নবাবি আমলে কিছুটা ব্রিটিশ আমলের শুরুতে কলকাতায় [এবং অবশ্যই বাংলাজোড়া] জমিদার, স্বচ্ছল, অবস্থাপন্ন বাড়িতে প্রচুর হাবসি দাস দেখা যেত। হাবসি দাস রাখা সে সময়কার আভিজাত্যের অন্যতম প্রকাশভঙ্গী ছিল। বাংলায় সুলতানি আমলে হাবসি দাসেরা ক্ষমতাও দখল করেন।
আকবর যে জেনানা [হারেম] শুরু করেন, সেই জেনানায় যেটায় বিদেশি, মুঘলদের লব্জে ফিরিঙ্গি [পরে ফিরিঙ্গি বলতে শুধুই ব্রিটিশ জনগণ বোঝাবে] রুশ, পোলিশ, পর্তুগিজ ইত্যাদি দেশের মহিলা থাকত, সেই অংশের নাম দেন বাঙালি জেনানা। আইনিআকবরিতে বলা হয়েছে হাবসি খোজারা মূলত বাংলা থেকেই যেত দিল্লি আগরা লাহোরের দরবারে। গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় হাবসি খোজাদের বিপুল অংশ সরবরাহ করত মুঘলদের বুলগাখানা [বিদ্রোহের বাড়ি] বাংলা। এই প্রবন্ধের পরের দিকে দেখব বাংলার ঘোড়াঘাট এবং সিলেট অঞ্চলে ব্যাপকাকারে বালকদের খোজা করা হত; তাদের প্রশাসনে কাজ করার, অভিজাতদের সুরক্ষা দেওয়া, দ্বাররক্ষা ইত্যাদি কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত এবং তারপরে ভারতবর্ষের বাজারে নিয়ে যাওয়া হত বিক্রি করার জন্যে। এই জন্যেই হয়ত আকবর তার বিদেশিদের থাকার জেনানার নাম দিয়েছিলেন বাঙালি জেনানা।
ব্লখম্যানের অনুবাদে আবুলফজলের আইনি-আকবরির প্রথম খণ্ড সূত্রে জানা যাচ্ছে ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকজুড়ে সামগ্রিক মুঘল সাম্রাজ্যের জন্যে সব থেকে বেশি হাবসি খোজা [এবার থেকে শুধুই খোজা] সরবরাহের প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চল ছিল বাংলা সুবা।

হাবসি নামটির উৎপত্তি আরবী আল-হাবশ থেকে। আরবরা আল-হাবশ বলতে বুঝাত আফ্রিকার আবিসিনিয়াকে [আজকের ইথিওপিয়া]। ইথিওপিয় বা আবিসেনিয় জাহাজের নাখোদারা[মালিক কাম প্রধান নাবিক] দক্ষিণ এশিয়ায় রপ্তানি করা পণ্যের সাথে সজীব ক্রীতদাসও নিয়ে আসত উচ্চদামে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে। হাবসিরা শারীরিক ভাবে শক্তিশালী ছিল। তারা একসঙ্গে অনেক কাজ করতে পারত। ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ায় হাবসি ক্রীতদাসের চাহিদা বাড়তে থাকে। বাড়ন্ত চাহিদার সুযোগ নিয়ে পর্তুগীজ নাবিক এবং ব্যবসায়ীরা আফ্রিকা থেকে বিপুল পরিমান ক্রীতদাস ধরে নিয়ে এসে উপমহাদেশ বিক্রি করে মুনাফা করত। হাবসিদের অনেক সময় আফ্রো-ইন্ডিয়ান হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। আরবরা হাবশি বলতে জাঞ্জদের বোঝায় (আরবি জাঞ্জ শব্দের অর্থ আফ্রিকার নিগ্রো)। এছাড়া চীনারা আরবি ভাষার অনুবাদ করে হাবশিদের জিঞ্ঝি বা জিঞ্জি শব্দ ব্যবহার করে।
বাংলায় আসা মুসাফির ফ্রান্সিসকো প্লেসারেত বলছেন বাংলায় খোজা বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল সরকার ঘোড়াঘাট এবং সিলেট। বাংলার কপালে খোজা উৎপাদন এবং খোজা বাণিজ্যের নেতা হওয়ার টিকা কবে থেকে লাগল জানা যায় না। তবে খোজা সরবরাহের জন্যে বাংলাই যে ‘একমাত্র’ ভৌগোলিক সূত্র ছিল না সেটা বলাই বাহুল্য। কারন যে কোনও সময়ে, যে কোনও জায়গায় খোজা ‘তৈরি’ করা যেত সাধারণ পরম্পরার শল্য চিকিৎসার সামান্য জ্ঞান থাকলেই। ফলে দারুলইসলামের প্রান্ত ক্ষেত্রগুলো যেমন বাংলা, জাভা, মিশর এবং সুদানের মধ্যেকার নুবিয়া ইত্যাদি অঞ্চল খোজা উৎপাদন এবং ব্যবসার অন্যতম বড় কেন্দ্র ছিল। জাভার ক্ষেত্রে ভারথেমা ষোড়শ শতকের প্রথমপাদে লিখছেন ‘…এই দ্বীপে ব্যবসায়ীরা শিশু কেনা ছাড়া অন্য কোনও ব্যবসায় নিযুক্ত হত না, তারা বাচ্চাদের জীবন থেকে সব কিছু কেড়ে নিয়ে তাকে মহিলাদের মত গড়ে পিটে বাজারের চাহিদা মত তৈরি করত’। টম পিরেস ১৫১৩-য় বলছেন ‘জাভায় বিপুল সংখ্যায় খোজা ছিল। তাদের মূলত মহিলাদের মত কাপড় পরানো হত। মাথার চুল চুড়ো করে মাথার মাঝখানে ঊষ্ণীষের মত করে বাঁধত। খোজারা জাভার ঈর্ষান্বিত জনসাধারণের থেকে থেকে বাড়ির মেয়েদের বাঁচাতে অন্তঃপুরের মহিলাদের দেহরক্ষী হিসেবে নিযুক্ত হত। তবে অভিজাত, জমিদার, ধনীরা মেয়েদের প্রকাশ্য রাস্তায়, খোলামেলা পরিবেশে বের হতে দিত না, এ প্রথা রক্ষার জন্যে তারা জীবনও দিতে পিছপা হত না। এই ভূখণ্ডের মানুষ [অবরোধ] প্রথাটি নিয়ে এতই মুগ্ধ ছিল যে তারা এই প্রথা থেকে একচুলও বিচ্যুত হতে চাইত না’। উনবিংশ শতক পর্যন্ত সুদান থেকে মধ্য প্রাচ্যে বছরে ৩,৫০০ খোজা ব্যবসায় আনা হত; শোনা যায় এই ব্যবসায় খুব কম করে ৩৫,০০০ খোজা পরিবহনেই মারা যেত।
ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কোপোলোর স্মৃতিকথা খোজা ব্যবসা বোঝার প্রাচীনতম লেখ্য সূত্র। মাথায় রাখতে হবে তিনি বাংলার এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু বাংলার ভুগোল ইত্যাদি বিষয়ে খুব একটা জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন এরকম তথ্য প্রায় নেই বললেই চলে, তাও বিষয়টা বুঝতে তাঁর উদ্ধৃতিটি তুলে দেওয়া গেল। তিনি লিখছেন ‘এখানে প্রচুর খোজার বাস। এই প্রদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশের অভিজাত আমীরেরা খোজা সংগ্রহ করতেন…এই অঞ্চলে ইন্যান্য অঞ্চলের ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এসে আমার পূর্বে উল্লিখিত খোজা এবং দাস কিনে অন্য দেশে গিয়ে তাদের বিক্রি করে দেয়। এ দেশে খোজায় ভর্তি, কারন যাদেরই জেলে পোরা হত, তাদের সক্কলকে খোজা করা হয়েছে’। তবে তার বর্ণনায় খোজা হওয়া শিশুদের কোন রাস্তায় পরিবহন করা হত সে তথ্য পাচ্ছি না, বকেয়া রাজস্ব যে খোজা দিয়ে শোধ করা যেত, এই বিষয়টা তার লেখায় আসে নি, তার মনে হয়েছে অধিকাংশ খোজা যুদ্ধবন্দী। তবে এর এক’দু শতাব্দ পরে যখন খোজা ব্যবসা পেকে উঠেছে এবং এই ব্যবসা সম্বন্ধে জনগণের একটা ন্যূনতম জ্ঞান তৈরি হচ্ছে এবং শিকারকে খোজা করার পর আর শুধুই বাংলায় বা বাংলার প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর বাজারের জন্যে তৈরি করে রাখা দরকার হচ্ছে না, এ সময় খোজারা দূর দেশে চাকরি নিয়ে যাচ্ছে, তাদের বিক্রির বাজারও বাড়ছে।

ষোড়শ শতের প্রথম দফায় সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের (১৪৯১-১৫১৯খ্রিঃ) রাজত্বে দুই ইওরোপিয় মুসাফিরের অভিজ্ঞতা সূত্রে জানছি বাংলায় খোজাদের নিয়ে তুমুল ব্যবসার কথা। সুমা ওরিয়েন্টালে টম পিরেজ লিখছেন, ‘বাংলার খোজা রাখা [স্বচ্ছল গৃহস্থদের তুমুল] শখে পরিণত হয়েছে, বিশ্বে [খোজাদের নিয়ে] এমন [আগ্রহ] কোথাও দেখিনি’। ডুরেট বারবোসার লেখা আরও তথ্যদায়ী, ‘শহরের [বাঙ্গালার] মুসলমান ব্যবসায়ীরা অবসর সময়ে দেশের ভেতরে হিদেনদের বাবা-মার থেকে তাদের ছেলেদের কিনে বা চুরি করেন তাদের খোজা করায় যাতে খোজারা অন্য কোনও কাজের উপযোগী না থাকে। খোজা করার সময় অনেকে মারাও যায়। যারা বেঁচে থাকল, তাদের সুচারু প্রশিক্ষণ দিয়ে বিক্রি করা হয়। খোজাদের মহিলা, বাগান বা অন্যান্য সম্পদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্যে ব্যবহার করার প্রথা ছিল। এ ধরণের কাজ করতে খোজারা পারদর্শী।
খোজারা সমাজে সচ্চরিত্র মানুষ হিসেবে প্রভূত সম্মান পেত। তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যবসার ব্যবস্থাপক হয়ে, প্রদেশিয় প্রশাসক পদে আরোহন করে, রাজাদের ডান হাত হয়ে বিপুল অর্থ রোজগার করে বিশাল বিশাল প্রাসাদে বাস করেন’। এ প্রসঙ্গে তাভার্নিয়ের বর্ণনায় শাহজাহানের দরবারে খোজাদের প্রসঙ্গে এসেছে, ‘আগরার শাহী গোরস্থানগুলোর আকার আঙ্গিক খুবই মনোরম, আগরাজুড়ে এরকম প্রচুর সাজানো গোজানো গোরস্থান আছে, সম্রাটের হারেমের প্রত্যেকটি খোজা এধরণের বাগানে গোর যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। হারেমে বিপুল অর্থ রোজগার করে তারা প্রথমের প্রচুর উপহার নিয়ে মক্কায় যাওয়ার ভাবনা ভাবে; কিন্তু মুঘল সম্রাটেরা চান না যে অর্থ তাদের দেশের বাইরে বেরোক, তাই এই সব [বিদেশে যাওয়ার] পরিকল্পনায় তারা সায় দিতেন না। খোজারা যেহেতু বুঝতে পারত না এই বিশাল সম্পদ নিয়ে তারা কী করবে, তাই তারা এসইব সম্পদ ব্যয় করত নিজেদের গোরস্থান সাজানোগুজোনোয়। এইভাবে আগরাজুড়ে বিপুল পরিমান সুদৃশ্য মেমোরিয়াল গড়ে উঠেছে’। (চলবে)
চমৎকার। তথ্য সমৃদ্ধ।
কৃতজ্ঞতা দাদা
অসম্ভব ভালো। অচর্চিত লেখা। মনে হয় না বাংলায় এইভাবে আগে খোজাদের নিয়ে লেখা বেরিয়েছে কিনা।
তবে আমার একটু জানতে ইচ্ছে করে একটা জায়গায় লিখেছেন সাড়ে তিন হাজার খোজা পরিবহন করা হতো আবার মারা গিয়েছিলেন 35000 খোঁজা ।
এই সংখ্যাটায় বোধহয় একটু গন্ডগোল আছে সৈয়দ মুজতবা আলী এই নিয়ে গবেষণা করেছেন বলে জানি এই বিষয়টা যদি আপনি আলোকপাত করেন।
১। কৃতজ্ঞতা অনুপম পাল মশাই।
আপনি যে খোজাদের নিয়ে কথা বলছেন সেটা খাজা, খোজা নয়; আগা খাঁএর পূর্বজ। তাদের নিয়ে মুজতাবা আলির জার্মানিতে পিএইচডি। আমি যাদের নিয়ে লিখেছি, তাঁরা খোজা, এক প্রকার হিজড়ে। এরা এক সময় খুব প্রতাপশালী ছিল।
২। বছরে ৩৫০০ শুধু সুদানের হিসেব। গোটা এশিয়া আফ্রিকায় এবং অটোমান ইওরোপে বিপুল সংখ্যায় মারা যেত।
কত অজানার মধ্যে আরো একটু জানা।
পরের কিস্তি গুলো কীকরে পাবো?