ক্রমশ বোঝা যাচ্ছে মুঘল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় শাহী পুরুষ, নারীর মধ্যে একটা পার্থক্যের স্থায়ী দেওয়াল, পর্দা প্রথা তৈরি হচ্ছে এবং হারেমে থাকা নারীদের জন্যে আলাদা রীতিনীতি তৈরি হচ্ছে। পর্দা প্রথা নিয়ে আকবরের নির্দেশে হুমায়ুনের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে লেখা হুমায়ুননামায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে হুমায়ুনের বোন, গুলবদন বানু বেগম বলবেন, এই প্রথার কল্যাণে মুঘল সাম্রাজ্যের বয়স ৫০০ বছর কমে গেল। আশ্চর্যের হল, মধ্য এশিয়ার আদবাসী গোষ্ঠী থেকে উদ্ভুত এক নারী, যাঁদের জীবনে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনতা অনেক বেশি ছিল [আগের কিস্তিতেই তাঁর পিতা বাবরের শিবিরে অন্যান্য পুরুষের সঙ্গে বসে মদ্যপান করা হুলহুল আনিকার কথা উল্লেখ করেছি বাবরের স্মৃতিকথা থেকেই, রুবি লালের বয়ানে] তিনি মহিলাদের স্বাধীনতা হরণে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, অথচ তার ২০০০ বছর আগে, এক ধর্ম প্রধান গৌতম বুদ্ধ, মহিলাদের ভিক্ষুণী করার উদ্যোগে উদ্যোগী, তাঁর প্রধান সচিব আনন্দের উৎসাহে নিমরাজি হয়ে, পালিতা মা গৌতমী এবং অন্যান্য ৫০০ শাক্য নারীকে বুদ্ধ পন্থে নেওয়ার সময় তিক্ত স্বরে বলেছিলেন মহিলাদের অংশগ্রহণে বুদ্ধপন্থের বয়স ৫০০ বছর কমে গেল (মণিকুন্তলা হালদার, বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস)।
ফতেহপুর সিক্রির মূল প্রাসাদে এই পর্দা প্রথা কঠোরভাবে অনুসরণ করার উদ্দেশ্যে স্থাপত্য কাঠামো নতুন করে বিকাশ করাবেন সম্রাট আকবর। মনসারেত সূত্রে মনে হয় এই পর্দা প্রথাটি ১৫৮০ নাগাদ মুঘল শাহী পরিবারে বলবত হতে শুরু করবে। মনসারেত থেকে শাহী খাওয়ার ঘরের বর্ণনা থেকে পাই, ‘সেগুলি [খাওয়া বহনকারী তৈজস] যুবারা খাওয়ার ঘরের দরজার সামনে বয়ে আনে। যুবাদের সামনে ভৃত্যরা সার বেঁধে যায়। সঙ্গে থাকে প্রাসাদপ্রধান। এখানে খাদ্যপাত্রগুলো হাত বদল হয় খোজাদের সঙ্গে। তারা খাওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা যবতীদের হাতে সেগুলি তুলে দেয়’। এটা হল জেনানা মহল এবং পুরুষ মহলের মাঝের অংশ, যে অংশে মূলত খোজাদের (এবং মহিলা ভৃত্য আর অভিকর শিল্পীদের জন্যে বরাদ্দ, যাদের কাজের চরিত্র তুলনামূলকভাবে দুই এলাকায় যাওয়া আসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট) কাজকারবার।
ফলে আমরা দেখলাম, খোজাদের ক্রমশ মহিলামহল থেকে বার করে এনে মহিলা মহলের বাইরে, প্রাসাদের নানান কাজে লাগানো হচ্ছে। আইনইআকবরির আলাদা অধ্যায়ে বিশদে আলোচনা আছে জেনানার প্রশাসনিক রীতিনীতি নিয়ে, জেনানায় মহিলাদের কাজকর্ম নিয়ে। দেহরক্ষীরা হতেন, ‘প্রশান্ত, সংযত এবং কর্মী মহিলা… তাদের স্পষ্টভাবে রাজ্ঞীদের মহলে মোতায়েন করা হত’। জেনানার নিরাপত্তায় নিরাপত্তা রক্ষীদের দিয়ে বেশ বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হত। খোজারা প্রাসাদের দেওয়ালের বাইরে পাহারা থাকতেন আর জেনানার ভেতরে থাকতেন উরদুবেগী নামে মহিলা দেহরক্ষী।
আবুলফজল, খোজাকরণের পদ্ধতিতে সৃষ্টি খোজাদের নানান শ্রেণীবিভাগ দেখেছিলেন [এটা আমরা আলোচনা করেছি বাংলায় খোজাদের নিয়ে আলোচনার প্রবন্ধে] — কখনও পুরো জননাঙ্গটাই কেটে ফেলা হত শুধু জলত্যাগ করার জন্যে একটা মাত্র ফুটো থাকত। কারোর শুধু অণ্ডকোষ কেটে ফেলা বা অকেজো করে দেওয়া হত, আবার কারোর শুধু লিঙ্গের একাংশ অকেজো করা হত। পুরুষত্ব নাশ করা সত্ত্বেও জেনানায় খোজা পুরুষদের বিশ্বাস করা হল না। হয়ত খোজা আর মহিলাদের মেলামেশা পুরোপুরি আটকানো যেত না বলেই জেনানা থেকে খোজাদের কার্যত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয়। যারা জেনানার আশেপাশে ছিলেন, সেই খোজাদের ওপর খুব কঠোর শর্ত চাপানো হল। শর্ত ভাঙলে কড়া শাস্তি বরাদ্দ ছিল। টমাস রো লিখছেন— জাহাঙ্গিরের সময় জেনানার এক রাজ্ঞী এবং এক খোজা চুমু খাওয়া অবস্থায় ধরা পড়লে খোজাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। খোজাকে হাতির পায়ের তলায় ফেলা হয় এবং জল খাবার না দিয়ে একটি খাদে মহিলাটির হাত বেঁধে হাতটা সূর্যের রশ্মির দিকে মুখ করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে অন্য কেউ পুরুষত্বহীন খোজাদের সঙ্গে শারীরিকভাবে লিপ্ত না হতে পারে।
ডি ল্যাক্ট বলছেন,— রাজ্ঞীরা মহিলা দেহরক্ষীদের কঠোর নিরাপত্তায় দিন কাটাতেন এবং রাজ্ঞীরাও কঠোরভাবে মহিলা দেহরক্ষীদের কাজকর্ম নজরদারি করতেন ‘কোনও দেহরক্ষী যদি তার কর্তব্যে ভুলচুক করত, তাহলে তার কঠোর শাস্তি বরাদ্দ ছিল এবং যাতে সেই দেহরক্ষীর প্রতি শাস্তিটা প্রযুক্ত হয় সেটাও জেনানার সেই শাহী মহিলা নিশ্চিত করতেন’। ডি ল্যাক্ট এবং অন্যান্য ইওরোপিয় মুসাফিরের লেখা আমাদের বলে খোজারা জেনানায় দেহরক্ষী কাজ করতেন না, তাদের ব্যবহার করা হত মহিলাদের ওপর নজরদারি চালাতে, মহিলারা যাতে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা না করেন, মহিলাদের চরিত্র যাতে বিগড়ে না যায় সেটা দেখা ইত্যাদি কাজে। খোজাদের কাজকর্মও আলাদাভাবে নজরদারি করা হত।
জাহাঙ্গির কেন খোজাকরণের বিরোধী হলেন, সে তথ্য খুব একটা স্পষ্ট নয়। আকবর দাস প্রথার বিরুদ্ধে নিয়ম করেন ১৫৮২-তে। দাসেদের তিনি মুক্ত করেন, চেলা লামে অভিহিত করেন। কিন্তু আকবরের এই বিশাল পদক্ষেপের কোনও চরিত্রই জাহাঙ্গিরের খোজাকরণ বিরোধী নির্দেশে জড়িয়ে ছিল না। খোজাকরণ এবং খোজাদের বাণিজ্য বন্ধ করার বিশাল দাবি করলেও তিনি সেই কাজে বিন্দুমাত্র সফল হন নি। ঐতিহাসিকেরা বলছেন হয়ত জেনানা মহলের সুরক্ষা আর লোকচক্ষুর থেকে মহিলাদের ব্যক্তিগতজীবনকে বাঁচানো প্রশ্ন উঠে আসায় তাঁর খোজাকরণ বিরোধিতার নীতি বিফল হয়।
সপ্তদশ শতকের জেনানা মহল নিয়ে বহু ইওরোপিয়র লেখায় বিশদ বর্ণনায় গরম কামার্ত, বেলেল্লাপনার হুদো হুদো বর্ণনা পাই। খোজাদের হাত ধরে হারেমে ঢোকা মানুচি এ সব বেলেল্লাপনার প্রচুর উদাহরণ বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এক নাজিরের উদাহরণ দিয়ে বলছেন, তিনি ক্ষমতাবানদের মধ্যে সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদী, রাজ্ঞী রোজগারের নিরাপত্তাবিধান করতেন। তিনি আমলাদের মধ্যে ক্ষমতাশালীতম মানুষ ছিলেন। প্রত্যেক ভৃত্য তাকে অত্যাবশ্যক সুরক্ষা সমীক্ষা দৈনিক জমা দিত। তাছাড়া খোজাদের দরজায় পাহারা রাখা হত জেনানায় ঢোকা বেরোনো মানুষদের ওপর নজরদারি করতে। বহু বৃদ্ধ এবং যুবা খোজা থাকত যাদের জেনানার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল হয় হাতচিটা নামক চিঠিপত্র আদান-প্রদানের বাহক হয়ে না হয় তাদের নিয়োগকারী কর্তাদের নানান বার্তা নিয়ে আসার কাজে। আমরা দেখলাম, খোজারা জেনানার ভিতরেও কয়েকটা কাজে প্রবেশ করত।
আকবরের যুগে প্রথম সময়েও নানা চিত্রে আমরা জেনানার মধ্যেকার ঘটনায় খোজাদের যে সব ভূমিকায় দেখতে পাই, সে ধরণের ভূমিকায় আর আমরা খোজাদের দেখতে পাচ্ছি না জাহাঙ্গিরের আমল থেকে। আগে যেমন গোটা মহিলামহলকে মিনিয়েচার ছবিতে ধরা হত, সেটা হচ্ছে না, জেনানায় যেভাবে মিনিয়েচারে খোজাদের মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখতে পেতাম, সেটা আর পাচ্ছি না — হয় খোজাদের গুরুত্ব কমেগেছে, নয়ত খোজারা হারেমের মধ্যে যে ধরণের পোষাক পরে ঘোরাফেরা করছেন, সে পোষাক হয়ত মহিলাদের পোষাক থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। ১৬১০-এর বিসন দাসের আঁকা শাহজাদার জন্ম ছবিতে প্রতিটা মহিলা পোষাক পরা চরিত্রের মধ্যে ৩ জনকে পাই যারা পুরুষদের মত শিরস্ত্রাণসহ একটু আলাদা পোষাক পরেছেন। তাদের ক্ষীণতনু, প্রখর/তীক্ষ্ণ অবয়ব, নেকলেস আর কান জড়ানো শিকলি দেওয়া কানপাশা অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। হয়ত যে সব পুরুষদেহে মহিলাদের বাস, তাদের হয়ত জেনানায় তুলনামূলকভাবে বেশি ছাড় ছিল।
অভিজাতদের জেনানায় বিপুল ভৃত্য এবং রক্ষী ব্যবস্থাপনায় দরবারের মত বিস্তৃত শ্রেণীবিভাগ ছিল না। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বাদ দিয়ে মহিলাদের নিরাপত্তা এবং যত্ন নেওয়ার কাজটা খোজারাই করত। সৈয়দ খানের ১২০০ খোজার দল ছিল। জনৈক ইতিবর খান ছিলেন তার উকিল। আরেক ইতিবর খান ছিলেন তার জায়গিরদারির ফৌজদার। ইওরোপিয়দের বয়ানে আমীরদের প্রশাসনে এবং গৃহস্থিতে খোজাদের স্বচ্ছলতা এবং ক্ষমতা বিশদে বর্ণীত হয়েছে – ‘তাদের ইচ্ছেই শেষ কথা ছিল – তারা সব থেকে ভাল ঘোড়া চড়ত, বাইরে প্রত্যেক পদক্ষেপে দাসেরা দেখাশোনা করত, ঘরে মহিলারা, আর তারা যে কাপড় পরত, সে গুণনাম শুধুই মালিক পরতে পারতেন’। এধরণের বয়ানে তাদের স্বচ্ছলতার মূলসূত্র বলা হয়েছে তাদের নারীস্বভাব, যে যুক্তি খুব পলকা বলেই মনে হয়েছে। (চলবে)