‘সেই সময়’ উপন্যাসটি লেখার জন্য আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে হাজার বার অভিনন্দন জানাই। আমি তাঁকে হাজার হাজার বার অভিনন্দন জানাই নবীনকুমারকে এই উপন্যাসের নায়ক করার জন্য। কে এই নবীনকুমার? না, তিনি কোন কাল্পনিক চরিত্র নন। তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকোর বারাণসী ঘোষ স্ট্রিটের ধনী পরিবারের সন্তান কালীপ্রসন্ন সিংহ। যাঁর জীবনের আয়ু মাত্র ৩০ বছর, ১৮৩০ থেকে ১৮৭০। মাত্র তিরিশ বছর। কিন্তু এই অত্যল্পকালের মধ্যে তিনি বাংলা সাহিত্যে, বাংলার সমাজ জীবনে রেখে গেছেন অসামান্য অবদান।
কালীপ্রসন্ন এক বিস্ময়কর মানুষ। অথচ অবাক কাণ্ড, সেই তীব্র গতিশীল, ছকভাঙা মানুষের জীবন নিয়ে খুব বেশি আলোচনা আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। সেদিক থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অসামান্য কাজ করেছেন। হোক না ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাস, হোক না গল্পরসে সিক্ত, কিন্তু এই প্রথম আমরা একটি আস্ত কালীপ্রসন্নকে, একজন জীবন্ত কালীপ্রসন্নকে পেলাম।
কালীপ্রসন্ন শুধু ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’র লেখক ও মহাভারতের অনুবাদক নন। এই দুটি বই-এর সুবাদেই আমরা তাঁকে চিনি। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা; বিভিন্ন লেখককে গ্রন্থপ্রকাশে সাহায্য করা, সংস্কারকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে চলা, এবং এই সব কারণে পারিবারিক ধনসম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার কথা তত বেশি প্রচারিত নয়। মহাভারত অনুবাদ করতে গিয়ে খরচ হল আড়াই লক্ষ টাকা। ফলে চলে গেল ওড়িশার জমিদারি। কপর্দকশূন্য হলেন কালীপ্রসন্ন, তাঁর সাহায্যে এগিয়ে এলেন না কেউ।
তিনি কিন্তু দ্বিধাহীনভাবে দাঁড়িয়েছেন পরিচিতজনের পাশে, সাহায্য করেছেন সাধ্যমতো। ‘হিন্দু পেট্রিয়টের’ সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বন্ধু তিনি। সেই প্রকৃত বন্ধু যে রাজদ্বারের মতো শ্মশানেও থাকে পাশে। ১৮৬১ সালের ১৪ জুন অকালে মৃত্যু হল হরিশচন্দ্রের। কালীপ্রসন্ন হরিশের স্মৃতিরক্ষা তহবিলে ৫ হাজার টাকা দান করলেন। হরিশস্মৃতি মন্দির স্থাপনের জন্য তিনি তাঁর সুকিয়া স্ট্রিটের ২ বিঘা জমি দান করার অঙ্গীকার করলেন। আর তিনি রচনা করলেন এক অসাধারণ পুস্তিকা : ‘হিন্দু পেট্রিয়ট সম্পাদক মৃত হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের স্মরণার্থ কোন বিশেষ চিহ্ন স্থাপন জন্য বঙ্গবাসিদেগের প্রতি নিবেদন’।
পুস্তিকায় তিনি বললেন হরিশচন্দ্রের মৃত্যুতে ভারতভূমি যত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তত ক্ষতি জলপ্লাবন, দুর্ভিক্ষ ও বিদ্রোহে হয় নি। রামমোহন, বিদ্যাসাগরের সঙ্গে হরিশচন্দ্রের তুলনা করে তিনি বললেন :
‘তিনি ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করিয়া ইহার যত উন্নতি সাধন করিয়াছেন, সতীদাহ নিবারণে রাজা রামমোহন রায়, বিধবাবিবাহ প্রচলনে বিদ্যাসাগরও তত উপকার সাধন করিতে পারেন নাই।’
আপাতভাবে কালীপ্রসন্নের এই কথাকে অত্যুক্তি মনে হতে পারে; কিন্তু যদি আমরা রাজনৈতিক সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক ভাবনার দিক থেকে বিচার করি, তাহলে মনে হবে কালীপ্রসন্নের বক্তব্য সঠিক। দরিদ্র রায়তদের জন্য, নীলকরপীড়িত কৃষকদের জন্য, স্বাধিকারপ্রমত্ত শ্বেতাঙ্গ শাসকদের গতিকে রোধ করার জন্য হরিশচন্দ্র আজীবন কাজ করে গেছেন। স্বার্থহীন এই নিখাদ দেশপ্রেমিকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে কালীপ্রসন্ন প্রায় অশ্রুরুদ্ধকণ্ঠে বলেছেন :
‘গৌরব গ্রহণ, রাজদ্বারে সম্মান বা স্বদেশীয়ের নিকট সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া এক দিনের নিমিত্ত তাঁহার মনে উদিত হয় নাই। জন্মভূমির হিতানুষ্ঠানে কায়মনোবাক্য ও জীবন পর্যন্ত সংকল্প করিয়াছিলেন; বঙ্গসমাজে এবম্প্রকার লোক কয়জন জন্মিয়াছে? যিনি যে পরিমাণে বঙ্গদেশের শ্রীবৃদ্ধি করিয়াছেন, আমি প্রায় সকলেরই চরিত্র লক্ষ্য করিয়াছি; সুতরাং সাহস করিয়া বলিতে পারি যে, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় যেরূপ নিঃস্বত্তে ভারতবর্ষের শ্রী সাধনে উদ্যত হইয়াছিলেন, কোন মহাত্মা সে প্রকার মন প্রাপ্ত হন নাই।’
এদেশে রাজনীতির আলোচনা, শাসকের সমালোচনার পথিকৃৎ হরিশচন্দ্র :
‘কোন বাঙ্গালীই সাহস করিয়া রাজবিধি বিরুদ্ধে লেখনী চালন করেন নাই এবং নির্দিষ্ট নিয়ম সংশোধানার্থ সদুপায় নির্দ্ধারণে অসমর্থ ছিলেন, কিন্তু হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় উল্লিখিত বিষয়ে প্রথমে হস্তক্ষেপ করিয়া বাঙ্গালীদিগের উন্নতি সাধনে যত্নবান হইয়াছিলেন।’
নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা, সংসার যিনি ত্যাগ করেছিলেন, সেই হরিশচন্দ্রের কাছে দেশবাসীর অসীম ঋণ। কালীপ্রসন্ন তাঁর পুস্তিকায় নানাভাবে দেশবাসীকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি আকুলভাবে বলেছেন:
যদি আমাদের রামমোহন রায়ের নিকট, বিদ্যাসাগরের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বিধেয় হয়, তাহা হইলে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নিকট শতগুণে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।’