নগরায়নের চাপে হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের বর্ধিষ্ণু জনপদ হরিনাভি এখন নিজেকে ফ্লাট কালচারের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এখানেই দুশ বছর আগে জন্মেছিলেন পন্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্নের মতন সমাজ সংস্কারক যিনি বাংলার প্রথম মৌলিক নাট্যকারও বটে। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই গড়ে উঠেছিল হরিনাভী বঙ্গ নাট্য সমাজ। কিছুদিন আগেই এটির দ্বিশত বার্ষিকী পালিত হয়েছে। বয়সে উনি ছিলেন বিদ্যাসাগরের প্রায় সমসাময়িক।

হরিনাভীতে জন্মেছিলেন দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের মতন শিক্ষাবিদ। যিনি মাত্র সতেরো জন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হরিনাভি ডি.ভি.এ.এস হাই স্কুল। যদিও এর প্রতিষ্ঠার বছর নিয়ে দ্বিমত রয়েছে, তবে এর প্রথম ব্যাচের ছাত্ররা ১৮৬৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেছিলেন সেই হিসাবে পরবর্তী সময়ে এটিকেই প্রতিষ্ঠার বছর হিসাবে মেনে নেওয়া হয়েছে। একসময় দ্বারকানাথ শিবনাথ শাস্ত্রী ওপর হরিনাভী স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন। সম্পর্কে তিনি ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রীর মামা।

১৯২০ সালে হরিনাভির এই স্কুলে পড়াতে এসেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল যতীন্দ্রমোহনের। তারই উৎসাহ আর প্রবল তাগাদায় এখানে থাকার সময়ই তাঁর সাহিত্য রচনার শুরু। একসময় এখানে প্রবল ব্রাহ্ম আন্দোলন হয়েছিল। প্রাচীন সমাজ মন্দিরটি স্থানীয় ব্রাহ্মদের সহোযোগীতায় সুসংস্কৃত হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিস্টলে রামমোহন রায়ের সমাধি মন্দিরের অনুকরণে একটি মন্দিরও তৈরী হয়েছে।

এখানে রয়েছে প্রায় শতবর্ষ প্রাচীন লোহার রথ, ঘোষেদের বিশাল পারিবারিক প্রাচীন দেবাঙ্গন আর ভেঙে পড়া ঠাকুর দালান। চারিদিক উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা রাধা মাধব মন্দিরটি বেশ ব্যাতিক্রমী। মাটি থেকে সিড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয়। সমতল ছাদের চারিদিকে বারান্দা দেওয়া দারুন সুন্দর এই মন্দির। এখনও ভিতরে ঢুকে সদর বন্ধ করে দিলে মনে হবে আপনি উনবিংশ শতকে পৌছে গিয়েছেন। এটির স্থাপত্য দেখে আপনার কালিঘাটের মন্ডলদের মন্দিরের কথা মনে পরে যাবে। বিশালতায় সামনের নাট মন্দির মুল মন্দিরকে ছাপিয়ে গিয়েছে। দৈর্ঘে প্রস্তে বোধহয় বাগবাজারের মদনমোহন মন্দিরের সমান সমানই হবে কিংবা সুরুলের সরকার বাড়ীর মতনই।

কিন্তু তফাত একটাই। সীমাহীন অবহেলা এই অনবদ্য স্থাপত্যকে প্রায় ধংসের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। পাশেই ভেঙে পরা ঘোষেদের দুই খিলানের দুর্গা মন্ডপ। কয়েক বছর আগেও পুজোর সময় গমগম করতো। আজ খন্ডহর। তবে মন্দিরের দেওয়ালে হরিনাভী বঙ্গ নাট্য সমাজের শ্বেত পাথরের ফলকটি মনে হয় অপেক্ষাকৃত নবীন। হয়তো কোন এক সময় মন্দিরের ভেতরের সার সার ঘরের এক বা একাধিক সমাজের কাজে ব্যবহৃত হতো আর প্রয়োজনে নাট মন্দিরে মহলা। দুঃখের বিষয় দক্ষিন ২৪ পরগনার দুই বড় মাপের বনেদী বাড়ীর দুর্গা মন্ডপ — বগুড়া আর হরিনাভী আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

এদের সংরক্ষনের প্রতি কি আমাদের কোনই দায়বদ্ধতা নেই। নতুন শহর তৈরী হোক কিন্তু ফেলে আসা সময়ের পাথুরে প্রমান দু-একটা তো পরম মমতায় লালন করতে হবে। এ প্রশ্নের মুখোমুখি একদিন হতেই হবে। পুজোতে কাঠ, বাঁশ দিয়ে বহু অর্থ ব্যায় করে আমরা এর মডেল বানিয়ে সেরা পুজোর সন্মান আদায় করে নিচ্ছি কিন্ত গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের সেই বিখ্যাত গানের কথায় বলতে গেলে ‘ঐ টাকাটাই পরতো যদি একটু ঘুরে গিয়ে’ তবে কারও ‘কঠোর খিদের জ্বালা’ হয়তো মিটতো না তবে ‘বাঁচার আশা জাগতো’ সেই সব হারিয়ে যেতে বসা বাংলার স্থাপত্যের যা একান্ত ভাবেই বাংলার।

আর নবরুপে সুসংস্কৃত হয়ে ফিরে এলে স্থানীয় অনেকেরই ‘খিদের জ্বালা’ যে অবশ্যই মেটাবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই। আর ভুপেন হাজারিকার কথায় ‘একটু সহানুভূতি কি পেতে পারে না’? সেই আশায় রইলাম।
বেশ তথ্যবহুল রচনা।মন কেমন করা।আমরা বড্ড উদাসীন আমাদের অতীত গৌরব ও ঐতিহ্য নিয়ে।এর মাশুল আমাদেরকেই দিতে হবে। আপনার রচনায় এরকম অনাদৃত অবহেলিত ঐতিহ্য আলোকময় হোক, হয়ে উঠুক আলোচনার,ভাবার বিষয় এই কামনা রইল।
আমরা একই সঙ্গে গৌরব ও বেদনা অনুভব করছি । এক – একটি পূজা সমিতিকে যে পরিমাণ অর্থসাহায্য করা হয় , তার একটা ভগ্নাংশ যদি সব সমিতির বরাদ্দ থেকে নিয়েএই ধরণের গৌরব ও ইতিহাস রক্ষার কাজে লাগানো হয় , তাহলে কতই না ভালো হয় !
লেখাটি বেশ তথ্যবহুল এবং সুসংবদ্ধ । পড়ে একাধারে সম্বৃদ্ধ এবং বিষণ্ণ বোধ করছি ।
লেখাটি শুধু তথ্যসমৃদ্ধই নয়, ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করে লেখাটির মধ্যে লেখকের এক নিজস্ব ভাষাশৈলীর পরিচয় পাওয়া যায় । প্রাচীন ঐতিহ্য ও গর্বের সংস্কৃতি যে আমরা বাঙালিরা হারাতে বসেছি তার নিদর্শন স্বরূপ লেখক শুধু উদাহরণ হিসেবে হরিনাভির ইতিহাস এবং স্থাপত্যসমূহ আমাদের কাছে উপস্থাপিত করে দায় শেষ করেননি। সেসবের সংস্কার
যাতে করা হয় তার জন্য ভূপেন হাজারিকার গানের কথার মাধ্যমে কাতর আবেদন করেছেন । এমন প্রতিবেদন পড়ে ভালোও লাগে আবার হতাশাও জাগে ।