ব্রতচারী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ গুরুসদয় দত্ত জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮২ সালের ১০ই মে অবিভক্ত বাংলার সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার(বর্তমান অসম রাজ্যের অধীন)বীরশ্রী গ্রামে। ছাত্র হিসেবে অসাধারণ প্রতিভা ছিল। সিলেটের ইংরেজি স্কুল থেকে ১৮৯৯ এন্ট্রান্স, প্রেসিডেন্সি থেকে ১৯০১এ এফ এ পাস করে ইংল্যান্ডে গিয়ে ১৯০৪এ আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সেখানে কিছুদিন অধ্যাপনার পর তিনি ১৯০৫ এর শেষে দেশে ফিরে আসেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্যরূপে। তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরী করলেও স্বজাত্যবোধ ও দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে ছিলেন নির্ভীক। ১৯৩০ সালে লবন আইন আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধী গ্রেফতার হলে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ঠেকাতে গুলিচালনার নির্দেশ দিতে তিনি অস্বীকৃত হন। ফলে তাঁকে বদলি হতে হয়। তিনি লোকনৃত, লোকসংগীত ইত্যাদির প্রতি খুবই উৎসাহী ছিলেন। জাতীয়তাবাদী লেখক হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল ও বহু পুস্তক তিনি রচনা করেছেন। কিন্তু তিনি বাঙালির কাছে আজীবন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন মহান ব্রতচারী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের কারণে।
ব্রতচারী আন্দোলন ছিল বিশ্বব্যাপী আত্মিক ও সামাজিক উৎকর্ষ সাধনের এক মহৎ প্রয়াস। ১৯৩২ সালে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এর লক্ষ্য ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ, স্ত্রী-পুরুষ ও বয়স নির্বিশেষে সব দেশের মানুষের মধ্যে একটি বিশ্ব নাগরিকত্ববোধ সহ জাতীয় চেতনা প্রতিষ্ঠা করা। সংঘবদ্ধভাবে লোকনৃত্য ও লোকসংগীত চর্চার মাধ্যমে শরীর মন ও আত্মাকে বিকশিত করা এবং এরই সঙ্গে দেশ ও মানবসেবায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে কাজ করা ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যেই গুরুসদয় দত্ত ‘বাংলা ব্রতচারী সমিতি’ গঠন করেন এবং তারই প্রচেষ্টায় বাংলার বহুস্থানে এর বিস্তার ঘটে। এমনকি ইউরোপেও এর প্রভাব পরে। ১২নং লাউডন স্ট্রিটে ছিল এর মূল কার্যালয়। ব্রতচারী সাধকদের জ্ঞান, শ্রম, সত্য, ঐক্য ও আনন্দ- এই পঞ্চব্রতে দীক্ষিত হয়ে চরিত্র গঠন ও দেশসেবায় আত্মোৎসর্গ করতে হোত। ব্রতচারী সাধনা চারটি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল- চরিত্র, কৃত্য, সঙ্ঘ ও নৃত্য। বাংলার অনেক স্থানের মধ্যে হুগলি জেলা ব্রতচারী সমিতি ও কলকাতায় কালীঘাট উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় ব্রতচারী সঙ্ঘ ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৯৪১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর এই আন্দোলন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে যায়।
বাঙালির জীবনে এক চরম হিতৈষী ছিলেন গুরুসদয় দত্ত। কিন্তু আজ অনেকেই তাঁর নাম জানেনা। তিনি একপ্রকার অবহেলার শিকার। কলকাতার সন্নিকটে ব্রতচারী গ্রাম প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর এক প্রশংসনীয় কীর্তি। তিনি লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্প সংগ্রহেরও চেষ্টা করেন। তার সংগৃহিত অনেক নিদর্শন ঠাকুরপুকুরে অবস্থিত জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তাঁর কীর্তিকে ধরে রাখা ও বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা বাঙালী হিসেবে আমাদের কর্তব্য। এই মহান বাঙালির ১৩৮তম জন্ম জয়ন্তিতে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁকে স্মরণ করি।
(কৃতজ্ঞতা স্বীকার: বাংলাপিডিয়া)