দক্ষিণ এশিয়া ভূখণ্ডে খোজাদের চাহিদা পৌরাণিক কাল থেকে তুঙ্গে ছিল। মনুতে স্পষ্টভাবে খোজা/হিজড়াদের উল্লেখ আছে। আর পি কাংলের (R. P. Kangle) অনুবাদে অর্থশাস্ত্রে খোজাদের বিভিন্ন প্রকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের লাগানোর নানানস্তর আলোচনা করা হয়েছে। সোমদেবভট্টর কথাসরিত সাগরের খোজাদের অস্তিত্ব দেখি। বাণভট্টে যে কঞ্চুকিদের বর্ণনা পাচ্ছি, যারা অস্ত্র হাতে রাজকীয় অন্তঃপুর এবং তার সম্মান রক্ষা আর পাহারা দিতেন, তাঁরা প্রত্যেকেই অসম্ভব সম্মানিত ছিলেন। শান্তিনিকেতনের ছাত্র হাজারিপ্রসাদ দ্বিবেদীর বাণভট্ট কী আত্মকথা, প্রিয়নাথ সেনের অনুবাদে বাণভট্টের আত্মকথায় খুব বিশদে কঞ্চুকিদের বিশদ আলোচনা আছে। খোজাদের সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানোর প্রথা ব্রিটিশ পূর্ববর্তী ৫৫০ বছরেও বিপুলভাবে দেখি। দক্ষিণ এশিয়ায় ধনী পুরুষদের অন্তঃপুরের মহিলা দলকে পাহারা দেওয়ার কাজে খোজাদের ব্যবহার করা হত। ব্যক্তিগত সহচর হিসেবে ব্যবহার করার কাজে খোজাদের তুমুল চাহিদা ছিল। প্রভু, তাঁদের ইচ্ছে মত খোজা ভৃত্যকে ব্যবহার করতে পারতেন। ব্রিটিশ টমাস বোয়ারি (Thomas Buari) বলছেন মুসলমান বা দেশিয়রা চাইতেন না তাদের স্ত্রী বা কন্যারা একা একা বাইরে বেরোক। তাদের অন্তঃপুরেই খোজা আর সুগঠিত যুবতীদের পাহারায় দরজা বন্ধ করে রাখা হয়’। বাওরির সমসাময়িক টমাস ফ্রেয়ার (Thomas Frear) ‘মুসলমানদের চরিত্র ঈর্ষা খুব বড় ভূমিকা পালন করত, তারা পরিবারের মহিলাদের বন্দী করে রাখতেন এবং মহিলা খোজারা [ক্যাপনস] তাদের পাহারায় থাকত’। ব্রিটিশ ফ্রেয়ারের পক্ষে খোজাদের ক্যাপনস বলা খুব আশ্চর্যজনক নয়, কারন তিনি মনে করতেন, ‘ফোকলা মহিলা, মাকুন্দ খোজারা তাদের যৌন চাহিদা পূরণ করতে পারতেন না বলেই তাদের [গৃহস্থ বাড়ির] মহিলাদের পাহারা দেওয়ার কাজে লাগানো হত’।
মুঘল পূর্বসময়ে খোজাদের রাজনৈতিক সাফল্যের বড় উদাহরণ মালিক সারওয়ার। তিনি জৌনপুরের শর্কি সাম্রাজ্যর প্রতিষ্ঠাতা। ১৩৮৯ তে তিনি খাজাইজাহান উপাধি পান। ১৩৯৪ তে সুলতান নাসিরুদ্দিন মহম্মদ শাহ তুঘলক তাঁকে মালিক-উস-শার্ক উপাধি দিয়ে জৌনপুরের প্রধান প্রশাসক নিযুক্ত করেন। খুব কম সময়ের মধ্যে তিনি আতাবাকইয়াজম উপাধি নিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এটাওয়া, কোলি, কনৌজের বিদ্রোহ দমন করে দক্ষিণ বিহার পর্যন্ত রাজত্ব বিস্তার করেছিলেন। বাংলার লক্ষনৌতি এবং ওডিসার জাজপুরের শাসকেরা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে হাতি উপহার পাঠান। মালিক সারওয়ার, মালিক উজির নামে একটি হিন্দু পরিবারের দাস শিশুকে দত্তক নেন। এই মালিক উজির তুঘলক সুলতানের জল বাহক ছিলেন। সারওয়ারের মৃত্যুর পর তাঁর দত্তপুত্র মালিক উজির, মালিক করনফিল নাম নিয়ে সিংহাসনে বসে মুবারক শাহ নাম নিলেন। তিন বছরের রাজত্বে তিনি নিজের নামে মুদ্রা চালু করেছিলেন।

তবে সুলতানি আমল বা মুঘলপূর্ব সময়ে খোজারা বিপুল পরিমানে প্রশাসনে নিযুক্ত হতেন। ফ্রেয়ার লিখছেন, ‘খোজারা প্রভুদের মনঃতুষ্টি করে… দাস অবস্থা থেকে সাম্রাজ্য প্রধানও হয়েছেন’। মুঘল আমলে খোজাদের রাজনৈতিক ভূমিকা প্রায় শূন্য ছিল।
তুরুস্কুদের (তুর্কি) আক্রমণের আগের সময়ে বাংলায় খোজাদের অস্তিত্ব জানা গেলেও তুর্কি বিজয়ের পরে ১৩৩৮-এর সুলতান ফকরুদ্দিন মুবারক শাহের রাজত্বের স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনা থেকেই বাংলায় খোজার চাহিদা বাড়িতে শুরু করে অভিজাত আমীরদের অন্তঃঅউর/জেনানা, বাড়িঘরদোর সামলানোর কাজে। বাংলার সুলতানি আমলে দুধরণের খোজা ছিল, দেশিয় এবং বিদেশি। বিদেশিদের হাবসি খোজা নাম দেওয়া হত। এদের অধিকাংশ পূর্ব আফ্রিকার আবিসেনিয়া অঞ্চলের অধিবাসী। প্রথম বিপুল পরিমাণে হাবসি খোজা নিযুক্ত করেন সুলতান রুকনুদ্দিন বরবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪)। তার প্রশাসনে ৮০০০ খোজা ছিল। তার উত্তরাধিকারী শামসুদ্দিন ইয়ুসুফ শাহ এবং জালালুদ্দিন ফতেহ শাহের রাজত্বে হাবসি গুলামেরা বিপুল শক্তি আর সম্পদ সংহত করতে থাকে। জালালুদ্দিন ফতেহ শাহ হাবসি খোজাদের বাড়তে থাকা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলে তিনি বিদ্রোহী খোজাদের হাতে নিহত হন। সিংহাসন দখল করে হাবসি নেতা বারবক শাহজাদা প্রথম ক্ষমতায় বসেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তিনিও ক্ষমতার লড়াইতে নিহত হন হাবসি সেনাপতি মালিক আন্দিলের হাতে। মালিক আন্দিল সাইফুদ্দিন ফিরুজ শাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তার তিন বছরের রাজত্বকালের ইতিহাস কিছুটা গৌরবের ছিল। অবশেষে প্রাসাদরক্ষীদের হাতে তারও মৃত্যু হয়। এবার ক্ষমতায় আসেন দ্বিতীয় নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ। কিন্তু কিছুকাল রাজত্ব করার পর তিনিও নিহত হন। এক হাবসি সর্দার তাকে হত্যা করে শামসুদ্দিন মুজাফফর শাহ নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন (১৪৯১-১৪৯৩ সাল)। অত্যাচারী ও হত্যাকারী হিসেবে তার কুখ্যাতি ছিল। ফলে গৌড়ের সম্ভ্রান্ত আমীর অভিজাত মুজাফফর শাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দেন মুজাফফর শাহের উজির সৈয়দ হুসেন। অবশেষে নিহত হন মুজাফফর শাহ। এইভাবে অবসান ঘটে বাংলার হাবসি শাসনের যুগ। সে সময় বহু হাবসিকে বাংলা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাদের অনেকেই গুজরাট আর দক্ষিণের দিকে পালিয়ে যায়।
কিন্তু টম পিরেজ বলছেন এত বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলায় হাবসি খোজাদের আধিপত্য শেষ হল না। তিনি ষোড়শ শতের দ্বিতীয় দশকে বাংলায় প্রচুর পরিমাণে হাবসিদের সম্ভ্রান্ত ঘরে কাজ করতে দেখছেন, ‘শাসকেরা সকলে আবিসেনিয়। তারা জমিদারিও[নাইট] সামলাচ্ছে। তাদের বিপুল সম্মান। সুলতানেরা তাদের বাড়িতে আসেন। তাদের গোষ্ঠী প্রধান এক হিজড়া। যারা হিজড়া নয় তারা যুদ্ধে অংশ নেয়। রাজার পরেই সুলতানি রাজত্ব হাবসিদের ভয় পায়’। আগেই উল্লেখ করেছি ১৪৮৬ থেকে ১৪৯৩ পর্যন্ত সুলতান এবং সুলতান বানানোর মূল কারিগর ছিলেন হাবসি খোজাদের মধ্যে যারা হিজড়া। বরবক শা ছাড়া অন্যদের নাম হিসেবে পাচ্ছি কাফুর (কর্পুর), করণফিল (লবঙ্গ), ফিরুজি (নীলকান্তমণি), আলমাস (হিরে), ইয়াকুত (রক্ত-সাদা শিসমনি), হাবাসি খান, আনদিল, সিদ্দি বদর ইত্যাদি। নামগুলো থেকে বুঝতে পারি এরা সকলেই হিজড়া/খোজা বা তাদের অনুগত ছিলেন। সাধারণত হিজড়াদের দামি পাথর আর রত্নের নামে নাম দেওয়া হত, কিন্তু কাফুর, হাবসি খান, আনদিল বা সিদ্দি বদর নাম থেকে পরিষ্কার এদের উৎপত্তি আফ্রিকায়, এরা বাংলার জন্ম-খোজা নয়। একই প্রসঙ্গে জানানো যাক ইবন বতুতা বাংলা প্রবাসকালে যে লুলু (মুক্তো) নামে দাস-সঙ্গী কেনেন, সে হিজড়া/খোজা ছিল।

তবে বাংলায় স্বচ্ছল অভিজাত আমীরদের বাড়িতে হাবসি পোষা খুব গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক স্তর নির্দেশক ছিল। বাংলার অধিকাংশ হিজড়া ছিলেন দেশিয় বাঙ্গালী। তারা হাবসিদের মত বিক্রি হতেন, অথবা সিলেট থেকে যেমন সুলতানি দরবারে হাবসি উপহার/নজর হিসেবে গিয়েছিল, তেমনি উপহার হিসেবে হিজড়াদেরও পাঠানো হত। আওরঙ্গজেবের সময়ে এরকম এক বাঙালি খোজার ঘটনা পরে উল্লেখ করব।
বাংলায় সুলতানি আমল শেষ হয়ে মুঘল আমল শুরু হলে স্বাধীন সুলতানের দরবার প্রাদেশিক সুবাদারের দরবারে রূপান্তরিত হল। এখান থেকে নানান দামি পণ্য আগরা এবং অন্যান্য মুঘল দরবারে উপহার হিসেবে পাঠানোর সময়ের সূচনা হয়। দাসদের [সাধারণত সুন্দরী, বালক দাস এবং হিজড়া] নজর, উপঢৌকন হিসেবে পাশের রাজ্যে পাঠানো বাংলা শুধু নয় দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘ কালের প্রথা। আইনইআকবরি বা তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরিতে বাংলা থেকে কেন্দ্রিয় দরবারে দাস পাঠানোর যে উদাহরণ দেখি, সেই পরম্পরা শুরু হয় সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের সময় থেকে। তাঁর নীতি ছিল রাজস্বের দেনা দাস দিয়ে শোধ করার। জাহাঙ্গির যতদিন না ফরমান জারি করে এই প্রথাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করছেন, ততদিন বাংলা থেকে বিপুল পরিমানে দাস দিল্লিতে পাঠানো হতে থাকে।
জাহাঙ্গির লিখছেন তাঁর আগে বাবার রাজত্বে সুবা থেকে দাস উপহার হিসেবে কেন্দ্রিয় দরবারে পাঠানোর প্রথা বন্ধের সক্রিয় উদ্যম নিয়েছিলেন। কারন তিনি নিজের হারেমের দসেদের উন্নয়নের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রূপায়িত করেছিলেন। এই নিষিদ্ধকরণ বিষয়ে ঐতিহাসিক আবুলফজল আইনিআকবরিতে বিশদে লিখেছেন। সৈয়দ আমীর আলি দ্য স্পিরিট অব ইসলামে লিখছেন প্রাচীন সাসানিয় ইরান বা বাইজান্টিয়ামে যে খোজাকরণ শুরু হয়, আব্বাসিদ খলিফাদের সময় সেটা বিশালভাবে সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শাসকশ্রেণীর মধ্যে। ইসলামি আইনে কঠোরভাবে খোজাকরণ নিষিদ্ধ করা হলেও সে নির্দেশ মানা হয় নি। রাষ্ট্র নিযুক্ত মুহতসিবের কাজ ছিল এই ধরণের কোনও ইসলাম বিরোধী কোনও কাজ আটকানো এবং শাস্তি দেওয়া। কিন্তু ইসলামি সাম্রাজ্য জুড়ে খোজা দাসেদের এতই চাহিদা ছিল যে ইসলামি আইনের বিধান উড়িয়ে সব থেকে দামি দাস, হাবসি খোজাদের কেনাবেচা প্রকাশ্যেই চলতে থাকে সাম্রাজ্যের মদতে। (চলবে)