অবিভক্ত মেদিনীপুর : মাদুর
দুই জেলারই অন্যতম প্রধান হস্ত শিল্প মাদুর। বাংলার মাটির ঘরে মাদুরের প্রয়োজনীয়তা, গরমে মাদুরে শোয়ার আরাম, কাঁচামালের সহজ লভ্যতা, নয়নাভিরামতা, দামের স্বল্পতা, আরামপ্রদতা এবং বিপুল ঐতিহ্যের সঙ্গে জুড়ে থাকার ইচ্ছের জন্য মাদুর গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে আজও নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে গণ্য হয়। বাংলার নানান গ্রামীণ গল্পে, রূপকথায়, পূর্ববঙ্গগীতিকায় বারংবার মাদুরের কথা, মাদুর নিয়ে নানা উপমা, মাদুরের নানান প্রকারের কথা উঠে এসেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতায়ও মাদুর বোনা হত।
মুঘল আমলে ভারত ভ্রমণে আসা তাভার্নিয়ের মত নানান ব্যবসায়ী মাদুরের কথা উল্লেখ করছেন। মাদুর যে বিপুল পরিমাণে ভারতের, নানান এলাকায় ভারতের বাইরে নানান এলাকায় রপ্তানি হত তার কথা উল্লেখও করছেন। বাংলার শিল্পীরা এমন দক্ষতায় মাদুর বানাতেন, সেই এত সূক্ষ্ম যেন কাপড়। তার ওপর সাপ বয়ে যেতে পারত না। আজও মাদুরের ওপর কাজ, মাদুরের কাঠির সূক্ষ্মতা, তার বুননের দক্ষতা ওপর নির্ভর করে মাদুরের চাহিদা আর দাম। ব্রিটিশ আমলে ওম্যালি, পোর্টার এবং স্বাধীনতার পরে প্রশাসক আশোক মিত্রের মত বহু মাদুর বিষয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। সারা দেশে এমনকি হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগণা আর দিনাজপুরেরও কিছু মাদুর বোনা হলেও, দুই মেদিনীপুর কিন্তু সারা বিশ্বে মাদুর তৈরির জন্য প্রখ্যাত।
মাদুরের মূল উপাদান এক ধরনের তৃণ– সাধারণতঃ যা মাদুরকাঠি নামে পরিচিত। মাদুরকাঠি সরু, গোলাকার, দৈর্ঘে চার হাত বা একটু বড়, কোনো গাঁট থাকে না বা শাখা প্রশাখাও হয় না। তৃণ শীর্ষে চার পাঁচটি ধারালে পাতা থাকে। মাদুর কাঠির চাষ হয় সাধারণতঃ পূর্ব আর পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ আর উত্তর ২৪ পরগণা, আর হাওড়া জেলায়।

বাংলার মাদুর সাধারণতঃ তিন ধরণের – একহারা, দোহারা আর মসলন্দ। কাঠি তৈরির জন্য প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন ছুরি। একে গেঁজে ছুরি বলে। এক হারা মাদুর বোনার জন্য প্রয়োজন, মাদুর কাঠি, সুতলি, টানা দেওয়ার জন্য ৪টে বাঁশের খুঁটি, টানা বাঁধার জন্য ২ খানা সোজা বাঁশ, দুটি মোটা দড়ি, শালকাঠের শানা (প্রতি ৯ ইঞ্চিতে ১৪ থেকে ১৬টা ফুটো), একটা তক্তা, কাছি ভেজাবার জন্য পাত্র। দোহারা মাদুরের জন্য প্রয়োজন এ সবই কিন্তু শানার জন্য প্রতি ৯ ইঞ্চিতে ৯ থেকে ১০টা। মসলন্দ মাদুরের জন্য আরও প্রয়োজন গোল বাঁশের চটা। শানায়ও তারতম্য হয় প্রতি ৯ ইঞ্চিতে ২৮ থেকে ৪৮। মসলন্দ মাদুরের কাঠি থেকে মাঝখানের সাদা অংশটি ছেঁটে বাদ দিতে হয়।
মাদুরের নকশা অনুসারে যতটুকু অংশ রং করার দরকার হয়, সেই অংশ টুকুর দুধারে ভাল করে বাঁধেন কারিগরেরা, তার পর সেদ্ধ করে নিতে হয় কম করে আট ঘন্টা। রং পাকা করার সময় নুন আর তেল ব্যবহার করা হয়। মাদুরকাঠি রংএর জন্য ব্যবহার হয় সবং এলাকার একধরনের গাছের পাতা। সাধারণতঃ ভারতের অন্যান্য গ্রাম শিল্পের মতই মাদুর শিল্পীরা বংশ পরম্পরায় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন। তবে এলাকা তারতম্যে মাদুর বুননের পার্থক্য রয়েছে।
পাঁশকুড়া বা বালিচক স্টেশন থেকে সবংএর দিকে গেলে পড়ে দশগ্রাম, সবং, তেমোহানি, কুচবসান, সারতা, খাজুরি, বালিচক প্রভৃতি অঞ্চল। অঞ্চলে যে একহারা মাদুর বোনা হয়, তাতে একটি মাত্র টানায় সামনাসামনি দুজন কারিগর বসেন প্রতি কাঠি বোনার পর শানা মারেন। কাঠি যে যার বাঁদিক থেকে বোনা আরম্ভ করেন। বোনার শেষে কাঠির ডগা টানার শেষে যে দড়ি থাকে সেই দড়িতে পেঁচিয়ে রেখে গিয়ে পরে শানা মারার সময় ডগা মুড়ে গাঁট দিয়ে যান। তাই বুননের সঙ্গে সঙ্গে বাঁধাও শেষ হয়। তাই মাদুর চিকন হয়, মসৃণ থাকে, আরক ধার সোজা বাঁধার ফলে দেখতেও সুন্দর হয়।
আর মাদুর তৈরি হয় কলকাতা-দীঘার পথে রামনগরে। এখানে একজন শিল্পী ৩-৫-৭ করে কাঠি বুনে শানা মারেন। আর বোনার সময় বাঁধাও হয় না। সামনা সামনি বসে একজন বিজোড় কাঠি বোনেন এবং শানা মারেন। ফলে মাদুরের জমি প্রায়শঃই মসৃণ হয় না। ফলে মাদুরের ধার অসমান হওয়ার সুযোগ থেকে যায়।
কাঁথি-খড়্গপুর বা মেচেদা-বাজকুল-দীঘা রাস্তায় পড়ে এগরা– এ অঞ্চলেও রামনগর অঞ্চলের একহারা বুননের রীতি অনুসরণ করা হয়। এখানে রঙিন মাদুর কম হয়। সবংএর দোহারা মাদুরের বুনন পদ্ধতি অন্যান্য অঞ্চলের মতই।

সবংএর মোহাড়ে এক বিশেষ মাদুর তৈরি হয় – নাম চালা মাদুর যা দোহারা মাদুরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। প্রথনে দুই তিন ইঞ্চি বোনার পর বোনা অংশের কাঠিগুলিকে নখ দিয়ে শিল্পীরা পেছনের দিকে চালিয়ে মাদুরকে যতসম্ভব খাপি করার চেষ্টা করেন। তাই জমিন ঘন হয়, বেশিদিনও ব্যবহার করা যায়। রামনগর অঞ্চলে দোহারা মাদুর কম হয়, এগরায় বেশি হয়। তৈরি হয় মাদুর আর আসন।
সবং আর রামনগরে মসলন্দ মাদুর তৈরি হয়। কাঠির মান অনুযায়ী মসলন্দ মাদুরের মসৃণতার হেরফের হয়। সবং অঞ্চলের শিল্পীরা এই মাদুর বোনার সময় কাঠি দাঁত দিয়ে চিরে নেন। আর মাদুর বোনার সময় ধার বেঁধেও যান। প্রকৃতিক রং ব্যবহারের জন্য রং পাকা হয়। সবং এলাকার কাঠি সবুজাভ তাই দেখতে অনেক সুন্দর। রামনগরের কাঠি অনেকটা হলদেটে – মাদুরের কাঠি থেকে পিথি অংশটা বাদ দেওয়া হয় – তাই স্থায়িত্ব বেশি।
আজকাল চিন থেকে সরাসরি আসছে প্লাস্টিকের মাদুর। দাম কিছুটা কম, রংচঙে। প্রথমের দিকে দেদার বিকোলেও কিছুদিন পরে বিক্রি বেশ কমে গিয়েছে। প্লাস্টিকের কাঠির আঁশ উঠে শোয়াতো দূরস্থান, বসারও অযোগ্য। আদতে মাদুরের সৌন্দর্য তার গ্রাম্য নম্রতায়; যত দিন যাবে মাদুর যত ব্যবহার হবে সে ততই মোলায়েম হবে – বসে শুয়ে আরাম। মাঝে মধ্যে ধুয়ে দিতে হয়।
ইদানিং শহরে প্রচুর বাতানুকূল যন্ত্র বিক্রি হওয়ায় শহর এলাকায় মাদুরের চাহিদা বেশ কমে গিয়েছে। মাদুর শিল্পীরা শুধু মাদুর না বুনে মাদুর কাঠি দিয়ে নানান রকমের ব্যবহার্য দ্রব্য তৈরি করছেন। সেগুলির চাহিদাও ক্রমশ তৈরি হচ্ছে শুধু শহরেই নয় গ্রামেও। টেবল ম্যাট, জানলা দরজার ভাঁজ করা নানান রঙের পর্দা ইত্যাদি তৈরি করছেন। আদতে গ্রাম বাংলার মানুষেরা নানান বাধা বিপত্তি সয়ে কিন্তু গ্রাম বাংলার শিল্পগুলির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। শহরের মানুষেরা আরেকটু উদ্যমী হয়ে গ্রাম বাংলার উৎপাদনের পাশে দাঁড়ালে দেশের অর্থনীতির চেহারাটাই পাল্টে যেতে পারে।
পট
মাদুরের মত দুই মেদিনীপুরের আন্যতম বড় রপ্তানি আর পরিচিতি হল পট আর পটুয়া। পটুয়াদের গ্রামে কোন পরিবারে পাশপোর্ট নেই গুনতে গেলে হতাশ হতে হবে। বাংলায় দুটি প্রধান পটুয়া গ্রাম – পাঁশকুড়া বা বালিচক স্টেশন থেকে নয়া আর কলকাতা-দীঘা রাস্তায় চণ্ডীপুর থেকে নন্দীগ্রামের দিকে যেতে হাঁসচড়া। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাত ধরে নয়ার প্রত্যেক বাড়ি এখন ছবির মত সেজে উঠেছে। রাণী বা মধু বা বাহার চিত্রকরের মত বহু শিল্পী একবার না একবার বিদেশ গিয়েছেন। দেশেও তাঁদের কাজের চাহিদা তুঙ্গে। ছাতা, হাঁটার লাঠি, ঘর সাজানো কুঁজো, দৈনন্দিনের যা কিছু ব্যবহার্য, সব কিছুর ওপরে তাদের হাতের কাজের চাহিদা দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। শৌখিন মানুষেরা তাঁদের বাড়ির দেওয়াল আঁকিয়ে নেন পটুয়াদের দিয়ে নানান লৌকিক কাহিনী। বিভিন্ন পজো মণ্ডপে তাদের চাহিদাও দিনের পর দিন বাড়ছে।

এঁরা যে কোনও গ্রাম সংস্কৃতির মত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন। নয় এগারোর প্রেক্ষিতে লাদেন পট, যে কোনও বড় বন্যার পরে বা সংসদে হানার মত বড় ঘটনার প্রেক্ষিতে এঁদের কাজ এক সময় বেশ বিকিয়েছে। এবং এগুলিই বাংলার গ্রাম সংস্কৃতির বেঁচে থাকার রসদ, তাঁরা কয়েক হাজার বছর ধরে সারা বিশ্বের নানান বিষয়ের সঙ্গে জুড়ে থেকেছেন। চলতি নানান ইস্যুতে তাঁদের তীর্যক মন্তব্য শিল্প রসিকদের দৃষ্টি এড়ায় নি। এছাড়াও মঙ্গল কাব্যের নানান পালা নিয়ে তাঁরা ছবি আঁকেন এবং গান তৈরি করেন। আজকাল আবার সরকারী নানান প্রচারে তাঁরা নতুন নতুন ধরণের সামাজিক অভ্যেস তৈরি করার গান বাঁধছেন। মহান্ত আর এলোকেশীর ঘটনা নিয়ে প্রচুর ছবি এঁকেছেন কালিঘাটের পটুয়ারা। বৌদ্ধ থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সব রাজত্বেই তাঁরা সমান নিজস্ব ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর। সোমবার ছাড়া যে কোনও দিন ঠাকুরপুকুরের গুরুসদয় সংগ্রহশালায় বাংলার প্রচুর প্রাচীন পটের নিদর্শন দেখা যেতে পারে। আর যাওয়া যেতে পারে দুটি গ্রামে।
বাংলার চিত্রকলার এক বিশিষ্ট অঙ্গ পট। কমকরে আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্য তাদের। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বৌদ্ধ আমলের বাংলার ঘটনা, বেনের মেয়ে উপন্যাসে যে মস্করীদের কথা বলেছেন, তাঁরা আদতে সেকালের পটুয়া। দীনেশ চন্দ্র সেন বৃহৎবঙ্গএ বলছেন বৌদ্ধ আমল থেকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় যে সব মহাযানী বৌদ্ধ মঠ তৈরি হয়েছে, সেই সব মঠে বাংলার পটুয়াদের পট তৈরির পদ্ধতিতে দেওয়ালের গায়ে ছবি আঁকন হয়েছে। লেখককে তাঁর এক গুণী বন্ধু, পেদঙ্গের গুম্ফার ছবিগুলো নতুন করে ঢেলে সাজের সময় দাঁড়িয়ে দেখেছেন, ২০০০ বছর আগের পদ্ধতিতে দেওয়াল আঁকার যোগ্য ক্রা হচ্ছে। আদতে অবিকল পটুয়াদের পট তৈরির পদ্ধতিতে দেওয়াল তৈরি করে ছবি আঁকা হচ্ছে।

দীনেশ সেন মশাই বলছেন পটুয়াদের পূর্বপুরুষ মস্করী উপাধিধারী বৌদ্ধ ভিক্ষু। সপ্তম শতকের প্রথম দিকের বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’এ যমপট ব্যবসায়ীদের উল্লেখ আছে। রাজা হর্ষবর্ধণ একজন পটুয়াকে কতকগুলো ছেলেদের মাঝে বসে পট বোঝাতে দেখেছিলেন। আট শতকের রচিত বিশাখাদত্তের মুদ্রারাস নাটকে কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম্’ ও মালবিকাগি্নমিত্র’ নাটক, ভবভূতির উত্তররাম রচিত এবং ভট্ট রচিত হরিভক্তি বিলাস’ পটচিত্রের বিষয়ে বিভিন্ন উল্লেখ রয়েছে। পটিদারেরা বুদ্ধের সময় হতে পটচিত্র এঁকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করতেন। বাংলার মাস্করীদের নাম পটীদার। অত্যাচারিত পটুয়ারা অনেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তাদের পূর্ব পুরুষের বৃত্তি আঁকড়ে ধরেছিলেন, এখন তাঁরা না মুসলমান না হিন্দু।
পট শব্দের অর্থ ছবি আঁকার কাপড় – যেটা এখন ক্যানভাস নামে পরিচিত। সহজ কথায় পটচিত্র বলতে আমরা পটের উপর অংকিত কোন ছবিকে বুঝি। অবশ্য পরবর্তীতে কাগজ কিংবা মাটির তৈরী বড় থালার উপর চিত্র তৈরী হলে তাকেও পটচিত্র বলা হয়েছে – যার নাম সরা।

তবে পটের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে পটগান। শুধু বৌদ্ধ কিংবা হিন্দু কাহিনী নিয়েই পট গান তৈরী হয়নি, মুসলিম কাহিনী নিয়েও পটগান তৈরী হয়েছে যেমন গাজী কালুর পটগান। গাজীপীরকে মনে করা হতো বাঘের দেবতা। পূর্ববঙ্গে বেশী প্রচলন ছিলো এই গাজী কালুর পট। এক গবেষক পূর্ববঙ্গের গাজীর পট নাচানোর বর্ননায় এক স্থানে একটি চিত্রের উল্লেখ করেছেন, গাজী সাহেব ব্যাঘ্রের উপর সমাসী ও চারিদিকে ঊর্দ্ধপুচ্ছ ব্যাঘ্রাদির পালায়ন। এছাড়াও গাজী-কালু-চম্পাবতীর জীবনকে কল্পনা করে তাদের জীবনের ধারাবাহিকতার উপর বিভিন্ন পটগান তৈরী হয়েছে। এ ছাড়াও মঙ্গলকাব্যের সঙ্গে যে নানান সামাজিক বিষয়ে গান বাঁধছেন তাঁর উল্লেখ করা হয়েছে আগেই।
বাংলার পটচিত্র রীতির দুইটি আকৃতি। একটি জড়ানো এবং অন্যটি চৌকো। জড়ানো পট ১২ থেকে আসীম লম্বা হতে পারে এবং ১ থেকে ৩ ফুট চওড়া হতে পারে – মণিমালা একসময় ১০০ফুট জড়ান পটে রামায়ণ এঁকেছিলেন । সকল জড়ানো পটই কাহিনী নির্ভর। এক একটি ছবি দেখানো হতো এবং সমবেতভাবে গীত-বাদ্য-নৃত্যের মধ্য দিয়ে তা পরিবেশিত হতো।
চৌকো পটের সার্থক কলকাতার কলীঘাটে। এখানে পটুয়ারা নানান আঙ্গিকে পট অঙ্কন করেছেন, বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে তাঁদের মতামত প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন উৎসবের সময় বাঙালিরা তীর্থ ভ্রমণ করতে এসে এই পটচিত্র নিয়ে ঘরে ফিরতেন।

পট অঙ্কনের কয়েকটি রীতি দেখা যায়। বিশেষ করে পটের গানের জন্য যে পট ব্যবহৃত হতো সেগুলো প্রধানত কাপড়ে আঁকা হয়। কখনো কখনো কাপড়ের উপর কাগজও লাগানো থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাপড়ের পটই ব্যবহৃত হয়। কাপড়ের উপর লাল মাটির প্রলেপ বা গোবর মিশ্রিত মাটির প্রলেপ দেওয়া হতো। মাটির প্রলেপের পর তেঁতুল বিচি জ্বাল দিয়ে এক প্রকার আঠা তৈরী করে তার উপর লাগানো হতো। তেঁতুল বিচির আঠা লাগিয়ে পট তৈরীর উপযুক্ত জমিন তৈরী করে নেওয়া হতো। পটুয়ারা নিজস্ব পদ্ধতিতে গাছের পাতা, বাঁকল, ইত্যাদির রস-আঠা ব্যবহার করে রঙ তৈরী করতেন। এর সঙ্গে মেশানো হতো তেঁতুল বিচির তৈরী আঠা। বিভিন্ন আখ্যান অনুযায়ী এক একটি পট অঙ্কন করতে এক একজন পটুয়ার এক থেকে ছয় মাস লাগে। (চলবে)