বাড্ডার পোস্ট অফিস গলি থেকে বের হলেন লোকটা। চোখে পুরনো চশমা। পাকা উষ্কখুষ্ক চুল মাথায়। হাতে বাজারের ব্যাগ। বড় রাস্তায় এসে সোজা দক্ষিণ দিকে হাঁটা শুরু করলেন। ওদিকেই বাজার। সকাল হলেও রোদের তেজ বেশ চড়া! আজ রাস্তায় খুব বেশি যানজট। লোকটা হাঁটছিলেন উদভ্রান্তের মতো। বাস-ট্রাক, প্রাইভেট গাড়ি-স্কুটারের সঙ্গে রিকশার ক্রিং ক্রিং শব্দে তাঁর কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা। তবু সামনে হাঁটতে লাগলেন। বাজার না করলে চলবে? এক পাশে আবর্জনার স্তূপের দুর্গন্ধ, অন্য পাশে ফুটপাত দখলে নিয়ে ফার্নিচারের দোকান। হেঁটে যাবেন কী করে! রিকশাওয়ালা গায়ে হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল, আরে চাচা মিয়া, আপনে তো চাক্কার তলে পইড়া যাইবেন। সত্যিই তো চাকার তলায় পড়ে যাবেন! চাকার তলায় পড়ে মারা গেলে কী হবে? কিছুই হবে না কারো। হয়তো তার আত্মাটা সামান্য হা-হুতাশ করবে নিকট-ভবিষ্যতের নানা অবিষ্কার দেখতে না পাওয়ার জন্য—এই তো? সামনে পহেলা বৈশাখ। পালা-পার্বণে বাজারের উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে অসহায় বোধ করেন লোকটা। তবে তা শুধু ওই সময়টুকুর জন্যই। দু-এক দিন পর আবার ভুলে যান এসব।
এক পাশে সরে গিয়ে দেখলেন রিকশাওয়ালা তাঁর দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসছে! উঁচু বিলবোর্ডে ক্যাটরিনা কাইফের বিশাল ছবি, বেগুনি পাতলা ফিনফিনে সিল্ক পরে উড়ছে নক্ষত্রজগতের সেনসেশন ক্যাটরিনা। তাঁর মায়াবী চোখ আর রঙিন ঠোঁট বলছে—দুনিয়া দেখবে যখন সিল্ক দিয়ে সাজবে জীবন। বার্জার সিল্কের বিজ্ঞাপন! টিভির খবর শুরুর আগেই হরবখত এই যুবতীর মুখ দেখতে হয় দর্শককে। রিকশাওয়ালা ওভাবে হাসার কারণ ওটাই। মুরব্বি কেন তাকাবে ওই অপ্সরার দিকে!
লোকটা বাজারে ঢোকার আগে হোটেলে ঢুকে পড়লেন। চা খাবেন। শুধু চা খাবেন তা নয়, এখানে বসলে ভালো লাগে তাঁর। চা খাওয়া যায়, নানা কিসিমের মানুষ চোখে পড়ে, তারা টিভির খবর দেখে, চলচ্চিত্রের গান শোনে। সঙ্গে সঙ্গে চা খাওয়া মানুষগুলোর কথাও উপভোগ করা যায়। যতক্ষণ ঘরের বাইরে এসব জায়গায় থাকেন ততক্ষণ বেশ আনন্দেই থাকেন। এখানেও ভিড়! চিনি ছাড়া এক কাপ র-চায়ের অর্ডার দিলেন। লোকজন চা খাচ্ছে আর টিভি দেখছে। বঙ্গোপসাগরে বিশাল ইঞ্জিনের নৌকায় জীবন্ত কঙ্কালগুলো বড় বড় ভয়ার্ত চোখে তাকাচ্ছে ক্যামেরার দিকে। কত দিন পেটে দানাপানি পড়েনি, কে জানে! ‘এইগুলা বাঙালি, মালয়েশিয়া যাইতাছিল, ঢুকতে পারে নাই—চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল একজন।’ খবরের মাঝখানে আবার বিজ্ঞাপন। হালকা-পাতলা গোলাপি শরীর ভেসে এলো পর্দায়—দীপিকার শরীরের সুরভি নিয়ে নতুন লাক্স স্টার কালেকশন। চা খেতে খেতে সিগারেট ধরালেন একজন। লোকটার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, কী খবর আবুল হাসান সাহেব, আগে তো মাঝেমধ্যে দেখতাম লেকের ধারে হাঁটছেন, এখন হাঁটা ছেড়ে দিয়েছেন নাকি?—না না, হাঁটাহাঁটি ছাড়িনি তো, হয়তো দেখা হয় না, সে জন্য—লোকটা বললেন।
বাজারের ফর্দটা বের করলেন পকেট থেকে। আজ অন্য রকম ফর্দ, বড় ইলিশ মাছ, মুরগি, খাসির মাংস, পোলাও চাল, তার সঙ্গে মসলা এটা-ওটা নানা কিছু। ফর্দটা করেছে তাঁর স্ত্রী। নৈমিত্তিক বাজারের টাকাটা খরচ করবেন লোকটা। অতিরিক্ত টাকা হাতে দিয়ে তাঁর স্ত্রী বলেছে, মাছ, মুরগি, মাংস আর চালের জন্য আলাদা টাকা দিলাম। লোকটা জানেন, তিন-চার দিন পর ছেলে আসবে বউ নিয়ে। সে থাকে মালিবাগে। ছাত্ররাজনীতি করে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর কোনো রকমে বিএটা পাস করে বলেছিল, ব্যবসা করবে। চাকরি করলে সারা জীবনে কিছুই করতে পারবে না। ছেলে কোথায় কী করে, কিভাবে তার সময় কাটে কিছুই জানতে পারেন না লোকটা। জানতে চানও না। কার কাছে জিজ্ঞাসা করবেন? স্ত্রীর কাছে জিজ্ঞাসা করলে কী বলতে কী বলে বসবে তার কি কোনো ঠিক আছে! সব সময় খিটমিটে ভাব। কথা বললেই তার মাথায় রক্ত উঠে যায়। তার থেকে চুপচাপ মুখ বুজে থাকা অনেক ভালো। জীবনের খাতা খুলে কখনো হিসাব-নিকাশ করলেন না লোকটা, করার ইচ্ছাও নেই। কোনো দিন করবেনও না। সংসারের ঘূর্ণিতে কত মানুষ কোথায় ভেসে যাচ্ছে, আর তিনি তো সামান্য এক মাস্টার! এই শহরে তাঁর নিজের কোনো ফ্ল্যাট নেই। গাড়িও নেই। এসব তো তাঁর জন্য নয়। সব কিছু সবার জন্য নয়। ভাড়া বাসায় জীবন কেটে গেল। তবে এত দিন কাটলেও এখন আর কাটছে না। একটু-আধটু বাগিবতণ্ডা হলেই স্ত্রীর সোজাসাপ্টা কথা তীরের মতো বিঁধে যায় লোকটার বুকের ভেতর—মানুষ গড়ার কারিগর! কী সুন্দর কথা! সারা জীবন করলা ভাজি, আলু ভর্তা খেয়ে মাস্টারি করে করে এখন তো ফসিল হয়ে গেছ। এভাবেই কথার বাণ ছুড়ে দেয় তাঁর স্ত্রী।
প্রথমে মাছের বাজারে ঢুকলেন লোকটা। আজ ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া। মনে হলো ইলিশে হাত দিলে হাতে ফোসকা পড়ে যাবে। মাঝারি সাইজের একটা ইলিশের দাম জিজ্ঞাসা করলে মাছওয়ালা পাত্তা দিল না লোকটাকে। কারণ কী? পাত্তা দিচ্ছে না কেন? লোকটার মনে পড়ল, এই বাজারে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কেনাকাটা করছেন কিন্তু এই সাইজের ইলিশ কেনেননি কখনো! সে জন্যই তাঁকে পাত্তা দিচ্ছে না বেটা মাছওয়ালা। এবার বেশ শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন, কৃত্রিম ভাব আনলেন গলার স্তরে, গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, এইটা কত? মাছওয়ালা তাঁর চোখের ওপর চোখ রেখে বলল, দাম চাইলে ষোল শ, নিলে এক দাম বারো শ। লোকটার মনে হলো, এই বাজারের মাছওয়ালারা যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক মনোবিজ্ঞানীর চেয়ে বড় মনোবিজ্ঞানী। তারা ক্রেতার মুখ দেখে বলে দিতে পারবে কার পকেটে কত টাকা আছে অথবা কে কোন সাইজের মাছ কিনতে পারবেন! লোকটা বললেন, এত দাম চাচ্ছ কেন, এক হাজার রাখো? মাছওয়ালা লোকটার সঙ্গে কোনো কথা না বলে এক হালি মাছ বড় পলি ব্যাগে ঢুকিয়ে পাশের ক্রেতার ব্যাগে পুরে দিয়ে সালাম দিল—আবার আইসেন স্যার। মাছওয়ালা এবার লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হাজার-এগারো শ হইব না, পলা বৈশাখ, বাজার চড়া দেখতাছেন না?’ লোকটা এখন কী করবেন! দ্রুত মানি ব্যাগ থেকে বারো শ টাকা বের করে বললেন, এই মাছটা দাও।
ফর্দ দেখে এক-এক করে মুরগি, মাংস, পোলাও চাল, মসলা কেনা শেষ হলে রাস্তার এক পাশে এসে দাঁড়ালেন লোকটা। সব কিছুর দাম বেশি হলেও আজ অনেক টাকার বাজার করলেন। ব্যাগ ভরা বাজার। হঠাত্ মনে হলো, তাঁর স্ত্রী এত টাকা পেল কোথায়? সে সংসারের টাকা থেকে একটু একটু জমিয়ে তার পছন্দের জিনিস কেনে। এই টাকাটা কী সেই জমানো টাকা! একটা রিকশা ডেকে বাজারের ব্যাগ নিয়ে উঠে বসলেন। চারপাশে গনগনে রোদ। চৈত্রের গরম বাতাসে পুড়ে যাচ্ছে মানুষের শরীর। রিকশা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে চলল। রিকশা টানতে কষ্ট হচ্ছিল বয়স্ক রিকশাওয়ালার। চারপাশে মানুষের কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, এর মধ্যেই লোকটাকে ভাবালুতায় পেয়ে বসল। বিয়ের পর একদিন স্ত্রীর কাছে গল্প করেছিলেন…ট্রেনিং শেষ হলে বর্ডার পার হয়ে আমরা কুড়িজনের দল ঢুকে পড়লাম আলমডাঙ্গার দক্ষিণ দিকে নীলমণিগঞ্জে। আমাদের হাতে এসএলআর, শুধু দলের নেতা হান্নানের হাতে ছিল এসএমজি। সে আমাদের কমান্ডার। কুড়িজনের দলে তিনজন ছিল ভয়ংকর দুঃসাহসী, কমান্ডার হান্নান আর দুজন, সেলিম আর পচা, পচার নাম ছিল আকবর আলী। পচা রেকি করে এলো সকাল ১০টায়। ১০-১২ জন পাকিস্তানি সেনা দুপুরে নীলমণি বাবুর বাড়িতে অবস্থান নেবে। উদ্দেশ্য, ওই বাড়িটাকে ক্যাম্প বানিয়ে আশপাশের গ্রামে আত্মগোপন করে থাকা যুবকদের খুঁজে বের করে হত্যা করা। কারণ ওই সব যুবক কুষ্টিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সব কিছু শুনে হান্নানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে কুড়িজনের দলকে তিন ভাগে ভাগ করে দিল। প্রথম দল থাকবে রেলস্টেশনের দক্ষিণে প্লাটফর্মের আড়ালে, দ্বিতীয় দল হাই স্কুলের আড়ালে, আর তৃতীয় দল থাকবে দূরে মাঠের মধ্যে পাটক্ষেতের আড়ালে। যারা দূরে মাঠের মধ্যে অবস্থান নেবে, তারা শত্রুর পেছনে চলে যাবে। প্রথম ফায়ারটা শুরু করবে তারা। তারপর তিন দিক থেকে। কী যে হলো সেদিন, হান্নানের কথা শুনে আমরা বারুদের মতো জ্বলে উঠলাম। বসে আছি শত্রুর অপেক্ষায়…। গল্পের মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে তাঁর স্ত্রী জানতে চেয়েছিল, তোমার সনদটা দেখাবে একদিন? পলিথিন পেপারে রাখা সনদটা টিনের পুরনো বাক্স থেকে বের করে একদিন স্ত্রীকে দেখিয়েছিলেন লোকটা। তারপর দীর্ঘ সময় কেটে গেছে, সনদ নিয়ে আর কোনো কথা হয়নি। গত বছর ডিসেম্বরে হঠাত্ এক রাতে দেখলেন তাঁর স্ত্রী টিনের পুরনো বাক্স খুলে কিছু একটা খুঁজছে! লোকটা বললেন, কী খুঁজছ? কোনো কথা না বলে উদ্ভ্রান্তের মতো খুঁজতে খুঁজতে তাঁর স্ত্রী বলল, পেয়েছি! কী পেয়েছ? লোকটা জানতে চাইলেন।—তোমার সনদটা, এই দেখো!—আশ্চর্য! এই রাতে কী হবে ওটা।—দেখলাম ঠিকমতো আছে কি না। সেই রাতে তাঁর স্ত্রী বলেছিল, ওই সনদ দেখিয়ে কত মানুষ কত কিছু করে ফেলল, তুমি কিছুই করতে পারলে না, আশ্চর্য! স্বগতোক্তি করেছিলেন লোকটা—দেশ স্বাধীন হয়েছে, এক হাজার মাইল দূর থেকে কেউ আর এখন চোখ রাঙাতে পারে না, নিজস্ব পতাকা ওড়ে স্কুল-কলেজে, খেলার মাঠে—এসব তো অনেক পাওয়া, ছেলে-বুড়ো সবাই জানে দেশ গড়তে হলে দুর্নীতি হটাতে হবে সবার আগে। লোকটার ভাবনা তাঁকে আবার অতীতে নিয়ে যায়…বছর দশেক আগে হান্নানের সঙ্গে দেখা। বলেছিল, হাসান তোর তো লেখার হাত আছে নীলমণিগঞ্জের যুদ্ধটার কথা লিখিস, আমার কথা, সেলিমের কথা, পচার কথা, সেদিন অ্যাম্বুশ করতে করতে শহীদ হয়েছিল রহমান—তার কথা, আমাদের সবার কথা লিখিস। লেখা আর হলো কোথায়? দুই বছর আগে অবসর নেওয়ার পর মুন্সীপুর গিয়েছিলেন পচার সঙ্গে দেখা করতে। কয়েকজন কম বয়সের ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলীকে চেনো? চেনে না কেউ! শেষে মুক্তিযোদ্ধা পচা বলার পর চুল-দাড়ি পাকা কয়েকজন মানুষ তাঁর দোকান দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ পচা, ওই যে দোকানে চা করতিচেন, উটাই পচা। দুঃসাহসী গেরিলা পচা এখন চা-দোকানি!’ দোকানের সামনে গিয়ে একটা টুল টেনে নিয়ে বসলেন লোকটা। লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা, মুখে সাদা গোঁফ-দাড়ি। কোমরটা একটু বাঁকা, মাথা সামনে ঝুঁকে আছে, দুই চোখের মণি ঢুকে গেছে কোটরে। চিনতে কষ্ট হলো পচাকে।—কেমন আছ পচা? জিজ্ঞাস করলেন লোকটা। অপরিচিত লোকের মুখে আচমকা নিজের নাম শুনে অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকালেন পচা!—চিনতি পারলাম না তো, কিডা আপনি! —ভালো করে দেখো, চিনতে পারো কি না? পচা লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে অতীতের স্মৃতি খুঁড়তে লাগলেন—না চিনতি পারলাম না, নাম বলেন…। —হাসান, আবুল হাসান, এবার চিনতে পেরেছ?—কুন হাসান?—একাত্তরের নীলমণিগঞ্জের…। চায়ের কাপটা এক পাশে সরিয়ে রেখে কয়েক সেকেন্ড লোকটার দিকে তাকিয়ে থেকে তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন পচা। তাঁদের দুজনের চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে গেল। চা দোকানে বসে দুজনার মধ্যে অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। লোকটা জানতে পেরেছিলেন, সেলিম মারা গেছে, চিকিত্সা পায়নি, হয়তো দুঃসাহসী গেরিলা পচাও একদিন চিকিত্সা না পেয়ে মরে যাবে! ভৈরব নদীর পারে এক রাতে ওরা কুড়িজন চিত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল, সারা দিন বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত, আকাশজুড়ে ভরা জ্যোত্স্না ছিল সেই রাতে, ওরা খুব নরম সুরে একসঙ্গে গেয়েছিল—চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি। কুড়িজন যুবকের অবসেশন! তাঁদের অহংকার ১৯৭১! চারপাশের যানজট শব্দজটের মধ্যে বসে লোকটা বিড়বিড় করছিলেন। বাম দিকে যামু? —রিকশাওয়ালার কথায় লোকটার ভাবালুতা কেটে যায়। —হ্যাঁ, হ্যাঁ বাঁ দিকে যান।
ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে রিকশা। বাজারে যাওয়ার সময় যেসব বিলবোর্ড দেখেছেন, ওগুলো এখন আর চোখে পড়ছে না। এখন রিকশা যাচ্ছে দক্ষিণ দিক থেকে উত্তরে। এদিককার বিলবোর্ডগুলো সুন্দরী তরুণীদের ছবিতে ভরে আছে। হঠাত্ তাঁর চোখে পড়ল আকাশছোঁয়া উঁচুতে বিশাল এক বিলবোর্ড। যার ওপরের এক কোনায় ছোট্ট করে নেতা-নেত্রীদের ছবি। মাঝখানে বোর্ডজুড়ে এক যুবকের ছবি! সে হাত তুলে হাসছে। নিচে লেখা আবির হাসান, ছাত্রসভার সহসাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য রহিমুল্লাহ ভাইকে অভিনন্দন জানাচ্ছে, সে সবার দোয়া চায়। আকাশের সমান উঁচু বিলবোর্ডে একজন ছাত্র বিজ্ঞাপন দেয় কী করে! দেওয়ার টাকা পায় কোথায়! দেশের মানুষের বিবেক-বুদ্ধি কি লোপ পেয়ে গেল! লোকটার শরীর কাঁপছিল! কোনো রকমে রিকশার হুড ধরে বসে থাকলেন। মুক্তিযোদ্ধার সনদটা কি পাচার হয়ে গেল ছেলের কাছে! দুঃখ ভোগ আর কাকে বলে! লোকটা দেখলেন ঘরের ভেতরে-বাইরে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে গেছে তার বিপরীতে…মানুষ গড়ার কারিগর! কী সুন্দর কথা! সারা জীবন করলা ভাজি, আলু ভর্তা খেয়ে মাস্টারি করে করে এখন তো ফসিল হয়ে গেছ! বিশাল উঁচু বিলবোর্ডটার দিকে তাকিয়েই আছেন লোকটা। হতবাক! তাঁর নিজস্ব কোনো চিন্তাভাবনা কাজ করছে না। মনে হলো কেউ তাঁকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে পাশের অবর্জনার স্তূপে। এখন তাঁর সারা শরীরে পচা-আবর্জনার দুর্গন্ধ!
ক্রমেই লোকটা ফসিলে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন।
৮ জানুয়ারি, ২০১৬