করোনা আমাদের শোককেও স্তব্ধ করে দিয়েছে। চারিদিকে চাপা অস্থিরতা। অবসাদের ছায়ায় জিরিয়ে নেওয়ারও অবকাশ নেই। নিত্যনতুন দুঃসংবাদ অবিচ্ছিন্ন অবিরল। লকডাউনের ছাড় থেকে করোনার নাচার প্রকৃতিতে জেরবার জনজীবন। তার মধ্যে অপার্থিব হয়েছেন আনিসুজ্জামান (১৮.০২.১৯৩৭-১৪.০৫.২০২০) তথা বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপকের শিরোভূষণে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বাংলা মননশীল সাহিত্যে তাঁর অবাধ বিচরণ দুই বাংলার জনমানসেই হাতছানি দিয়ে চলে। শিক্ষাক্ষেত্রের পণ্ডিতির ভূমিকাকে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য অনেকেই সফলতা পেয়েছেন। কিন্তু সেই অধ্যাপনার গণ্ডিকে দেশবিদেশের বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দিয়ে ক্রমশ তার ছায়াকে কায়ায় পরিণত করে শ্রদ্ধা-সম্মান ও ভালবাসা এবং জাতীয় স্বীকৃতি লাভের বিরল ব্যক্তিত্বে আনিসুজ্জামান একালে অনন্য ব্যক্তিত্ব।
বিদ্বান সর্বত্র পুজ্যতের চলমান অভিজ্ঞান ছিলেন তিনি। অন্যদিকে বাংলাদেশের শিক্ষা ও বৌদ্ধিক চর্চায় তাঁর অভিভাবকসুলভ স্বচ্ছন্দ বিচরণ তাঁকে ক্রমশ সে দেশের প্রমুখে প্রতিমায়িত করেছিল। এপার-ওপার দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির অভিভাবকত্বে তাঁর বিস্ময়কর ভূমিকা আজীবন উৎকর্ষমুখর হয়ে ছিল। তাঁর ছিল না শিল্পী-সাহিত্যিক হিসাবে অদ্বিতীয় পরিচিতি, না ছিল গড়ে তোলা প্রাতিষ্ঠানিক আভিজাত্য। অথচ সাহিত্য-সংস্কৃতির বনেদি আভিজাত্যে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি অভিভাবকসুলভ শোভন ব্যক্তিত্বের গৌরব ছড়িয়ে দিয়েছে। সর্বত্র তাঁর অধ্যাপক পরিচিতির বনেদিয়ানা প্রকাশমুখর। সেখানে তাঁর পাণ্ডিত্যের ভার তাঁকে জনবিমুখ করেনি, বরং জনসমাদরে জনপ্রিয় করে তুলেছে যা সচরাচর দেখা যায় না। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান শিক্ষাক্ষেত্র থেকে জনসমাবেশ সর্বত্র সচল সরব। সেই সরবতার পরশে আমিও ধন্য হয়েছি। পেয়েছি তাঁর বনেদি সৌরভ। তাঁর এই ক্রান্তিকালে চলে যাওয়ায় সেই স্মরণের সরণি বেয়ে কত কথাই না মনে পড়ছে, সেকথা ভাবতেই বিষাদের ছায়াতেও আলো এসে পড়ে।
#
আসলে কারো মৃত্যু প্রাচীর ভেঙে পড়ার শব্দ বয়ে আনে, কারো বাড়ি ভেঙে পড়ার, কারো গাছ উপড়ে পড়ার, কারো বজ্রপাতের, কারো আবার ভূমিকম্পের। আনিসুজ্জামান ভূমিকম্পে তাঁর অনস্তিত্ব জানিয়ে দিয়েছেন। বেশি শব্দ হল না, কিন্তু বাঙালির বোধিবৃক্ষের পতনে সারা বাংলা কেঁপে গেল। দুই দেশেই তাঁর প্রকাশ, তাঁর আকাশ, তাঁর শাখাপ্রশাখা, তাঁর অস্তিত্ব আমূল বিস্তৃত। মহীরূহের পতনে শব্দ যে কম্পনেও অনুভূত হয়। তাঁর পরশেও ছিল সেই কম্পনের শিহরণ। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তা পরখ করার। তখনও তাঁকে ভালো করে চেনা-জানার অবকাশ হয়নি। পত্রপত্রিকার দৌলতে তিনি তখন আমার কাছে বাংলাদেশের নামীদামি মননশীল ব্যক্তিত্ব। এজন্য তাঁর এদেশে আগমন আমার কাছে আবির্ভাব হয়ে ওঠে। আসলে ইতিমধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরে কোচবিহারের দিনহাটায় বয়েজ রিক্রিয়েশন ক্লাবের আয়োজনে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন হয়ে আসছিল। সেখানে বাংলাদেশ থেকে জনপ্রিয় কাউকে আনার কথা ওঠে। আমি ক্লাবের তৎকালীন সম্পাদক গোকুল সরকারকে বারবার আনিসুজ্জামানের কথা জানাই। যাতে তাঁর আলোতে আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি ছড়িয়ে পড়ার অবকাশ পায়। অন্য একটি কারণও তাতে মজুত ছিল।
সেবার আমাকেই সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া কথা জানানো হয়। এতে আনিসুজ্জামানের হাতে থেকে তা নেওয়ার সদিচ্ছা জেগে ওঠে। স্বাভাবিক ভাবেই জীবনে প্রাবন্ধিক হিসাবে প্রথম পুরস্কার প্রাপ্তিতে রোমাঞ্চিত মন যখন প্রত্যাশিত ভাবে তাঁর হাতে থেকে নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখনও অপূর্ব শিহরণে কেঁপে উঠেছিলাম। আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন মঞ্চে (২০১৫-এর ৭ ফেব্রুয়ারি) ‘হিতেন নাগ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪’ গ্রহণ করেছিলাম একালের বাঙালির শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিকের হাত থেকে। অসাধারণ মনীষার আলোর পরশে সেদিন আমার পুরস্কার আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। আজ তাঁর শূন্যতায় সেই স্মৃতিচিত্রই অমূল্য পুরস্কার মনে হয়। মহাজনেরা যে এভাবেই দুহাতে ছড়াতে ছড়াতে না ফেরার দেশে অদৃশ্য হয়ে যান। অথচ তাঁদের নৈঃশব্দ্যেই জেগে ওঠে ভূমিকম্পের বিধ্বংসী শিহরণ। সে ভূমিও যে তাঁদের ভূমিকায় সচল সরব। সেখানে আনিসুজ্জামান বাঙালির বোধিবৃক্ষ, বাংলার মনীষা প্রদীপ। সেই প্রদীপে যে অসংখ্য প্রদীপ জ্বলে উঠেছে, তা সহজেই অনুমেয়। অন্যদিকে তাঁর স্মরণীয় স্মৃতির ঝাঁপি তাতেই শেষ হয়ে যায় না। ভাগ্যক্রমে দেবতাও প্রসন্ন হয়ে ওঠে।
#
আমার প্রবন্ধের অনুরাগী পাঠক তথা গবেষক কার্তিককুমার মণ্ডল ইতিমধ্যে আমার প্রবন্ধের একটি সংকলন সম্পাদনা করেছিল এবং সেটি আনুষ্ঠানিক প্রকাশের তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। আমি সেটিও সেই মঞ্চে আনিসুজ্জামানের হাতে প্রকাশের কথা কার্তিককে জানাই। আনিসুজ্জামান সানন্দে তা প্রকাশ করেন এবং আমার এরকম বয়সে কারও দ্বারা সম্পাদিত প্রবন্ধ-সংকলন বিষয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেই অনুষ্ঠানে কথাসাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যও উপস্থিত ছিলেন। বইটির উদ্বোধকের কথায় আকৃষ্ট হয়ে তিনি এক কপি ‘স্বপনকুমার মণ্ডল নির্বাচিত প্রবন্ধ-সংকলন’ চেয়ে নেন। সেদিক থেকে আনিসুজ্জামানের বনেদি সান্নিধ্যের শিহরণ আজও আমি বয়ে চলেছি। তারপর থেকে তাঁকে যত জেনেছি, ততই তীব্র অনুরাগে রোমাঞ্চিত হয়েছি।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অমূল্য গবেষণাকে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগে তাঁকে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াসী হই। আমাদের সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা অনার্সের সিলেবাসে তাঁর অসাধারণ প্রবন্ধের বই ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’(১৯৬৪) আজ পাঠ্য। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ উদার আকাশে ছিল বিদ্যারই মুক্ত হাতছানি। আনিসুজ্জামানের অনাড়ম্বর জীবনের পরশ সেদিনও অনুভব করেছিলাম। নিজেকে সহজ করে নিতে পেরেছিলেন বলে সর্বত্র তাঁর অনায়াস বিচরণ ক্ষেত্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ে, মান্যতাবোধে সংযম রক্ষা করে চলায় বিপন্নতাবোধে তাঁকে পীড়িত হতে হয়নি। সহজতা ও সংযমে তাঁর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ব্যক্তিত্ব বাঙালি মানসে ক্রমশ ধারে আর ভারে ভারী হতে থাকে। সেই ভারের আকস্মিক পতনে মানসভূমির কম্পন তো অনিবার্য মনে হয়।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া।