দেবাশিস ভট্টাচার্য
লকডাউনের ফলে কাজ বন্ধ হওয়ায় শহর থেকে গ্রামমুখো হাজার হাজার শ্রমিকের মধ্যে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ২১ জন মারা গিয়েছেন। অভুক্ত থেকে শ শ মাইল হাঁটার ফলে তাঁরা মারা গিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে যোগী আদিত্যনাথ সরকার ঘরমুখো শ্রমিকদের আটকে জীবানুনাষক রাসায়নিক মিশ্রিত জল ছিটিয়ে স্নান করিয়েছেন। এতে শিশুরাও আছে। গত রবিবার ছত্তিশগড়ের এক প্রবীণা থানায় ফোন করে জানান, লকডাউনের ফলে তিনি ওষুধ কিংবা খাবার কিছুই কিনতে পারছেন না। বলেন, ‘না খেয়ে মরার চেয়ে আত্মহত্যাই করবো’। থানার পুলিশ গিয়ে খাবার দিয়ে আসেন। তিন দিন অভুক্ত থাকা সেই পরিবার।
দেশের প্রধানমন্ত্রী সোয়া তিন বছর আগে নোটবন্দী ঘোষণার সময় বুঝতেই পারেননি তাঁর হঠকারী কাজের ফলে কতটা ক্ষতি হবে। ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বহু ক্ষুদ্র শিল্প উঠে গেছে।
একটা প্রবাদ আছে ‘ভাবিয়া করিও কাজ’। মোদী ভেবে পরিকল্পনা করে কাজ করার লোকই নন। হঠাৎ লকডাউন ঘোষণা করলে হাজার হাজার মানুষ বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘরমুখো হবেন, শ শ মাইল হাঁটবেন – এ চিত্র মোদী ভাবতেই পারেননি। রবিবার রেডিওয় আত্মপ্রচারের প্রোগ্রাম মন কি বাতে বলেছেন, ‘গরিব ভাই বোনদের হাজারো অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে এজন্য আমাকে ক্ষমা করবেন’। দেশের প্রথম করোনা আক্রান্তের কথা জানা যায় ৩০ জানুয়ারি। তারপর পঞ্চাশ দিন ধরে তিনি এই সমস্যা ভুলে গিয়েছিলেন। তখন তিনি ব্যস্ত ছিলেন ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে, দিল্লির দাঙ্গা ও মধ্যপ্রদেশের সরকার দখল করতে। এরমধ্যে ১৯ মার্চ অর্থনৈতিক টাস্ক ফোর্স গঠন করার কথা ছিল। এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজও সারেননি। তারপর হঠাৎ ‘উঠল বাই তো কটক যাই’ ভাবনায় ২২ মার্চ জনতা কার্ফু এবং ২৪ মার্চ রাত ১২ টা থেকে ২১ দিনের লকডাউন ঘোষণা করলেন। এত বড়ো সিদ্ধান্তের আগে সরকারের কোনও প্রস্তুতিই ছিল না বোঝা যাচ্ছে। নোটবন্দি না হয় গোপন সিদ্ধান্ত ছিল, কিন্তু লকডাউন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সম্মেলন আগে কেন করা হলো না?
দেশের অবস্থা খুব খারাপ। কত লোক যে অনাহারে অর্ধাহারে দুর্ভাবনায় যোগাযোগের অসুবিধায় অ-করোনা রোগে মারা পড়বেন সে কথা ভেবে আঁতকে উঠি। শুধু মানুষই নয় অবলা প্রাণীরাও মারা পড়বে।
মোদী টেলিভিশন ও বেতারে ভাষণ দিয়েই তৃপ্ত থাকছেন। অন্য দিকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ১) আগামী দিনে কী হলে কী করণীয় তার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ২) রোগ যাতে না হয় তার ব্যবস্থা করছেন। এজন্য প্রথমেই তিনি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ করার কথা বলেছিলেন। বিদেশ বা ভিন রাজ্য থেকে আসা ব্যক্তিদের বাড়িতে চোদ্দ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলেন। কলকাতার রাস্তা এখন ওষুধ মিশ্রিত জল দিয়ে ধোয়া হচ্ছে। যা দেখে অমিতাভ বচ্চন টুইটে প্রশংসা করেছেন। ৩) আবার রোগ হলে তার নিরাময়ে হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো উন্নত করেছেন। নিজে সেখানে গিয়ে তদারকি করেছেন। গরমকালে এখন রক্তদান শিবিরও সম্ভব নয়, অথচ হাসপাতালে রক্ত দরকার তাই মুখ্যমন্ত্রীর পরিকল্পনায় প্রতিদিন পুলিশকর্মীরা রক্ত দিচ্ছেন। মোদীর মাথাতেই আসবে না। ৪) অনাহারে মানুষ যাতে মারা না যান সেজন্য বাজার ও পাইকারি বাজার খুলে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। ৫) গরিবদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ৬) নিজে বাজারে গিয়ে সবজির দাম জেনেছেন। চড়া দাম ঠেকাতে ব্যবস্থা নিয়েছেন। ৭) দুজন ক্রেতার মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য নিজের হাতে ইটের টুকরো দিয়ে গোলাকার ব্যবধান রেখা চিহ্নিত করে দিয়েছেন। ৯) ভিনরাজ্যে কর্মরত অথবা আটকে পড়া বাংলার মানুষদের অসুবিধে দূর করতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছেন। আবার অন্য রাজ্যের যে মানুষরা বাংলায় আছেন তাঁদেরও খোঁজ রাখছেন। ১০) মানুষের মন থেকে করোনার ভয় দূর করতে নিজে কবিতা লিখে তাতে সুর দিয়ে ইন্দ্রনীল সেনকে দিয়ে গাইয়েছেন। করোনা বিরোধী এই লড়াইয়ে গানটি পথে ঘাটে যেমন বাজছে তেমন প্রতি ঘরে পৌঁছে গেছে। এমন একজন জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী হলে আজ এই সঙ্কটের দিনে দেশের হাল এমন খারাপ হতো না।