আজ দু-বছর হলো… শিক্ষক দিবসের প্রাঙ্গণ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন। এই মাঝের সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার সামাজিক প্রেক্ষাপটে এসেছে প্রচুর পরিবর্তন। এই দীর্ঘ যোজন দূরত্ব পেরিয়ে আবার কবে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে আন্তরিকতা জায়গা নেবে, সে নিয়ে বড় চিন্তায় দিন কাটছে।
বছরের প্রথমে নতুন ক্যালেন্ডার হাতে এলে কবে দুর্গাপূজা কিংবা পয়লা বৈশাখের দিনক্ষণ দেখার সাথে সাথে আরেকটা তারিখের দিকে চোখ পড়ে… ৫ সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবস। আজ থেকে ১৪ বছর আগে সুন্দরবন অঞ্চলের এক অতি প্রত্যন্ত জায়গায় স্কুলে চাকরির প্রথম চিঠিটা এই দিনই পাই। তারপর এত পথ মন খারাপ নিয়ে যোগদানের পর কখন যেন অজান্তে এই পেশাটাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম। নদীর পাড়ের সেই হতদরিদ্র গ্রামের ছেলে মেয়েরা কি অসাধারণ আন্তরিকতায় আমাদের বরণ করে নিত শিক্ষক দিবসের দিন। ওদের নিজের হাতে তৈরি কার্ড, বেলুন দিয়ে সাজানো ঘর, চকলেট মিষ্টি পেন উপহার… আমাদের আপ্লুত করতো। আমাদের দিদিমণিদের কাছেও এই দিনটা একটু বেশিই বিশেষ ছিল… তাই সাজগোজের পরিমাণটা ঐ দিন তুলনামূলক বেশি থাকত। সকাল থেকে বাড়িতেও সাজো সাজো রব… আজ যে আমাদের দিন! ট্রেনের লেডিস কামরায় আমরা দিদিমণিরা সেদিন একটু বেশিই উচ্ছ্বসিত থাকতাম। স্কুলের পথে যাওয়ার ২ ঘন্টার ধকল এক নিমিষে মিলিয়ে যেত যখন গেটের বাইরে থেকেই ছেলে মেয়েগুলো ‘Happy Teacher’s Day’ বলে প্রণাম করতে আসত। তারপর ওদের বড় ক্লাসের ছেলেমেয়েদের কি উৎফুল্লতা, ওরা যে প্রথম সুযোগ পাচ্ছে… ছোট ক্লাসে পড়ানোর। নিজেদের মনে মনে শিক্ষক ভাবার বাসনাটা এদিনই হয়ত চাগাড় দিয়ে ওঠে। হয়ত বা আমারও কোন এক শিক্ষক দিবসে প্রিয় দিদিমণির ভূমিকা পালন করতে করতে এই পেশায় পদার্পণ। প্রথম দুটো পিরিয়ড ওরা ক্লাস নিত, আমরা দূর থেকে দেখতে যেতাম। তারপর খোলা মাঠে নিজেদের খুশি মত অনুষ্ঠান করে ওদের প্রিয় শিক্ষক শিক্ষিকাকে বরণ করে নিত। দিনের শেষে মিষ্টি চকলেট খেয়ে ওরাও একটা ফুরফুরে মন নিয়ে বাড়ি ফিরত, সাথে আমাদেরও মন জুড়ে এই দিনটার ভালবাসার আবেশ থেকে যেত।
দীর্ঘ ৭ বছর পরে সেই গ্রাম ছেড়ে মফস্বলের এক মেয়েদের স্কুলে আবার নতুন করে শিক্ষকতার শুরু। এখানেও প্রায় ৭ টা বছর কাটিয়ে দিলাম। আন্তরিকতার দিক থেকে দুটো স্কুলের বাচ্চাদের মানসিকতা একই রকমের। ওদের কাছে এই দিনটা থাকে… প্রিয় শিক্ষককে একটু কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখার মত সুখানুভূতি, আবার ওদের ভালবাসা প্রকাশ করার একটা বড় দিন। মেয়েদের স্কুলে এই ব্যাপারটা চমকপ্রদতায় একটু বেশি। হয়ত বা মেয়েলি আবেগ কাজ করে, তাই অতি যত্নে দিনটা পালন করে ওরা। সপ্তাহ খানেক আগে থেকে নিজেরা আমাদের থেকে অনুমতি নিয়ে রাখে… কি কি অনুষ্ঠান করবে, কখন রিহার্সাল দেবে, কারা কারা কোন ক্লাস নেবে, এ সব কিছু। ক্লাসে গেলেই শোনা যায়… ম্যাডাম, আপনার মত করে অংক বোঝাবো ছোট ক্লাসের বোনদের। এই ভাবে করলে হবে তো? এমন সব প্রস্তুতি পর্ব চলতে থাকে। যারা ক্লাস নেবে, সেই সব নবম দশম একাদশের ছাত্রীরা সেদিন সেজেগুজে শাড়ি পরে দিদিমণি সাজার অনুমতিও আদায় করে নেয়। সকালবেলা স্কুল প্রাঙ্গনে পা দিতেই বোঝা যায়, আজ দিনটা বিশেষ। মাঠ জুড়ে সামিয়ানা, ওরা অনুষ্ঠান করবে, বাকিরা সেখানে বসে দেখবে। ফুল, বেলুন দিয়ে স্টেজ সাজানো, আর তার পিছনে আমাদের বসার আসন সাজিয়ে রাখা।

আমাদের মেয়েরা ড. সর্বপল্লী রাধেকৃষ্ণণের ছবি সুন্দর করে মালা চন্দন দিয়ে সাজিয়ে রাখে। সেদিন সকালটাই কেমন অন্যরকম হয়ে যায় স্কুল চত্ত্বর। মনের কোনো এক কোণে নিজের পেশাকে নিয়ে খুব গর্বিত মনে হয়। সেদিন সকাল থেকে ছোট ক্লাসের মেয়েগুলো ও সাহস জুগিয়ে কাছে এসে বলে যায় তাদের প্রিয় দিদিমণিকে যে, আজ আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে, ম্যাডাম। বলেই টুক করে একটা প্রণাম সেরে হাতে একটা পেন দিয়েই ছুট দেয় মাঠে। এই মিষ্টি মিষ্টি অভিজ্ঞতাই শিক্ষক জীবনের পূর্ণতা। প্রথম ক্লাসের ঘন্টা পরতেই অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা মেয়েরা এসে আমাদের নিয়ে যায় প্রতিটা ক্লাস ঘুরে ঘুরে দেখানোর জন্য। কি সুন্দর করে আলপনা,রঙিন কাগজ, বেলুন,ওদের আঁকা ছবি দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে ঘর গুলো। আর সেই কিশোরী বড় ক্লাসের মেয়েগুলো বেশ দিদিমণি সুলভ আচরণে ছোট ছোট ক্লাসগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে পড়াচ্ছে!! দেখে বোঝাই যাচ্ছে, ওরা আমাদের পথ অনুসরণ করে পাঠদান করছে। এও এক গর্বের জায়গা… শিক্ষিকা হিসেবে। দুটো ক্লাস হওয়ার পরে নীচে সাড়ম্বরে শুরু হয় ওদের অনুষ্ঠান। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি, দিদিমণিদের সাহায্য ছাড়াও ওরা কি অসাধারণ নিপুণতায় নাচ, গান, আবৃত্তি, বক্তৃতা, নাটক করছে। সেই সাথে নিজেরা সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে। বাকি সব মেয়েরা শান্তভাবে বসে সে অনুষ্ঠান উপভোগ করে। এই পুরো ঘটনাটা বড় ক্লাসের মেয়েদের নিয়ন্ত্রণে চলে। এখান থেকেও বোঝা যায়… ভবিষ্যতে মেয়েরা নিজেদের সংঘবদ্ধ রেখে যেকোন পরিস্থিতি কাটাতে পারবে কি করে। এরপর ওরা কেক কেটে, বেলুন ফাটিয়ে… একটু নিজেদের মত করে আমাদের ভালবাসা পাওয়ার চেষ্টা করে। আলাদা করে এই দিন তাদের প্রিয় শিক্ষিকার জন্য ভালবাসা জড়ানো উপহার দিয়ে ছাত্রীরা যে আবেগ প্রদর্শন করে, তা শিক্ষক জীবনের পরম প্রাপ্তি। আমাদের স্কুলে এই দিন সব ছাত্রীকে মিড ডে মিলের সাথে বিশেষ পদ হিসেবে মাংস খাওয়ানোর ব্যবস্থা থাকে। এক্ষেত্রেও বড় ক্লাসের মেয়েরা দায়িত্ব নিয়ে আগে সব ছোট বোনদের খাওয়া শেষ করে, হইহই করে নিজেরা পারলে এক পাতে ওদের দুপুরের আহার সম্পন্ন করে। এরপর দিনের শেষে মেয়েদের আবদারে ওদের সাথে ফটো তোলার পর্ব চলে। এমন করে দুপুর গড়িয়ে গেলে যে যার বাড়ির পথে পা বাড়ায়। আর আমাদের মনে একরাশ প্রশান্তি নিয়ে ঘরে ফিরি।
এ লেখা… ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিকথা। এই দিনটা আমাদের কাছে এক স্বীকৃতির দিন, আমাদের কাজের বিনিময়ে ভালবাসা প্রাপ্তির দিন, আমাদের শিক্ষাদানের প্রতিরূপ দেখার দিন…. আমাদের এই পেশায় পদোন্নতি শব্দের প্রতিফলন ঘটে ছাত্র ছাত্রীদের থেকে সম্মান, ভালবাসার মধ্যে থেকেই। কিন্তু আজ দুটো বছর আমরা কেউ কিন্তু ভালো নেই, আমাদের এই প্রিয় মুখগুলোকে না দেখে। সমাজের নানা স্তরের মানুষের হাসির খোরাক হচ্ছি আমরা কিংবা আমাদের ঘরে বসে টাকা রোজগারের মত দায়ভার মাথা নত করে নিতে হচ্ছে। কিন্তু এ দায়ভার কি আমাদেরই শুধু? আমরা কি ইচ্ছাকৃত ঘরবন্দী রাখতে চাইছি বাচ্চাদের? আমরা নিজেরা কি এতটাই ফাঁকিবাজ যে, আমাদের শিক্ষাদান থেকে বিরত থাকবো? যে পেশা সমাজের সবচেয়ে সম্মানের জায়গা, আজ সেই শিক্ষক সমাজই এই করোনা পরিস্থিতিতে অসম্মানিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু যে বা যারা করছেন, তাদের নূন্যতম শিক্ষালাভও হয়েছিল এমনই কোন শিক্ষকের হাত ধরে। আবার তাদের ঘরের বাচ্চাদের কি এই বিপর্যয়ের মধ্যে তারা ঠেলে দিয়ে স্কুল পাঠাবে? শিক্ষার্থী না থাকলে শিক্ষকের ভূমিকা কোথায়?
এত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আজ আমরাও ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। মাথা পেতে অনেকটাই মেনে নিয়েছি এই অপমানের বোঝা। তাই যে শিক্ষক দিবস এত ধূমধামের সাথে প্রতি বছর কাটিয়েছি, এবার শুধু একটাই প্রার্থনা… এই লাঞ্ছনার হাত থেকে শীঘ্রই নিষ্কৃতি পাই আমরা, নাহলে সমাজের পক্ষে সমূহ বিপদ। তবুও দিনের শেষে, কয়েকজন প্রিয় ছাত্র ছাত্রীর ফোন কিংবা মেসেজে শুভেচ্ছা বার্তা যখন আসবে, মনের কোণে একটা আশা থাকবেই…. আমরা এখনও ফুরাই নি, এ সমাজে আমাদের জায়গা অক্ষুন্ন আছে। আবার নতুন ভোরে, এমনই কোন শিক্ষক দিবসে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ভালবাসার কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে শিক্ষার্থী শিক্ষক সম্পর্ককে অটুট নিবিড় রাখবে।