তিনি শ্রী রবীন্দ্রনাথ। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমার একমাত্র পরিচয় কবিমাত্র”। তাই কী? হয়ত তাই কিংবা নয়! তাহলে শিল্পী, দার্শনিক, শিক্ষাব্রতী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, চিন্তানায়ক রবীন্দ্রনাথ, গানে, গল্পে, উপন্যাসের রবীন্দ্রনাথ কে? হয়ত অলকান্দার জলে হৃদি ভেসে যায় যে মানুষটার , যে মানুষটা আসলে কোন ঠাকুর নন, নন কোন গুরুদেব ; বড্ড আপন যে জন হৃদিমাঝে খুঁজে ফেরে প্রকৃতির স্নেহ ছায়াতল, সেই তিনি — শ্রী রবীন্দ্রনাথ
সন্ধ্যা হল গো ও মা
সন্ধ্যা হল বুকে ধর
অতল কালো স্নেহের মাঝে
ডুবিয়ে আমায় স্নিগ্ধ করো
এমন রবীন্দ্রনাথ অহরহ আমাদের ঘিরে থাকেন। অনেক অনেক গম্ভীর উচ্চারণে যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের থেকে আলোকবর্ষ ব্যবধানে সরে সরে যান, তিনি তো তেমন নন। এও আমাদের এক ভ্রান্তি। চেনা মানুষটাকে ধুপ ধুনোয় ঢেকে দিয়ে তাঁকে দূরের মানুষ করে তুলি। ‘বীরপুরুষ’ এর খোকার কথা আমরা কজন মনে রাখি—
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার’ পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধুলোর মেঘ উড়িয়ে আসে
দস্যুদের হাত থেকে এই বীরপুরুষ খোকাকে দেখে মা ভাবেন, “ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল, কী দুর্দশাই হত তা না হলে।” স্বামী দেবেন্দ্রনাথ তখন হিমালয় ভ্রমনে। খবর এল রুশীরা ভারত আক্রমন করতে পারে। এই গুজবে বিচলিত মা সারদা দেবী বাড়ির বড়দের কাছে সহানুভূতি না পেয়ে শিশু রবির শরনাপন্ন। ‘জীবনস্মৃতি’ তে রবীন্দ্রনাথ বলছেন” রাশিয়ানদের খবর দিয়ে কর্তাকে একখানা চিঠি লেখো তো। মাতার উদ্বেগ বহন করিয়া পিতার কাছে সেই আমার প্রথম চিঠি। তাঁর পত্রের সংখ্যা অগুন্তি, সেই নিয়ে গ্রন্থ, গ্রন্থ সমালোচনা, বিশ্লেষণ, টীকা পাদটীকা— মানুষ রবি কোথায়? মায়ের জন্য উদ্বেগ, মায়ের নিরাপত্তায় রূপকথার রাজপুত্রের মত মাকে আগলে রাখা, বাবার জন্য চিন্তা— এই তো আমাদের ঘরের ছেলে, বড্ড চেনা।
বাল্যকালে মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত ছিলেন রবিন্দ্রনাথ। জন্মের কিছুকাল পরেই বাড়ির রীতি অনুযায়ী মায়ের কোল থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন দাসীর কোলে। আর একটু বড় হওয়ার পর নির্বাসন ঘটে বাহির মহলে, চাকরদের কাছে। মাকে না পাওয়ার যন্ত্রণা পরিনত বয়সেও ব্যথিত করত তাকে।এছাড়াও মা’ যে ঠাকুর বাড়ীতেও তেমন গূরুত্ব পেতেন না, রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন। ঠাকুর বাড়ীতে অনেকসময় বউ আনা হত গরিব ঘর দেখে, যাতে পিরালী ব্রাম্ভনদের জাতপাতের হিসেব ঠিক থাকে। রবীন্দ্রনাথ সমাজে মেয়েদের প্রান্তিক রূপ দেখেছিলেন, উপলব্ধি করেছিলেন তাদের যন্ত্রনা, কষ্ট, বেদনা। তাদের সামাজিক অবস্থান। আর যদি সে সাধারণ ঘরের মেয়ে হয় তাহলে তার যন্ত্রণা দীর্ন জীবনের ছবি কেমন হয় তাও রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন তাঁর ‘শিশু ভোলানাথ’ এ ‘রবিবার’ কবিতায়,
রবিবার যে কেন মাগো
এমন দেরী করে ?
ধীরে ধীরে পৌঁছোয় সে
সকল বারের পরে ?
আকাশপারে তার বাড়িটি
দূর কি সবার চেয়ে ?
সে বুঝি, মা, তোমার মতো
গরিব ঘরের মেয়ে?
যাবার বেলায় যায় সে কেঁদে
মোদের মুখ চেয়ে
সে বুঝি, মা, তোমার মত
গরিব ঘরের মেয়ে?
মায়ের জন্য শিশুর ব্যাকুলতা, মায়ের বঞ্চনা ও অভাবের জন্য প্রান কাঁদা— এই তো আমাদের রবীন্দ্রনাথ। বংশপরিচয়,পারিবারিক আভিজাত্য, উচ্চকোটির আবেষ্টনে বদ্ধ রবীন্দ্রনাথ সাধারণের নাগালের বাইরে ছিলেন— এমত ধারণা স্বাভাবিক। কিন্তু না, তাঁর জমিদারীতে, তাঁর ব্রম্ভচর্যাশ্রমে তিনি ছিলেন আটপৌরে এক বাঙালি। কেউ তাঁকে দেখে ভয় করেনি, সঙ্কোচ করেনি, মনেও ভাবেনি তিনি ধনী, সম্ভ্রান্ত, মহাসম্মানী,নাগরিক অভিধায় বিশ্বকবি! প্রজারা নির্ভয়ে তাঁর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিত, বয়স্করা তাঁকে প্রায়শই ‘তুই’,’তুমি’ বলে সম্বোধন করত। পল্লির নিভৃতে, কোন নদির ঘাটে, কোথাও কোন বটতলায়, কোন গৃহকোণে দুই বিঘা জমির উপেন, পুরাতন ভৃত্য কেষ্টা, মাসির বুকের ধন রাখাল, স্বামিহারা মল্লিকা, কুড়ি টাকা মাইনের পোস্টমাস্টার,একতারা হাতে কন্ঠিগলায় বাউল, নিঃসন্তান জয়কালি ঠাকুরুন, চিরদুখিনি বিন্দুবাসিনি, স্নেহকাঙ্গালিনি কাকিমা, গোবেচারি রামকানাই- এই রকম প্রান্তিক মানুষ তাঁর অন্তরে জায়গা করে নিয়েছিল। তাঁর আগে এমন ঘরোয়া জীবনের কাহিনী তেমন ভাবে কেউ চিত্রিত করেন নি। এতখানি দরদ দিয়ে দেখেনও নি। এসব চরিত্র এসেছে স্বাভাবিক ছন্দে, কোন ফরমায়েসী চরিত্র হিসেবে নয়। তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা এসেছে প্রান্ত জীবন থেকে, তৃণমূল স্তর থেকে- এরা ড্রইংরুমে পিয়ানো বাজায় না, চা খায়না, টেনিস খেলতে খেলতে খিল খিল করে হাসেনা, ইংরেজি বলেনা । এরা ডাবা হুঁকোয় তামাক খায়, খালি পায়ে মাঠে যায়, হরির লুঠে নেচে কুঁদে গান গায়, তিলক কাটে, মিথ্যে সাক্ষ্য দেয়না, জমিদারের কাছে হাতজোড় করে, প্রয়োজনে লাঠিও ধরে। শ্রেনীচ্যুতির বাগাড়াম্বার রবীন্দ্রনাথের ছিলনা, ছিল এক উদার মানবিক মন।
তিনি ছিলেন আলোকপ্রাপ্ত জমিদার। শিলাইদহের পুণ্যাহ সভার কথাই ধরি। জমিদার কাছাড়িতে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান মহা-সমারোহে পালিত হত। প্রকাণ্ড পাল্কিতে চেপে জমিদার বাবু কাছাড়িতে আসতেই বন্দুকের আওয়াজ, রোশনচৌকির বাদ্যে, প্রজাদের জয়ধ্বনি, মেয়েদের উলুধ্বনি আর শঙ্খরবে কাছাড়ি প্রাঙ্গন মুখরিত হয়ে উঠত। জমিদারবাবুকে ফুলমালা ও চন্দন টিপ দিয়ে আশীর্বাদ করা হত। মাতব্বর প্রজারা ও কাছারির আমলারা জমিদারের স্তুতি করতেন। কিন্তু সেবার ঘটল বিপত্তি।তরুন জমিদার রবীন্দ্রনাথ সিংহাসনে বসলেন না, কাছারির দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন। পুণ্যাহ সভায় প্রজাদের মর্যাদা ও জাতিবর্ণ অনুযায়ী বিভিন্ন রকমের আসনের বন্দোবস্ত থাকত। হিন্দুরা একধারে, তার মধ্যে আবার ব্রাম্ভনরা পৃথক ভাবে, মুসলমানদের স্বতন্ত্র ব্যবস্থা, এমন কি কাছারির অন্যান্য আমলাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী পৃথক পৃথক আসন। তরুণ জমিদার জানতে চাইলেন— বসার জন্য এত বিভিন্ন রকমের আয়োজন কেন? সদর নায়েব উত্তর দিলেন-এটাই ত রীতি। চলে আসছে সেই কবে থেকে। ব্যাথিত হলেন রবীন্দ্রনাথ। এমন একটা শুভ উৎসবেও আমাদের মিলনে এত বাঁধা , এত ভেদবুদ্ধি! এসব আসন উঠিয়ে দিন, একাসনেই উৎসবের সার্থকতা। পরবর্তী সময়ে ‘লোকহিত’ প্রবন্ধেও তিনি বলেছিলেন,কাছারিতে মুসলমান প্রজাদের মাদুর তুলে বসতে হয়, দাওয়ায় ওঠার অধিকার নেই তাদের-তারা কেন ‘এক হও’ বলে ডাকলে সাড়া দেবে?
এই ছিলেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ। মানুষ রবীন্দ্রনাথ। কত কথা কত জনে বলে। তিনি দর্পী, তিনি দাম্ভিক,তিনি বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত, তিনি অত্যাচারী জমিদার। অথচ অসহায় সময়ে, পরিনত জীবনে তিনিই হয়ে ওঠেন আর্তের আশ্রয়। তাঁর আবাহন আছে, বিসর্জন নেই। এক লাথি মেরে তিনখানি রবীন্দ্ররচনাবলী যিনি পাপোশে ফেলেন, তিনিই আবার ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ এ আশ্রয় খুঁজে পান। মূর্তি ভাঙ্গার কারিগররা তাঁকেই আশ্রয় করেন। বুর্জোয়া তিনি সময়ের সাথে সাথে সাম্যের প্রতীক হন।
এই আমাদের রবীন্দ্রনাথ। তিনি আমাদের হৃদয়ের গ্রন্থি, সময়ের বন্ধু। এক অখ্যাত অগ্রজ কবির কথা ধার করে বলতেই পারি—
বুঝতে পারি, যে বাড়িতে রবীন্দ্র গান বাজে
তারা সমাজবিরোধী হয়না
যে ভিটেয় তার আসন, সেখানে মৌলবাদী নেই।
যে ঘরে তিনি পঠিত, সে ঘর
কোন জঙ্গির জন্ম দেয়না
তিনিই আমাদের শ্রী রবীন্দ্রনাথ।