মুঘল সেনা এবং প্রশাসনেক সেবায় বাহিনীতে বিপুল পরিমান দাসের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। মাথায় রাখতে হবে প্রতিবেশী পারস্য বা ইরাণের রাজনীতির একটা বড় ভিত্তি ছিল দাস সমর্থন। যদিও ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতকে পারস্যের সুলতানের রাজত্বে দাসেদের যে অবদান ছিল, তার খুব একটা প্রভাব পড়ে নি পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতের সৈয়দ বা লোদিদের রাজনীতিতে — কিন্তু ষোড়শ শতাব্দে প্রাদেশিক রাজত্বগুলোয় দাস কাঠমো সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হবে। মুঘল জামানায় যেহেতু গৃহস্থ কাঠামো এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোয় দাসেদের বড় ভূমিকা ছিল, ফলে আমরা আশা করতেই পারি, রাজনীতিতেও দাসেদের একইরকম প্রভাব দেখতে পাব। ফলে আমরা এই খণ্ডে মুঘল সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনিক সেবায় দাসেদের কর্মকাণ্ড বিষয়ে আলোচনা করব।
মুঘল আমলের শুরুতে দাস-সেনা নিয়ে খুব বেশি তথ্য পাই না। মির্জা মহম্মদ হায়দার দাঘলাতের ব্যক্তিগত জীবিনের ইতিহাস তারিখ-ই-রশিদিতে সেনাবাহিনীতে বিপুল পরিমান দাস ব্যবহারের বর্ণনা পাচ্ছি, কিন্তু তারা সকলেই শিবির পাতা আর সেনাবাহিনীকে রসদ ইত্যাদি বিষয়ে সাহায্য করার দল। মির্জা বলছেন কনৌজে হুমায়ুনের হারের একটা বড় কারন হল রসদ নিয়ন্ত্রণ করা দাস বাহিনীর বিশৃঙ্খলা এবং বিভ্রান্তি। আমরা তৎকালীন সাহিত্যে সেনাদাসেদের খুব একটা উল্লেখ পাচ্ছি না। অথচ ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকের দিল্লিতে বিপুল পরিমান দাস সেনা এবং সেনা আধিকারিক বিশাল ক্ষমতা এবং সম্মান অর্জন করছেন। বাংলায় হাবসি [আবিসেনিয়] দাসেরা একজোট হয়ে তাদের প্রভুকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করার সংবাদে বাবরও হতবাক হয়ে যাচ্ছেন।
তুর্কিদের এবং মুঘলদের সামরিক পরম্পরা সম্পূর্ণরূপে আলাদা। তাদের পূর্বজ মোঙ্গলেরা যতদিন না ইসলামে যুক্ত হয় নি, ততদিন তারা সেনাবাহিনীতে পেশাদার দাস-সেনা ব্যবহার করত না, তারা দাস ব্যবহার করত সেনা কাঠামো তৈরির কাজে। ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর তারা সেনাবাহিনীতে গোলাম ব্যবহার করা শুরু করে। ১৩৫৫-তে তৈমুর ২০ বছর বয়সে দাস ব্যবহারের এচিভমেন্ট বলতে গিয়ে কিন্তু দাস-সেনার কথা উল্লেখ করছেন না। তখনও হয়ত মুঘলদের সেনাবাহিনীতে দাস-সেনা ব্যবহারের ধারণাটা আসে নি। পঞ্চদশ শতকে হেরাট বা তাবরেজের তৈমুরীরা দাসেদের সেনাবাহিনীতে ব্যবহার করত না সেটা আমরা বুঝতে পারি বাবরনামা এবং তারিখইরশিদি এ বিষয়ে উচ্চবাচ্য না করায়।
বাবর এবং হুমায়ুনের বাহিনীতে দাস ব্যবহার করা হয়েছে। হায়দার দাঘলাতের নেতৃত্বে হুমায়ুনের জন্যে হিন্দুস্থানকে উদ্ধার করতে দাস এবং মুক্ত মানুষদের নিয়ে তৈরি সেনাবাহিনী কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আইনইআকবরিতে উল্লিখিত হয়েছে বাবর এবং হুমায়ুনের সময় বেশ কিছু দাস নিচু শ্রেণীর আমলা পদও অলঙ্কৃত করেছেন। যেমন পেশরাউ খান। পারস্যের সুলতান তামস্প, হুমায়ুনকে পেশরাউ খান নামে জনৈক শিক্ষিত দাস উপহার দেন। তিনি হুমায়ুনের সময় শুধুই প্রহরী হিসেবেই জীবন কাটিয়েছেন, সেনাবাহিনীতে সেবা দেওয়ার সুযোগ পান নি। দাসেদের শুরুতে মূলত গৃহস্থিতে কাজে লাগানো হত, কিন্তু তারা বিশ্বাস অর্জন করলে তুলনামূলক উচ্চপদাধিকার দেওয়া হত; তাছাড়া বহু দাস যেহেতু মালিকের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটাত তাই দাস আর প্রভু দুজনের মধ্যে গভীর সম্বন্ধও বিকশিত হতে দেখি বহু ক্ষেত্রে। সুলতানি আমলে যেরকম পরিকল্পিত এবং পদ্ধতি মেনে সেনায় দাসেদের অন্তর্ভূক্তি ঘটেছে, সে উদাহরণ আমরা মুঘল আমলে দেখি না।
আকবরের সময় থেকেই মুঘল কাঠামোয় বিশাল সংখ্যক দাস অস্তিত্ব লক্ষ্য করি। তিনি বেশ কয়েক হাজার, দাসকে ১৫৮২তে মুক্তি দেন। দাসেদের মধ্যে গৃহস্থিতে কাজ করা ছাড়াও দাসেদের একটা বড় অংশ অস্ত্রধারী দ্বাররক্ষী এবং সম্রাটের আশেপাশে থাকা রক্ষীদলের কাজ করত। সম্রাট দাসেদের মুক্তি দিয়ে তাদের নাম দিলেন চেলা; তাদের পদাতিক বাহিনীর একাংশে নিয়োগ করার তথ্য পাচ্ছি আইনইপিয়াদাগন অংশে। কেউ কেউ মাঝারিগোছের পদাধিকারীও হলেও তাদের ছোট সেনাপত্য এবং কম অঙ্কের মনসব অর্জন করেই খান্ত দিতে হয়েছে। তাছাড়া আগেই বলেছি কয়েকজন সম্রাটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীও হন। এদের নাম হয় চেলা, আবুল ফজল চেলা নিয়ে বিশদ বাক্যব্যয় করেছেন। মুক্ত দাস চেলাদের বিভিন্ন কাজে লাগানো হল।
আকবরের সময়ে যে বিপুল পরিমানে বিকশিত দাস ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতে সম্রাটকে কেন কঠোর পদক্ষেপ নিতে হল, তার কোনও বাস্তবজনোচিত ব্যখ্যা নেই। ১৫৮২-র পরে দাসেদের চাহিদা যে বেড়েছিল, এমন কোনও ইঙ্গিতও নেই সমসাময়িক লেখাপত্রে। বহু পুরুষ দাস, খোজাকৃত দাসের ধরা পড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত হওয়ার উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে এবং খোজাকরণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত আবুলফজল দিচ্ছেন। তিনি লিখছেন, ‘প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা চালানোর উদ্দেশ্যে খোজাকরণ বন্ধ করতে কঠোর দাওয়াই দিয়ে গর্বিত খোজাকারিদের মৃত্যুদণ্ড, অন্ধত্ব এবং অঙ্গহানির শাস্তি দেওয়া জরুরি ছিল’। উদ্ধার করা খোজা আর দাসদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে নিয়োগ করা হয়। বিপুল সংখ্যক দাস আর খোজাকে যে নানান ধরণের প্রশিক্ষণ দিয়ে সম্রাটের গৃহস্থি, ব্যক্তিগত, সামরিক কাজে নিয়োগ করা আদতে সাম্রাজ্যের মহিমা বাড়ানোর কৌশল ছিল মাত্র। আমাদের মনে হয় আকবর সাম্রাজ্যের কেন্দ্রিকরণের পরিকল্পনা রূপায়ন করলেন বলেই তাতে তিনি দাস বা প্রাক্তন দাসেদের শাহী রক্ষী বাহিনীতে নেওয়ার উৎসাহ দেখান নি।
মুক্ত দাসেদের দিন প্রতি ১ দাম থেকে ১ টাকা দৈনিক মজুরিতে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া হল। যদিও ঐতিহাসিকেরা বলছেন এতে দাসেরদের দৈনন্দিনের অর্থনৈতিক জীবনে খুব বেশি প্রভাব পড়ে নি, কিন্তু মাথায় রাখতে হবে দাস মুক্তি আকবরের সময়ের খুব বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল। তাছাড়া আমরা যেন মাথায় রাখি মুঘল আমলের দাসেদের সঙ্গে কোনও ভাবেই আমেরিকিয় বাগিচা কৃষির দাস ব্যবস্থার তুলনা করা যায় না। তবে আকবরের সময়েরই বিচারের রায় চেলা এবং সাধারণ প্রজাদের জন্যে আলাদ আলাদা হত। দুজনকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হলে, জনৈক হাসান খান চেলাকে পিটিয়ে বন্দী করে রাখা হল, আর অন্যজনকে বিচার শুরু না হওয়া পর্যন্ত শুধুই বন্দী করে রাখা হয়। সমসাময়িকেরা অধিকাংশ সময়ে প্রাক্তন দাসেদের গুলাম নামেই অভিহত করতেন, চেলা নয়। বান্দা থেকে চেলায় উত্তোরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। চেলা শব্দে প্রভুর সঙ্গে ভৃত্যের সঙ্গে যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বন্ধন তৈরি হত, সেটা অতটা বান্দার সঙ্গে জুড়ে থাকত না। বাদাউনি বলছেন আকবর, হিন্দু প্রথা যোগী পরম্পরার অনুসরণে চেলা নামে বিশেষ এক অনুগামী গোষ্ঠী তৈরি করান। তবে আকবর বিদ্বেষী বাদাউনির এই ব্যাখ্যার কোনও যৌক্তিকতা নেই কারন আবুলফজল নিজে চেলা শব্দের বিস্তৃত বর্ণনা লিখেছেন, এবং যে কোনও অভিজাতও চেলা হতে পারত। (চলবে)