ভারতের কয়েকটি হন্টেড হাউস খোঁজ করতে গেলে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের একটা জায়গার নাম আসবেই, সেটা হলো— কালিম্পং-এর ‘মর্গান হাউস’। ভূত বাংলো (haunted house) হিসেবে পরিচিতি। গুগলে গিয়ে হন্টেড হাউস সার্চ করলে একেবারে শুরুর দিকেই এই বাংলোটার (morgan house) কথা পাবেন। ওই বাড়িতে দু-রাত কাটানোর কিছু অভিজ্ঞতা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই।
কালিম্পং আমার দেখা ছোট্ট সাজানো পছন্দের শৈলশহরের মধ্যে অন্যতম। আগে দু-বার কালিম্পং-এ থেকেছি, তখন মর্গান হাউসকে দূর থেকে দেখে এসেছি, কেমন একটা অমোঘ টান অনুভব করতাম বাড়িটির প্রতি। কি সুন্দর কাঠ দিয়ে বানানো পরিপাটি আভিজাত্যপূর্ণ বাংলো বাড়ি। ভূতে বিশ্বাসী নই— তাই বছরের শুরুতেই WBTDC তে online বুক করে শীতে কাঁপতে কাঁপতে পাহাড়ি শহরে এসে পড়ি। কালিম্পং শহর ছাড়িয়ে গাড়ি উপরে উঠলো বেশ খানিকটা— কি নিস্তব্ধতা চারপাশে, পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে গেছিলো। আগাম মধ্যাহ্নভোজের কথা বলা ছিল। তাই ঠান্ডায় হু হু করে কাঁপতে কাঁপতেই গরম ভাত, ডাল, ডিমের কারিকে অমৃত মনে হলো। এর অপর কারণ অবশ্য, সুন্দর সাজানো কাঠের ডাইনিং হল, কাঁচের ওপাশে লনের থেকে অপরূপ ফুলের শোভা দর্শন।

একেবারেই সাহেবি বাংলো। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে পোড়ো বাড়ি। দোতলা কাঠের বাড়িটিতে ৬টা মত গেস্টরুম আছে। আমরা যে রুমে ছিলাম, পরিমাপে সেটা আমাদের যে কোনো ঘরের দ্বিগুণ, সামনে বেড়িয়েই ব্যালকনি থেকে খোলা ছাদে যাওয়া যায়। আসলে, ভেতরটা ঝাঁ চকচকে করলেও বাইরের চেহারাটা ইচ্ছে করেই বদলানোর চেষ্টা হয়নি। বলা ভাল, উন্নয়নের নামে অহেতুক পাকামি করা হয়নি। কর্পোরেট আদল আনতে গেলে সাবেকিয়ানাটাই হারিয়ে যেত। আকাশ পরিস্কার থাকলে ঘরের জানলা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ রূপ দর্শন করা যায়।
আমরা যে সময়ে গেছি, মেঘে ঢাকা থাকায় সে সৌভাগ্য হয় নি। কিন্তু তাতে কোনো আক্ষেপ নেই! কারণ শীতের রাতে পাহাড়ি নির্জন এক শাপিত রাজপুরীতে থাকার মত অভিজ্ঞতা তো করে এসেছি। ৩-৪ জন কর্মচারী ছিলেন মোট আর রান্নাঘরে ৩ জন মত কর্মী। ঘরোয়া পরিবেশ— আমরা বাদে আর দুটো ঘরে মানুষজন ছিলেন, এক বয়স্ক দম্পতি আর এক সদ্য বিবাহিত যুগল।

বিকেলে কোনো কিছুই করার ছিল না, তাই আমরা সামনের সুন্দর সাজানো লনে বসে কিছু সময় কাটালাম। মেয়ে দৌড়ে ছুটে খেলে কাটালো। তারপর বাংলোর সামনের রাস্তা ধরে হাঁটলাম কিছু সময়। আর্মি ক্যাম্প, গল্ফ কোর্স— এ সবই চারিদিকে। আমাদের মত ট্যুরিস্ট কমই ছিল, তাও ওই সবাই দিনের দিন দেখে ফিরে যাচ্ছেন। রাস্তায় মারুতি গাড়ি যায় স্থানীয় বাজারে যাওয়ার জন্য। তাতে উঠে কালিম্পং বাজারে পৌঁছালাম সন্ধ্যায়। ঘুরে ফিরে, কিছু শীতবস্ত্র কিনে, চা কিনে, হালকা স্ন্যাক্স খেয়ে আবারও গাড়ি ধরে ফিরলাম ঐ নির্জনে। গাড়ির ভাড়া ঠিকঠাকই, বাইরের লোক বলে কোনো ঠকানোর ব্যাপার চোখে পড়লো না।
ফিরে এসে অনুভব করলাম, বাড়ির পরিবেশ কেমন অদ্ভুত শান্ত! রাতের খাবার ওরা রুমে দেবেন বলে গেলেন, কারণ তাড়াতাড়ি বন্ধ করে যে যার বাড়ি ফিরে যান। তাই অগত্যা, সন্ধ্যা ৭টাকেও কেমন রাত ১২টার মত মনে হতে লাগলো। দূরে ওই বয়স্ক দম্পতির ঘর থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আওয়াজ ভেসে আসছে। নিজেরা গল্পগুজব করে রাত ১০টার মধ্যে খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

পরের দিন, সকালে স্নান সেরে জল খাবার খেয়ে লাভা মনেস্ট্রি দেখতে বেরোলাম। তারপর কালিম্পং-এর কিছু সাইট সিন সেরে ডেলো পার্কে সময় কাটিয়ে দুপুরের খাবার ডেলোতে খেলাম। বিকেলে আবারও সেই নির্জনতায় ফিরলাম। আগের দিনের মতই একই অবস্থা— নিঝুম নিশুত রাতের হাতছানি সন্ধ্যা থেকেই।
এবার আসি, কথিত কথাতে— ১৯৩০ সালে পাট ব্যবসায়ী মি. মর্গান পাহাড়ের কোলে থাকবেন বলে এই বাংলো বানান। বিয়ের পর স্ত্রী-সহ ভালোই সময় কাটছিলো। কিন্তু সুখ বেশিদিনের ছিল না। Mrs. Morgan অল্পবয়সে মারা যান আর Mr. Morgan এই জায়গা ছেড়ে চলে যান। অনেকের মত, স্ত্রীর উপর অত্যাচার করতেন মর্গান সাহেব, তাই অকালে মারা যান কিংবা মেরে ফেলা হয় মিসেস মর্গানকে। তাঁর অতৃপ্ত আত্মাই নাকি ঘুরে বেড়ায় এই বাড়িতে। অনেকেই নাকি করিডরে হিল পড়ে হাঁটার আওয়াজ পেয়েছেন এখানে। স্বাধীনতার পরে সরকার এই বাড়ি অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে অনেক অভিনেতা, গায়কের অবসরযাপনের জায়গা এই বাড়ি। তার ছবিও এদের রিসেপশনে আছে।
এবার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি— বাড়িটা অপরূপ সুন্দর সাজানো, কাঠের মেঝে। আমি নিজে হিল জুতো পড়ি, তাই যখনই ওখানে সিঁড়ি দিয়ে উঠেছি, অদ্ভুত এক ঠকঠক আওয়াজের প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছি ফ্লোর জুড়ে। হয়ত লোক কম, অনেকটা জায়গা জুড়ে ঘর গুলো, ফাঁকা ফাঁকা— তাই নিজের হাঁটার আওয়াজের তীব্রতা অনুভব করেছি। আর রাতে খুব তাড়াতাড়ি সবাই ঘুমায়, আসেপাশে কোনো জনমানুষ্যি না থাকায় সামান্য গাছ থেকে ডাল এসে কাঠের ছাদে পড়া, কিংবা বাথরুমের জলের কলের টুপটাপ পড়া, গাছের কোটরে ঘুঘুর বাসার ডাক, পায়রাদের ছাদে ঠুকঠুক করা— এ সবই একটা ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি করে।
নিঝুমতা, নিস্তব্ধতা, পাহাড়ি নৈশব্দ সব মিলেমিশে এই বাড়িকে এক অলীক মায়াজালে আবদ্ধ করে রেখেছে। তাই তো এর আকর্ষণ দুর্নিবার, আবার গল্পগাঁথাও অনেকরকম। তবে আমরা এক অন্যরকম দুটো দিন কাটিয়েছি ওখানে।
কর্মচারীদের ব্যবহার বেশ ভালো, ঘরোয়া খাবার… গাড়ির ব্যবস্থাও ওরা করে দেন। তাছাড়াও মূল বাড়ির নীচে সরকারি annexure building ও আছে। বুকিং wbtdc এর সাইটে হয়। আমরা যে রুমে ছিলাম সেটির ভাড়া ৩০০০ টাকা করে প্রতি রাত। এছাড়া খাবারের খরচ মোটামুটি ঠিকঠাক।