টেনিদা বললে, “মেরে দিয়েছি কেল্লা। চল একটু মিষ্টিমুখ করে আসা যাক। …কোনও ভাবনা নেই —
বুঝলি? তোর এক পয়সাও খরচ নেই— সব পরস্মৈপদী”
পরস্মৈপদী? কে খাওয়াবে ? আমাদের মতো অপোগণ্ডকে খাওয়ানোর জন্য কার মাথাব্যথা পড়েছে ?
টেনিদা বললে, “ওরে গর্দভ, আজ যে হালখাতা। দোকানে গেলেই খাওয়াবে। ”
…বলেই পকেট থেকে বের করলে একগাদা লাল-নীল হালখাতার চিঠি।
টেনিদাদের শেষ অবধি হালখাতার খাওয়া দাওয়া কেমন হয়েছিল, সেটা জানতে হলে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প “হালখাতার খাওয়াদাওয়া” পড়তে হবে।

হালখাতা। বাংলা নতুন বছরে এখন প্রায় বিলীয়মান, বিবর্ণ একটি উৎসবের ধারা। চার দশক আগেও এই হালখাতার ব্যাপারটি গঞ্জে তো বটেই, খোদ মহানগরেও যথেষ্ট আড়ম্বরে পালিত হতো।
বঙ্গজীবনের প্রচলিত ধারায় বাংলা বছরের প্রথম দিনটিতে দোকানী, ব্যবসায়ীরা হিসেবের পুরোন খাতা বন্ধ করে নতুন খাতার শুভ মহরত করেন। আরবী ‘হাল’ শব্দটির অর্থ ‘বর্তমান কাল’। হাল সনের খাতা, তাই হালখাতা।
লাল মলাট দেওয়া নতুন খেরোর খাতাটিতে গোলা সিঁদুরে ডোবানো টাকার ছাপ বা সিঁদুরের পুত্তলী অঙ্কিত করা হয়। অনেক খাতায় স্বস্তিকা চিহ্নও দেওয়া হয়। খাতার প্রথম পাতায় লেখা হয় ‘শ্রী শ্রী সিদ্ধিদাতা গণেশায় নমঃ’। মুসলমান ব্যবসায়ীরা লেখেন “এলাহী ভরসা”।
হালখাতা মূলত ব্যবসায়িক ব্যাপার । দোকানে বাকী বকেয়া যা ছিল, নতুন বছরের শুরুর এই দিনটিতে খদ্দেররা সেসব শোধ করে দেন আর দোকানদার তাঁদের মিষ্টিমুখ করান। যার বাকী নেই, সে কেবল একটি টাকা দিয়ে নতুন খাতায় নাম তুলবে। কিন্তু ব্যবসা ও ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে দেনা— পাওনার সম্পর্ক ছাপিয়ে হালখাতা সামাজিক মেলামেশার এক উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ উদযাপনের ঘটা যখন প্রচলিত ছিল না, হালখাতাই ছিল নতুন বছরের সেরা আকর্ষণ। হুতোম প্যাঁচার নকশায় হুতোমের ভাষায় — “কেবল কলসি উচ্ছুগগ্গু কর্তারা আর নতুন খাতাওয়ালারাই নতুন বৎসরের মান রাখেন।”

সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র লিখেছেন, “আর পঞ্জিকা খুলেই পয়লা বৈশাখের হালখাতার পাতাটি বার করে দেখতাম। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজার তারিখ বছরে বছরে বদলায়। কিন্তু হালখাতার তারিখটি পয়লা বৈশাখে একেবারে বাঁধা। এর আর এগোনো পেছোনো নেই।”পুরোন পঞ্জিকাতে দেখা যেত হালখাতার মার্কামারা ছবি — দোকানদারের ফরাসপাতা গদিতে কয়েকজন ভদ্রলোক রূপোবাঁধানো হুঁকোয় তামাক খাচ্ছেন আর দোকানদার কোঁচানো চাদর গলায় ঝুলিয়ে সবিনয়ে সহাস্যে তাঁদের আপ্যায়ন করছেন।
হালখাতা মানেই দোকানে দোকানে আন্তরিক আপ্যায়ণ, আর দোকানদারের সাধ্য ও রুচি অনুযায়ী মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা। বড়ো বড়ো দোকানে রীতিমতো চিঠি দিয়ে ক্রেতাদের আমন্ত্রণ করা হতো। চার পাঁচ দশক আগেও সেসব চিঠি যখন বাবা-জ্যাঠামশায়দের নামে বাড়িতে আসত, কচিকাঁচাদের মনটা নেচে উঠত রসগোল্লা লাড্ডু, নিমকি, গজা আর রঙীন শরবতের হাতছানিতে। এই দিনটি তো দেনা-পাওনার ঊর্দ্ধে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মিষ্টি সম্পর্কের দিন। তাই বাড়ির ছোটদের হাত ধরে দোকানে দোকানে হালখাতার নিমন্ত্রণ রাখতে গণ্যমাণ্য ক্রেতাদেরও দেখা যেত। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের “হালখাতা” গল্পে ধরা আছে কোন এক গঞ্জের হালখাতার সেই ছবি— “দাসেদের দোকানঘরটি আজ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। দু-দিকে দু-টি কলাগাছ পোঁতা। জলভরা দুটি মাটির কলসী তার গোড়ায়। গাছের ডালে ডালে রঙীন কাগজে শিকল জড়ানো। আজ যেন বিক্রীর দিকে তেমন মন নেই দোকানদারের। ক্রেতাদের সঙ্গে আজ যেন শুধু তাঁর রসের আর রসগোল্লার সম্পর্ক।”
অনেকে তাঁদের কেনাকাটা হালখাতার দিনের জন্যে রেখে দিতেন, কারণ এইদিন কিছু কিনলেই মিষ্টিমুখ ‘ফাউ’, (এখনকার পরিভাষায় “ফ্রী”)। অবশ্য কেউ কেউ যে দোকানদারের গদীতে সামান্য টাকা দিয়ে, বা কেনাকাটা না করেও আন্ডাবাচ্ছা নিয়ে সপরিবারে মিষ্টি আর ঘোলের শরবত খেয়ে বেড়াতেন না, তা নয়। টেনিদার ভাষায়, “দোকানদাররা এ-সময় ভারী জব্দ থাকে জানিস তো? যত টাকাই পাওনা থাক না কেন, মুখ ফুটে চাইতে পারে না। যত খুশি খেয়ে আয়, হাসিমুখে বলবে আর দুটো মিহিদানা দেব?” তবু সব মিলিয়ে হালখাতা বেশ জনপ্রিয় জমজমাট অনুষ্ঠান ছিল।

পুরোন কালে দোকানে বসিয়ে খাওয়ানোর রীতি ছিল। কোথাও কোথাও মাটির খোরায়, আর ধনী ব্যবসায়ীর দোকানে বসার জন্যে কুশাসন আর ভোজনপাত্র তাজা সবুজ কলাপাতা। পরে ক্রমে ক্রমে বসিয়ে খাওয়ানোর পরিবর্তে মিষ্টির বাক্স দেওয়ার চল শুরু হয়ে যায়।
কবি গিরিজা কুমার বসুর ‘হালখাতা’ নামে কবিতার কয়েকটি পংক্তি এই প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
“না ফুরোতে পাতা পুরাতন খাতা তুলিয়া রাখিনু বেঁধে
সকল হিসাব না হতেই সাফ, নতুন বসিনু ফেঁদে।
অতীতের পানে কাতর নয়ানে কী ফল চাহিয়া ফিরে ?
পাওনা দেনার বেচা ও কেনার হালখাতা খুলেছিরে।”
হাল আমলে ডিজিট্যাল জমানায় কেবল দেনা-পাওনার পদ্ধতি পাল্টায়নি, সম্পর্কও পাল্টেছে। ক্রেডিট কার্ডের যুগে দোকানে বাকী-বকেয়া বিলুপ্তপ্রায়। বাঙালীর জীবনের অনেক রীতিনীতি, অনেক প্রথা, অনেক উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে হালখাতাও দ্রুত “স্মৃতির আর্কাইভে” স্থান পেতে চলেছে।
বাংলার এক বিলুপ্তপ্রায় উৎসবের কথা লেখক অল্প কথায় চমৎকারভাবে পরিবেশন করেছেন । পড়তে পড়তে নিজের ছেলেবেলার দিনগুলোর কথা মনে ভাসছিল । এমন সুন্দর একটা নিবন্ধ উপহার দেওয়ার জন্যে লেখককে অজস্র ধন্যবাদ ।
Ujjwal : halkhatar উপর lekhati পরে khub I ভালো লাগলো. Best wishes.
Manab Nath
অনেককিছুর মতো আর একটা ক্রমশঃ লীন হয়ে আসা ছবি।
ভালো লাগলো তবে কষ্ট কি হলো না একটুও!