“ওয়াহেগুরু জি কা খালসা, ওয়াহেগুরু জি ফাতেহ”।
এই বঙ্গের কত স্থান ধন্য হয়ে আছে কত কারণে তা আমাদের অজানা। সেই অজানাকেই জানতে আজ কথা হবে পশ্চিম মেদিনীপুরের পুণ্যস্থান চন্দ্রকোণার নানকসার সাহিব। গুরুদুয়ারা নানকসার গুরুদুয়ারা রামগড় নামেও পরিচিত। গুরু নানক পুরীধাম যাওয়ার পথে এই চন্দ্রকোণায় আসেন। তাঁর আগমনের প্রভাবেই এই গুরুদুয়ারা স্থাপন করা হয়। ত্রেতা যুগে রাম চন্দ্র, তাঁর ছোট ভাই লক্ষণ এবং সীতা দেবী এই স্থানটি পরিদর্শন করেছিলেন বলে অনেকের মধ্যে নিশ্চিত বিশ্বাস রয়েছে।
ইতিহাস বলে, প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোন জনপদ চন্দ্রকোণার নাম ছিলো ‘মানা’। সমগ্র অঞ্চলটি ভানদেশ নামে পরিচিত ছিলো। চতুর্দশ শতকের প্রথমের দিকে মল্লভূম বংশের রাজাদের অধীনে ছিলো এই স্থান। পরবর্তী কালে মল্লদের সিংহাসন চ্যুত করে কেতুবংশের রাজা চন্দ্রকেতু রাজ্য দখল করে ও তাঁর নামানুসারে এই স্থানের নাম হয় চন্দ্রোকোনা। সেই সময় থেকে জঙ্গল পরিবৃত জনপদ সেজে উঠতে থাকে। লৌকিক দেব-দেবী থেকে শুরু করে রাম মন্দির, সতী মন্দির, বিষ্ণু, শিব-সহ চারশোরও বেশি মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে বীরভান বংশের রাজারা এখানে আধিপত্য বিস্তার করে।

এখানকার মন্দিরের টেরাকোটার কাজ মুগ্ধ করে পর্যটকদের। আজো এখানে হিন্দু রাজাদের কিছু কীর্তি ও মন্দির রয়েছে। বড় ব্যবসার স্থান থাকায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘বাহান্ন বাজার তিপ্পান গলি, তবে জানবি চন্দ্রকোণা এলি’। ১৮৬৯ সালে চন্দ্রকোণা পুরসভার তকমা পায়।
গুরু নানকজি রামগড়ে এসেছিলেন কুড়ি বছর বয়সে তাঁর দুই অন্তরঙ্গ সঙ্গী বালাজি এবং মর্দানাজির সাথে পুরী যাওয়ার পথে। এসে কয়েকদিন অবস্থান করেছিলেন। যেখানে গুরু নানকজি অবস্থান করেছিলেন সেই জায়গাটি ‘নানক ভিটা’ নামে পরিচিত। কথিত আছে যে গুরু সাহেব একটি বিশেষ বটগাছের (বিভিন্ন প্রকারের পাতা বহন করে) তলায় বসে বহু দিন ধরে উপাসনা ও আরাধনায় মগ্ন ছিলেন। এগুলি ‘নানক প্রকাশ’ নামের বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যা ‘গুরুমুখী’ ভাষায় লেখা ও প্রকাশিত হয়েছিল।
গুরু নানকের কাছে গ্রামের বহু ভক্ত ও সাধুসন্তরা আসেন তাঁর আশীর্বাদ নিতে। তিনি সকলকে ঈশ্বরের ধ্যান ও নাম পাঠ করার উপদেশ দেন। আইন-ই-আকবরীতে উল্লেখ করা হয়েছে চন্দ্রকেতু (‘মন’/Mana) গুরু নানকজির সাথে দেখা করতে এসেছিল এবং তাঁকে পুত্র সন্তান লাভের জন্য আশীর্বাদ করার অনুরোধ করেছিলেন। শোনা যায়, আশীর্বাদ লাভের পর তার মনস্কাম পূর্ন হয়। নানকজির আজ্ঞায় তিনি এখানে ২০০ একর জমির উপর একটি ধর্মশালা তৈরি করেন। জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল এবং সেওয়াদারদের রাখা হয়েছিল আগত পুণ্যার্থীদের সেবা করার জন্য এবং দেবতার নাম পাঠ করার জন্য।

গুরু নানকজি এখানকার পাঁচ কৃষক ভাই গন্টু বালা, হন্টু বালা, দখনি বালা, তেতলা বালা, ছোট বালার অনুরোধে তাদের বাড়ি গিয়ে খেয়েছিলেন এবং তাদের দেবতার নাম (মূল মন্ত্র এবং গুরু মন্ত্র) পাঠ করার উপায় বলে দিয়েছিলেন। আজও এখানে পুরানো বাঙালিরা ঈশ্বরের নাম পাঠ করে (পেহলি- paudi da path) ।
১৯৯৫ সাল পর্যন্ত, বর্তমান সময়ের শিখদের কাছে চন্দ্রকোণার এই ভূমিতে গুরু সাহেবের সফর সম্পর্কে কোনও তথ্য বা সূত্র ছিল না। ইতিহাসে রয়েছে যে গুরু সাহেব চন্দ্রকোনায় মঞ্জি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ১৯৯৫ সাল অবধি এটি একটি হিন্দু পরিবার এবং চন্দ্রকোনার গ্রামবাসীদের দ্বারা দেখাশোনা করা হচ্ছিল। এই পরিবারের কিছু সদস্য এবং গ্রামবাসী কলকাতায় যান এবং এটি কলকাতা গুরুদ্বার প্রবন্ধক কমিটির নজরে আনেন। তারা অনুরোধ করেছিলেন, শিখভাইয়েরা যেন এই ঐতিহাসিক স্থানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। চন্দ্রোকোনা থেকে কলকাতার দুরত্ব প্রায় ১৭০ কিলোমিটার। দূরত্বের কথা স্মরণে রেখে তারা খড়গপুরের গুরুদ্বার কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সেইজন্য খড়গপুর খরিদা গুরুদ্বার কমিটি রাজি হন এটি দেখভাল করার জন্য।
চন্দ্রকোনা খড়গপুর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে (আইআইটি-খড়গপুরের জন্য বিখ্যাত একটি শহর) একটি ছোট শহর । আধুনিক প্রযুক্তির আবির্ভাবের প্রভাব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে এখানে। কিন্তু আশেপাশের বেশিরভাগ এলাকাই বন বা ছোট ছোট গ্রাম রয়েছে। কৃষিই রয়ে গেছে এখানকার প্রধান পেশা এবং অধিকাংশ মানুষ নিম্ন-মধ্যবিত্ত কৃষক। এখানে প্রতি পূর্ণিমার দিনে খুব বড় উৎসব হয়। এই এলাকায় ৫০-৬০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিখ পরিবার নেই, তবে কলকাতা, খড়গপুর, টাটা জামশেদপুর, দুর্গাপুর, আসানসোল, রানিগঞ্জ, ধানবাদ, পানাগড় থেকে প্রচুর লোক সমাগম হয় এই পবিত্র স্থান দর্শনের জন্য।

সতনাম সিংজি জানান, কাল বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে সকাল থেকেই ঠাকুরের নাম সংকীর্তন, পাঠ, অনেক অনুষ্ঠান চলে সারাদিন ধরে। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার ভক্তদের সমাগম ঘটে। রুটি, ভাত, ডাল, পায়েস, মিষ্টি ইত্যাদিতে ভরে ওঠে লঙ্গরখানা ভক্তদের সেবায়। প্রতিদিন এখানে ভজন পূজন ও লঙ্গরখানা চালু থাকে। গুরুদ্বারের অধীনস্থ প্রায় পাঁচশো বিঘা জমিতে চাষ চলছে।
বাঙালি শুধুমাত্র বুদ্ধিমান জাতি নয়, আতিথেয়তা, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা সবেতেই বাঙালি শতকদম এগিয়ে। এই মাটি প্রকৃতই পুণ্যের ও সম্প্রীতির।
তথ্যসূত্র : ভগ্ন দেউলের ইতিবৃত্ত এবং সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যসূত্র।
Medinipur gele ebar ei jaygay giye dekhe asbo.
একেবারেই একটা অজানা তথ্য নিশ্চিত করে জানতে পারলাম। ধন্যবাদ।
*বাহে গুরুজী কা খালসা বাহে গুরুজী কি ফতেহ*
কত কিছু মনে করিয়ে দিলেন,”চন্দ্রকোনা সাহিব”
ও গুরুনানামকজী*র কথা বলতে গিয়ে,ভীষণ
ভালোলাগলো ইতিহাস সম্মৃদ্ধ এই প্রতিবেদন বহু
দিন মনে থাকবে।ঠিকই লিখেছেন “বাঙ্গালী”রা
সত্যিই অতিথিপরায়ণন,কারন তারা বিশ্বাস করে
*অতিথি দেব ভব* ধন্যবাদ পেজ ফোর*
ধন্যবাদ জানাই সকলকে এত সুন্দর মতামতের জন্য।
সত্যিই অজানা ছিলো, একটু অন্য কথায় আসি, কি করে চন্দ্রকোনা কে চেনা! 2009 may মাস, বুদ্ধ গয়া তে পোস্টিং, হঠাৎ ডিমান্ড আসে লালগড় এর পুলিশ পোষ্ট মাওবাদী দের দখলে, অগত্যা যাত্রা, 2009 এর 9 জুন নামি চন্দ্রকোনা রোড স্টেশনে , তারপর অনেক গল্প, অনেক ঘটনা, 4 বছর ছিলাম, কিন্তু যাওয়া হয়নি ওই ঐতিহাসিক স্থানে
মতামতের জন্য ধন্যবাদ।
এখন কিছুটা ডেভেলপমেন্ট হয়েছে ওখানে। সুযোগ হলে ঘুরে আসবেন। ভালো লাগবে????