ইতিহাস কী? কারা তা লেখেন, কারাই বা পড়েন? ইতিহাসের কি কোনো গোত্র আছে? ভালো কিংবা মন্দ ইতিহাস? ইতিহাস কি বিজয়ীর আখ্যান, না কি বিজিত-র? ইতিহাসের পাতা উল্টোতে উল্টোতে এমন কত কথাই তো মনে আসে। আর ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করতে পৌঁছে যাওয়া যায় যদি এমন জায়গায় যেখানে ইতিহাস রচিত হয়েছিল? নবাবি আমলের ইতাহাসকে স্পর্শ করতে ঘুরে আসতেই পারেন মুর্শিদাবাদে। সেখানে ইতিহাস আজও কথা বলে। মুর্শিদাবাদের অন্যতম আকর্ষণ হাজারদুয়ারি রাজপ্রাসাদ। ১৮৩৭ সালে ডিসেম্বর মাসে হাজারদুয়ারি প্রাসাদের নির্মাণের কাজ শেষ হয়। ২০২২ সালে হাজারদুয়ারি ১৮৫ বছব বয়স পার করল।

ব্রিটিশ কোম্পানির আমলে বাংলার এক বৈচিত্রময় ঐতিহাসিক নিদর্শন হাজারদুয়ারি। মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগে হাজারদুয়ারি অবস্থিত। মুর্শিদাবাদ রেল স্টেশন থেকে এর দূরত্ব ২ কিলোমিটার। হাজারটা দরজা থাকার জন্য প্রাসাদটির নাম হয়েছে হাজারদুয়ারি। তবে প্রতিটি দরজা আসল নয়। ৯০০টি আসল ও ১০০টি নকল দরজা। শক্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্য নকল দরজা করার সিদ্ধান্ত। হলুদ প্রাসাদের সবুজ দরজাগুলি দেখলে বোঝার উপায় নেই কোনটা আসল, কোনটা বা নকল! ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত প্রাসাদটি তৈরি হয়েছে নবাব হুমায়ুন জা-র আমলে। তিনি ছিলেন মিরজাফরের পঞ্চম পুরুষ বংশধর। ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার জেনারেল ম্যাকলাউডের তত্ত্বাবধানে ১৮২৯ সালের ২৯ আগস্ট নবাব হুমায়ুন জা এই প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সমগ্র প্রাসাদটি ৪২৪ ফুট দৈর্ঘ্য, ২০০ ফুট চওড়া ও ৮০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট। এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল তৎকালীন সময়ে প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা।

সুবিশাল সবুজ উদ্যানে ইউরোপীয় স্থাপত্য শিল্পের রীতিতে তৈরি এই প্রাসাদটি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ কোম্পানি ও নবাবি আমলের কাহিনির এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। তৎকালীন সময়ের জলছবি ফুটে ওঠে হাজারদুয়ারিতে প্রবেশ করলে। বিশ্বাসঘাতকতা, প্রভুত্ব, আত্মবলিদান, বীরত্ব, প্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে হাজারদুয়ারির প্রতি রন্ধ্রে। সমগ্র প্রাসাদটি বর্তমানে ভারতবর্ষের পুরাতত্ত্ব বিভাগ পরিচালিত একটি মিউজিয়াম। ৪১ একর জায়গা নিয়ে হাজারদুয়ারি তৈরি হয়েছে। প্রাসাদের সামনের একতলা পর্যন্ত রয়েছে ৩৭টি সিঁড়ি। সিঁড়ির দুপাশে দুটি সিংহমূর্তি ও দুটি সেলামি কামান আছে। হাজারদুয়ারির প্রাসাদ তৈরির সঙ্গে সিরাজদৌল্লার কোনো সম্পর্ক নেই। সিরাজ মারা যাবার অনেক পরে প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন সময়ে মূলত এই প্রাসাদ বিচারের কাজে ব্যবহার করা হতো। এর তিনতলায় নবাবদের থাকার ঘর ছিল। এখনও তা আছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ সেখানে ঢুকতে পারে না। দোতলায় আছে দরবার হল (তৎকালীন সময় এখানে বিচার করা হতো), পাঠাগার ও অতিথিশালা, বৈঠকখানা ও খাবার ঘর। পাঠাগারেও দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ। টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয় হাজারদুয়ারির সংগ্রহশালায়। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এটি। সংগ্রহশালাটি ২০টি গ্যালারি নিয়ে তৈরি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সংগ্রহশালায় প্রবেশ করলে প্রথমে চোখে পড়বে নবাবি আমলের দুটি পালকি। একটির বাহক উট অপরটির হাতি। আর আছে ব্রিটিশদের ব্যবহার করা একটি গাড়ি। তারপর দরবার হলে ঢোকার সময় চোখ আটকে যাবে সুবিশাল ঝাড়লণ্ঠনটি দেখে। রানি ভিক্টোরিয়া নবাবকে উপহার স্বরূপ দিয়েছিলেন এটি। এছাড়া আছে রূপোর সিংহাসন। এই সিংহাসনে বসেই নবাব বিচারকাজ চালাতেন। সিংহাসন সংলগ্ন জায়গায় বসত বিচারসভা। সেই সভায় ইংরেজদের ও ভারতীয়দের বসার জায়গা আলাদা ছিল।

প্রাসাদের চারপাশে এখনও জ্বল জ্বল করছে ডাচ, ফরাসি ও ইতালিয়ান শিল্পীদের অসাধারণ তৈলচিত্র। মার্বেল পাথরের মূর্তিগুলি স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন বহন করছে। এখানের আর্ট গ্যালারিটে আছে হাসান আলি মির্জা ও হুসেন আলি মির্জার শৈশবের ছবি। এই ছবির বিশেষত্ব হলো ছবিটি যেদিক থেকেই দেখা হোক না কেন, মনে হবে শিশুদুটি যেন দর্শকের দিকেই ঘুরে আছে। এছাড়া সংগ্রহশালায় আছে নবাবদের নিত্য-ব্যবহারের মার্বেল ও চিনামাটির তৈরি একাধিক সামগ্রী। খাবারে বিষ মিশিয়ে গুপ্ত হত্যা রুখতে সেই সময় বৈজ্ঞানিক উপায়ে তৈরি করা হয়েছিল এক ধরনের বিশেষ থালা, বিষ মেশানো খাবার থালায় দিলে থালাটির রং পাল্টে যেত। সংগ্রহশালায় আজও রাখা আছে সেই থালা। এছাড়াও আছে সোনা-চাঁদির প্লেট, বাটি, চামচ, হাতির দাঁতের পাল্কি, বিশাল আকৃতির কুমির ও লুপ্তপ্রায় পাখির মমি। হাজারদুয়ারি সংগ্রহশালার বিশেষ আকর্ষণ দুটি আয়না। আয়নাগুলি এমন ভাবে তৈরি হয়েছে যাতে পাশে থাকা অন্য মানুষকে দেখা গেলেও নিজেকে দেখা যায় না। এটিও নবাবের সুরক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল। পশ্চাৎ থেকে আক্রমণ হলে নবাব এই আয়নার দ্বারা ঘাতককে দেখে ফেলতে পারতেন কিন্তু ঘাতক নিজেকে আয়নায় দেখতে পেত না। আজও সেই আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় না, যদিও পাশের সবাইকে দেখতে পাওয়া যায়। হাজারদুয়ারি সংগ্রহশালার আর একটি আকর্ষণ তৎকালীন সময়ে ব্যবহৃত প্রায় ২ হাজার ৬০০ অস্ত্র-শস্ত্র। প্রাসাদের এক তলায় আছে এই অস্ত্রাগার। পলাশির যুদ্ধে বা তার আগে নবাবপক্ষের ব্যবহৃত অস্ত্র যেমন আছে, ইংরেজদের ব্যবহৃত রাইফেল, বন্দুক-ও আছে। আছে আলিবর্দি খাঁ, সিরাজ-উদ-দৌল্লা, মিরকাশেমের তলোয়ার, মহম্মদ বেগের ছুড়ি — যা দিয়ে সিরাজকে হত্যা করা হয়েছিল। আছে মীর-মদন কামান। এছাড়া দেখতে পাওয়া যাবে যুদ্ধে ব্যবহৃত বর্ম, ঢাল, তির ইত্যাদি।

হাজারদুয়ারির সঙ্গে সত্যিই কি সিরাজের কোনো সম্পর্ক নেই? হ্যাঁ আছে। হাজারদুয়ারির সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বাঁদিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে একটি মসজিদ যা ‘সিরাজের মদিনা’ নামে পরিচিত। সিরাজদৌল্লার শাসনকালের স্থাপত্য শৈলী এটি। শোনা যায় মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে সিরাজ দৌল্লা কারবালা থেকে মাটি এনে স্থাপন করেছিলেন এই মসজিদ। একসময় এর দরজা মূল্যবান রত্ন খচিত থাকলেও আজ তা অনুপস্থিত। বহু কালের ধুলো জমে আছে এখানে। মিরকাশিম মুঙ্গেরে রাজধানী স্থানান্তরিত করবার সময় মদিনার মূল্যবান রত্ন খুলে মুঙ্গেরে নিয়ে যান বলে শোনা যায়, যদিও এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্য খুঁজে পাওয়া যায় না। এই মসজিদের সামনে আছে ১৮ ফুটের একটি কামান। ওজন প্রায় ১৭ হাজার পাউন্ড। সেই কামানে একবারই তোপ দাগা হয়েছিল। তোপের বিকট আওয়াজে গর্ভবতী মায়ের সন্তান প্রসব হয়ে গিয়েছিল বলেও শোনা যায়। সেই থেকে কামানটির নামকরণ হয় ‘বাচ্চাওয়ালি তোপ’। এলাকাবাসীর কথা ভেবে তার পর থেকে এই কামানটি ব্যবহার করা হয়নি। হাজারদুয়ারি প্রাসাদের সিঁড়ি থেকে সবুজ প্রান্তরের ওপর দেখা যায় এক বিশাল ইমামবারা। ১৮৪৭ সালে নবাব মনসুর আলি এটি তৈরি করেছিলেন। এটি ভারতের বৃহত্তম ইমামবারা। এছাড়া হাজারদুয়ারি-চত্বরে আছে ক্লক টাওয়ার। হলুদ রঙের টাওয়ারটির ঘড়ির কাঁটা আজ স্তব্ধ। হয়ত সময়ের এই স্তব্ধতা ইঙ্গিত করছে নবাবি আমলের দিকে। হাজারদুয়ারির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভাগীরথীও গল্প শোনায়, রোমাঞ্চ জাগায় বর্তমান প্রজন্মের মনে। প্রশ্ন জাগায় পলাশির যুদ্ধের ইতিহাস কি শুধু মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ও ইংরেজদের ক্ষমতা-লালসার ফল? সিরাজের ভোগ সর্বস্ব জীবন-যাপন, অপারদর্শিতা, অহঙ্কার কি পলাশির যুদ্ধে ইন্ধন জোগায় নি? যে মহম্মদি বেগ সিরাজদৌল্লার পিতার অন্নে প্রতিপালিত হয় সে কেন সিরাজের বুকে ছোঁড়া বসাবে, যেখানে মিরজাফরের ছেলে মিরন উপস্থিত? এখানেই শেষ নয় মনে আরও রহস্য ঘনীভূত হয় যখন দেখা যায় আলিবর্দি খাঁ ও সিরাজউদ্দৌল্লার সমাধির পাশে আজও আছে মহম্মদি বেগের সমাধি! নবাবি আমলের ইতিহাসের দিকে তাকালে এরকম বহু প্রশ্ন মনে উঁকি দেয়। এখানেই জানতে ইচ্ছে করে, ইতিহাসের কি কোনো গোত্র আছে? ভালো কিংবা মন্দ ইতিহাস? ইতিহাস কি বিজয়ের আখ্যান, না কি বিজিত-র? উত্তর মেলে না!