধিরাম বলছেন, লক্ষ্যভেদ কিন্তু অর্জুনই করেছিল, দ্রোনাচার্য নন। বোঝা যাচ্ছে লড়াই গুরু-শিষ্যেরই।
আবার সিপিএমের অশোক ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে বিজেপির শঙ্কর ঘোষও লড়বেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ। এবার তিন সতীর্থের লড়াই। বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনী দিতে নারাজ গুরু-শিষ্য মেখলিগঞ্জ তো বলছে, এবার লড়াই কুরুক্ষেত্র হতে চলেছে একেবারে। কেউ কাউকে বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনী দিতে নারাজ।
বাংলায় একুশের কুরুক্ষেত্রে গুরু-শিষ্যের লড়াই হচ্ছে শিলিগুড়িতেও। এই কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থী অশোক ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছেন তাঁরই একদা শিষ্য শঙ্কর ঘোষ। তিনি সম্প্রতি সিপিএম ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েই প্রার্থী হয়েছেন। যদিও এখানেও লড়াই ত্রিমুখী। বাম প্রার্থী অশোক ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে লুছেন তৃণমূল প্রার্থী ওমপ্রকাশ মিশ্র। শিলিগুড়ির মানুষ বলছে ওই লড়াই ছাপিয়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে শিষ্য শঙ্কর ঘোষের সঙ্গে গুরু অশোক ভট্টাচার্যের ফাইট।
রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, বেচারাম মান্না, সুজন চক্রবর্তী, রিঙ্কু নস্কর, পরেশ অধিকারী, দধিরাম রায়, গোবিন্দ রায়,অশোক
ভট্টাচার্য, শঙ্কর ঘোষ-সহ যত নাম বলতে পারবেন সবাই ক্ষমতা লোভী এবং ভোগী। ওঁরা রাজনীতি করেন শুধুমাত্র একটা
কারণে- ভোগ। তাই কে গুরু আর কে শিষ্য, কে লাল, কে সবুজ, কে গেরুয়া তাতে কি এসে যায়?
তার মানে কি রাজনৈতিক গুরুদের কাছে রাজনীতির পাঠ শেষ হলেই অন্য দলে নাম লেখানো গুরু হবেন বলে?
গুরু শিষ্যের লড়াই মহাভারতের যুদ্ধ থেকেই চলছে, এবারের ভোট যুদ্ধে গুরু না শিষ্য কে জিতবে তার জন্য আরও কিছুদিন
অপেক্ষা করতে হবে।