বিশাখদত্তের মুদ্রারাক্ষস নাটকে রাক্ষস নন্দরাজা ধননন্দর অমাত্য, প্রধানমন্ত্রী। চাণক্যের কূটনৈপূণ্যের প্রলয়নাচন থেকে গোয়ালা রাজা আর নন্দ রাজবংশ কোনওটাই বাঁচাতে পারেন নি; কিন্তু পলাতক রাক্ষস অমাত্য পাটলিপুত্রে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যকেও স্বস্তিতে রাখেন নি। রাক্ষস কোঅপ্টেড হলেন গুপ্ত রাজবংশে। গয়লা রাজবংশের প্রধানমন্ত্রী অমাত্য রাক্ষসের দৃষ্টিতে আজকের চলমান রাজনীতির টিপ্পনি।
ভারতীয় জনতা পার্টির নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহের এক দশকের তুমুল ছকভাঙ্গা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সামলাতে তাবৎ বিরোধী শিবির শ্মশানযাত্রায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অপর্যাপ্ত জনমোহিনী ক্যারিশমা পর পর দুটো কেন্দ্রিয় স্তরের নির্বাচনী বৈতরণী পার করলেও রাজ্যস্তরে মোদির অপ্রতিহত রথ কাদায় ভেঙে পড়েছে ১) জোরদার স্থানীয় নেতার পাল্টা ক্যারিশ্মা ধাক্কায় আর ২) ভাজপা-সঙ্ঘের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দিস্তানী রাজনীতির বাইরে বৈচিত্র বুঝতে না পারার অক্ষমতায় — রামরাজ্য চাপিয়ে দেওয়ার উদগ্র বাসনায়। রাজনৈতিক গুরু লালকৃষ্ণ দাঙ্গা আদবানিকে রাজনৈতিক সন্ন্যাস নিতে বাধ্য করা নতুন যুগের দুই চাণক্য নরেন্দ্র মোদি আর তাঁর দুকানকাটা সেনাপতি অমিত শাহ জানেন, উপনিবেশিক রাজনীতিই আদতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির খোঁয়াড়। বহুনেতার পার্টি ভারতীয় জনতা পার্টিকে কুক্ষিগত করা মোদি-শাহের, বিজেপি যে রাজ্যে কম ব্যবধানে হেরেছে, মুদ্রারাক্ষসের বলে সে রাজ্য জয় করার অক্ষহৃদয়, পাসওয়ার্ড বজ্রমুঠিতে আটকানো। নরেন্দ্র মোদির বিশ্বস্ত লেফট্যানেন্ট অমিত শাহ বিপক্ষের রক্ষণ চুরমার করে একের পর এক রাজ্যে বিধান সভা চালাবার অধিকার দখল নিয়েছেন শুধুই সুটকেস প্রকল্প সফল করে। প্রেমে আর যুদ্ধে সব কিছুই জায়েজ জানেন ভারতীয় রাজনীতির দুই সফল নেতা।
কিন্তু কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনে দুজনেরই সমস্ত কূটকৌশল অচল করে কংগ্রেস অপ্রতিহত গতিতে ক্ষমতায় এসেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে ভাজপা পেয়েছে কংগ্রেসের তুলনায় অর্ধেকেরও কম আসন। তাদের আশা ছিল কংগ্রেস ১০০র আশেপাশে থাকবে যাতে সুটকেস রাজনীতি চালানো যায়। এই পরিবেশে সুটকেস রাজনীতি অচল — তবুও রাজ্য-রাজনীতি বাজিয়ে দেখতে ছাড়েন নি, কিন্তু কিস্যু করা যায় নি। দুই খেলোয়াড় বেশ ব্যাকফুটে। উজ্জীবিত কংগ্রেসের সামনে মাথা নামিয়ে বাস্তব মেনে নিয়েছেন তারা। পোড় খাওয়া দুই নেতা জানেন কর্ণাটকের এই পরিবেশে সুটকেস রাজনীতি চালাতে গেলে ইমরানের পাকিস্তানের মত হিংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে মানুষ। মাথার ঘায়ে টমি পাগলের দশা ঠাণ্ডা মাথায় দেশজুড়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়া সংঘ-ভাজপায়। একমাত্র পথ, নষ্ট ইমেজ উদ্ধার। ভাজপায় অসন্তোষ সামলাতে আর ইমেজ উদ্ধারে তারা ভোটের পরে যে কটা পদক্ষেপ নিলেন, তাতে লাঠি ভাঙলেও নষ্ট ইমেজ উদ্ধার হল কী? অথচ পাবলিক বলছে নরেন মোদি কংগ্রেসকে ভারত ছাড়া করতে গিয়ে ভাজপা মুক্ত দক্ষিণ উপহার দিল জনগণকে। কর্ণাটকের নির্বাচনের পরে ৫টা কোল্যাটারাল ড্যামেজ তৈরি করেদিলেন বজ্রঅঙ্গী হনুমান। সেই কোল্যাটারাল ড্যামেজগুলো কী কী হল, গুণতি করা যাক —
শাহরুখ ২, বিজেপি ০
কাক কাকের মাংস খায় না প্রবাদ মিথ্যে প্রমান করলেন মোদি-শা। যে ভাজপা কেন্দ্রিয় তদন্তকারী সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে দেশজোড়া বিরোধীপক্ষের মুখ বন্ধ রেখেছে (কর্ণাটকের ডিকে শিবকুমারকেই জেলে পুরেছিল ইডি), সেই কেন্দ্রিয় নারকোটিক কন্ট্রোল ব্যুরোর সমীর ওয়াঙ্খেড়েকে অমিত শাহের সিবিআই ২৫ কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার দায়ে শমন পাঠিয়েছে। পাঠানের মত সি ক্লাস সিনেমার বিরুদ্ধে আইটি সেল ধর্মদ্বেষী প্রচার চালিয়ে হিট করিয়েছে। বিজেপির মুখ পুড়ল দুটো ক্ষেত্রেই। পাঠান হিট আর শাহরুখ খানের ছেলের অভিযোগ মুক্তি আর সমীর ওয়াঙ্খেড়ের সম্মানহানি। যে টপ আমলাকে সামনে রেখে বলিউড থেকে টাকা আদায় আর দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক সমীকরণ সাধন করতে গিয়েছিল ভাজপা, সেই আমলাকে আপাতত মেরে, লং রানে বাঁচাতে সিবিআই দিলেন অমিত। সিবিআই ৩-৫% মামলায় জেতে, এই তথ্য মোটাভাই-এর অজানা নয়। দুজনেই জানেন আপাতত সিবিআই দিলেও সমীর বলিউড থেকে যে টাকা আদায় করেছে, লং রানে সেই টাকাও সেফ, অভিযুক্ত আমলাও সেফ। আপাতত চাকরি আর সম্মান — আম আর ছালা দুইই গেল। কর্ণাটকের বিজেপি হারের প্রথম কোল্যাটারাল ড্যামেজ সমীর ওয়াঙ্খেড়ে।
কিরণ রিজুজুর শাস্তি বদলি
যে কিরণ রিজুজুকে সামনে রেখে প্রায় এক বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে কামান দাগছিলেন মেঘনাদ মোদি, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টকে আর নির্বাচনে জিততে হয় না, তারা অনেকটাই সেফ। তার মোদির মুখ রিজুজুর বিরুদ্ধে লড়েছেন কয়েকজন সিটিং জাজ। শেষ মোদি মুখ বাঁচাতে কর্ণাটক হারের পরে কোনও বাহানা না দেখিয়েই রিজুজুকে কোতল করলেন — সরিয়ে দিলেন পরিবেশ মন্ত্রকের মত অকিঞ্চিতকর এক দপ্তরে। এখানেই শেষ নয় — সিবিআই প্রধান বাছার জন্যে প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বোর্ড তৈরি করলেন মোদি। তার বদলে সুপ্রিম কোর্ট মোদির প্রডিজি, আদানির বিরুদ্ধে সেবিকে তদন্ত করতে আরও তিন মাস সময় দিল। কর্ণাটক হারের পর এটাই মোদি-শাহের জন্যে সেরা খবর। কিন্তু রিজুজুর কোল্যাটারাল ড্যামেজ আটকানো যায় নি। কোল্যাটারাল ড্যামেজ দুই, বেচারা কিরণ রিজুজু।
কেরালা স্টোরি, গপ্পই
যে কেরালা স্টোরির ‘ফ্যাক্ট’ সামনে রেখে কর্ণাটক নির্বাচন করলেন গ্রুজ্জী, তাকে পিওরলি ফাকশন বলার নির্দেশ দিল সুপ্রীম কোর্ট। মোদির মুখ পুড়ল। কোল্যাটারাল ড্যামেজ তিন, কেরালা স্টোরি।
২০০০ টাকার নোট বাতিল
আমাদের বন্ধু বাংলার কারিগর ফেসবুকে লিখছেন —
“কন্সপিরেসি থিওরিস্টদের ২০০০ নোট বাতিলের একটা তত্ত্ব হল কর্ণাটকে ভাজপা কয়েক হাজার কোটি টাকা জনগণকে ঘুষ দিয়েছিল ২০০০-এর নোটে ভোট পাওয়ার জন্যে। জনগণ উতপাতের ধন চিৎপাতে দিয়ে গিলে খেয়ে কঙ্গীদের ভোট দিয়েছে। রাগে গ্রুজী ২০০০ নোট বাতিল করলেন। আরেকটা কোল্যাটারাল ড্যামেজ”। এটা সত্যি না হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু গোদি মিডিয়ার মুগ্ধ-ভাষ্য কালো টাকা আটকাতেই গোলাপী টাকার মুখে কালি লেপে জলাঞ্জলী দিলেন মোদিজী। সেটাই যদি লক্ষ্য হত, তাহলে ২০১৬য় কেন ২০০০ টাকা আনা, যে টাকা এটিএমে রাখতে গিয়েও রিক্যালিব্রেট করতে হয়? উত্তর হল, তোমরা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের থেকে বেশি জান? কিন্তু তাতেও কী সামাল দেওয়া যাবে? কোল্যাটারাল ড্যামেজ চার ২০০০-এর গোলাপি টাকা।
ভূস্বর্গে গণ্ডগোল
কর্ণাটকে হারার আন্তর্জাতিক অসম্মান হল কাশ্মীরে জি-২০ সম্মেলনে চিন, আরব আর মিশরের কাশ্মীরে বয়কট। মিশর এবছর প্রজাতন্ত্র দিবসে আমন্ত্রিত ছিল। জি-২০তেও তারা আমন্ত্রিত। তাদের এই বৈঠকে না আসা ভারতের পক্ষে বড় কূটনৈতিক ধাক্কা। এই কোল্যাটারাল ড্যামেজ সামলাতে পারবেন তো দুই সংঘ প্রডিজি? কোল্যাটারাল ড্যামেজ পাঁচ আন্তর্জাতিক কূটনীতি।