এ বিশ্ব সংসার তখনও আধুনিক হয়নি। “শীতের কাঁথা, বর্ষার ছাতা আর গরমের পাখা”-ই ছিলো বাঙালির একমাত্র সম্বল। গরমের সময় শরীরকে শীতল পরশে ডুবিয়ে দেওয়ার একমাত্র মন্ত্র ছিল হাতপাখা। শুধু তাই নয়, আমাদের ছোটবেলার মায়ের হাতের নাগালে শাসন করার চরম অস্ত্র, পিঠ চুলকানোর হাতিয়ার, মাছি মশা তাড়ানোর মেশিন, অতিথি আপ্যায়নের শীতলপাটি, পুজার আচারে অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ছিলো এই হাতপাখা।
আদিম গুহা মানব বড় বড় গাছের ডালপালা ভেঙে নাড়িয়ে চালিয়ে গরম তাড়িয়েছে এরকম দৃশ্য গুহাচিত্রে অনেক পাওয়া গেছে। এগুলোই যে হাতপাখার আদিরূপ তা সহজেই অনুমেয়। আসিরীয় ও ইজিপ্টের মানুষরাই এ পাখার ব্যবহার প্রথম শুরু করে।

বিশ্ব ইতিহাস বলে ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম জাপানে উন্নত মানের হাতপাখা তৈরি হয়েছিল। প্রাচীনকাল থেকেই জাপানিদের জীবনে বংশমর্যাদা ও কৌলিন্য রক্ষায় পাখার অবদান অসীম। বড় বড় হাত পাখায় জাপানিরা পারিবারিক বংশ তালিকা লিখে রাখত। পরে পাখার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল সেখানকার শিল্প-সংস্কৃতি ও আধুনিকমনস্কতা। জাপানের মানুষ বিশ্বাস করে, মৃত্যুর পর কেউ স্বর্গে গেলে দ্বারপাল তাকে পাখা নির্মাণে কৌশল জিজ্ঞেস করে। যে যত বেশি দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে, সে ততো বেশি স্বর্গসুখ লাভ করে। জাপানে এখনো বিভিন্ন উৎসব ও উদ্বোধনীতে হাতপাখা ব্যবহার অন্যতম অঙ্গ। একসময় জাপানের বহু শিল্পী হাতপাখার উপর ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

হাত পাখা নির্মাণে চীন কোন অংশে পিছিয়ে ছিল না। দশম খ্রিস্টাব্দে নানা ধরনের হাতপাখার নিদর্শন আছে ইতিহাসে। সে যুগের চীনের মহিলারা হাতপাখা নিয়ে সর্বত্র যাতায়াত করত। প্রথম দিকে সেখানে থাকতো পাখির পালক, সরু বেতের কঞ্চি ও খেজুর পাতা দিয়ে হালকা সুদৃশ্য হাতপাখা।১৭০০ শতাব্দী নাগাদ সে দেশে হাতির দাঁত, সোনা ও রুপো দিয়ে বেশ ভারী ও দামি পাখা তৈরি হতে থাকে। সেই আমলে দেশে পাখার অভিনবত্ব নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতার হিড়িক পড়ে যেত।

পাখার কথা পশ্চিমি দেশগুলিরও অজানা ছিল না। ১৬৭৪ সালে ফ্রান্সে হাতপাখা তৈরীর একটা বড় কারখানায় ছিল। প্যারিসকে বলা হতো ‘পাখার বিপণীকেন্দ্র।’ ইতালিতেও ততদিনে চামড়ার তৈরি হাতপাখা রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখনো (ফ্লোরেন্স) ইতালির রাষ্ট্রীয় সংগ্রহালয়ে এরকম চামড়ার পাখা দেখতে পাওয়া যায়। খ্রিষ্টান চার্চগুলিতে পবিত্র পাত্রে যাতে মশা-মাছি বসতে না পারে সেজন্য হাতপাখা ব্যবহার করা হতো। ইউরোপে হাত পাখার আগমন ভৌগোলিক আবিষ্কারের যুগে এবং তা পর্তুগীজদের হাত ধরে।
ভারতবর্ষেও ষোড়শ শতাব্দী নাগাদ নানা রকম হাতপাখার প্রচলন ছিল। সেই কোন যুগ থেকে ভারতের বিভিন্ন মন্দির ও পূজা স্থানে আরতির সময় দেব দেবীকে পাখা দিয়ে বাতাস করার ধর্মীয় রীতি পালিত হচ্ছে। একদা বার্তাবাহক রুপে একে দেখা গেছে, আবার রূপ বদল হয়ে একে ব্যবহার করা হয়েছে শুভেচ্ছা বার্তা হিসেবে, আবার কখনো শুধুই আভিজাত্য ও সৌখিনতার প্রতীক হিসেবে। এই বাংলা যখন বাবু কালচারে আপ্লুত, তখন বাবুদের শরীর মন সুস্থ রাখতে হাতপাখার চল ছিল।

জমিদারের সেরেস্তা কিংবা কাছারি বাড়িতে বা মজলিসের স্বস্তি আনতে মোতায়ন করা হতো পাখা বরদার বা পাঙ্খা পুলার। যাদের কাজই ছিল গ্রীষ্মে বিশাল বিশাল পাখা দিয়ে বাতাস টেনে কর্মব্যস্ত কিংবা বিলাসিতায় ডুবে থাকা মনিবদের কষ্ট লাঘব করা। পরে অবশ্য জমিদার গিন্নীদেরও স্বস্তির প্রতীক হয়ে ওঠে পাখা। এমনকি সেসময় এ দেশে বসবাসকারী ব্রিটিশ রমনীরাও তাদের হাত বেঁধে রাখতেন ছোট্ট সৌখিন হাতপাখা। ঘর্মাক্ত কলেবরে গৃহে প্রত্যাগত স্বামীদের হাত পাখা দিয়ে হাওয়া করে শরীর ঠান্ডা করার মধ্যে গৃহবধূদের থাকতো এক অনুরাগের ছোঁয়া।
হাতপাখা নিযে আলোচনার ক্ষেত্রে শ্রীমা সারদা ও ভগিনী নিবেদিতার জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ করি। শ্রীশ্রীমা একদিন নিবেদিতাকে একখানি পালকের তৈরি ছোট হাতপাখা দিয়ে বলেছিলেন,: আমি এখানি তোমার জন্য করেছি। নিবেদিতা পাখাটি নিয়ে একবার মাথায় রাখেন একবার বুকে ঠেকান আর সবাইকে বলেন, ‘কি সুন্দর কি চমৎকার! কি সুন্দর মা করেছেন দেখো।’ শ্রীশ্রীমা তখন বলেছিলেন, ‘কি সামান্য একটা জিনিস পেয়ে ওর আল্লাদ দেখেছ! আহা, কি সরল বিশ্বাস! যেন সাক্ষাৎ দেবী।’

এরপর হাত পাখার দিন বদলালো। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়াতে ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রোটেশন খুঁজে পেলেন আর ১৮৯০ সাল নাগাদ তৈরি হয়ে গেল বৈদ্যুতিক পাখা। তখন অবশ্য সে পাখা চলত ডিসি অর্থাৎ ডাইরেক্ট কারেন্টে যার আবিষ্কর্তা ছিলেন আমেরিকার বিজ্ঞানী এডিসন। তারপর থেকেই দেশে বিজ্ঞানের জয়রথে চড়ে অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে চলে এল বৈদ্যুতিক পাখা।

হাতপাখা মূলত ছিল তালপাতার বোনা। যার ডাঁটি হয় বাঁশের। এরপরে বেত, পাট, বাঁশ, কাপড় বা পশম দিয়েও তৈরি হতো হাতপাখা। সম্ভ্রান্ত পরিবারে ময়ূরের পালক, চন্দন কাঠের হাতল বিশিষ্ট হাতপাখাও ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়। এমন পাখা জলে ভিজিয়ে হাওয়া খেলে চন্দনের সুগন্ধে আমোদিত হতো চারদিক। জমিদার বাড়িগুলিতে বা অবস্থা সম্পন্ন বাড়িতে তালপাতার পরিবর্তে ব্যবহৃত হতো সিল্ক জরি সার্টিন বা অন্য দামি কাপড়। তাতে থাকতো সোনার অথবা রুপোর কারুকার্য। এমনকি এগুলিতে স্থানীয় রীতি সম্পর্কিত নকশা, কাঁথা স্টিচ-এর কাজ, মধুবনী শিল্প এমনকি কাঁচ বসানো জরির কাজও বানানো হতো। পরাধীন ভারতে পটচিত্র আঁকা ছবি বা কবিতার পংক্তি সম্মৃদ্ধ হাতপাখা ছিল ঐতিহ্যের প্রতীক।

আজ কবিতা লেখা বা ছবি আঁকা হাত পাখা কালের অতলান্তে প্রায় হারিয়ে গেছে। জাপানি শিল্প সৃষ্টির পাখা বা ঘোরানো হাতলের পাখাও আজ অতীত স্মৃতি। শহরাঞ্চলের গৃহস্ত বাড়িতে এখন হাতপাখা মেলা দুর্লভ তবুও শহরের প্রাণকেন্দ্রে ফ্যাশন শো-এর হাত ধরে এই পুরনো শিল্পকে মেলে ধরার শুভ প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে “চামর” হিসেবে যা ব্যবহার করা হয় তাও একরকম হাতপাখা। বিদ্যুতের আবিষ্কারের পর থেকে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রিক পাখা ব্যবহার শুরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু লোডশেডিংয়ের বাজারে হাতপাখা তার কৌলিন্য মোটেও হারায়নি।
অসাধারণ লেখনী????????????
অনেক ধন্যবাদ
তালপাতার হাত পাখা নিয়ে আর একটি অনবদ্য লেখা।
ছেলেবেলায় গ্রামে দেখেছি প্রচুরপরিমাণে তালপাতার হাতপাখার প্রচলন।
দুই রকম পাখা দেখতাম। একপ্রকার আটপৌরে, চারকোণা বেশির ভাগ একটু বড় সাইজের, গোলও হতো, তাতে ধরার ডাটায় বাঁশের নল লাগানো থাকতো, পাখাটি ঘোরানো যেতো। এগুলি তালপাতা সরু করে কেটে চিরে শীতল পাটির মতো বোনা হতো।
আর এক প্রকার সৌখিন। সেগুলো সাধারণত গোল। সুন্দর কাপড়ের ঝালর লাগানো, ভিতরে সূচ সূতো দিয়ে পাখি, ফুল আঁকা বা সুন্দর কিছু লেখা। এগুলি জামাই, সোদর, আত্মীর পরিজনদেরকে ব্যবহার করতে দেওয়া হতো। এগুলি গোটা তালপাতার ডাটা কেটে বানানো, বোনা নয়।
বছর কুড়ি আগে রাম মন্দিরের কাছে সেন্ট্রাল এভিনিউর উপর একটি তালপাতার হাতপাখার গুদাম কাম পাইকারি দোকান দেখেছিলাম। সেখানে প্রচুর পাখা ছিল!
জানি না, এখনো আছে কিনা।
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে এত সুন্দর মতামত দেওয়ার জন্য❤️❤️
ছোটবেলায় মা কে দেখেছি কাপড়ের পাড় ছিঁড়ে হাতপাখার কোনায় সেলাই করতে। উদ্দেশ্য একটাই, ঘুমের ঘোরে পাখার খোঁচায় কেটে না যায় কোথাও।বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য জীবনধারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, কমেছে হাতপাখার প্রচলন। পরিশ্রম কমলেও চিন্তার ভাঁজ পরেছে পাখা তৈরি শিল্পীদের।
মা’র হাতে শাখা,হাতপাখা ঝিমুনিতে বকাঝকা,
মা নেই পাখা আছে,নতুন স্বরূপে হাতছেড়ে
দেওয়ালেতে ঝোলা,ঘোরা শান্তি বজায় রাখা!
এখনো পাওয়া যায় কিন্তু খুব একটা দরকার পরে
না।এসি,কুলার,প্যাডেস্টাল ইত্যাদী বহুরকমের
উপকরণ ইতিহাস হয়ে যাবে।
এই সুন্দর প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেবে পাখার
ইতিহাস! ভালোলেখা ভালোলাগা ভালোবাসা*
ঋদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হই আপনার মতামত পেয়ে। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ❤️❤️