১৫৬২-৬৩তে আকবর দাস নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মাথায় রাখতে হবে আমেরিকায় যেভাবে বাগিচা কৃষিতে দাস ব্যবহার হয়েছে, বা উপনিবেশিক সময়ে বাগিচা কৃষিতে ব্রিটিশ ভারতে দাস ব্যবহার হয়েছে সেভাবে ব্রিটিশপূর্ব সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দাসেদের ব্যবহার করা হয় নি। মাথায় রাখতে হবে দাস শব্দ উচ্চারণ করতেই আমরা যে আমেরিকিয় দাস প্রথার কথা চিন্তা করি, সেটা অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতকে বাংলা তথা দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু এক প্রকারের দাস প্রথা আলোচনার ফল। তবুও অস্বীকার করার উপায় নেই আলোচ্য মুঘল সমাজে দাসেরা ছিল, বহুল পরিমানেই ছিল। আকবরের নির্দশটি ছিল কোনও সেনাই কোনও শিশু, নারী বা বিপক্ষের সেনার কোনও আত্মীয়কে দাস হিসেবে রাখতে পারবে না। আরিফ কান্দাহারি তারিখ-ই-আকবরিতে বলছেন, আকবরের নির্দেশ ছিল ‘কোনও পুরুষ, মহিলা বা শিশু বা বয়স্ককে দাস করা যাবে না, কোনও দাস মহিলার অমূল্য জীবনের বিনিময়য়ে তাকে কেনাবেচাও করা যাবে না’। এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার আকবর ব্যক্তিগতভাবে দাস রাখার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করে নির্দেশিকা জারি করেছিলেন, যা আকবরনামায় স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয় নি।
রফিউদ্দিন সিরাজির তাজকিরাতুলমুলুক থেকে ইরিফান হাবিব তাঁর আকবর এন্ড সোসাল ইনইকুয়ালিটিজ — আ স্টাডি অব দ্য এভোলিউশন অব হিজ আইডিয়াজ প্রবন্ধে বলছেন, এই সময়ে ১৫৬৩-৬৪তে অন্তত আগরায় দাস কেনাবেচা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এই প্রবন্ধে ইরফান হাবিব উক্ত বই থেকে উদাহরণ দিয়ে বলছেন, রফিউদ্দিন শিরাজির এক বন্ধু ১৫৬৩-৬৪তে আগরায় দাস বিক্রি করতে গেলে শহরের কোতোয়ালের নির্দেশ শুনতে পান যে নির্দেশে বলা ছিল বাজারে দাস বিক্রি করলে তার আঙুল আর কাজ কেটে আগরার দুর্গের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হবে। আইনইআকবরি সূত্র আমরা জানি শহরের কোতোয়ালের অন্যতম কাজ ছিল, তিনি যদি মনে করতেন দাস বিক্রি করায় সেই দাসের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় আঘাত লাগছে, তাহলে সেই কাজ তিনি বন্ধ করাতে পারতেন। তাছাড়া আরও একটি নির্দেশে ভূমিপথে দক্ষিণ এশিয়া থেকে দাস রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়।
হয়ত এর ফলে সে সময় পরম্পরাগত, দীর্ঘদিন ধরে, বিশেষ করে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা চলা দাস বাজারগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়ে ঘুরতে আসা কোনও ইওরোপিয় মুসাফির, চতুর্দশ শতকে সুলতানি আমলের মত, মুঘল সাম্রাজ্যের কোনও শহরেই দাস বাজারের কথা উল্লেখ করেন নি। ১৫৯০-৯১তে বাদাউনিও পরিতৃপ্তিতে বলছেন দক্ষিণ এশিয়ায় মুক্ত মানুষকে দাস করা বা বিক্রি করার প্রবণতা বহুলভাবে কমে গিয়েছিল।
আমাদের মনে হয় এই সব কাজকর্মের ফলেই দাস সরবরাহে ঘাটতি আসতে থাকে। যারা অভিজাতদের গৃহস্থিতে কাজ করে দাস জন্ম নিয়েছিল, তাদের ওপরেও এই আদেশ প্রযুক্ত হয়। ফলে অভিজাতরাও এই আদেশের ফলে প্রভাবিত হতে থাকে। শাহী সেনাবাহিনীর আধিকারিক আবুল ফাতা গিলানির রুকাতইআবুলফাতায় পাচ্ছি, তিনি শাহী শিবির থেকে ফতেহপুর সিক্রিতে এক বন্ধুকে চিঠি লিখে দাসীদের মধ্যে থেকে তার উপযুক্ত উপপত্নী (দাহ্ dah) খুঁজে পাঠাবার অনুরোধ করছেন। তিনি বলছেন, তার এই অনুরোধ রাখতেই হবে, তিনি কোনও অজুহাত শুনবেন না। কিন্তু তিনি যে অনুরোধটি করছিলেন, সেটা সে সময় রক্ষা করা খুবই সমস্যার ছিল। অন্য একটা চিঠিতে তিনি ভাইকে লিখছেন, তার কাছে থাকা দুটি দাসীর মধ্যে একটিকে ছেড়ে দিতে চান, কারন এখনও দুটোর একটাও সন্তান উৎপাদন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই দুটি দাসীকে তিনি ফতেহপুরসিক্রির ব্যক্তিগত দাস মালিকের থেকে কিনেছিলেন। আমরা দেখলাম আকবরের রাজধানীতে, বাজারে বিক্তি না হলেও ব্যক্তিগতভাবে অভিজাতরা দাস হাত বদল করতেন।
সম্রাট স্বয়ং বিপুল সংখ্যক স্ত্রী পুরুষ দাস নিয়ন্ত্রণ করতেন। গৃহস্থিতে নানান পরিশ্রমের কাজের উপযোগী দাসের উপস্থিতি ছাড়াও জেনানা, শাহী গৃহস্থী এবং দরবারের নানান কাজে, নানানস্তরে বিপুল সংখ্যক দাস ব্যবহার করা হত। জেনানায় বিপুল সংখ্যক রাজ্ঞী, উপপত্নীদের কাজ সমাধা করতে প্রচুর গতর খাটানো দাসীর প্রয়োজন হত। জানানখানা [জেনানা] সুরক্ষিত রাখার জন্যে খোজাদের ব্যবহার করা হত পুরুষ দাস রক্ষী হিসেবে। ১৫৮২ তে আকবর দাস রাখা নিজের থেকে বন্ধ করে দিলেন। তিনি শাহী নিয়ন্ত্রণে থাকা হাজারো দাস দাসীকে ছেড়ে দিলেন তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীনতা দিয়ে, তিনি তাদের বললেন তারা চাইলেও সাম্রাজ্যেও কাজেও দৈনিক ভাতার বিনিময়য়ে তাদের শ্রম দিতে পারেন। তখন তাদের গুলাম বা চেনা কিছুই বলা যাবে না। পুত্র নাম দিয়ে, প্রভুর কোনও মানুষের ওপর দাসত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি জেহাদ ঘোষণা করলেন। তবে তাঁর নির্দেশে তখনও মহিলা দাসের কথা উল্লিখিত হয় নি। কিন্তু তাদের নামও বদলে গেল চেলা’র অনুকরণে তাদের পরিস্তরন (উপাসক, যেমন চেলা) নাম দেওয়া হল; তখন থেকে তাদের কানিজাক বা কানিজ বা দাহ নাম সরকারি নথি থেকে মুছে দেওয়া হল।
বাবা এবং ঠাকুর্দার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আকবরকে নিশ্চই বিপুল সংখ্যক দাস পালন করতে হয়েছে। আইনইআকবরিতে আকবরের আমীর অভিজাতদের যে তালিকা পাচ্ছি তাতে দেখছি হুমায়ুনের চারজন দাস [একজন ২০০০, দুজন ৯০০ এবং একজন ২০০ মনসবদার] এবং একজন বাবরের খোজা দাসের নাম। তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরিতে পাচ্ছি আকবর হুমায়ুনের দুজন দাস আধিকারিকের পদোন্নতি করান একজন পেশরাউ খান, অন্যজন মিহতার খান। তাছাড়া বিদেশি প্রতিনিধি, শাসক এবং অন্যান্য অভ্যাগতদের থেকে প্রচুর দাস উপহার পেতেন। পেশরাউ খানকে পারস্যে গুলামির অত্যাবশ্যক প্রশিক্ষণ দিয়ে উপহার দিয়েছিলেন শাহ তামস্প।
শাহী প্রয়োজনে যে সব দাস ব্যবহার করা হত তাদের যতদূরসম্ভব সামরিক অভিযানের সময়ই সংগ্রহ করার চল ছিল। তিনি নিজের রাজত্বে স্থানীয় বিদ্রোহী এবং অবাধ্য চরিত্রগুলোর হাতে মহিলাদের দাসী করা আর শিশুদের দাস করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু এই নির্দেশের এক-দেড় বছর আগে মালওয়ার শাসক বাজ বাহাদুরকে হারিয়ে তিনি তার সামগ্রিক হারেমের দাবি জানিয়ে একলপ্তে তুলে এনেছিলেন। এর আশেপাশের সময়ে ১৫৬৭তে চিতোর বিজয়ের পরেই তিনি বিপুল সংখ্যক পুরুষ মহিলা দাস নির্বিশেষে অধিকার করেছিলেন। দক্ষিণের অভিযানে নাচ গানের মহিলাদের দাস হিসেবে অধিকার করা হত। হয়ত আকবরের এই নির্দেশ বিজিত শাসকদের হারেমের প্রতি প্রযুক্ত হত না, কারন সেটি শাহেনশার লুঠ হিসেবে পরিগণিত হত। এই সব বিজয়ের ফলে বিপুল সংখ্যক অধিকৃত মহিলাকে জেনানার কাজে জুড়ে দেওয়া হত। বিদ্রোহী অভিজাতদের জেনানাকেও ছাড় দেওয়া হত না। দখলি মহিলাদের সম্রাট তার ইচ্ছে মত বন্টন করতেন। ফলে সাধারণ মানুষের দাস রাখার অধিকারে নিষেধাজ্ঞা সাধারণভাবে সাধারণ সেনার দাস রাখাকে নিষিদ্ধ করেছে।
তবুও সাধারণ মানুষের দাস রাখার প্রবণতা থামে নি। জাহাঙ্গির জিতপুরের বিদ্রোহী জমিদারের জমিদারি দখল করে তার দখলে থাকা মহিলাদের কব্জা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী, কন্যা সহ জেনানার মহিলাদের ঠাঁই হয়েছিল শাহী জেনানায়। কল্পি এবং খের সামরিক অভিযানে, মুঘল সুবাদারেরা বিপুল সংখ্যক মানুষকে দাস বানান। ১৬০৪-১৪-য় রাজপুতানা অভিযানে বহু মহিলা শিশুকে দাস বানানো হয়েছে। ১৬৩২-এ মথুরা থেকে বিপুল সংখ্যায় মহিলা, শিশু এবং চাষীদের দাস বানানো হয়েছে। তখনও সাধারণ মানুষের দাস রাখা নিষিদ্ধ ছিল।
সপ্তদশ শতাব্দে দাস করার বহু উদাহরণ পাচ্ছি। ফৌজদার যখন কোনও বেয়াড়া গ্রামকে ‘শিক্ষা দেন’, বিদ্রোহীদের পরিবারের মহিলাদের তাকে উপহার দেওয়া হয়, গ্রামের অন্যান্য মহিলাদের দাস বানাত তার বাহিনীর সেনা, বাকিদের বিক্রি করে দেওয়া হত। সেওতি গ্রাম দখলের এক অভিযানের সরকারি নথি থেকে দাহ বা উপপত্নী বিক্রি করার ডিড থেকে এইসব তথ্য পাওয়া গিয়েছে।
মুঘল অভিজাতরাও এইসবভাবে দাস দখল করতেন। কিন্তু সাধারণ মহিলারা খুব বেশি শাহী বা অভিজাতদের জেনানায় পৌঁছত না। তাদের দাস চাহিদা বিশেষ করে উপপত্নীর চাহিদা নির্ভর করত মহিলার শারীরিক বৈশিষ্ট্য, কৃষ্টিগত অর্জন, ভব্যতা এবং সভ্যতার আচারবিচারের ওপর।
মূলত রাজস্ব বাকি পড়া গ্রামে সেনা অভিযান করে মহিলাদের ধরে আনা হত। পিটার মুণ্ডি লিখছেন সামগ্রিক গ্রামের রাজস্ব বাকি রাখা বিদ্রোহের নামান্তর এবং তার জন্যে চরম শাস্তি বরাদ্দ ছিল। পুরুষদের হত্যা করা হত, ‘বাকি মহিলা, আর শিশুদের ধরে এনে দাস হিসেবে বিক্রি করা হত’। মনরিকেও বলছেন রাজস্ব না দিতে পারায় চাষী তার ছেলে মেয়ে বৌকে দাসের হাটে নিলামে তুলে বিক্রি করেছে’। তাছাড়া মন্বন্তরের সময়েও মানুষ নিজেকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিত। এটাও দাস জোগাড় করার অন্যতম প্রধান পথ ছিল। সিজার ফ্রেডরিক ক্যাম্বের মন্বন্তরের উদাহরণ দিচ্ছেন। ১৫৯৭তে একখণ্ড রুটির জন্যে মন্বন্তরে মানুষ নিজের পুত্রকে বিক্রি করছে। গুজরাট এবং দক্ষিণে এটা স্বাভাবিক প্রথা ছিল। আকবর দাস বিক্রি নিষিদ্ধ করলেও মন্বন্তরে আত্মীয়দের দাস হিসেবে বিক্রি করা জায়েজ ছিল।