বেশ কিছুদিন আগে একজন নামী মনের ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম শহরের এক দামি পলিক্লিনিকে। ডাক্তার পরিচয়ের থেকেও নিজেকে মনের মিস্ত্রি হিসেবেই পরিচয় দিতে বেশি ভালবাসেন ছাত্রদের মধ্যে রীতিমতো জনপ্রিয় এই ডাক্তার-শিক্ষক। সেদিন রোগীর ভিড় প্রায় ছিল না বললেই চলে, তবুও এক কিশোর এবং তার বাবা-মাকে নিয়েই তিনি নাজেহাল। বন্ধুদের সঙ্গে নাকি কিছুতেই মানিয়ে চলতে পারছে না ক্লাস সেভেনের ছাত্রটি, প্রায়ই বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে স্কুলে। বাবা-মায়ের ক্রমাগত অনুনয়-বিনয়, ‘ডাক্তারবাবু এমন কিছু ওষুধ দিন যেটা খেলেই ছেলের এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’ ডাক্তারবাবু কিন্তু কিছুতেই তাঁদের বুঝিয়ে উঠতে পারছেন না যে ওষুধ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যায় না। এটা একজন ডাক্তারের কাজও নয়। এর জন্য সাহায্য নিতে হবে সাইকোলজিকাল কাউন্সিলরের, যিনি বিষয়টি বিশ্লেষণের পরে রাস্তা দেখাবেন সঠিক সমাধানের।
আর একটা ঘটনা আরও মজার। এক উচ্চবিত্ত সুদর্শন যুবক এক মনস্তাত্বিক পরামর্শদাতা বা সাইকোলজিকাল কাউন্সেলরের কাছে এসে আবদার করলেন তিনি এবং তাঁর সুন্দরী স্ত্রীর আউটিঙের সঙ্গী হতে হবে তাঁকে। বলা নেই, কওয়া নেই,আচমকা এই প্রস্তাব কেন? করুণ মুখে যুবকটির উত্তর, ‘আমার বউ কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। কথা বলে না আমার সঙ্গে। বাকি সব ব্যাপারে দারুন আগ্রহ। কাউকে কথাটা বলতেও পারছি না। আপনি আমাদের সঙ্গে কয়েকদিন গ্রামের বাগান-বাড়িতে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক আর ভিটামিন দিয়ে ওকে ভাল করে দিন। ও যেন আমার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে।’ কথাটা শুনে কাউন্সেলরেরই গলা শুকিয়ে কাঠ।
আসলে মানসিক সমস্যায় জর্জরিত বেশির ভাগ মানুষই এখন চায় ‘হ্যাপি পিল’ কিংবা ‘মুশকিল আসান ট্যাবলেট’, যা খেলেই বোধ হয় নিমেষের মধ্যে দূর হয়ে যাবে সব দুঃখ, সমাধান হয়ে যাবে সব সমস্যার। সুখের সাগরে ভেসে যাবে জীবন। কিন্তু বাস্তবে কি কখনও তা সম্ভব?
ওষুধ না কাউন্সেলিং?
হ্যাঁ, মানসিক রোগের নিরাময়ের জন্য ওষুধের দরকার হতেই পারে, কিন্তু সেটাই মুক্তির একমাত্র রাস্তা নয়। সমস্যার সমাধানের জন্য কখনও চাই কাউন্সেলিং, কখনও প্রশিক্ষণ। বিহেভিয়র থেরাপির মাধ্যমে আচরণ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাও কম নয়।
অনেকে বুঝতেই চান না যে নিজেদের অজান্তেই কখন চুপিসাড়ে বাসা বেঁধেছে মানসিক বিকার। যখন অনুভূত হলো তখন হয়তো দেরি হয়ে গেছে কিছুটা। তবুও কিন্তু বন্ধ হয় না ফেরার পথ। শুধু এই কথাটা বুঝতে হবে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনস্তত্ত্ববিদ এবং মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতার ভূমিকা পারস্পরিক সম্পর্ক যুক্ত হলেও এবং একে অপরের পরিপূরক হলেও প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব কাজের ক্ষেত্র আছে। এবং এই ব্যাপারটা মানসিক সমস্যায় যারা ভুগছেন ও তাঁদের প্রিয়জনদের অবশ্য-ই স্পষ্ট ভাবে জানা উচিত। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট পেশাদারদেরও এ বিষয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোন কাজটার জন্য ঠিক কাকে দরকার সে ব্যাপারে সঠিকভাবে পথ দেখাতে হবে।
যেমন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানিয়ে চলার সমস্যা এবং পরিণামে বিচ্ছেদ এখন জলভাত। নেপথ্যে কারণ থাকতে পারে অজস্র। থাকতে পারে শারীরিক মিলনের সমস্যা,যেখানে ডাক্তার কিংবা ওষুধের প্রয়োজন হলেও হতে পারে, কিন্তু যেখানে মূল সমস্যা শাশুড়ির সঙ্গে বউমার ইগো-ক্ল্যাশ কিংবা স্বামীর প্রতি স্ত্রীর সন্দেহ-প্রবণতা অথবা লাগামছাড়া অধিকারবোধ, সেখানে ডাক্তার-বদ্যি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আদৌ সম্ভব কি? এখানে তো দরকার সাইকোলজিকাল কাউন্সেলরের সঠিক বিশ্লষণ এবং পরামর্শ।
আবার ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবা-মায়েদের ক্রমাগত বেড়ে চলা উদ্বেগ নিরসনের ক্ষেত্রেও কাউন্সেলিঙের গুরুত্ব উর্ধমুখী। শৈশবে রীতিমতো মাথাব্যাথার কারণ দু’টি—‘অপজিশন ডিফায়েন্স ডিসঅর্ডার’ বা অবাধ্যতা এবং ‘কনডাক্ট ডিসঅর্ডার’ বা আচরণগত সমস্যা। দু’টি ক্ষেত্রেই সমাধানের মূল রাস্তা কাউন্সেলিং এবং বিহেভিয়ার থেরাপি। আবার ADHD বা ‘অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার’এর জন্য জরুরি সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ এবং কাউন্সেলিং। আর অটিস্টিক চাইল্ড এবং মানসিক জড়বুদ্ধির শিশুদের ক্ষেত্রে সাইকিয়াট্রিস্টদের দেখানো পথে আসল কাজটা তো করতে হয় প্রশিক্ষকদেরই।
সবথেকে বড় কথা অভিভাবক হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালনের জন্যও কিন্তু এখন কাউন্সেলরদের দ্বারস্থ হচ্ছেন বাবা-মায়েরা। নিচ্ছেন বিশেষ প্রশিক্ষণ।
যৌথ প্রয়াস
এবার আসছি অবসাদের কথায়। কখনও অকারণ মন খারাপ, কখনও কিছুই ভাল লাগছে না আবার কোনও সময় এক অদ্ভুত শূন্যতা। জাগাতে পারে আত্মহত্যার ইচ্ছেও। সত্যিই এ এক গোপন মহামারী, কয়েক বছরের মধ্যেই যা বিশ্বের দ্বিতীয় মহামারীর আকার নিতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আশঙ্কা।
টেনশন বা স্ট্রেসের বিপদটাও কিন্তু কিছু কম নয়। পদে পদে অজানা আশঙ্কা,আতঙ্ক। বুক ধড়ফড়, মাথাধরা, অনিদ্রা, ক্লান্তি, উত্তেজনা, হাত-পা ঘেমে যাওয়া,ভয়, হতাশায় ভেঙে পড়া, খিটখিটে মেজাজ, কাজে অনীহা—আরও কত কিছু। একটাই আর্তি, ‘মুক্তি চাই। সুস্থ মনে বাঁচতে চাই।’ প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিন্তু চাই ডাক্তার, মনোবিদ এবং মনের পরামর্শদাতার সহযোগিতা। একমাত্র যৌথ প্রচেষ্টাই পারে মনকে এই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে। মনে রাখতে হবে, ডিপ্রেশন-টেনশন-স্ট্রেস মনের সঙ্গে গুরুতর দৈহিক সমস্যারও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মনের ভারসাম্যহীনতার হাত ধরে আসতে পারে হাই ব্লাডপ্রেসার, সুগার, কোলেস্টেরল সংক্রান্ত অসুখ। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে হার্ট, কিডনি, লিভার। আবার উল্টোটাও হতে পারে। দৈহিক এই সমস্যাগুলো থেকেই জন্ম নিতে পারে মানসিক রোগ। আবার কিছু রোগের কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও অবসাদ ডেকে আনতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। অতএব, এই সব সমস্যার মোকাবিলায় ডাক্তারদের চাই-ই। কিন্তু এখানেই সমস্যার শেষ নয়। রোগীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথাবার্তা চালিয়ে,তাঁর আস্থা অর্জনের মাধ্যমে মনের গহনে ডুব দেবার জন্য দরকার কাউন্সেলরকেই। আসল কারণ খুঁজে বের করে এনে মুক্তির পথটাকে তো বাতলাতে হবে তাঁকেই। ঠিক এইভাবেই খুঁজে বের করতে হবে মধ্যবয়সের মহিলার একাকিত্ববোধের কিংবা ‘এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম’-এর সমাধানের পথ। প্রেমিক-প্রেমিকার বা নিছকই বন্ধুত্বের মধ্যে সম্পর্কের জট ছাড়ানোর যথাযথ কৌশল আশা করা যায় মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতার কাছেই। ‘পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ এর সঙ্গে লড়াইয়ের অস্ত্রও কাউন্সেলিং-ই। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টে অবশ্য আজকাল জায়গা করে নিয়েছে প্রাণায়াম আর যোগ-ব্যায়ামও। সঙ্গে অবশ্যই ধ্যান।
সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল রোগে কিন্তু মূল দায়িত্বটা বর্তায় মনের ডাক্তারের ওপরেই। এখানে ওষুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিন্তু এরই পাশাপাশি সাইকো-সোশ্যাল থেরাপির গুরুত্বটাও কম নয়।
ধৈর্য আর সময়
আসলে পারিবারিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে মানুষ এখন এতটাই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে যে ধৈর্য ব্যাপারটাই যেন জীবন থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। মুক্তির জন্য ছটফট করছে সকলে। অনেকে তো আবার বুঝতেই পারেন না বা বুঝতে চান না আসল সমস্যাটাকে। লোকে পাছে পাগল ভেবে বসে তাই যন্ত্রণা চেপে রাখেন, বলতেই চান না কাউকে। নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে আরও সর্বনাশ ডেকে আনেন। কেউ আবার আসক্ত হয়ে পড়ছেন পেইন-কিলারে। অথচ অনিদ্রা কিংবা ব্যথার আসল কারণ ডিপ্রেশন কিংবা স্ট্রেস কি না তা ভেবেও দেখছেন না অনেকেই। মনের ডাক্তার কিংবা পরামর্শদাতার কাছে গিয়েও ভাবখানা এই, ‘এমন কোনও ওষুধ দিন যাতে এখনই দূর হয়ে যায় সব দুঃখ-কষ্ট, মনের ব্যাথা।’ কিন্তু মনের জ্বালা জুড়ানো কি এতই সহজ? এর তো কিছু নির্দ্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। যেমন সাইকোথেরাপি, বিহেভিয়রথেরাপি, ড্রাগথেরাপি। প্রতিটির আবার নিজস্ব কিছু ভাগ আছে, আছে বিশেষত্ব। যে অসুখে যা লাগে। কাজের ক্ষেত্র অনুযায়ী আছে স্পেশ্যালাইজেশনও। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না—এটা মেনে নিতে হবে পেশাদারদেরও। সবকিছু একাই করে নেব, অন্য কাউকে জায়গা ছাড়বো না, এই মনোভাব থাকলে রোগীদের প্রতি অবিচার করা হবে। আর রোগী এবং তাঁর প্রিয়জনকেও বুঝতে হবে সেই কঠিন বাস্তবটা, মনের সমস্যা সমাধানের কোনও জাদুকাঠি নেই, নেই কোনও ‘হ্যাপি পিল’ও। চাই শুধু ধৈর্য এবং অবশ্যই কিছুটা সময়।