বিনপুর-শিলদা-বেলপাহাড়ির পাথর শিল্প
এলাকার মিস্ত্রী উপাধিধারী পরিবাররা পাথর কেটে নানান ধরণের তৈজস বানান। এগুলির বেশ চাহিদাও আছে। আজও বাংলার ঘরে বিশেষ করে পুজোর ঘরে হয় কাঁসা-পিতলের অথবা পাথরের বাসন ব্যবহার হয়। তাই হয় শুশুনিয়ার পাথর শিল্প অথবা বিনপুর-শিলদা-বেলপাহাড়ির পাথর শিল্পই ভরসা। বেলনচাকি থেকে শুরু করে ধুপ, মোম দানি, চন্দনপিড়ি, পাথরের শিবলিঙ্গ, নানান ধরণের বিশেষ করে সসন্তান দুর্গা মূর্তি তৈরি করেন। কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রাম। সেখান থেকে ৩০ কিমি দূরে মালাবতীর জঙ্গল পার হয়ে শিলদা মোড়। সেখান থেকে আরও কিছুদূর গেলে বেলপাহাড়ী।

তবে এই এলাকায় যদি আসেন তাহলে অবশ্যই লালজল গ্রামে যাবেন। বেলপাহাড়ী থেকে বাঁশপাহাড়ীর রাস্তায় পড়বে লালজল মোড়। সেখনা থেক ২ কিমি গেলে লালজল গ্রাম। দেওপাহাড়ে রয়েছে আদিম গুহা। দেওয়ালে খোদাই করা বেশ কিছু ছবি।
আর যাবেন ডুলুং পেরিয়ে চিল্কিগড়ের স্বর্ণদুর্গা। এই নিয়ে প্রচুর লেখালিখি হয়েছে। তাই আর বেশি কথা বাড়ালাম না। শুধু মনে করিয়ে দেওয়া গেলমাত্র।

বাঁকুড়া পোড়ামাটির কাজ
বাঁকুড়া মানেই মল্লভূম রাজাদের রাজধানী বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া মানেই বাংলার ধাতু শিল্পের মহাবলদের বাসভূমি, বাঁকুড়া মানেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত পিছুটান, যে টানে বারবার ছুটে যেতে হয় নিজের পূর্বজদের কৃতিকে সম্মান জানাতে, নিজের শেকড়ের পায়ে মাথা ছোঁয়াতে, নিজের পূর্বজদের আনপনেয় আত্মসম্মানের প্রতি নিজেদের প্রণত করতে।

যে ঘোড়া দৌড়য় না
বাঁকুড়া মানেই আপ্রতিদ্বন্দ্বী পোড়ামাটির কাজ। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের কাজে পোড়ামাটির শিল্পসামগ্রীর বিচারে প্রাচীন সভ্যতার কাল নির্ণয়ের প্রথা চলে আসছে। কারণ মৃৎশিল্পের বিশ্বজনীনকে আবেদনকে হস্তশিল্পের কাব্য মনে করা হয়। যদিও ধর্মীয় প্রথা ও অনুষ্ঠানের সঙ্গে এর সম্পর্কের আরও গভীরতর গুরুত্ব রয়েছে। ভারতে পোড়ামাটির শিল্পদ্রব্যের ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। মুসলমান ধর্মের পীরের থান বা আদিবাসীদের জাহের থানে বিপুলাকৃতি ছোড়া, হাতিসহ নানান পশু-পাখির ছলন মূর্তি (রূপক মূর্তি – ভবিষ্যতে সম্পাদক লিখতে দিলে শুধু বাংলার নানান একালার ছলন মূর্তি নিয়েই একটা প্রবন্ধ লেখা যায়) আধুনিক কালে অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে বিশ্ববাজারে স্থান পেতে মৃৎশিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বিমূর্ত শিল্পচেতনার সঙ্গে শহুরে রুচির মিলন ঘটিয়ে থাকেন।
বাঁকুড়ার পোড়ামাটির ঘোড়া ও হাতি নির্মাণের প্রধান শিল্পকেন্দ্রগুলি হল পাঁচমুড়া, রাজগ্রাম, সোনামুখী ও হামিরপুর। প্রত্যেক শিল্পকেন্দ্রের নিজস্ব স্থানীয় ধাঁচ ও শৈলী রয়েছে। এগুলির মধ্যে পাঁচমুড়ার ঘোড়াগুলিকে চারটি ধাঁচের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বলে মনে করা হয় কেননা কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের হাতে পড়ে এটি এখন কেন্দ্রীয় হস্তশিল্প প্রদর্শনশালার প্রতীক হয়েছে ফলে এটির স্থান হয়েছে বাঙালি মধ্যবিত্তের ঘরে। আমি একজন ছাত্রকে জানতাম, যে শুধু কলকাতায় তার পড়ার খরচ চালাতে পাঁচমুড়াত ঘোড়া কলকাতায় এনে পাইকারিভাবে বিক্রি করত। এত এর চাহিদা।

বাঁকুড়ার ঘোড়াগুলির ভিতরের অংশ ফাঁপা হয়। এর বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদাভাবে কুমোরের চাকে তৈরি হয়।ঘোড়ার চারটে পা ও দীর্ঘ গলার দুটি অংশ আর মাথা মোট সাতটি অংশ তৈরি করে পুড়িয়ে সেগুলিকে এক সঙ্গে জোড়া দেওয়া হয়। অনেক সময় ফাটা অংশগুলি ঢাকতে বাড়তি মাটি দেওয়া হয়।পাতার মত আকৃতিবিশিষ্ট কান ও লেজ কাঁচামাটি দিয়ে তৈরি করা হয়। পরে এগুলি মূল ঘোড়ার দেহের তিনটি গর্তে স্থাপন করা হয়। মূল মাটির ঘোড়াগুলি রোদে ফেলে শুকানো হয়। খানিকটা শুকানোর পরে বিভিন্ন অঙ্গ ঠিক ভাবে ঘোড়ার দেহে বসানোর জন্য দেহের ভিতরের ও বাইরের অংশের গর্তগুলি তৈরি করা হয়। এর উদ্দেশ্য হল, উভয় অংশকে সমভাবে শুকানো।উভয় অংশ সমভাবে না শুকালে ঘোড়ার দেহে ফাটল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রথম দিকে ছয়-সাত দিন বন্ধ ঘরে শুকানোর পর এগুলিকে রোদে শুকানো হয়। শেষে এগুলিকে আগুনে পোড়ানো হয়।
বাঁকুড়ার পোড়ামাটির ঘোড়াগুলি সাধারণত দুই প্রকার রঙের হয়ে থাকে – লাল ও কালো। ঘোড়াগুলির ফাঁপা শরীর উনুনের মতো ব্যবহার করে এগুলি পোড়ানো হয়। অনেক সময় ঘোড়ার গায়ে ছিদ্র রাখা থাকে, যাতে পোড়ানোর সময় ধোঁয়া বাইরে বেরোতে পারে। এইভাবে পোড়ালে ঘোড়ার গায়ের রঙ হয় লাল। কিন্তু এই গর্তগুলির মুখ আটকে দিয়ে পোড়ালে ঘোড়াগুলি কালো রঙের হয়ে যায়।

তবে আমার অনুরোধ রইল, যারা বাঁকুড়ার সঙ্গে বিষ্ণুপুর যান বা ঘুরতে যেতে চান, তাঁরা অবশ্যই সোনামুখী যবেন। সেখানের ঘোড়া পাঁচমুড়ার থেকে বেশ আলাদা, যেমন হামীরপুর, যেমন রাজগ্রামের ঘোড়া আর হাতি। বাঁকুড়া-বর্ধমান রাস্তায় সোনামুখীর অবস্থান। গেলে ক্ষীরের সিঙ্গাড়া খাবেন আর ক্ষেত্রীয় গান্ধী আশ্রমের রেশমের থান কিনবেন কেননা একদা বাংলার যে ২২টি স্থানে মসলিন তৈরি হত সেগুলোর মধ্যে সোনামুখী অন্যতম ছিল, এখানে প্রায় ব্রিটিশ, ডাচ আর ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফ্যাক্টরি বা কারখানা আর গুদাম খুলেছিলেন। আজও পুরুলিয়ার রেশমের গুটি সোমানুখীতে এসে থান তৈরি হয়। সুতো তৈরির পরে তা তাঁতে আড়াআড়ি করে লাগানোর জন্য বিছিয়ে ফেলা হয়, যাকে বলে ‘টানা’।আর লম্বা সুতোর নাম পোড়েন। টানাতেও জট থাকে। সেই জটও ছাড়াতে হয়। টানা তাঁতে জোড়ার পরে তার উপরে লম্বালম্বি যে সুতো ফেলা হয়, তাকে বলে ‘পোড়েন’। দিনভর এই টানা-পোড়েন নিয়েই তাঁত বুনে শাড়ি তৈরি করেন তাঁতি। পুরুষদের সঙ্গে নিরন্তর কাজ করে চলেন বাড়ির মেয়েরাও। সোনামুখী শহরের ভেতরে পঁচিশ চূড়াযুক্ত (পঁচিশরত্ন) টেরাকোটা অলংকৃত শ্রীধর মন্দির। স্থাপিত ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৩৫-এ তৈরি গিরিগোবর্ধন মন্দিরটিও দর্শনীয়। জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি সমিন্বত স্বর্ণমুখী দেবীর মন্দির। যার নাম থেকেই সোনামুখী শহরের নামকরণ। কোম্পানি আমলের নীলকুঠির ধ্বংসচিহ্ন দেখা যায়।

রামনবমীতে এখানে মনোহর দাসের মেলা বসে। জমে ওঠে বাউল আখড়া। এ ছাড়া কালী ও কার্তিক পুজো এখানে এতই বিখ্যাত, সেখানে ঢল নামে মানুষের। আর রাজগ্রামে গেলে ঘোড়ার সঙ্গে কিনবেন অবশ্যই গামছা। এত মোটা সুতোর গামছা বাংলায় আর পাওয়া যায় না বললেই চলে।
আরও একটা আসম্ভব শিল্প দ্রব্য বাংলার পোড়ামাটির শিল্পীরা আবিষ্কার করেছেন সেটি হল পোড়ামাটির শাঁখ। দেখে বলবেন, এটি শাঁখের নকল একটি পোড়ামাটির শাঁখ। হ্যাঁ আবার না। নকল তো বটেই। কিন্তু সেটি – আবাক হচ্ছেন কী? উঁহু বিন্দুমাত্র রূপকথা বলছি না, মুখ দিয়ে শাঁখের মত বাজানোর চেষ্টা করলে ঠিক শাঁখের শব্দে বেজে ওঠে।
এখন এটি যদি কম্পিউটার যন্ত্রে তৈরি হত, তাহলে ভীষণ গর্বে বলা হত আধুনিকতম প্রযুক্তির উপহার। যেহেতু ইংরেজি না জানা, গ্রাম্য কুমোররা এই অসম্ভব আবিষ্কারটি তৈরি করেছেন, সেটিকে নিয়ে বাংলার শিল্পসংগ্রাহকদের বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই, প্রযুক্তি লেখকদেরও এ বিষয়ে ভাবনা চিন্তা নেই।

বিনীত আনুরোধ সেটি সংগ্রহ করবেন, আর চিন্তা করবেন বাংলারই এক সময়ের রাজধানী জেলা, বাঁকুড়ার অদম্য কিছু কুমোর সেটি কীভাবে তৈরি করেছেন পেটেন্টের পরোয়া না করেই, নিজেদের পরিচিতির ভাবনা না ভেবেই। সেই ভাবনা দিয়ে পোড়ামাটির অসাধারণ সব শিল্পীদের নতুন করে মনে করি যারা আমাদের উপহার দিয়েছেন কয়েকশ বছরের মাটির বাড়ি, যে বাড়ি রোদে জলে ঝড় ঝঞ্ঝায় বাজে পোড়েনা, ভাঙ্গে না, রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় না এ বাড়ি বা শঙ্খ তৈরি করার উদ্দ্যেশ্যে গবেষণার জন্য এবং তার পরে তৈরি করার জন্য বিদেশি ঋণ নিতে হয় নি, বিদেশি প্রযুক্তি কিনতে হয় নি। অথচ সিমেন্ট আর লোহার কাঠিতে তৈরি বাড়ি কয়েক দশকের মধ্যেই ভেঙে পড়ে হুড়মুড়িয়ে। সম্পাদক মশাই যে সুযোগ দিলেন, এই সুযোগে সেই মানুষগুলোকে আমাদের শ্রদ্ধা জানালাম মনের প্রণতি মিশিয়ে। (চলবে)