| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলার হস্তশিল্প (পর্ব আট) ডোকরা শিল্প, দশাবতার তাস : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ১২৭৯ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

নিভিছে দেউটি – ডোকরা শিল্প

দুর্গাপুরের দিক থেকে যামিনী আর তাঁর ভাই বসন্তরঞ্জনের রায়ের গ্রাম বেলেতোড়ে কড়ে আঙ্গুলের আকারের ছানার লম্বা লম্বা রসে ভেজা মিষ্টিতে মিষ্টিতে ভরপুর নিখুঁতি (বাংলায় তিন রকম নিখুঁতি একটা বেলেতোড়ের, অন্যটা বর্ধমানের সীতাভোগের সঙ্গী, একটা কৃষ্ণনগরেরটা আনেকটা দানাদারের আঙ্গিকের) আর আরও বেশি মিষ্টি মেচা-র স্বাদ আস্বাদন করে আপনি যখন বাঁকুড়া শহরে ঢুকবেন ঢুকবেন করছেন তখন আশেপাশে নজর করলে দেখবেন বিকনা এসেছে। আধুনিকতা আর বড় পুঁজির স্বার্থে রাস্তা চওড়া হওয়ায় পুরোনো রাস্তার পাশের ডোকরা পাড়ার সব চিহ্ন প্রায় লুপ্ত হয়ে গিয়েছে তবু একটু খঁজলেই পাড়ার মানুষ আপনাকে দেখিয়ে দেবে শিল্পডাঙ্গা যাবার রাস্তা।

একদা ভারতের বিপুল পরিমাণবৈদেশিক রপ্তানির একটা বিপুল অংশ ছিল লোহা-ইস্পাত। বাঁকুড়া-বীরভূমের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল সাঁওতালসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোহা গলানোর কারখানা। আর সেই গলানো লোহা নিয়ে কামার শাল চালাতেন এই সম্প্রদায়ের বাইরের মানুষেরা সাধারণতঃ কামার সম্প্রদায়েরা। কিন্তু শিল্পগ্রামে ঢুকলেই বুঝবেন এখানকার কোনও কিছুই আর শিল্পীত নেই। সব কিছুই রুখা শুখা। বাতাসে চাপা মদের গন্ধ, খোলা নর্দমায় নাক ঢাকে। এই মানুষগুলি কয়েক কাহার বছর ধরে ছিলেন যাযাবর। কখোনো এ গ্রাম কখোনো ও গ্রামে গিয়ে গ্রামীণদের সংসারের নানান ধাতুর চাহিদা মেটাতেন তাঁর বর্ণনা রয়েছে কমলকুমারের লেখায়। ধরমপালজী বলছেন ১৯০০র আশেপাশে ডোকরা কামারদের সারা ভারতে এই ধরণের স্থানান্তর যোগ্য চলমান চুল্লির সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। প্রত্যেকটি চুল্লি প্রত্যেক বছর ৩৮ থেকে ৩২ সপ্তাহ জুড়ে ২০ টনের বেশি লোহা গলিয়ে নানান তৈজস এবং নানান দরকারি দ্রব্য তৈরি করতে পারতেন এদের তৈরি ধাতু পিণ্ড রপ্তানি হত বিদেশে – বিশেষ করে আরবে যেখানে তৈরি হত দামাস্কাস তরোয়াল। এঁরা সক্কলে বাবা বিশ্বকর্মার সন্তান। কারোর উপাধি কর্মকার, কারোর লোহার, কেউ কামার, কেউ আআবার স্বয়ং বিশ্বকর্মা – বস্তারের সোনাধর বিশ্বকর্মা পৈয়াম। ভারতের বিশ্বকর্মাদের ওপর ভাস্কর মীরা মুখোপাধ্যায়ের একটি আবিস্মরণীয় বই পড়তে পারেন বিশ্বকর্মার সন্ধানে বা ইন সার্চ অব বিশ্বকর্মা। পরিকল্পনা করে ১৮০০ সালের পর যে বিশিল্পায়নে ক্রমশঃ ধ্বংস হতে থাকে ভারতের নিজস্ব লোহা-ইস্পাত শিল্পের বিকশিত পরিকাঠামো।

তো এই যাযাবর মানুষগুলিকে স্বাধীনতার পর গৃহী পরিকল্পকরা রাষ্ট্রের কর্তারা এদের ঘুরে বেড়াবার দুঃখ না দেখতে পেরে বসিয়ে দিলেন বাংলার দুই অঞ্চল বাঁকুড়া আর বর্ধমানের গুশকরারা কাছে সাধুর বাগানে। এদের দফা রফা হওয়ার যতটুকু বাকি ছিল সব শেষ। যে মানুষদের গৃহীদের মত জমাবার অভ্যেস নেই, যে মানুষদের নিজস্ব সম্পত্তি বলতে শুধুই বংশ পরম্পরায় অধীত অর্জিত জ্ঞান, সে মানুষদের যখন বসিয়ে তাদের হাজার হাজার বছরের অভ্যেস পাল্টে ভাল করবার জন্য গৃহী বানিয়ে দেওয়া হলে, যা হবার তাই হয়েছে।

আজ এদের বুশ্বাস, আচার আচরণ, সম্পর্ক ইত্যাদির সঙ্গে শিল্পকর্মটাও প্রায়-সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ধাতুর ওপরে জং না পড়ার প্রযুক্তিটা এঁরা আজও ধরে রয়েছেন, ধরে রয়েছেন লস্ট ওয়াক্স পদ্ধতিতে তৈরি করা ধাতুর নানান শিল্প। কেন এই পদ্ধতিতে জং পড়ে না তাই নিয়ে তথাকথিত পশ্চিমি ধাতু বিশেষজ্ঞ মহলে আনুমানের পর আনুমানের বন্যা। কেউ আজও ভালকরে জানেন না কেন অন্তত দশ হাজার বছর পুরোনো এশিয়া বা আফ্রিকার এই লস্ট ওয়াক্স নামক আদিম পদ্ধতিতে জং পড়ে না। এই লেখায় সে পদ্ধতি বিশদে বর্ণনা করলাম না। কোনও দিন যদি বাঁকুড়া যান, ভাগ্য ভাল থাকলে আপনারা দেখতে পাবেন কিভাবে মাটির ছাঁচ বানিয়ে তাতে মোম দিয়ে একটার পর একটা আংশ জোড়া হচ্ছে। গীতা কর্মকার এক প্রবাদপ্রতীম শিল্পী। আজ সেখানে খুব বেশি থাকেন না গীতাদি। তাঁর এক ছেলে সেই শিল্পডাঙ্গায় থাকেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলে যদি যাওয়া যায় তাহলে সেই আদিম কিন্তু অত্যন্ত আধুনিক এই প্রযুক্তিটি চাক্ষুষ দেখতে পাবেন।

বিষ্ণুপুর

মল্ল রাজাদের পীঠস্থান। বাংলার কারিগরী শিল্প আর নিজস্ব প্রযুক্তি বলতে যা বোঝায়, তাঁর একটা বড় অংশ আজও ধারণ করে রয়েছে বিষ্ণুপুর। বৈষ্ণব চর্চার পীঠস্থান, বাংলার মাটির বাড়ি যে এত্ত সুন্দর এত্ত ভাষ্কর্যময় আর এত্ত দিন টিকে থাকতে পারে বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলো না দেখলে বোঝা যায় না। শুধু বিষ্ণুপুরই নয়, রাঢ় বাংলার গ্রামের বাড়ির বাঁকানো চাল আর দেওয়ালে দেওয়ালে নয়নাভিরাম পঙ্খের, আলপনার কাজ দেখে ভাবনা শুন্য হয়ে, সব কিছু চুরি করে নিজের করে নেওয়া পরম্পরা ঐতিহ্য সংস্কৃতিহীন ব্রিটিশরা নিজেদের বাড়ির আন্য নাম না দিয়ে নাম দিল বাংলো বা বাংলা আঙ্গিকের বাড়ি! আজ ঔপনিবেশিক কর্তারা কোনও কিছু না ভেবেই, বাংলার স্থাপত্য ভুলে ইওরোপের গথিক আঙ্গিক নকল করছেন। বিষ্ণুপুরের মাটির মন্দির বিষয়ে প্রচুর বাক্য, মেধা খরচ হয়েছে, ফলে সেই পথে না হেঁটে আমরা বিষ্ণুপুর পরিভ্রমণ শুরু করব দশাবতার তাস দিয়ে।

দশাবতার তাস

আমি মন্দিরের রাস্তায় না গিয়ে পরিচয় করাব এক নতুন শিল্পকর্ম দশাবতার তাস বিষয়ে। সাধারণ প্রচলিত ভারতীয় ইতিহাস বলছে পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে তাস খেলার উদ্ভব। কিন্তু বিষ্ণুপুরের ইতিহাস বলছে মল্লরাজাদের সমৃদ্ধিকালে দশাবতার তাস আর তাস খেলার প্রবর্তন হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই ১৮৯৫ সালের এসিয়াটিক সোসাইটির জার্নালের এক ছোট্ট নোটে বলছেন …I fully believe that the game was invented about eleven or twelve hundred years before the present date. শাস্ত্রী মশাই-এর হিসেব অনুযায়ী এই খেলার উদ্ভব সপ্তম-অষ্টম শতক। প্রথম কারণ সাধারণতঃ প্রচলিত দশাবতার বিশ্বাসে জগন্নাথ বা বুদ্ধের স্থান নবম – কল্কীর(স্মরণ করুন কবি কোকিল জয়দেবের দশাবতার শ্লোকাবলী – প্রলয় প্রলয়ধি জলে-র বুদ্ধসংক্রান্ত শ্লোকটি) আগে। কিন্তু দশাবতার তাস অনুযায়ী জগন্নাথ বা বুদ্ধদেবের স্থান পঞ্চম। শাস্ত্রীমশাইএর যুক্তি ধরে বলা যায়, বাংলায় এমন এক সময়ে দশাবতার তাস খেলার প্রবর্তন হয়েছিল, যখন বুদ্ধদেব পঞ্চম অবতার রূপে গণ্য। তাসে বুদ্ধমুর্তি আদতে জগন্নাথ মূর্তি, – কেবল মাথা ও হাতসহ দেহকাণ্ডের মূর্তি। সুতরাং জীবের ক্রমবিকাশেরস্তরে নৃসিংহ(অর্ধ নর অর্ধ পশু) এবং বামনের (পূর্ণ নর) মধ্যবর্তী স্থান পেয়েছেন তিনি – অর্থাত্ নিম্নতম জীব মত্স্য থেকে পূর্ণ মানব পর্যন্ত বিকাশের ইতিহাসের একদম মাঝখানটি অধিকার করে আছেন তিনি।

তাই বিনয় ঘোষবাবু এটিকে বলছেন …খুব যুক্তিসংগত স্থান। আর ভারতীয় চিহ্ণতত্বের বিকাশের দৃয্টিভঙ্গী হিসেবে যদি দেখা যায়, দশাবতার তাসে বুদ্ধের প্রতীক পদ্ম। অর্থাত্ এই তাসটি এমন সময় প্রতিভাত হয় যখন বুদ্ধ পদ্মপাণিরূপে পরিচরত ছিলেন – অর্থাত্ পদ্মই ছিল তাঁর পুজোর প্রতীক – যে সময়ের বাংলার কথা আমরা আলোচনা করছি সেটি হল মহাযানী বাংলার কাল। ৮০০ থেকে ১০০০ খ্রীষ্টাব্দের সময় – পাল রাজত্বে বা তার কিছু আগেও হতে পারে। জয়দেব বা ক্ষেমেন্দ্রর কালে প্রচলিত ধারার উত্পত্তি হলেও পাল রাজাদের আগেও এই দশাবতার তাস খেলার প্রচলন ছিল।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাইএর বৌদ্ধিক কাজের প্রায় প্রতিটি অংশে বৌদ্ধবাইএর ছোঁয়া ছিল এ মিথ কিন্তু মিথ্যা নয় – বলেছেন অনেকভাবুকই – বিশেষ করে বিনয় ঘোষমশাই। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকাশন বিভাগ, পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ শাস্ত্রীমশাইএর যে রচনাবলী প্রকাশ করেছেন তার ছত্রেছত্রে এই তত্বের প্রকাশ এবং তাঁর এই অন্তর্দর্শণ অসম্ভব সত্য।

দশাবতার তাস খেলা, অঙ্কণরীতি, মুদ্রা, রংএর পদ্ধতি দেখলে পাল যুগেরই কথা সর্বাগ্রে মনে আসে। এদের ঐতিহ্য আজ বহন করছেন শীতল ফৌজদার তাঁর এই যৌবন বয়সে তাঁর কাকা ভাষ্কর ফৌজদারের ছেড়ে যাওয়া কাজটি বহন করতে নিয়ে চলেছেন একই ভালবাসায়, শ্রদ্ধায় আর জ্ঞানে, বাংলার নিজস্ব প্রযুক্তি প্রয়োগে – মনে রাখবেন পট তৈরি আর দশাবতার তাস তৈরির পদ্ধতি প্রায় এক। তাসের যে কাগজ সেটি তৈরিও অসম্ভব দক্ষতার, ধৈর্যের প্রয়োজন হয়।

মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, রাম (রঘুনাথ), ভৃগুরাম (পরশুরাম), বলরাম, জগন্নাথ (বুদ্ধ) ও কল্কী এই দশ অবতারকে নিয়েই দশাবতার তাসের মূল পরিকল্পনা।এঁদের মূর্তি আঁকা দশটি তাস থাকে। প্রত্যেক অবতারের ছবি আঁকা তাসের অধীনে একটি করে ‘উজীর’-এর ছবি আঁকা তাস। প্রত্যেক ‘উজীর’-এর অধীনে দশটি করে তাস আর তাদের প্রত্যেকের প্রহরণ(মানে অস্ত্র – মনে করুণ দশপ্রহরণ ধারিনী) নিয়ে প্রত্যেক আবতারের জন্য আরও ১২টা করে, মোট ১২০ টা তাস। দশাবতার তাস ছাড়াও নিতে পারেন নকশা তাস।

হাত নিশপিশ করছে লিখতে, কিন্তু এই ছোট্ট পরিসরে খুব বেশি বলার নেই, তবুও কয়েকটি স্তবকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, বাংলা তথা ভারতে যেমন মূর্তিবিদ্যা রয়েছে – তা নিয়ে খুব আলোচনা হয়েছে – নিবেদিতা করেছেন শ্রীলংকার ভাবুক আনন্দ কুমারস্বামী করেছেন খুব বিশদে, তেমনি কিন্তু রঙের ব্যবহারের তত্ত্ব নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় নি – অথচ গ্রামের ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা সে তত্ত্ব জানে – মুখোশের রং পাল্টে গেলে একই ছাঁচের মুখের দেবতাও পাল্টে যান – হলুদ রঙে হন কৃষ্ণ, আবার সেই মুখোশে সবুজ রং করে দিলে সেই মুখই হয়ে যান রাম। অনুরোধ করব শীতলের সঙ্গে বা কোনও পটুয়ার সঙ্গে যখনই কথা বলবেন, তাদের কাজ দেখবেন, অবশ্যই এই বিষয়টি নজর করবেন, আর তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় রং ব্যবহারের ইঙ্গিতময়তার যে ব্যপ্তি ঘটেছে তাঁদের শিল্পে তাও বোঝার চেষ্টা করবেন।

শীতলই আজ একমাত্র দশাবতার তাসের শিল্পী। সে যেমন লড়াই শেষ করে নি, আর যেখানে তার কাকা ছেড়ে গিয়েছিলেন, সেখানেই শেষ করে নি। শিল্পের প্রতি একই শ্রদ্ধায় নিজের ছোট ছোট আত্মীয়কে শেখাচ্ছে এই কলা। আপনারা যে কেউ বিনয় ঘোষের পশ্চিম বঙ্গের সংস্কৃতির চার খণ্ডএর একটির জোড়াপাতায় (এনেক্স) পড়লে বুঝবেন এই তাস খেলার পদ্ধতি। সব কিছু এই ছোট্ট পরিসরে লেখায় না। আমার আনুরোধ হবে, বিষ্ণুপুরে যারা গিয়েছেন, তাঁরা নতুন করে একবার যান শীতলের বাড়ি, ঐতিহ্যমণ্ডিত শাঁখারি পাড়ায়। দেখুন তাঁর কাজ। কথা বলুন তাহলেই বিষ্ণপুরের একটা বড় ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের জুড়তে পারবেন।

আর এই পুজো সংখ্যায় লিখছি বলে আর একটি তথ্য না বলে পারছি না, বাংলার দুটো রাজবাড়ির পুজোয় বাংলার দুর্গা মূর্তি পুজোর বিবর্তনটি আজও চোখে দেখা যায়, সেটি হল বিষ্ণুপুর রাজবাড়ি আর কৃষ্ণগর রাজবাড়ি। আজও বিষ্ণুপুর রাজবাড়িতে কিছুটা ঘটে পটে কিছুটা মূর্তিতে পুজো হয়। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের হাত ধরে যে মূর্তি পুজো বাংলায় চলে আসছে, যার রমরমা শুরু হয়েছে উলাবীরনগরের বারোয়ারি পুজোয়, সেই সময়ের আগের পুজো পদ্ধতি দেখতে পাবেন।

রাজবাড়ির এই পট কিন্তু যায় শিতল ফৌজদারের বাড়ি থেকে। জানি পটের দাম এখন প্রচুর, দুই বা আড়াই হাজারের কমে হবেনা, কিন্তু আমার আবার আনুরোধ যদি সম্ভব হয়, শীতলের কাছে যদি লক্ষ্মীবিলাস পট যদি পেয়ে যান তাহলে দরাদরি না করেই কিনে নেবেন। বাংলার প্রাচীন অঙ্কন পদ্ধতি আর তার শৌর্য এই পটে ফুটে উঠেছে – সেটি নিজের কাছে রেখে দেওয়ার মর্যাদা গর্ব আনন্য।

বাংলার এমন প্রচুর শিল্প রয়েছে যে শিল্পে মাত্র একটি পরিবার বেঁচে। তাঁরা ছেড়ে দিলে সমগ্র কাজটিই বিশ্বের ঐতিহ্যের ইতিহাস থেকে মুছে যাবে। কিন্তু শীতল তাঁর শীতলতর প্রজ্ঞায় যেভাবে জুঝছেন চকচকে মোড়ক স্বর্বস্ব বাজার, নতুন সময়ের ক্রেতা – এবং নিজে নিজে শিখছেন ঐতিহ্য ধ্রুব রেখে কিভাবে মোড়ক করা যায় নিজের পণ্য, সব কিছুর সঙ্গে শীতল আদতে টিকে থাকতে চায় এই নশ্বর বিশ্বে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শীতল ভাবছে নিজের মত করে।

তার পাশে দাঁড়ান, তার সঙ্গে কথা বলুন, তার দশাবতার তাস কেনার প্রয়োজন নেই। একজন শিল্পী তাঁর শিল্পের সমঝদার চায়। সেটি বিক্রি হলে তো ভালই লাগে। কিন্তু সেটা তার কাছে বোধ হয় খুব একটা বড় বিচার্য বিষয় নয়। তার সঙ্গে কথা বললে সে বোঝে প্রায় নিভে যাওয়া শিল্পটি সামনে যে মানুষটি বসে আছেন, তিনি বুঝতে চান; আরো একজন মানুষ সেই শিল্পের সমঝদার হয়ে উঠতে চান। তার পাশে দাঁড়াতে চান; আমার ধারণা তার নতুন ভালবাসা পেলে তার বেঁচে ওঠার আর সঙ্গে সঙ্গে আপনারও নতুন করে বাঁচার আনুভূতি হবেই হবে।

আরও একটা কথা শীতলের মত বিষ্ণপুর সমঝদার কিন্তু আমি এখোনো কাউকে দেখিনি। তাকে গাইড হিসেবে নিলে পস্তাবেন না, বরং বেশ লাভও হবে। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev